যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সংগঠনগুলো ভিন্নধর্মে বিশ্বাসীদের মধ্যে বিয়ে, মহিলাদের ইমামতি এবং নারী পুরুষের একসঙ্গে নামাজ পড়ার বিষয়গুলোকে মেনে নিচ্ছে

MuslimYouth

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস : লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া Ñ ওমর আকেরসিম নিয়মিত নামাজ আদায় করে এবং রমজানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখে। আবার সে খোলামেলাভাবেই একজন গে।

আকেরসিম, ২৬, হলেন আমেরিকার মুসলিমদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু বিকাশমান দলের অংশ যারা ইসলামের দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সেইসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে যেগুলো তাদের বাবা-মায়েদের বিশ্বকে গড়ে তুলেছিলো। তারা বিশ্বাস করে যে, কেউ গে হয়েও মুসলিম থাকতে পারে; নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে নামাজে শরিক হতে পারে, নারীরা ধর্ম প্রচার করতে পারে, মুসলিম নারীরা ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী পুরুষকে বিয়ে করতে পারেÑ এবং তারা তাদের এসব বিশ্বাসের পক্ষে কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে।

এই অবস্থান পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে যখন তরুণ আমেরিকান মুসলমানরা যে বিশ্বাসের মধ্যে বেড়ে উঠেছে সেটির পুনর্গঠনের জন্য কাজ করছে যাতে এটি তাদের জটিল, দ্বৈত পরিচিতির সঙ্গে আরও ভালভাবে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারে। এজন্য তারা একদিকে যেমন তাদের বাবা-মার অভিবাসী বিশ্বাসের জগৎকে ধারণ করার চেষ্টা করে তেমনই অন্যদিকে তারা আমেরিকার সদা-পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক চিত্রের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারেও সচেষ্ট। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, মুসলিম বলতে কী বোঝায় সে সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংলাপের সৃষ্টি হয়েছে এবং একইসঙ্গে ইসলামের চিরস্থায়ী বিধানসমূহের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মত নতুন ব্যাখ্যার জন্য কোরআনের পুনঃপরীক্ষার একটি পা-িত্যপূর্ণ প্রয়াসও দেখা যাচ্ছে।

লস এঞ্জেলেসে গে মুসলিমদের সমর্থনকারী একটি গ্রুপের নেতৃত্বদানকারী আকেরসিম বলেন, ‘‘একটি জাতি হিসাবে আমরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি তার প্রেক্ষাপটে আমেরিকায় ইসলামের ওপর পরিবর্তন আনার জন্য এবং সমকামিতার মত বিষয়গুলির প্রতি তার অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এখানকার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ ও জানান দেয়ার জন্য ইসলাম এখন উন্মুখ এবং এটি করতে হলে তাকে খাপ খাওয়ানোর কাজটি করতে হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘১০ থেকে ১৫ বছর আগে এটি ছিলো অসম্ভব।’’

ইসলামে পরিত্যাজ্য হিসাবে বিবেচিত বিষয়গুলির সম্পর্কে ধারণা ভেঙ্গে দেয়ার মধ্যেই এই অবস্থান পরিবর্তনের অবসান ঘটবে না। তরুণ আমেরিকান মুসলিমরা প্রায়শই হানা দিচ্ছে ফ্যাশন, মিউজিক এবং এমনই আলোড়ন সৃষ্টিকারী নানা বিষয়ে যা আমেরিকার পপ সংস্কৃতির অংশ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় সাম্প্রতিক সময়ে ইউটিউবের একটি ভিডিওর কথা যার ব্যাকগ্রাউন্ডে জে-জেড-এর ‘‘সামহোয়্যার ইন এমেরিকা’’ গানটির উদ্দাম বাজনার সঙ্গে মাথায় স্কার্ফ ও স্কিনটাইট জিন্স পরা মুসলিম হিপ্পিদের Ñ অথবা বলা যায় মিপস্ট্যারসদের স্কেটবোর্ডিং করতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় সাড়ে ২৭ লাখ মুসলিমের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই হলো এদেশে জন্ম গ্রহণকারী এবং এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে কারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী সার্বিক মার্কিন জনসংখ্যার চেয়ে বয়সে তরুণতর। ২০১১ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সমীক্ষায় এই তথ্য পাওয়া গেছে।

অধিকতর উদার ইসলামের পক্ষে যারা ওকালতি করেন তারা বলেন, ভিন্ন ধর্মের নারী পুরুষের বিয়ে এবং সমকামিতার ওপর কোরআনে কোন বাধা নেই বরং এর ভিত্তি হলো ইসলামিক আইনের রক্ষণশীল ব্যাখ্যা যার কোন গুরুত্ব আমেরিকায় নেই। ঐতিহাসিকভাবে অনেক মুসলিম দেশেই নারীপুরুষের একসঙ্গে নামাজ আদায় এবং ভিন্নধর্মীদের মধ্যে বিয়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ২০১২ সালে ‘‘লাভ ইনশাল্লাহ’’ নামে মুসলিম আমেরিকান নারীর ভালবাসার গল্প সঙ্কলন প্রকাশ করেছেন তানজিলা আহমেদ, ৩৫। তিনি বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, এটি বলা ভালো যে আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে যে ঐতিহ্যগত ইসলাম রয়েছে তা অনেক মুসলমানকে পরিত্যাগ করেছে। আমার বাবা-মা যে ইসলামের অনুসরণ করেছেন তা আমাকে গ্রহণযোগ্য মনে করে বলে আমি কখনই অনুভব করি না।” যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ইসলামের একীকরণের বিষয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একজন অধ্যাপক ড. ওয়াইভোনি হাদ্দাদ বলেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক আমেরিকান মুসলিম এখনও ঐতিহ্যগত উপায়ে তাদের ইসলামের বিশ্বাস লালন-পালন করেন, কিন্তু অন্যরা তাদের বাবা-মার ইসলামকে নিছক একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসাবে দেখতে শুরু করেছেন।’’ এর ফলে নামাজ আদায় বা সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য মসজিদের পরিবর্তে কোন নিরপেক্ষ স্থান যেমন কমিউনিটি সেন্টার ইত্যাদি বেছে নেয়ার ওপর নতুন করে গুরুত্ব আরোপিত হচ্ছে।

হাদ্দাদ বলেন, ‘‘এদের অনেকে এখনও মসজিদেই যেতে চান, তারা এখনও বিশ্বাস ধরে রেখেছেন এবং নামাজ আদায় করেন কিন্তু অন্যরা সরে আসছেন। এই সরে আসা লোকেরা ধর্মহীন মানুষ হিসাবে খুবই স্বস্তি অনুভব করেন।’’ হাদ্দাদ বলেন, ‘‘এসব লোক মনে করেন যে, তাদের সংস্কৃতি মুসলিম হিসাবে তাদেরকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ইত্যাদির মাধ্যমে একটি ঝুলন্ত অবস্থা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পেরেছেন এবং সমাজ তাদের ওপর যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করেছিলো সেই সবকিছু থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে তারা অত্যন্ত স্বস্তি বোধ করছেন।’’

লস এঞ্জেলেসে ‘প্রগতিশীল মূলবোধের মুসলিম’ নামের একটি ধর্মীয় গ্রুপ একজন মহিলা ইমামকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে যেই মহিলা ইমাম সমকামী এবং ভিন্নধর্মীদের মধ্যে বিয়ে পড়ান এবং গে মুসলিম গ্রুপগুলিকে সমর্থন করেন। তিনি এবাদতের এমন পদ্ধতিতে বিশ্বাস করেন যেখানে মহিলারা খুতবা দিতে এবং নারী-পুরুষ এককাতারে নামাজে সামিল হতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়টি বড় শহরে এবং ছয়টি বিদেশী রাষ্ট্রে এই গ্রুপের শাখা রয়েছে এবং গত বছর এটিকে একটি বেসরকারী সংস্থা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।

মালয়েশীয় বংশোদ্ভূত একজন মুসলিম মহিলা গায়িকা ও সঙ্গীত রচয়িতা অ্যানি জোনভেল্ড এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কিছু ইসলামিক পপ গানের রেকর্ড বের করার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় কারণ একজন মুসলিম নারী এসব গান গেয়েছেন। এর পরই ১৯৭৭ সালে তিনি ধর্মীয় গ্রুপটি গঠন করেন।

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে ইসলামের ব্যাখ্যা হলো সামাজিক সমতার মূল্যবোধÑ আর সমতার ধারণা শুধু মুখে যা বলি সেটা নয় এই সমতা আমাদের চর্চার মধ্যে। এটিই হলো ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম থেকেও স্বাধীন হওয়া।’’

গে মুসলিম আকেরসিম খুব ভালো করেই জানেন যে এই অবস্থানগত পরিবর্তন কতটা কঠিন।

গত বছর আকেরসিম তার বাবা-মার বাড়ি থেকে রাতের বেলা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। কারণ তারা তাকে কাজের সময় ডেকে নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন যে, সে কবে বিয়ে করবে। সে এখন তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে কিন্তু গত দেড় বছর ধরে বাবার সঙ্গে কথা বলে না।

এখন সে মসজিদে যায় না তবে একাকী নামাজ পড়ে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তার মনে কোন অনুশোচনা নেই।

তার ভাষায়, ‘‘আমাকে যেসব কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে সেসব আমাকে আরও বেশি করে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। আমার মধ্যে ঈশ্বর শক্তি যোগাচ্ছেন।

মন্তব্য