সোনামসজিদের সোনার খোঁজে

sonaখান মাহবুব

রাজশাহীতে প্রকাশক সমিতির সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটনকে শর্ত দিয়েছিলাম, যদি সোনামসজিদ পর্যন্ত যেতে রাজি থাকেন তবে রাজশাহী যাব। নিপাট ভদ্রলোক রাজি হয়ে গেলেন। এক ভরসন্ধ্যায় মাইক্রোবাসে চেপে প্রকাশক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা লোটন ভাই, প্রধান ভাই, কবীর ভাইয়ের সহযাত্রী হয়ে রওনা হলাম। যাত্রাপথের শত বিড়ম্বনা মাড়িয়ে রাজশাহী পৌঁছলাম কাকডাকা ভোরে। রাজশাহীর ডালাস হোটেলে খানিক সময় ঝিমিয়ে নিয়ে রাজশাহীর প্রোগ্রাম সেরে মধ্য দুপুরে রওনা হলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী সোনামসজিদ দেখতে। রাজশাহী পেরিয়ে বরাইপাড়া বাঁকে মহানন্দা নদের মৃত ধারা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিছুকাল আগেও এই নদে পানির প্রবাহ অনেক বেশি ছিল। এই নদ দিয়েই ভারতের মালদা অঞ্চলের সঙ্গে নৌবাণিজ্য চলত। যাই হোক, আমাদের গাড়ি রানওয়ের বিমানের গতিতে চলছে রাজশাহীর বরেন্দ্রভূমির ওপর দিয়ে। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রায় ৬০ কিলোমিটার। চাঁপাই সদর থেকে সোনামসজিদ আরও ৩৬ কিলোমিটার। আমাদের গাড়ি চাঁপাই শহরকে পাশে রেখে ছুটছে। লক্ষ্য করলাম, গাড়ি ঘণ্টা দেড়েক চলার পর লোকালয় কম। সুনসান নীরবতা। আঁকাবাঁকা পথ। গাড়ি যাচ্ছে আমবাগানের মধ্য দিয়ে। লোটন ভাই বললেন, এটাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কানসাট আমবাগান। মাইলের পর মাইল শুধু বাগান। পাকা রাস্তার ওপর গাছে ঝুলছে থরে থরে আম। মন জুড়িয়ে যায়। আমরা ঢাকায় বসে যে আম খাই, তা নাকি এই কানসাট অঞ্চল থেকেই বেশি আসে। যদিও এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফরমালিন। যাই হোক, দুপুরের হিট স্ট্রোকে আমরা ক্লান্ত ছিলাম। কিš‘ সূর্য তার অবস্থান পরিবর্তন করে পশ্চিমে হেলে পড়ায় তেজ কমে গিয়েছিল। আমরাও স্বস্তি পাচ্ছিলাম। এমন এক প্রশান্তময় পরিবেশে আমরা হাজির হলাম আমার স্বপ্নের তীর্থভূমি সোনামসজিদের সোনামাখা আঙিনায়।

সোনামসজিদের বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। এই মসজিদ পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ স্থাপত্য নিদর্শনের মতো শুধু ইট-সুরকির নয়। এর মূল কাঠামো ইট-সুরকির হলেও মসজিদের দেয়ালে রয়েছে পাতলা কালো পাথরের প্রলেপ। আছে পাথরের গুঁড়ির লতা-পাতার অলঙ্করণ। ‘সোনামসজিদ’ বঙ্গের রাজ মসজিদ। বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর অনুদানে ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলীর (র.) তত্ত্বাবধানে ১৪১৯-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে এ মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদের কেন্দ্রীয় দরজার সামনে স্থাপিত শিলালিপি থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। জনশ্র“তি আছেথ আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ মসজিদে নববীর (সা.) আদলে গড়া এই মসজিদ থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।

সোনামসজিদে ৫টি মিহরাব ও ১৫টি গম্বুজ আছে। এক সময় সোনামসজিদের মিম্বারগুলো সোনা দিয়ে গিল্ড করা ছিল। এই জনশ্র“তির পক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাওয়া না গেলেও সোনামসজিদ নামকরণে ‘সোনা’ যুক্ত হলো কেন এ নিয়ে কৌতূহল থেকেই যায়।

মসজিদের অভ্যন্তরের মেঝে ৭১ ফুট ৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য এবং ৪০ ফুট ৬ ইঞ্চি প্রস্থ। মেঝে ৩ সারিতে বিভক্ত। প্রত্যেক সারিতে ৫টি পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। মিহরাবের ক্যালিগ্রাফিগুলো এখন আর নেই। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এগুলো খুলে পড়ে। মসজিদের ভেতরের একটি স্বতন্ত্র শ্বেতপাথরের বড় খণ্ড এবং পশ্চিম দেয়ালের ক্যালিগ্রাফি বেনিয়া ইংরেজরা লুটে নিয়ে গেছে।

সোনামসজিদ প্রাঙ্গণের মেকী কবরের রহস্য আজও স্থানীয় ও আগত দর্শনার্থীদের কৌতূহলকে উস্কে দেয়। যদিও অনেকে মনে করেন, কবর দুটি সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ ও তার বেগমের। কিš‘ এই ধারণার পেছনে অকাট্য প্রমাণ নেই। তবে সোনামসজিদ সংলগ্ন স্থানে বসবাসরত গৌড় বংশধরদের মতে, সোনামসজিদ প্রাঙ্গণের বড় দুটি কবর মূলত মেকী। এখানে মসজিদের নির্মাতা ধনরতœ মজুদ করেছিলেন। এই কবরের পাশে প্রাচীন ৩৫টি কবর আবিষ্কৃত হয়েছে। কিš‘ কবরে শায়িতদের পরিচিতি ও সময়কাল জানা যায়নি।

বাংলাদেশে অবস্থিত প্রাচীন স্থাপনাগুলোকে শিলালিপি ও সঠিকভাবে পরম্পরা নিয়ে ইতিহাস লিপিবদ্ধ না থাকার কারণে বিভিন্ন মত ও পথের সৃষ্টি হয়েছে। লুক্কায়িত রয়ে গেছে ইতিহাসের অনেক সোনার হরিণের। সোনামসজিদও এর ব্যতিক্রম নয়।

সোনামসজিদ নির্মাণ পর্বে এখানে একটি সরাইখানা ও মসজিদের উত্তর-পূর্ব রাস্তার পাশে বিলাস পুকুর খনন করা হয়েছিল। সময়ের আবর্তে সরাইখানাটি বিলীন হলেও আজও মসজিদের সমান বয়সী পুকুরটি স্মারক চিহ্ন হিসেবে টিকে আছে। সোনামসজিদের সৌন্দর্যকে উত্তুঙ্গে নিয়ে গেছে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের তোরণ। প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার এই তোরণ মসজিদের অনুরূপ নির্মাণসামগ্রীতে গড়া ও রঙ-বেরঙের ক্যালিগ্রাফি ছিল। সময়ের পথ পরিক্রমায় ক্যালিগ্রাফির লয় হলেও এখনও এর সুষমা মনোমুগ্ধকর। এই মসজিদ প্রাঙ্গণেই শায়িত আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও একাত্তরের শহীদ মেজর নাজমুল হক।

সোনামসজিদে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি ছোট পাঠাগার ১৯৯৬ সাল থেকে চালু আছে।

আজও সোনামসজিদ দেখতে আসা দর্শনার্থীরা ছুঁয়ে দেখেন এর দেয়াল। অবলোকন করেন এর আভা। আগত অনেকেই ভক্তিভরে মসজিদে নামাজ আদায় করে বসে থাকেন মসজিদ প্রাঙ্গণে শান্তির পরশ নিয়ে। মসজিদে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা এখানে এসে রুকু-সেজদা করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন আর মসজিদে ঘুরে ঘুরে হয়তো সোনা খুঁজতে থাকেন।

আলোকময় রাতে কিংবা ভরবর্ষণে স্নাত হয়ে সোনামসজিদ দীপ্তি ছড়ায় চারপাশে।

আমাদের এই সোনামসজিদের কাঁচা সোনার মোহিনী শক্তির শুভ্রতা ছড়িয়ে রাখতে চাইলে প্রতœতত্ত্ব দফতরের শুধু একটি সাইনবোর্ড দিয়ে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনগণকে অনুরোধ জানালে চলবে না। কর্তৃপক্ষকে মসজিদের সৌন্দর্য রক্ষায় রাখতে হবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। তবেই গৌড়ের এই গর্ব সোনামসজিদ শির উঁচু করে থাকবে অনাগত দিনের গৌড়বাসীর জন্য।

মন্তব্য