ঋষি নদীর ধারে

দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে

দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে

রিশপে এসেছি দুদিন হলো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে রিশপ। এখানে আসার পরদিন ভোরে মেঘের জন্য সূর্যোদয়ের সময় সোনারাঙা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়নি। মেঘের ওপর খানিকটা অভিমান নিয়েই ভোরে রিশপ ট্যুরিস্ট লজের উঠোনে চেয়ার পেতে বসে আছি আরও একটি সূর্যোদয়ের জন্য। চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যেন সবাই অপেক্ষা করছে আমার মতো। হালকা সাদা হয়ে আসছে চারপাশ। পাখিগুলোর ঘুম ভাঙছে এর সঙ্গে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া কাঁপন ধরিয়ে দেয় দেহে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি দিগন্তের দিকে।

কাঞ্চনজঙ্ঘাটা ওখানেই কোথাও আছে। পাখিদের কোলাহল কেবলই বাড়ছে। কান পাতা দায়, খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক করে দিল পাখিগুলো। এর ফাঁকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াটা টকটকে লাল হয়ে গেল। সেই লাল ছড়িয়ে পড়ল গোটা চূড়াতে। তারপর কমলা থেকে হলুদ, শেষে ধবধবে সাদা পাহাড়টা দাঁড়িয়ে গেল চোখের সামনে, যেন কোনো এক জাদুর কাঠির স্পর্শে ঘুম ভেঙে উঠল। আমি তাকিয়েই রইলাম, তাকিয়েই রইলাম।

রিশপের পরের পাহাড়টাই পেডং। শান্ত নিরিবিলি জনপদ। আঁকাবাঁকা পাথুরে পথ বেয়ে পেডংয়ে আসতেই সকালের নাশতা হজম হয়ে গেল। আমরা যাব পেডং থেকে ১৭ কিলোমিটার নিচের ঋষি নদীর পারের ঋষি ইকো ট্যুরিজম রিসোর্টে। আগে থেকে বুকিং না দিয়ে চলে এসেছি, সঙ্গে সেবাস্টিন প্রধানের ফোন নম্বর। ভাবলাম পেটে কিছু দানাপানি দিয়ে নাহয় জিপে উঠি। হোটেলে ঢুকে অর্ডার দিলাম।

ভাই, ডিম হ্যায়?

ক্যায়া?

মানে আন্ডা আছে?

ক্যায়া?

আরে ভাই ডিম ডিম, মানে আন্ডা আন্ডা।

এবার বুঝল হোটেলের বেয়ারা। ডিম-রুটি খেয়ে হেঁটে হেঁটে সোজা জিপ স্ট্যান্ডে। চলল তুমুল দরদাম। সব ড্রাইভার একজোট, আর আমি যেন এক বেচারা।

শেষে বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। সেবাস্টিন প্রধানের নাম বলতেই জোট ভেঙে গেল দ্রুত। আমি সেবাস্টিনের বন্ধু জানাতেই ৩০০ রুপির ভাড়া হয়ে গেল ২৫০ রুপি আর ড্রাইভারের গোমড়া মুখ হয়ে গেল উজ্জ্বল হাসিমাখা। ১৭ কিলোমিটার পথ গড়াতে গড়াতে এসে থামলাম সিকিমের চেকপোস্টে। ইকো ট্যুরিজম রিসোর্ট পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিম সীমান্তে। সিকিমের চেকপোস্ট দিয়ে ঢুকে একটা নদীর সেতুর পার হয়ে রিসোর্টে যেতে সময় কম লাগে। তাই সিকিম চেকপোস্টে আসা। বাংলাদেশিদের সিকিমে ঢুকতে বিশেষ অনুমতি লাগে, যেটা আমার নেই। তাই নিজের পরিচয় লুকিয়ে সিকিম ঢোকার চেষ্টাই করলাম না। ফোন দিলাম সেবাস্টিনকে। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই হাজির ছিপছিপে গড়নের এক শক্তপোক্ত লোক। চেকপোস্টে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। গার্ডগুলো বেশ হাসিমুখেই আমাকে ঢুকতে দিল। পাঁচ-সাত মিনিট হেঁটে তারপর ছোট একটা কাঠের সেতু পেরিয়ে আবার পা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে। নদীর পাড় ধরে খানিকটা হেঁটে এসে পৌঁছালাম রিসোর্টের  আঙিনায়। ‘রিসোর্ট’ শব্দটির মধ্যে যে রকম ভারিক্কি একটা ব্যাপারস্যাপার আছে, তার কিছুই নেই এখানে। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা রকমের ঘর। আর মাঝখানে একচিলতে উঠান। এর এক পাশ দিয়ে বয়ে চলছে তিস্তার ছোট্ট একটা শাখা নদী। কত চওড়াই বা হবে, এই ধরুন ২০-২৫ ফুট। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি, কিন্তু কী যে তার গর্জন। বড় বড় পাথরকে কোন মুলুক থেকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে এখানে কে জানে? উঠোনের অন্য পাশটা পাহাড়ি বন। ঘন সবুজ পাইন বনের ভেজা বাতাস দূর করে দেয় সব ক্লান্তি।

দুপুরটা কেটে গেল ঋষি নদীতে মাছ ধরে আর হাঁটুপানিতে হুটোপুটি করে। ঋষি নদী দিয়ে বয়ে চলা হিমালয়ের বরফ গলা কনকনে ঠান্ডা পানি হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিল। দুপুরের খাবারের মেনুতে ঠাঁই পেল নদীতে ধরা ছোট ছোট মাছ ভাজা, সবজি আর ডাল। ছিমছাম পরিবেশে ছিমছাম খাওয়া। বিকেলে ঘুরে বেড়ালাম নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে।

ঋষিতে সন্ধ্যা নেমে এল ঝুপ করে। কুপি আর হারিকেনের মিটিমিটি আলোতে অদ্ভুত এক আলো-আঁধারি পরিবেশ। হাজার হাজার পাখি ঘরবাড়ি নিয়ে ঝগড়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দুই পাশে পাহাড় আর মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে বসে আছি সেবাস্টিন প্রধানের সঙ্গে।

সেবাস্টিনের পুরো নাম সেবাস্টিন সত্য প্রকাশ সাঙে চোগিয়াল প্রধান। জন্ম তাঁর খ্রিষ্টান পরিবারে। যুবক বয়সে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নেন, আর এখন বৌদ্ধ। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এর কারণ বললেন ‘আগে খেয়ে নাও তারপর শুনো।’ রাতের মেনু বেশ ভারী। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে মুরগির ঝোল, সবজি আর ডাল। খোলা আকাশের নিচে হারিকেনের আলোয় ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত গরম ভাতের সঙ্গে উষ্ণতা খুঁজে নিল।

সেবাস্টিনের গল্প শুরু হয়। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি, কীভাবে একটা লোক পাল্টে দেন একটা গোটা জনপদ। কীভাবে একটা লোক নিজ হাতে পরিষ্কার করেন পেডংয়ের রাস্তার জঞ্জাল, কীভাবে ঘোরের মাঝে উড়ে বেড়ান হিমালয়ের ওপর।

রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারা মিটমিট করছে।রাত গভীর হয়। নদীর পথগুলোর শব্দ আরও তীব্র হয়। ঠান্ডা হাওয়া জেঁকে ধরে চারপাশ থেকে। জঙ্গল থেকে ভেসে আসে পাহাড়ি পোকার তীক্ষ্ম ডাক। সেবাস্টিনের কানে কিছুই পৌঁছায় না, সেবাস্টিন ঘোর লাগা মানুষের মতো গল্প বলেই যায়, বলেই যায়।

 

মন্তব্য