কানাডায় চাকরি খুঁজে পেতে এতো দীর্ঘ সময় লাগে কেন?

প্রবাসী কন্ঠ ডেস্ক : একজন সাবেক ক্যারিয়ার বিষয়ক পরামর্শক একসময় আমাকে বলেছিলেন, চাকরি খোঁজার সময়সীমার সঙ্গে প্রত্যাশিত বার্ষিক বেতনের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।  তিনি দাবি করেন প্রতি ১০ হাজার ডলার প্রত্যাশিত বেতনের জন্য চাকরি গড় অনুসন্ধান এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বলা হয়ে থাকে, বার্ষিক ৫০ হাজার ডলার বেতনের চাকরি খুঁজে পেতে গড়ে ৫ মাস সময় লাগে।তবে এই ফর্মুলার বাস্তব কোন ভিত্তি নেই অথবা একে সমর্থন করার মত কোন তথ্য উপাত্ত্বও নেই; এই পর্যবেক্ষণ আস্থা রাখার মতো না হলেও চাকরির বাজারে ঢুকার সময় চাকরি প্রার্থীরা কি প্রত্যাশা করবে এ বিষয়ে এটি একটি বাস্তব মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। চাকরি খুঁজে পেতে সময় লাগে; একটি চমৎকার চাকরি পেতে আরো বেশি সময় লাগে। যদিও এটি মন খারাপ করে দেয়ার মত কথা তারপরও এর পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়োগ বিষয়ক ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময় কিছু বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সেগুলো হচ্ছেঃ

সময়ভেদে চাকরীর বাজারের উঠা-নামা

অনেকটা ফলের মতোই চাকরির বাজার খুবই মৌসুমি এবং অনেক সময় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। কিছু কোম্পানি তাদের অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করতে বছরের শুরুতেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে। জানুয়ারিতেই ব্যবস্থাপকদের কাছে বার্ষিক বাজেট  দিয়ে দেয়া হয় এবং কাল  বিলম্ব না করে তা কাজে লাগাতে আগ্রহী থাকে। তাই বছরের শুরুতেই চাকরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি তুলনামূলক বেশি থাকে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কোন কোন কর্ম বাজারে গ্রীষ্মকালে মন্থর গতি চলে আসে কারণ ওই সময় ছুটি থাকে। কৃষি বা নির্মাণ খাতের মতো মৌসুম ভিত্তিক চাকরির ক্ষেত্রগুলোতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কর্মী নিয়োগ করা হয়ে থাকে।

করপোরেট সময়

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোম্পানি যত বড় তাদের কাজের গতিও তত মন্থর। বড় বড় কোম্পানি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে প্রতিটি পদের জন্য হাজার হাজার আবেদনপত্র জমা পড়তে পারে। তাই যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করতে এসব কোম্পানির নিয়োগ টিম বেশ চাপের মধ্যে থাকে এবং তাদের কাজের গতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে।  এছাড়া, বিস্তৃত করপোরেট পরিবেশে, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নীতিও নিয়োগ চক্রের সময়সীমাকে প্রভাবিত করে; একটি শূণ্যপদের বিজ্ঞাপন দিতে এসব কোম্পানিকে বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন দরকার হয় এবং চাকরি প্রার্থীকেও দীর্ঘ স্বাক্ষাতকার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।যারা খুব বড় কোম্পানিতে কাজ করেন, সেখানে সিদ্ধান্ত আসতে বিলম্ব হতে পারে, এতে তাদের অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পরিবর্তনের শর্তাবালী

চাকরিতে নিয়োগের আগ পর্যন্ত শূণ্য পদের জন্য প্রদত্ত শর্তাবলী পরিবর্তিত হওয়ার ঘটনা কোন কোন কোম্পানির ক্ষেত্রে মোটেই অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণস্বরুপ, যখন কোন শূণ্যপদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, তখন প্রথমেই এমন কাউকে খোঁজা হয় যার ওই পদে কাজ করার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা আছে।এটা অনেক ক্ষেত্রেই কাজে দিতে পারে, আবার এটাও অসম্ভব নয়, যে পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেই পদেরই পরিবর্তন হতে পারে এবং কোম্পানি এটা বুঝতে পারে কয়েকজন চাকরীপ্রার্থীর স্বাক্ষাতকার নেয়ার পর। চাকরির শর্তাবলীতে যদি একটি পরিবর্তন হয় তাহলে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়। তা কয়েক সপ্তাহ তো বটেই এমনকি মাসও লেগে যেতে পারে।

/নির্বাচিত হবার ক্ষমতা

অর্থনৈতিক মন্দার সময় যোগ্য চাকিরি প্রার্থীর তুলনায় কর্মক্ষেত্রের পরিমাণ কমে যায়।( এটা না বললেই নয় যে, অর্থনৈতিক মন্দার সময় চাকরি পাওয়াটা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়)এ সময় কোম্পানিগুলো একজন যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় সিলেক্টিভ হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া এমনিতেই ব্যয়বহুল তারওপর কম যোগ্যতা সম্পন্ন কাউকে নিয়োগ দেয়া আরো ব্যয়বহুল। যদি এমন হয় যে কারো যোগ্যতার সঙ্গে মেলে এমন কাজের ক্ষেত্রগুলোতে চাকরির স্বল্পতা দেখা দেয়, তাহলে তাকে চাকরি খোঁজার জন্য দীর্ঘ সময় দিতে হতে পারে।

দ্ব্যর্থবোধকতা

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, কিছু কোম্পানি আসলে জানেই না তারা কোন ধরণের কর্মী চাচ্ছে।একজন নিয়োগ ব্যবস্থাপন আমাকে একবার বলেছিলেন, স্বাক্ষাতকারের সময় তিনি নিজেও জানতে না তিনি কেমন প্রার্থী খুঁচ্ছেন। কিন্তু তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যোগ্য প্রার্থী দেখলে তিনি বুঝতে পারবেন-তিনি কি চান। এ ধরণের পদ্ধতিকে বৈধতা দেয়া অসম্ভব এবং এরসাথে যারা জড়িত তাদের সবার জন্যই এটা অসুবিধাজনক। সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক শর্তাবলী না থাকলে নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেক বেশি দীর্ঘ হতে পারে; বিভিন্ন ধরণের যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক প্রার্থীর স্বাক্ষাতকার নেয়া সময় ও প্রচেষ্টার অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রচেষ্টা

এতোসব সত্ত্বেও, কম হলেও কিছু নিয়োগদাতা আছেন যারা সত্যিকার অর্থেই দক্ষ ও যোগ্য প্রার্থী খোঁজেন। তুমি যতটুকু চেষ্টা করবে তোমার চাকরি খোঁজা ঠিক ততটুকু সফল হবে। কেউ কেউ বলেন, চাকরি খোঁজাটাই ফুল টাইম জবের মতো। এতে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ দক্ষতা, অধ্যাবসায় ও সময়ের প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট পরিমাণ চেষ্টা করতে প্রস্তুত না হলে সফলতা পাওয়ার আশা করা যায় না।

যদি তোমার সামনে কোন সুযোগ আসে তাহলে সবচেয়ে উত্তম ভূমিকা হবে শান্ত থাকা এবং স্মরণ রাখা যে এতে সময় লাগবে। অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় চাকরির বাজার অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং তোমার চূড়ান্ত সফলতার পেছনে অনেক বিষয় কাজ করবে।সবশেষে, তোমাকে মনোযোগী, সচেষ্ট ও ইতিবাচক থাকতে হবে, যেমন তোমার মা সব সময় বলেন, সবুরে মেওয়া ফলে।

মন্তব্য