প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী অপরাজিত ৩০ বছর

Prasenjit-Chatterjeeপ্রবাসী কন্ঠ ডেস্ক: দিনের পর রাত আসে। রাতের পর আবার দিন। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে, থাকবে। কিন্তু প্রসেনজিতের মতো গুণী অভিনেতা কি আর দ্বিতীয়টা টালিউড পাড়ায় জন্ম নেবে? প্রশ্নটা থেকেই যায়। কারণ, সময়ের বাহনে চড়ে অনেক অভিনয় শিল্পী এসেছেন, আসছেন, আসবেন। তবে তিনি একজনই, যিনি টালিউড পাড়ায় অভিনয় দক্ষতায় অপরাজিত টানা ৩০ বছর।

৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৬২। ভারতের কলকাতায় জন্ম নেন তিনি। রক্তেই ছিল অভিনয়ের বীজ। তাঁর বাবা পরিচালক ও অভিনেতা বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী। দিনের পর দিন চলচ্চিত্র ভুবনে বাবার সৃষ্টিশীল কাজ তাঁর মনে অনেকটা অংশ জুড়ে জায়গা করে নেয়। ঠিক করেন বড় হয়ে অভিনেতা হবেন। ছোটবেলা থেকে তাই অভিনয়কে নিত্য সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছেন প্রসেনজিৎ। অভিনয় জগৎকে ভেবেছেন আরেকটি পরিবার। অদম্য স্পৃহা আর কঠোর পরিশ্রম আজ তাই তাঁকে এনে দিয়েছে সফলতার মুকুট। সময়ের প্রয়োজনে আর দর্শকের চাহিদানুযায়ী তাই প্রয়োজনে কখনও নিজেকে ভেঙ্গেছেন আবার কখনও বা গড়েছেন।

চলচ্চিত্র জীবনে আত্মপ্রকাশ শিশুশিল্পী হিসেবে। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর বাবা বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী পরিচালিত ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবির মাধ্যমে। এরপর অনেকটা সময় পেরিয়েছে। তাঁকে আর পর্দায় দেখা যায়নি। তবে পর্দায় না থাকলেও তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবা বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জীর শূটিং ইউনিটে দেখা যেত। ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন পুরো ইউনিট। দেখতেন মুগ্ধ হয়ে অপরের অভিনয়। তখন তাঁর মনে বাসনা জাগে নায়ক হবেন। কারণ, তাঁর দৃষ্টিতে নায়ক সব কিছু পারেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তে পারেন, খেলাধুলায় জয়ী হতে পারেন, পরিবারের সদস্যদের ভালবাসতে জানেন, প্রেম করতে পারেন, ছোট বোনের সঙ্গে খুনসুটি করতে পারেন, পড়ালেখায় সাফল্য অর্জন করতে পারেন, ভাল চাকরি পেতে পারেন, কবি হয়ে কবিতা লিখতে পারেন, গু-াদের সঙ্গে মারপিট করতে পারেন, রাজনীতি করে জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারেন, মোটা অঙ্কের উপার্জন করতে পারেন এবং সবশেষে একটা ফুটফুটে মেয়ে দেখে বিয়েও করতে পারেন। বিষয়গুলো তাঁকে প্রতিনিয়ত দোলা দিতে থাকে। বুকের মাঝে লালিত এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন প্রসেনজিৎ। শুরু করেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বই-পুস্তক ঘাটতে, নায়ক-নায়িকাদের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে, সফল অভিনেতা হওয়ার সব রকমারি কৌশল আয়ত্ত করার সুপ্ত রহস্য উদ্ঘাটনে। এসব কাজে বরাবরই বাবা বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জীকে তিনি পাশে পেয়েছেন। অবশেষে ১৯৮৩ সালে নায়ক হিসেবে অভিষেক ঘটে ‘বুম্বা দা’ খ্যাত নায়ক প্রসেনজিতের। ছবির নাম ‘দুটি পাতা।’ পরিচালক ছিলেন বিমল রায়। বিমল রায় তাঁর অভিনয় দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘একদিন তুমি অনেক দূর যাবে, সফলতা হবে তোমার নিত্যসঙ্গী। আমার আশীর্বাদ তোমার সঙ্গেই থাকবে সারাক্ষণ।’ সেই আশীর্বাদ বিফলে যায়নি। আজ প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী রীতিমতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন টালিউড পাড়া। দর্শকদের উপহার দিয়ে চলেছেন একের পর এক সুস্থধারার চলচ্চিত্র। টালিউডের গন্ডি পেরিয়ে বলিউডেও রয়েছে তাঁর উপস্থিতি। তবে তাঁর একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ছবির স্ক্রিপ্ট ভালভাবে না পড়ে কিংবা শুনে তিনি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন না। আর এ জন্যই তাঁর বুঝি আজ এত যশ-খ্যাতি।

তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে- দুই পৃথিবী, প্রতিশোধ, অপরূপা, দুটি পাতা, অগ্রদানী, জীবন মরণ, দাদামণি, পূজারিণী, শত্রু, সোনার সংসার, নীলকণ্ঠ, তিল থেকে তাল, লাল মহল, পরিণতি, জীবন, আতঙ্ক, পথভোলা, বর্ণা, মধুময়, তিন পুরুষ, প্রেম বন্ধন, অর্পণ, আপন ঘরে, সম্র্রাট ও সুন্দরী, স্বর্ণময়ের ঠিকানা, বিক্রম সিংহ : দ্যা লায়ন ইজ ব্যাক, সাংহাই, মাদ্রাজ ক্যাফে, হনুমান ডটকম, মিসর রহস্য (কাকাবাবু), পরিচয় ও জাতিস্মর। এছাড়া তিনি ‘দ্যা লাস্ট লিয়র’ নামে একটি ইংরেজী ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয় করেছেন।

শুধু অভিনয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। করেছেন প্রযোজনাও। তাঁর প্রযোজিত প্রথম ছবি ‘বাপি বাড়ি যা।’ এছাড়া জনপ্রিয় ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি বাংলায় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় পরিবেশিত টিভি সিরিয়াল ‘কনকাঞ্জলি’ তাঁর অন্যতম সফল প্রযোজনা। সম্প্রতি তিনি ফ্যামিলি রিয়েলিটি শো ‘বাংলার সেরা পরিবার’-এ হোস্টের দায়িত্ব পালন করছেন। সুদীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি কুড়িয়েছেন ভূয়সী প্রশংসা, ভক্তদের মন উজাড় করা ভালবাসা আর সম্মাননাস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার। তন্মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্টার ডাস্ট পুরস্কার, মহানায়ক সম্মাননা, মিরচি মিউজিক এ্যাওয়ার্ড, আনন্দলোক পুরস্কার, জি গৌরব এ্যাওয়ার্ড, বিগ বাংলা মুভি এ্যাওয়ার্ড, স্টার জলসা ইন্টারটেইনমেন্ট এ্যাওয়ার্ড, কালাকর অ্যাওয়ার্ড, বিএফজেএ পুরস্কার, সঙ্গীত সিনে এ্যাওয়ার্ড উল্ল্লেখযোগ্য।

প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী ১৯৯২ সালে বিয়ে করেন বিখ্যাত অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়কে। তিন বছর সংসার করার পর তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর জীবনসাথী করেন ১৯৯৭ সালে অপর্ণা গুহঠাকুরতাকে। কিন্তু অজানা কারণে সে বিয়েও বেশিদিন টেকেনি। অতঃপর ২০০২ সালে অভিনেত্রী অর্পিতা পালকে বিয়ে করে তিনি শুরু করেন জীবনের আরেক নতুন ইনিংস। বর্তমানে প্রসেনজিৎ-অর্পিতা দম্পতির ত্রিশেনজিৎ নামে এক পুত্র সন্তান রয়েছে।

অভিনয় দক্ষতার বদৌলতে কোটি দর্শকের অন্তরে অমর হয়ে আছেন, থাকবেন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী এ কথা মিথ্যে নয়, দিনের আলোর মতোই সত্য। শুভ হোক তাঁর আগামীর পথচলা। জয় প্রসেনজিৎ, জয় বাংলা সিনেমা।

মন্তব্য