প্রবাল দ্বীপের হাতছানি

martin

রাকিব কিশোর

 

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে চারপাশের নীল পানিকে পাড়া-প্রতিবেশী বানিয়ে যে প্রবাল দ্বীপের বসবাস, সেটাই কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘রুপালি দ্বীপ’, প্রবাল দ্বীপ। পুবের এলোমেলো পাহাড় আর পশ্চিমের নীল সাগরের মাঝখানে তার বাস। নারকেল জিঞ্জিরা নামেও ডাকা হয় এ দ্বীপটিকে।

নীল সাগরের সাদা বালু আর টুকটুকে লাল কাঁকড়া দেখার টানে ছুটে গেছি স্বপ্নদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। সঙ্গে ছিলেন সারাক্ষণ হাসতে থাকা আরমান ভাই, হাসাতে থাকা রকি ভাই, চুপ মেরে থাকা অলি ভাই আর শাহেদ।

ছোট এই দ্বীপটা চাইলে হেঁটেই তিন ঘণ্টার মধ্যে পুরোটা ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। তাই যাঁরা সকালে গিয়ে বিকেলেই ফেরত আসেন, তাঁরা কোনো মজাই পান না, এখানকার আসল মজা লুকিয়ে আছে বিকেল আর রাতগুলোয়। বিকেলবেলায় ভাটার টানে যখন সমুদ্রের পানি স্কুল ছুটির মতো সৈকত থেকে হুড়হাড় করে পালিয়ে যেতে থাকে, তখন প্রবালের খাঁজে খাঁজে হাঁটুপানিতে আটকে পড়ে রংধনু রঙের ছোট ছোট অনেক মাছের দল। শেষ বিকেলের এই মাছ দেখা সময়টা কাটতে না কাটতেই চলে আসে তারাভরা রাত। জোছনা এসে জড়িয়ে ধরে চিকচিকে বালুর সারা গা, নিথর কেয়াবনে শাঁ শাঁ করে ছুটে যায় ব্যস্ত বাতাস, সাগরের ফেনা আছড়ে পড়ে রুক্ষ প্রবালের গায়ে।

চাঁদের আলো গায়ে মাখা এই রুপালি দ্বীপে যিনি একবার জোছনা দেখেছেন, তিনি জেনেছেন পূর্ণিমা কী জিনিস, চাঁদের হাসি কাকে বলে!

সেন্ট মার্টিনে খুব ভোরে সূয্যিমামা জাগার আগেই প্রাতর্ভ্রমণে বের হয় লাল কাঁকড়ার দল। তাদের নিজ পায়ে করা শিল্পকর্ম দেখলে আর কোন শিল্পীর কাজ মনে ধরবেনা আপনার।

সেন্ট মার্টিনে গিয়েছিলাম দুটো কাজের জন্য। দেখা আর খাওয়া। বাংলাদেশের আর সব আনাচকানাচে গিয়ে খাওয়া নিয়ে বাছবিচার করলেও, সেখানে গিয়ে আমরা উদরপূর্তির বিষয়টায় রীতিমতো উদার হয়ে যাই। সারা দিন ছেঁড়া দ্বীপে টইটই করে ঘুরে পেটে রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়ে সন্ধ্যার সময় ফিরলাম বাজারে। উদ্দেশ্য, মাছের বারবিকিউ খাব। মাছ দেখে চক্ষু চড়কগাছ। কী বিশাল একেকটা! দোকানির প্লেটে শুয়ে আমাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেড়-দুই কেজি ওজনের রূপচাঁদা, টেকচাঁদা, কালাচাঁদা আর কোরালগুলো। চকচক করতে থাকা মাছগুলোর দিকে লোভনীয় দৃষ্টি ঢেলে দাম জানতে চাইলাম, ব্যাপক দর-কষাকষি শেষে দুটি বিশাল আকারের মাছ কিনলাম ৮৫০ টাকা দিয়ে, জীবনের সেরা বারবিকিউ খেলাম সেদিন। ফোলা পেট নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে যখন সাগরের কিনারে এসে পা ডুবিয়ে দাঁড়ালাম, তখন ভরা পূর্ণিমার চাঁদকেও আড়াল করে দিল উত্তর-দক্ষিণে সোজা চলে যাওয়া দুধসাদা ছায়াপথ। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাঁদের আলোয় নাচতে থাকা বঙ্গোপসাগর জানান দিল, দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটায় কী নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যায়।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বাস যায়। সেখান থেকে সকাল সাড়ে নয়টায় জাহাজ ছেড়ে যায় সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে। নাফ নদী পেরিয়ে তিন ঘণ্টা পর আপনি পৌঁছে যাবেন নারকেলের দ্বীপে। থাকা-খাওয়ার জন্য বেশ কিছু হোটেল আছে। যদি মাছের বারবিকিউ খেতে চান, তাহলে দোকান থেকে সরাসরি না কিনে একটু হেঁটে চলে যান মাছের আড়তে, বড় বড় মাছ পাবেন, পাবেন শুঁটকিও। হোটেলগুলোয় আপনার পছন্দমতো রেঁধে দেবে মাছ। এখানে বিকাল তিনটার পর সবকিছু পাবেন অর্ধেক দামে। আরেকটা কথা, এখানে গেলে অবশ্যই এক রাত থাকবেন। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রাত আপনার জন্য লুকিয়ে রেখেছে জল-পাথরের এই রুপালি দ্বীপটা।

মন্তব্য