মনোকামনায়

Kathmandu

শাকুর মজিদ

পোখরা থেকে আমরা রওনা দিয়েছি কাঠমাণ্ডুর পথে। এই যাত্রাপথে একটা আকর্ষণীয় মন্দিরে আমরা নামব। মন্দিরের নাম মনোকামনা মন্দির। মন্দিরটি নাকি দেখার জন্য খুব চমৎকার একটা জায়গা। কিন্তু মন্দির যা-ই হোক না কেন, এর পেছনের ঘটনাটি খুবই আকর্ষণীয়।

প্রায় ৪০০ বছর আগের ঘটনা। তখন নেপালের গোরখা রাজা রাম শাহর স্ত্রী নাকি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারিণী ছিলেন। তাঁর এই অলৌকিকতার খবর জানতেন শুধু একজন, তাঁরই সেবাদাস লক্ষ্মণ থাপা। একদিন দৈবাৎ রাজা দেখেন তাঁর স্ত্রী দেবীর আসনে বসে আছেন, তাঁর সামনে সিংহের অবয়ব নিয়ে আছে লক্ষ্মণ থাপা। রাজা এই দৃশ্য দেখামাত্রই অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেন। রাজার মৃত্যু হলে তাঁর স্ত্রীকেও ‘সতী’ হতে হয়। রাজার শবানলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আÍাহুতি দেন রানি। আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার আগে রানি তাঁর দাসীকে বলে যান যে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আবার ফেরত আসবেন। এ ঘটনার মাস ছয়েক পর, এক কৃষক জমি চাষ করার সময় তার লাঙলের আগায় এক খণ্ড পাথর দেখতে পায়। কৃষক দেখে, লাঙলের খোঁচা লেগে পাথরখণ্ড থেকে একসঙ্গে রক্ত আর দুধ বেরোচ্ছে। এ খবর শোনার পর লক্ষ্মণ থাপা সে জায়গায় এসে হিন্দুধর্মের কিছু মন্ত্রবাণী পড়া শুরু করে দেন এবং এখানে একটি স্থাপনা বাণীয়ে ধর্মচর্চা করেন। দিন দিন খবর রটে যায়, এই স্থাপনায় এসে যেকোনো ইচ্ছা পূরণের কথা বললে সেই মনোকামনা পূর্ণ হয়।

কালের পরিক্রমায় প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট ওপরে গড়ে উঠেছে এক দৃষ্টিনন্দন মন্দির। এই মন্দিরে যাওয়ার জন্য আছে কেব্ল্কারের ব্যবস্থা, নেপালের একমাত্র কেব্ল্কার। আমরা পোখরা থেকে কাঠমাণ্ডু ফেরার পথে এই মনোকামনা মন্দিরে যাওয়ার জন্য একটা স্টেশনে এসে নামি।

মনোকামনা মন্দিরটি নেপালের গোরখা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। দূরত্বগত অবস্থানে এটি পোখরা আর কাঠমাণ্ডুর প্রায় মাঝামাঝি একটা জায়গায়।

পোখরা থেকে ভোর ৬টায় আমরা রওনা দিয়ে বাসে উঠেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম যখন ভাঙল, শুনি মনোধরকে ঘিরে বেশ বড় ধরনের একটা ক্যাঁচাল লেগেছে নিচের কাউন্টারে। ইংরেজি-বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। বিষয়টা হচ্ছে, কেব্ল্কারের টিকিট। এর আগে নেপালের যতগুলো ট্যুরিস্ট স্পটে গিয়েছি, সার্কভুক্ত দেশের সদস্য হিসেবে আমরা বিশেষ সুবিধা পেয়েছি। নেপালিদের জন্য টিকিট সবচেয়ে কম, তার একটু বেশি সার্কভুক্ত দেশের সদস্যদের জন্য, এর বাইরে বাকি সবাইকে ডলারে টিকিট কাটতে হয় এবং এর অঙ্কটি সাধারণের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি হয়ে থাকে। এখানে এসে এর ব্যতিক্রম দেখা গেল। নেপালি আর ভারতীয়দের জন্য শুধু ৫০০ রুপি, বাকি সবাই বিদেশি এবং সবাইকে ২০ ডলার দিয়ে টিকিট কাটতে হবে। এটা সাইনবোর্ডে লেখা।

কিন্তু সাইনবোর্ডের লেখা মানতে রাজি নন আমাদের দলনেতা দিলু ভাই। তাঁর কথা হচ্ছে, ইন্টারনেটে তিনি সার্চ দিয়ে দেখেছেন সার্ক ন্যাশনালের জন্য নেপালিদের সমান ভাড়া- ৪৭৫ রুপি, সে হিসেবে ট্যুর প্ল্যান করা হয়েছে। মনোধর হিন্দি-নেপালি মিলিয়ে কাউন্টারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে, কোনো সমাধান দিতে পারছে না। নতুন করে হয়তো তখনই সার্কুলার এসেছে; কিন্তু ইন্টারনেটে এটা আপডেট হয়নি, মনোধর কেন এই তথ্য আগে জানল না, এই নিয়ে ক্যাঁচাল।

কিন্তু খুব বেশিক্ষণ তা স্থায়ী হলো না। মন খারাপ করে নেপালি এক হাজার ৬০০ রুপিতে টিকিট কাটতে বাঁধ্য হলো সবাই। দিলুভাই ফোঁস ফোঁস করে বারবার বলছেন যে নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশি হাইকমিশনারের কাছে এ বিষয়ে নালিশ জানাবেন, এই পরিবর্তনটুকু কেন করা হলো। তার ফোঁস ফোঁসই সার। প্রথমে রাজি না হলেও এখন তাকে মানিব্যাগে হাত দিতে হচ্ছে এবং তিন গুণ বেশি মূল্যে টিকিট কাটার জন্য লাইনেও দাঁড়াতে হলো।

আমাকে পোখারা থেকেই অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে সঙ্গ দিয়ে আসছে রিয়াদ। দিলু ভাই, নাসির ভাই ছাড়া আর আমাদের কেউ বাকি নেই। আমাদের চারজনকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘতম কেব্ল্ কারটি ছুটে চলে মনোকামনা মন্দিরের দিকে।

কেব্ল্ কারটি চালু হওয়ার পরপরই মনে হলো, কুড়ি ডলার মূল্যে এই বাহনটি পাওয়া খুব ব্যয়বহুল ছিল না। নেপালের প্রকৃতীর যা যা আকর্ষণীয়, তার সবই আমাদের সামনে স্থির হয়ে থাকবে।

আমাদের পায়ের তলা দিয়ে প্রথমে একটা নদী [ত্রিশূল] অতিক্রম করে। নেপালের নদীগুলো ক্ষীণকায়, খরস্রোতা। পানিতে নৌকা চলে না, মানুষের চলাচল নেই। পানির রং কখনো হলদে, কখনো স্বচ্ছ।

নদীর পাড় থেকে স্তরে স্তরে ওপরে উঠে গেছে পাহাড়। পাহাড়গুলোর উপরিভাগ কিছুটা সমতল। সমতলে ধান চাষ হয়েছে। ধানগাছের সবুজ, চিকন চিরল পাতা।

মিনিট পনেরো পর আমরা ওপারের একটা পাহাড় চূড়ায় গিয়ে নামি। নামতে নামতেই মনে হলো, কোনো এক মাজারের আখড়ায় চলে এসেছি। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ- এই তিন ধর্মেরই মন্দির বা মাজারকে কেন্দ্র করে যেসব আয়োজন আমি এই উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, চার হাজার ফুট উচ্চতার এই মন্দির চত্বরেও দেখি একই রূপ। পূজারির জন্য নানা রকমের অর্ঘ্য-ফুল, মিষ্টান্ন, ফলের সারি সারি দোকান। এখানে আগতদের মধ্যে কেবল পর্যটকের সংখ্যাই অতিনগণ্য। বেশির ভাগই পুণ্যার্থী।

পাহাড় চূড়ার এই মন্দির চত্বরটি ছোটখাটো এক শহরতলির মতোই। আছে দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ। আশপাশে তেমন কোনো লোকালয় নেই। আর সব পাহাড়ি অঞ্চলের মতোই পানির কিছু সমস্যা এখানে থাকবেই। একসময় আমরা এসে দাঁড়াই বর্গাকৃতীর প্ল্যানের ওপর তিন স্তরের ছাদ দিয়ে বানানো এই মনোকামনা মন্দিরের সামনে। প্রতিদিন এ মন্দিরে মনোকামনা দর্শনের জন্য শত শত পুণ্যার্থীর আগমন হয়। মন্দির দর্শনে এসে তাঁরা মূলত ভগবতী দেবীর দর্শন প্রার্থনা করেন। হিন্দু পুরাণমতে, এই ব্রহ্মাণ্ড পাঁচটি জাগতিক বস্তু দিয়ে তৈরি। এগুলো হচ্ছে- মাটি, আগুন, পানি, বাতাস আর আÍা [ইথার]। পুণ্যার্থীরা এখানে এসে এগুলোর অন্তত যেকোনো একটি তাদের দেবীর কাছে সমর্পণ করেন। আর এগুলো যেসব মাধ্যমে তাঁরা উপহার দেন সেগুলো হচ্ছে-

১. আবির [মোমবাতি বা অন্য কোনো প্রদীপ] ২. ফেসার [খাঁটি সেফরনের নির্যাস] ৩. ফুল এবং পাতা ৪. ধূপ ৫. দীপ [তেলের প্রদীপ] ৬. বস্ত্র [সাধারণত লাল রঙের এক টুকরো কাপড়] ৭. ফলমূল [নারিকেল বা মিষ্টিজাতীয় কিছু] ৮. ঘণ্টা ৯. পান-সুপারি ১০. অন্নদানা [চালজাতীয় কিছু]

এ ধরনের হিন্দু মন্দিরগুলোর চারপাশে বারান্দা ঘেরা থাকে। বারান্দার পূর্ব দিকে প্রবেশ করেন পুণ্যার্থীরা সারিবদ্ধভাবে। প্রবেশের সময় ঘণ্টাধ্বনি করেন। মন্দিরের ভেতর থাকেন পুরোহিত, তাঁর সামনে রাখা এই মন্দিরের পশ্চিম পাশে কতগুলো ডেস্ক রাখা। ডেস্কের ওপর পূজারিরা তাঁদের অর্থ রেখে যান। সেখানে ধূপ জ্বলছে, ফুল-পাতা ছড়িয়ে আছে। কেউ কেউ এসে জ্বালিয়ে রাখা কুপির আগুনে হালকা করে নিজেকে ধুইয়ে নিচ্ছেন।

আমার কাছে বিষয়টি নতুন। মুসলমানদের মাজার পূজার বিষয়গুলো আমি দেখেছি শাহজালাল, শাহ পরান, শাহ মখদুম, খানজাহান আলীর মাজারে। ভারতের দিল্লিতে নিজামউদ্দিনের মাজার বা

আজমিরের মাজারেও দেখেছি ভক্তকুলের ফরিয়াদ। বৌদ্ধধর্মের অনেক বড় বড় মন্দির-স্তূপ আমার দেখা হয়েছে বার্মা, চীন, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে। হিন্দুদেরগুলো এখানে এসে দেখছি। জানি, কাঠমাণ্ডুতেও অনেকগুলো বড় মন্দির আছে।

আমি এক পূজারির কাছে যাই। তিনি অর্ঘ্য দিয়ে আগুনে হাত শুকিয়ে তাকালেন। আমি জিজ্ঞেস করি- কী মনোবাসনা পূরণের জন্য আপনি প্রার্থনা করলেন?

আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন- শান্তি, সবার মধ্যে শান্তি আসুক, এটা বলেছি মা ভগবতীর কাছে। আমার মধ্যেও যেন সব সময় শান্তি থাকে।

- কেন? পুত্রসন্তান কিংবা ধনসম্পদণ্ড এসব চাননি?

পূজারি লজ্জায় পড়ে যান। বলেন, না না, ওসব চাইনি মার কাছে, সবাইকে শান্তি দেওয়ার কথা বলেছি।

আমাদের দলের মধ্যে সুতপা দাস একমাত্র হিন্দু। পূজার তবারক দেখে তার খিদে লেগে গেছে। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। আমার সঙ্গে দেখা হতেই বলে, ওই দেখেন, সেলিম ভাই সন্ন্যাসী সেজে বসে আছেন। চলেন, ওনার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে আসি।

চেয়ে দেখি, মন্দির চত্বরের মাঝে, পূর্ব দিকে একটা বড় গাছের তলায় লাইন ধরে কতগুলো সন্ন্যাসী কিসিমের লোক বসে আছেন। তাঁদের গায়ে গেরুয়া পোশাক, লাল রঙের পাগড়ির মতো একটা কিছু মাথায় দেওয়া, কপালে চন্দন। প্রত্যেকের সামনে একটা করে ছোট টুল। টুলের ওপর কিছু ফুল, প্রদীপ, সুতলি রাখা। তাঁদের সামনে যোগাসনে বসে আছেন সেলিম ভাই। হাঁটুর ওপর দুই হাত ছড়ানো, তাঁর চোখ বন্ধ। মনে হচ্ছে, ধ্যানকারীদের চরিত্রে অভিনয় করলে তার সাজ কী হতো, তা তিনি পরীক্ষা করে দেখছেন।

আমি কাছে গিয়ে হাজির হই। সেলিম ভাইর ধ্যানে বাঁধা সৃষ্টি করি না। আমি দেখি, সারিবদ্ধ সন্ন্যাসীদের সামনে একে একে এসে বসছেন কিছু লোক। সন্ন্যাসী তাঁর কপাল ছুঁয়ে দিচ্ছেন, তিলক লাগাচ্ছেন। তাঁর সামনের ফুলের পাপড়ি দিয়ে তাঁর মুখ ও মাথা স্পর্শ করছেন। কখনো বা বিড় বিড় করে কিছু বলছেনও। একসময় তাঁর ডান হাতে ‘বাজুবন্ধ’-এর মতো সুতার বাঁধন দিয়ে তাঁকে বিদায় করছেন। যিনি এতক্ষণ সেবা নিলেন, তিনি যাওয়ার সময় মানিব্যাগ থেকে কিছু একটা হাতে দিলেন তাঁর। যিনি পেলেন, তা রেখে দিলেন ক্যাশবাক্সে। এরপর প্রতীক্ষা পরবর্তী দোয়াপ্রার্থীর।

বারবার ফোন আসছে নাসির ভাইর। সবাই চলে এসেছেন, আমি এলেই নাকি কেবল্ কারে চড়বেন তাঁরা। আমি আর থাকি না। ট্রাইপড গোছাই। আবার ২.৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের। আগেরবার উঠেছিলাম, এবার নামব। নামতে নামতে আবার দেখব চমৎকার কিছু ভূমিরূপ।

গত চার দিন কেমন যেন এক মুগ্ধতার মধ্যে কাটিয়ে দিলাম। ৩০ জনের দলে ২০ জনের বেশি ছিল আমার অপরিচিত। কিন্তু এখন আর কেউ নেই- দলের সঙ্গে ভ্রমণ করার এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।

কাঠমাণ্ডু এসে আমরা তিন-চার হোটেলে ভাগ হয়ে যাব। আজ সন্ধ্যায় কেউ যাবে নাগরকোট, কেউ যাবে কাঠমাণ্ডু। আমি কোথায় যে থাকি, চিন্তায় আছি। এনায়েত ভাই বারবার ফোন দিচ্ছেন। কাঠমাণ্ডু নেমেই না হয় ঠিক করি।

নেপালে আরো চার রাত থাকা আছে। আরো কত কিছুই তো আছে দেখার!

মন্তব্য