সময়ের সুতোয় কবরী

koboপ্রবাসী কন্ঠ ডেস্ক : চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রূপালি পর্দায় দর্শকদের রাঙিয়ে দিয়ে আসছেন কবরী। ‘সুতরাং’ দিয়ে শুরু। এরপর তার ভুবনভোলানো হাসি আর হৃদয়ছোঁয়া অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছে সব বয়সী দর্শক। তার বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে হয়ে গেল অন্যরকম এক প্রদর্শনী।

তিনি মনে করেন, ‘পৃথিবীতে যখন এসেই পড়েছি, টিকে থাকতে হবে। এর জন্য চাই লড়াই। যুদ্ধই জীবন। ব্যক্তিজীবনে লড়াই করে এতদূর এসেছি। আমি বিশ্বাস করি, সবসময় মানুষের পাশে থাকতে হবে। ’ ঢাকার চলচ্চিত্রাঙ্গনের জননন্দিত অভিনয় শিল্পী সারাহ বেগম কবরী। চলচ্চিত্রে সংসার পেতেছেন প্রায় ৫০ বছর ধরে। এখন তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য। দুই ভুবনে অবাঁধ বিচরণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে কখনও অভিনয় করিনি, আবার অভিনয় জীবনেও কখনও রাজনীতিকে স্থান দিইনি। দুটি কাজই করেছি মানুষকে ভালোবেসে আর মানুষের ভালোবাসার জন্য। মানুষের পাশে থাকার উদ্দেশ্যে দুই ভূমিকায়ই মাঠে আছি। ’ কবরীর এই মন্তব্যই বলে দেয়, কর্মে যতখানি নিপুণ, গুছিয়ে বলতেও পারেন ততখানি। কিন্তু তার শুরুটা মোটেও গোছানো ছিল না। নিজেই স্বীকার করলেন তিনি। ১৩-১৪ বছর বয়সে নায়িকা চরিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নাম লেখানো, তখনই গান শেখা, নাচ শেখা, মুখের কথা থেকে আঞ্চলিকতা দূর করাথ সহজ ছিল না মোটেও।

আমারে তুমি অশেষ করেছ

শিল্পের অশেষ পথের অক্লান্ত যাত্রী তিনি। অভিনয়, রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের বর্ণাঢ্য ঘটনার রচয়িতা কবরী। তার জীবনের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র নিয়ে ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ নামে সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী গতকাল শেষ হয়ে গেল। জাতীয় জাদুঘরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। উদ্বোধন করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। প্রদর্শনীতে ২০০টি আলোকচিত্র ছাড়াও কবরী অভিনীত বেশকিছু চলচ্চিত্রের গানের ভিডিও ক্লিপিং দেখানো হয়। এর আয়োজক ছিল গ্রিন ভ্যালি ফাউন্ডেশন। এ সম্পর্কে কবরী বলেন, ‘সংগঠনটি মূলত প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে। আমিও তাদের সঙ্গে আছি। গত ৪০ বছরে আমার সংগ্রাম, চলচ্চিত্রে অভিনয়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, রাজনীতিবিদ হিসেবে আÍপ্রকাশথ এই দীর্ঘ পথচলার মুহুর্তগুলোই আয়োজকরা প্রদর্শনীতে তুলে ধরেছেন। জীবনে কতটুকু সাফল্য পেয়েছি জানি না, তবে শুরু থেকে লড়াই করছি। উদ্দেশ্য হলো, এসব স্থিরচিত্র দেখে সন্তানের জন্য চিন্তিত মায়েরা যেন একটু হলেও সুখের দেখা পান! মানুষ নিজের জন্য ই সব কাজ করে। কখনও খ্যাতির জন্য , কখনও অর্থের জন্য। কিন্তু সমাজের অবহেলিত শিশুদের জন্য কাজ করলে নিজের আÍা স্বস্তি পায়। এ জাতীয় কাজ করলে কখনও অর্থ-সম্পদ কমে না। সেই আগ্রহ ও উদ্দেশ্য নিয়েই আমি গ্রিন ভ্যালি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে একাত্ম হয়েছি। ’ অনুষ্ঠানে বক্তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তিনি যত বড় সম্মানেই ভূষিত হন না কেন, সবসময়ই মানুষের পাশে থাকবেন, মানুষের হয়ে কাজ করবেন।

স্মৃতি, অমিয়সুধা…

’আমারে তুমি অশেষ করেছ’ অনুষ্ঠানে আবেগঘন ও স্মৃতিজাগানিয়া কথা বলেছেন বক্তারা। কবরী সম্পর্কে অনেক অজানা গল্প উঠে এসেছে সেদিন। কবরী নিজেও স্মৃতি হাতড়ে কেঁদেছেন, কাঁদিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্থিরচিত্র বা চলচ্চিত্রগুলো অতীত স্মরণ করিয়ে দিতে সাহায্য করবে। অতীত মানে অনেক ঘটনা। কত সুখের স্মৃতি থাকে মানুষের! ‘ কবরী বলেন, ‘অনেক গুণী মানুষের সাহচর্য পেয়েছি আমি। চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে পড়াশোনাও শেষ করার সুযোগ পাইনি। তবে জ্ঞানী-গুণী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা, বই পড়ে, মানুষ দেখে দেখে আমি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা- কত কিছুই তো বুঝতাম না আমি! ‘

যেভাবে সবার ভালোবাসার মানুষ

তাকে বলা হয় চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে। তার হাসির দেশজোড়া খ্যাতি। তিনি যখন রূপালি পর্দায় অপরিহার্য সে সময়ে একটি কথা প্রচলিত ছিল- কবরী হাসলে লাখ টাকা, কাঁদলেও লাখ টাকা। অর্থাৎ তার অভিনয় এতটাই নিখুঁত যে, তিনি দর্শকের পাশের বাড়ির মেয়েটি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। পাশের বাড়ির মেয়েটির সুখ-দুঃখ যে কারও মনে রেখাপাত করতে পারে। যে কারণে তার হাসি বা কান্নাথ দুয়েরই অর্থমূল্য ছিল। নির্মাতারা ছবি তে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিশ্চিত থাকতে পারতেন। ১৪ বছর বয়সে মিনা নামে একটি কিশোরী পেটে গামছা প্যাঁচানো পুঁটলি বেঁধে গর্ভবতী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, সেই সূচনা। সেটি ছিল সুভাষ দত্ত পরিচালিত ও অভিনীত ‘সুতরাং’ ছবি। নায়িকা কবরীর আবির্ভাব তখনই। রীতিমতো খুঁজে বের করা হয়েছিল তাকে। গল্পটা এমন- সুভাষ দত্ত তখনও সুভাষ দত্ত হয়ে ওঠেননি। তিনি তখন চলচ্চিত্রে পোস্টার, ব্যানার তৈরি করেন। ‘মাটির পাহাড়’-এর সহকারী পরিচালক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সৈয়দ হককে তিনি নিজের একটি সুপ্ত ইচ্ছার কথা জানালেন। সুভাষ দত্তের স্বপ্ন- একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। একজন প্রযোজক তাকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। অবশ্য তখন একটি ছবি তৈরি করতে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার টাকা লাগতো। এ অবস্থায় সৈয়দ হক তাকে নির্ভয় দিলেন। এরই মধ্যে সত্য সাহাকে আবিষ্কার করলেন সৈয়দ হক। এবার তিনজন মিলে ছবি তৈরির প্রাথমিক কাজগুলো করতে শুরু করলেন। এর মধ্যে চিত্রনাট্য ও গানগুলো তৈরি হয়ে গেল। একজন নায়িকা দরকার যাকে সুভাষ দত্তের সঙ্গে মানাবে। [সুভাষ দত্ত নায়ক চরিত্র করছেন শুনে তখন অনেকেই হাসাহাসি করতেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন ছবি টি ফ্লপ করবে। ] এই চিন্তা থেকে সত্য সাহা চট্টগ্রামের এক মেয়ের খোঁজ দিলেন, তার নাম মিনা। খবর পেয়ে বাবা মিনাকে নিয়ে এলেন এই তিনজনের কাছে। বেশকিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে মিনা নির্বাচিত হলেন ‘সুতরাং’ ছবি র নায়িকা হিসেবে। সুভাষ দত্ত তার পর্দানাম রাখলেন কবরী।

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী…

গুণী অভিনেত্রী কবরী অকপটে বললেন, ”অনেকটা না বুঝেই অভিনয় শুরু করেছিলাম। কিছুই জানতাম না। কিন্তু কিছুদিন আগে যখন ছেলেদের নিয়ে আমি ‘সুতরাং’ ছবি টি দেখলাম- মনে হলো ভালোই তো ছিল। আমার সন্তানরা তো এ সময়ের মানুষ। তাদের কাছেও ছবি টি প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী মনে হয়েছে। সময়ই আসলে সব নির্ধারণ করে দেয়। আমি কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগুইনি ঠিক। কিন্তু একটা আকুতি ছিল আমার মনে। সঠিকভাবে আমার কাজটি করতে চেয়েছি। আহা, পৃথিবী কত বর্ণময়! তার রূপ-রস-গন্ধ আমি কীভাবে অনুধাবন করব? আমি ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিয়েছি। ভালো লাগা থেকে অভিনয়ে নিবেদিত হওয়া। সত্যি বলতে, দত্ত দা আমাকে অভিনয় শিখিয়েছেন, সত্য দা এবং জিএম মান্নান সাহেব আমাকে গান শিখিয়েছেন, আশু কাকা [রূপসজ্জাকর] আমাকে সাজসজ্জা শিখিয়েছেন। এভাবে একটু একটু করে পা ফেলেছি। তখনও সৈয়দ শামসুল হককে চেনার মতো বিদ্যাবুদ্ধি আমার হয়নি। ‘সুতরাং’ ছবি র সংলাপ ও গানগুলো তারই লেখা। দিনে দিনে এসব গুণী মানুষের ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছি। তারা আমাকে নিজের ঘরের মেয়ে বলে মেনে নিয়েছিলেন। এখনও হক ভাইয়ের সঙ্গে তেমনই যোগাযোগ। তিনি আমাকে শুরু থেকেই ‘দিদি’ সম্বোধন করেন, আমি বলি ‘হক ভাই’। জ্ঞানী-গুণী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি আমি। এসবই আমার সম্বল।

মন্তব্য