‘কালো তিলের বিনিময়ে যে দুই নগর’

samarkand

পিটার ওয়ার্ড

এই দুই নগরের পথে পথে যেন আজও ছড়িয়ে আছে আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, মার্কো পোলো আর তৈমুর লংয়ের মতো দিগিবজয়ীদের পদচিহ্ন। কেউ কেউ এই নগর যুগলকে বলেছেন ‘রোমান্স আর কবিতার তীর্থ’। কেউ বলেছেন ‘প্রাচ্যের রোম’। কিন্তু এক সময় শুধুমাত্র ‘প্রিয়ার চিবুকের একটা কালো তিলের বিনিময়ে’ এ দুই নগর লিখে দিতে চেয়েছিলেন জগদ্বিখ্যাত কবি-দার্শনিক ওমর খৈয়াম!

প্রাচীন কিন্তু এখনো জনবসতিময় নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা এ দুই নগরের নাম সমরখন্দ ও বোখারা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংযোগকারী বাণিজ্যপথ ‘সিল্ক রুট’ বা রেশমপথেই গড়ে ওঠে এ দুই নগর। প্রাচীন রেশমপথের ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠী ‘সোগদিয়া’রা এ নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে উজবেকিস্তানে অবস্থিত সমরখন্দ ও বোখারা এখন যথাক্রমে দেশটির দ্বিতীয় ও পঞ্চম বৃহত্তম নগর।

ইতিহাসে প্রাচ্যের রোম বলে খ্যাত সমরখন্দের পত্তন হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে। রেশমপথের সব নগরের মধ্যে সমরখন্দই নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবল স্মারক। ‘দ্য গোল্ডেন রোড টু সমরখন্দ’ গ্রন্থের রচয়িতা উনিশ শতকের প্রাচ্য-তত্ত্ববিদ জেমস ইলোরি ফ্লেকার এ নগর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘সমরখন্দ প্রাচ্যের রোমান্স আর কাব্যের তীর্থ।’

প্রায় ২ হাজার ৫০০ বছর ধরে মধ্য এশিয়ায় রেশমপথের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং জনবহুল নগর হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল সমরখন্দ। দূরপ্রাচ্যের চীন থেকে পাশ্চাত্যে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এদিকে-সেদিকে বিস্তৃত বহু পথে বাণিজ্যের প্রসার, পণ্য পরিবহন, অভিযাত্রী আর অগুনতি মানুষের যাতায়াতের সঙ্গে সঙ্গেই সংস্কৃতি ও দর্শনেরও মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল ওই রেশমপথ।

তৈমুর লংয়ের রাজধানী সমরখন্দ

একই সঙ্গে বীরত্বের জন্য কিংবদন্তি এবং নৃশংসতার জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠা তুর্কি-মঙ্গল শাসক তৈমুর লং চতুর্দশ শতকে তাঁর রাজধানী স্থাপনের পর থেকেই তিলোত্তমা হয়ে ওঠে সমরখন্দ। চারদিকে সাম্রাজ্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ার একক অধীশ্বর হয়ে ওঠা তৈমুর বিপুল অর্থ ব্যয়ে দ্রুতগতিতে গড়ে তোলেন একের পর এক সুবিশাল মসজিদ, মাদ্রাসা, বাগান, নগরচত্বর, ফটক, মিনার, সমাধি আর অট্টালিকা। শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় স্মরণীয় হয়ে থাকা তৈমুরের এসব অনন্য স্থাপত্য-কীর্তি শুধু সেই সময়েই নয়, আজও জগত্ সেরা হয়ে আছে।

কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ছড়িয়ে থাকা এই নগরে ভ্রমণে গেলে আজকের দিনে যে কেউ প্রথমেই যা দেখে ধাক্কা খাবেন তাহলো সমরখন্দের এখনো ঝকঝক-তকতক করতে থাকা রূপ। মনে হবে প্রাচীন নগরের ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষ কই? জীর্ণশীর্ণ দালানকোঠা আর ধুলা ওড়া অলিগলিই বা কই? চারপাশের প্রশস্ত সড়ক আর সুরম্য সব অট্টালিকা সবই যেন অনন্ত-যৌবনা।

স্থাপত্যের জাদুঘর-নগর বোখারা

রেশমপথের উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম পথের সংযোগস্থলে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে গড়ে উঠেছিল বোখারা। সে সময়ই এটা দুনিয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে স্বীকৃত। আর এখন এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুনিয়ার স্থপতি ও শিল্পানুরাগীদের অন্যতম এক তীর্থে, স্থাপত্যের এক জাদুঘর-নগরীতে।

১৯৯৭ সালে বোখারার ২ হাজার ৫০০ বছর পূর্তিকে ঘিরে শেষ করা হয়েছিল এখানকার স্থাপত্য সংস্কারের শেষ পর্যায়ের কাজ। চারিদিকে ১৩ কিলোমিটারের বিশাল দুর্গ-প্রাচীর আর অনেকগুলো ফটক ঘিরে রেখেছে একদার রোমহর্ষক এ দুর্গ-নগরীকে। এ অঞ্চলের সর্বশেষ স্বাধীন রাজ্য হিসেবে টিকে ছিল বোখারা। ১৯২০ সালে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবীদের কাছে পরাস্ত হয়ে বোখারার আমির আফগানিস্তানে পালিয়ে গেলে এ নগরের পতন ঘটেছিল।

বোখারায় অট্টালিকা, নগর-দুর্গ ও প্রাচীর, ফটক, মিনার, প্রাসাদসহ প্রায় ১৪০টি স্থাপনার সংস্কার করে সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বিশাল প্রবেশদ্বারসহ মূল নগর-দুর্গের পুনর্র্নিমাণের কাজ। আসল আকৃতির মাত্র ৩০ ভাগ আকারে পুনর্নির্মিত হয়েছে এই বিশাল ফটক। অনন্য এই স্থাপত্যের দিকে প্রথম দর্শনেই যে কারোরই দম বিস্ময়ে আটকে যেতে পারে, বিশেষত দর্শক যখন বুঝতে পারবেন যে আসলে উনি কোনো ফিল্ম সেটে দাঁড়িয়ে নেই এবং নিপুণ অলংকরণে সজ্জিত এই ফটক একটি সত্যিকারের স্থাপত্য।

স্থাপত্য সংস্কারের অনন্য নজির

সমরখন্দ এবং ২৫০ কিলোমিটার দূরের বোখারার নিপুণ স্থাপত্য-সংস্কার যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। সংস্কারকাজের পাশাপাশি নগর দুটির আধুনিকায়নও চোখে পড়ার মতো। সোভিয়েত ঘরানার প্রশস্ত সব সরণি এঁকেবেঁকে চলে গেছে নগরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত। গত শতকে সোভিয়েত রাশিয়ার শাসনামলে সম্পন্ন করা হয় এই স্থাপত্য সংস্কারের কাজ। বিশুদ্ধতাবাদীরা চূড়ান্ত মাত্রার এই স্থাপত্য-সংস্কারের সমালোচনা করলেও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, এটা করা না হলে সুবিশাল ওই অট্টালিকাগুলো হয়তো এত দিনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো।

সমরখন্দের নগর-কেন্দ্রের প্রধান চত্বরের নাম ‘রেগিস্তান স্কয়ার’। এটা প্রায় দুটি ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়। এর তিনদিক জুড়ে রয়েছে পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসার সুউচ্চ প্রবেশ ফটক। এক শতক আগের ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন করে এই ফটকগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। পাশেই তৈমুর লংয়ের সমাধিতে আছে ৬ ফুট চওড়া কালো জেড পাথরের ফলক। এটা সে সময়ের মতো এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেড পাথর হিসেবে স্বীকৃত।

ইতিহাসের পাতাটি এখনো জীবন্ত

১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ৭০ বছরের সোভিয়েত রাশিয়ার শাসনামলের ছাপ মুছে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট উজবেকিস্তান। এ প্রয়াসে প্রথমেই তৈমুর লংকে ‘জাতীয় নেতা’ ঘোষণা করে উজবেকিস্তান। একই সঙ্গে রাষ্ট্র কাঠামো এবং সংস্কৃতিচর্চায় উজবেক সংস্কৃতির চর্চাকে উত্সাহিত করতে নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। তবে সোভিয়েত আমলের যেসব ছাপ এখনো স্পষ্ট, তার মধ্যে অন্যতম উজবেক সমাজে নারীর উপস্থিতি। এশীয় এবং মুসলিম-অধ্যুষিত একটি দেশ হলেও উজবেকিস্তানে নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

আধুনিক সমরখন্দ বোখারায় সবকিছুই ঝকঝকে তকতকে। তবে নগরের রাস্তাঘাটে, বাজারে, দোকানে কেনাকাটায় গেলে পাওয়া যাবে ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথের স্বাদ। একটা দোকানে ঢুকলে কিছু না কিনে যেন আপনি বেরোতে পারবেন না, নাছোড়বান্দা দোকানিরা আপনার কাছে কিছু না কিছু বিক্রি করেই ছাড়বেই। এতে হয়তো আপনি খুঁজে পাবেন আগের দিনের রেশমপথের দিনগুলোর নানা দেশের নানা সংস্কৃতির ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়, বাট্টা আর পণ্যবিনিময়ের সেই হইচইয়ের স্বাদের কিছুটা। তবে এই বাজার-ঘাট কিন্তু খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর আধুনিক, তা রাস্তার ধারের খোলা দোকানই হোক বা কোনো শপিং-মল; এর যে কোনোটিই আজকের দিনের ইউরোপে অনায়াসে খাপ খাইয়ে নিতে পারার মতো আধুনিক।

সুস্বাদু ও বিচিত্র সব উজবেক খাবারদাবার

মধ্য-এশিয়ার এই অঞ্চলে বেড়াতে গেলে আর যা-ই করুন না কেন, উজবেকিস্তানের স্থানীয় খাবারদাবার চেখে দেখতে ভুলবেন না। উজবেক পোলাও, মান্টি, শুরপা, সাসলিক, লাগমান, সমুচা…খাবারের নামগুলোও যেন জিভে জল নিয়ে আসে, আর এগুলোর গন্ধ নাকে এলে নিজেকে সংবরণ করাই মুশকিল হয়ে যেতে পারে আপনার।

বেশির ভাগ ঐতিহ্যবাহী উজবেক খাবার রান্নারই আছে কয়েক শতাব্দীর পুরোনো ইতিহাস। তুর্কি, কাজাখ, তাতার ও মঙ্গল প্রভাবের সঙ্গে স্থানীয় বাবুর্চিগিরির মুনশিয়ানায় এসব খাবারের বৈচিত্র আপনাকে অভিভূত করবে। এমনকি একটি প্রাত্যহিক উজবেক ডিশেও এত পদের খাবার থাকে যে আপনি চমকে উঠতে পারেন। টেবিলের এ মাথায় তা হয়তো শুরু হবে মিষ্টি, ফল আর সালাদ দিয়ে, এরপর আসবে স্যুপের পালা, বহু ধরনের স্যুপের মধ্যে জনপ্রিয় দুটি হলো শুরপা আর মাস্তাভা। আপনার পেট ইতিমধ্যেই ভরে গেলে আপনি হিসাব কষতে খুবই ভুল করেছেন! কেননা এবার আসবে আসল ডিশ মান্টি, লাগমান, সাসলিক বা পোলাও।

সুগন্ধি চালের সঙ্গে ভেড়ার মাংস, পেঁয়াজ, গাজর ইত্যাদি দিয়ে রান্না করা এ খাবারের স্বাদ বলে বোঝানো সম্ভব নয়, এটা আপনাকে নিজের জিবেই পরখ করতে হবে। সমরখন্দ আর বোখারার যেকোনো ভালো রেস্তোরাঁতেই এ পোলাও পাওয়া যাবে, স্বাদ সব খানেই ভালো। কিন্তু সুযোগ পেলে যেতে পারেন বোখারার এম ইকবাল স্ট্রিটে খোলা আকাশের নিচে ‘ক্যারাভান রেস্তোরাঁয়’। আপনার যাত্রা বৃথা যাবে না।

পর্যটক-বান্ধব নগর

সমরখন্দ-বোখারার অসাধারণ স্থাপত্য সংস্কারকাজের পাশাপাশি যে বিষয়টা আপনার অবশ্যই চোখে পড়বে তা হলো এ নগর যে পর্যটক-বান্ধব তার প্রমাণ সর্বত্র ফুটে আছে। পথেঘাটে বেশ কয়েকটি ভাষায় দিকচিহ্ন, ঐতিহাসিক স্থানের পরিচিতিসহ পর্যটকদের সুবিধা বিবেচনা করা হয়েছে সব খানেই। এর মানে এই নয় যে, বিষয়টা জাদুঘর দেখতে যাওয়ার মতো। নগরের দোকানপাট, আর নানা প্রতিষ্ঠানেই সবাই স্বাগত জানাবে পর্যটকদের। একটা গালিচার দোকানে গিয়ে লাগোয়া বুনন ঘরেই উজবেক রীতির গালিচা বুননের চমৎকার শৈলী চাক্ষুষ করতে পারবেন আপনি।

এই বিষয়টা কেবল সমরখন্দ বা বোখারাতেই নয়, পাশের হিভা আর কাশগড়ে গেলেও এই একই বিষয় অভিভূত করবে আপনাকে। রেশমপথের পূর্ব-পশ্চিম পথের সংযোগস্থলে আরেক ঐতিহাসিক নগর হিভা ঘুরে দেখার সুযোগ হারানোটা ঠিক হবে না আপনার। এখানেও স্থাপত্য সংস্কারের কাজ হয়েছে নিপুণ দক্ষতায়। চৈনিক-উজবেক রীতির হস্ত ও কারুশিল্পের অনন্যধারা বিকশিত হয়েছে হিভা নগরে। চমত্কার পশমি টুপি, রেশমি কাপড়ের সমাহার চোখে পড়বে এখানকার দোকানপাটে। এর কাছেই আছে পশ্চিম চীন ও মধ্য এশিয়ার সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ নগর কাশগড়। হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন কাশগড়ে। ঐতিহাসিক রেশমপথের এই নগরগুলো আপনাকে উজ্জীবিত করবে এক অনন্য রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায়।

(রয়টার্সে প্রকাশিত লেখক-সাংবাদিক পিটার ওয়ার্ডের ফিচার অবলম্বনে)

মন্তব্য