আরব বসন্তে গ্রীষ্মের দাবদাহ

arab bosonto

মুহাম্মদ রুহুল আমীন

স্বাধীনতা ও উন্নয়নের আশিস নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের আবির্ভাব হলেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দুষ্টচক্রের করালগ্রাসে সে বসন্ত শেষ পর্যন্ত গ্রীষ্মের দাবদাহ ছড়িয়ে দিয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো- আরব বসন্তের ফলাফল বিশ্লেষক পণ্ডিতগণ আশাবাদী ও নিরাশাবাদী- এ দুইটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ নিবন্ধের প্রতিপাদ্য হলো- আরব বসন্তের নির্মোহ বিশ্লে­ষণ করে আশাবাদ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করা।

আরব রাষ্ট্রসমূহের একনায়ক শেখ রাজ আমীরদের স্বৈর শাসনে নির্যাতিত নিষ্পেষিত আরব জনতা প্রকৃতির ন্যায় শান্ত স্নিগ্ধভাবে কোন রকম কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা ও দিক-নির্দেশনা ছাড়া আরব মরু এলাকায় বসন্তের মৃদু মলয় প্রবাহিত করে। স্বৈরশাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি, দুঃশাসন, স্বজনপ্রীতি নাগরিকদের বেকারত্বের শৃংখলে এমনভাবে বেঁধে রাখে যে, জীবন সুখের অনুভূতিটুকুও তারা হারিয়ে ফেলে। যে রাষ্ট্রসমূহে আরব বসন্তের প্রবল ধাক্কা রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে, সেখানে শাসকগণ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে টিকে ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এমনভাবে গড়া হয়েছিল, যাতে এখনকার শাসকদের মৃত্যুর পর তাদের সন্তান-সন্ততি বা গোত্রীয় লোকজন শাসনভার গ্রহণ করতে পারে। কোথাও বিরোধী রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে পারেনি। ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারী তিউনিসিয়ায় একনায়ক বেন আলীর পলায়নের পূর্বে হাতে গোনা কয়েকটা রাজনেতিক দল ছিল, যারা বিরোধী দলের সাজানো মঞ্চে অভিনয় করতো। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে অনূর্ধ্ব ১০০টি রাজনৈতিক দল প্রকৃত অর্থে বিরাজ করছে। গাদ্দাফী, বেনআলী, হোসনি মোবারক, সালেহ-এর ন্যায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আকড়ে থাকা শাসকদের দেশ লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর ও ইয়েমেনসহ অন্যান্য আরব দেশসমূহে গণতন্ত্র ও মুক্ততার চিন্তা করা ও মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। বিখ্যাত Survival Joual-এর ৫৩ অভিউমের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বিশ্বের অন্যান্য দরিদ্র দেশের তুলনায় আরব দেশসমূহের বেকারত্বের হার শতকরা ১০ ভাগ বেশি। এ সমস্ত দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই ২৫ বছরের নিচে। অর্থাত্ বয়স্ক বেকার যুবক এখানে জনসংখ্যার অর্ধেকাংশ। ২০১১ সালে আইএমএফ এর-Regional outlook for me and central Asia-তেও এমন ভয়াবহ বেকারত্বের চিত্র অংকিত হয়েছে। ২০০৪ সালের Arab Human Development Report–এ আরব রাষ্ট্রসমূহের কাঠামোগত স্তরসমূহের সর্বত্র ‘চুক্তি ও ঘুষ’ (contracts and commissions) জাতীয় দুর্নীতি সঞ্চারিত হয়ে আসছে। আরব দেশগুলোর সর্বত্র মানবাধিকার মারাত্মকভাবে লংঘিত। আরব আবাসন খাতেও যে অরাজকতা, তাতে জনগণের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।

এমন এক ভয়াবহ আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার উচ্চ শিক্ষিত হতভাগ্য বেকার যুবকের আত্মহত্যার পথ ধরে আবর বসন্তের ঝিরিঝিরি বাতাস প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহে প্রবিষ্ট হয়। তখন কেউই হয়ত ভাবেনি আরব বসন্তের এ মৃদুমন্দ সমীরণ অনতিবিলম্বে সমগ্র আরব এলাকায় তীব্র দাবদাহ উদগীরিত করবে এবং অত্রাঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিন্যাসকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে নতুন এক উন্নয়ন ধারার সৃষ্টি করবে, এখানেই আরব বসন্তের প্রকৃত মূল্যায়নের রহস্য নিহিত।

আরব বসন্তের দেদীপ্যমান অবদান সত্ত্বেও বিশেষত: মিসরের ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পর একশ্রেণীর বিশ্লেষক আরব বসন্তের ব্যর্থতা প্রমাণিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, মিসরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে যেহেতু সামরিক বিচারিক আমালাদের ষড়যন্ত্রে উত্খাত করা সম্ভব হয়েছে, ফলে আরব বসন্ত মিসরে কার্যকর ফল বয়ে আনেনি। তিউনিসিয়ার নির্বাচনে প্রথম দিকে ব্রাদারহুডের আদলে ধর্মীয় ভাবধারায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক দল ‘ইন্নাহাদা’ এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেক্যুলার দল নিদায়ে তিউনিস পার্টির কাছে হেরে যাওয়ার কারণে তিউনিসিয়াতেও আরব বসন্ত ব্যর্থ হয়েছে বলে নিরাশাবাদিগণ  মতামত ব্যক্ত করেছেন। লিবিয়াতে বিপ্লবের জোয়ারে গাদ্দাফীর পতন হলেও পরবর্তীতে বিপ্লবীদের অনৈক্য ও বিশৃংখলার কারণে সেখানেও আরব বসন্ত কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনেনি বলে হতাশা ছড়ানো হচ্ছে। ইয়েমেনসহ অন্যান্য আরব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার অযুহাতে আরব বসন্তের মৃদুমলয়ের প্রভাব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বলয়ে স্থাপিত হচ্ছে না বলে ব্যাপক প্রচারণা, হাস্য-কৌতুক ও নিরাশা বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে।

আমার দৃষ্টিতে নিরাশাবাদীদের হতাশার অনেক যৌক্তিক কারণ অনস্বীকার্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে, এ বসন্ত নৈরাশ্যমূলক ঘটনাপঞ্জীর আড়ালে আরব বসন্ত অত্রাঞ্চলে গণতন্ত্র, প্রগতি ও মুক্ততার যে সম্ভাবনা সঞ্চারিত করছে তা কি অস্বীকার করার মত? আমার আশাবাদে স্থানিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বলয়ে আরব বসন্তের মরু মলয়ের ব্যাপক প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। আরব অঞ্চলে আরব বসন্ত ধীরে ধীরে আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনঃর্বিন্যাসের মাধ্যমে এক যুগান্তকারী ফলাফলের প্রভাব রচিত করছে। এখানে যা কিছু হতাশার, নৈরাশ্যের তা নিতান্ত সাময়িক, আর পরিবর্তনের হাতছানি চিরায়ত।

আরব বসন্ত স্থানিক রাজনীতি ও নেতৃত্ব শুধু চ্যালেঞ্জেই ফেলেনি, সেই অপরাজনীতি ও অভিশপ্ত নেতৃত্ব নিধনের সামাজিক আন্দোলন  গণচেতনায় চিবযুক্ত করেছে। সেই যুক্ততা এতই সবল, দুর্লংঘ ও শক্তিশালী যে, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কেউ পালিয়ে গেছেন, কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ কারান্তরীণে, আর কেউবা নিছক বেঁচে থাকার লক্ষ্যে বৈশ্বিক শক্তিচক্রের আশ্রয় প্রশ্রয় পাওয়ার ধান্দারত রয়েছেন। এভাবে আরব বসন্ত স্থানিক সমাজ ও রাজনীতিকে  যুগান্তকারী পরিবর্তনের কাঠামো উপহার দিয়েছে। আরব বসন্তের ফলাফল নিয়ে আমার আশাবাদের দ্বিতীয় কারণ হলো আঞ্চলিক পরিসরে  এতবছর ধরে জীবিত থাকা ঔপনিবেশিক, নব্য ঔপনিবেশিক এবং ছন্দ স্বদেশিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারায় মহাপ্রলয়ের আবির্ভাব ঘটা। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে মতাদর্শের সম্পূর্ণ বা অর্ধেকাংশ বা কিয়দংশ আরব্য আচরণের সাথে যুক্ত করে আরব রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থান্ধ রাজনীতিকরা যে রাজনৈতিক মডেল এতদিন গড়ে তুলেছিলেন, তা আরব বসন্তের ধাক্কায় পুনর্মূল্যায়িত হচ্ছে। বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরাসহ অন্যান্য বিশ্ব মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত বিপ্লবোত্তর আরব দেশসমূহের রাজনৈতিক মডেল নিয়ে তরুণ প্রজন্ম ও প্রাগ্রসর প্রাজ্ঞবর্গের বিতর্ক কি এই ইংগিত দেয় না যে আরবের আঞ্চলিক রাজনীতিকে নতুন মেরুকরণের সন্ধিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে? মূলত নরওয়ে, সুইডেনের মত কল্যাণ গণতন্ত্র বা ফ্রান্সের মত উগ্র ধর্মনিরপেক্ষবাদ বা তুরস্কের মত উদার আত্মজ স্বদেশী আদর্শবাদ এই তিনটি মডেলের কোনটি আরব বসন্তোত্তর আরব রাষ্ট্রসমূহে প্রযোজ্য হবে তা নিয়ে যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে, তার মধ্য দিয়ে একসময় একনায়কদের মডেলের অবসান ঘটবে। আমরা তিউনিসিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেক্যুলায় ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর ঐক্যের রশ্মিতে এমন এক সর্বজনগ্রহণীয় রাজনৈতিক মডেলের উদ্ভাসিত হতে দেখছি। অধিকাংশ আরব দেশের সাধারণ নাগরিকগণ প্রবল ধর্মানুভূতি দ্বারা লালিত বলে তাদের মধ্যে ফরাসীদের সেক্যুলায় নীতি হয়ত স্থায়িত্ব বা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। নরওয়ে বা সুইডেনের

কল্যাণতন্ত্র বেশ আকর্ষণীয় হলেও সর্বসাধারণ আরবদের কাছে এটা অপরিচিত ও ভিনদেশীয় হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দীর্ঘ চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে নিষ্ঠুর ইতিহাসের পরা বাস্তবতার  নিরিখে তিল তিল করে গড়ে তোলা তুর্কী মডেল উচ্চ শিক্ষিত, কম শিক্ষিত ও সাধারণ ধর্মগবিষ্ট আরব জনগণের কাছে বন্দনা পেতে পারে। এ তিনটি রাজনৈতিক মডেল  কে কেন্দ্র করে আরব এলাকায় এক সঞ্জীবিত বৈপ্লবিক ও সৃজনশীল রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে বলে এ মুহূর্তে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়।

আরব এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবোতর উন্নয়ন মডেল বিশ্লে­ষিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সালে উন্নয়নের লক্ষ্যে যে তত্ত্বসমূহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখাগুলোতে আলোচিত হতো, তা আরব এলাকায় প্রযোজ্য হবে না বলে অনুমান করা যায়। পুঁজিবাদী ভাবধারায় যে উন্নয়ন চিন্তা উন্নয়ন অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, শীঘ্রই তা ছক তাত্ত্বিকগণের  দ্বারা কেন্দ্র প্রান্তের শাসন শোষণ  এবং নির্ভরশীলতার  নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে অগ্রহণযোগ্য এবং অপাংক্তেয় হিসেবে প্রতিপন্ন হয়। ফ্লাংক, ওয়ালারস্টেইন, সামীর আমীন, ফুর্তাদো, ফ্যালেটটো প্রভৃতি পণ্ডিতগণ সেই যুদ্ধোত্তর পুঁজিবাদী আধুনিকায়ন তত্ত্বের অসারতা প্রমাণিত করেন। দুর্ভাগ্যবশত একসময় তাত্ত্বিকগণের মতাদর্শে গড়ে উঠা সমাজতান্ত্রিক ও কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রসমূহের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া গর্বাচভের গ্লাস্তনস্ত ও পেরেস্ত্রয়কা নীতি ঘোষণার সাথে সাথে অকার্যকর প্রমাণিত হয়। আধুনিকায়নে পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী মতাদর্শের এ সামগ্রিক ব্যর্থতার উদাহরণ সামনে রেখে আরব রাষ্ট্রসমূহ আধুনিকায়নের নতুন মডেলে আগ্রহী হবে। কি হবে সেই মডেলের রূপান্তর কাঠামো? হ্যাঁ, আরবদের দীর্ঘ সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ধারণ করে আরব সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যুত্সই ও যৌক্তিক এক গ্রহণযোগ্য মডেলের উপস্থাপনায় আরবের নেতৃবৃন্দ নবতর প্রয়াস চালিয়ে যাবেন। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ লক্ষ্যে ব্যাপক গবেষণা কর্ম শুরু হয়েছে।

আরব সংস্কৃতি এখন নতুনভাবে বিকশিত হচ্ছে। ইয়েমেনের বাবরাক কারমালের মতো প্রগতিশীল অথচ হিযাব পরিহিতা এক অকুণ্ঠ সাংবাদিক নির্মীয়মাণ আরব সংস্কৃতির মডেল হিসেবে একসময় চিহ্নিত হয়েছিলো। তাকে বিশাল পুরস্কার ও সম্মান দেয়ার কথাও ভাবা হচ্ছিল। তিউনিসিয়ার চেতনা জাগৃতির জনক রশিদ ঘানুচি বা মিসরের উচ্চ শিক্ষিত অথচ ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি বা তিউনিসিয়ার সেক্যুলার ধর্মীয় গোষ্ঠীর ঐক্যতানে গড়া এক মিশ্রিত সাংস্কৃতিক জাগরণ ইত্যাদি যেকোন একটি মডেল অনুসৃত হবে আরব রাষ্ট্রসমূহে। পরিবর্তন সেখানে অনিবার্য, অবধারিত। কারণ দীর্ঘ অপশাসন, দুঃশাসন, আগ্রাসী ঔপনিবেশিক ছত্রচ্ছায়ার শাসনে জর্জরিত আবরদের মাঝে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জোয়ার উঠেছে, যার তরংগ-অভিঘাতে সাংস্কৃতিক পুনঃমূর্তিয়ায়নের  নতুন যুগের উন্মেষ ঘটেছে।

আরব বসন্তের মৃদুমলয়ের প্রভাব বিশ্ব বলয়ে যে প্রকম্প জন্ম দিয়েছে, তা অচিন্তনীয়, আরব জাহানে স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে একচ্ছত্র মার্কিন কর্তৃত্ব আজ দূরতিক্রম্য চ্যালেঞ্জের মুখে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের  জন্ম দিয়ে ইরাক, আফগানিস্তান এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, যেভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশগুলো তছনছ করা হয়েছে, যেভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে পীর আওলিয়ার স্মৃতিময় স্থানসমূহ, যেভাবে গুয়ানতানামোর মত অত্যাচার-নির্যাতনের কারাগার বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তার কারণে আফ্রো-এশীয় আরব এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, সম্মান ও মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। অখ্যাত, অজ্ঞাত, আই এস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ন্যাটো রাষ্ট্রসমূহ এবং আরব রাষ্ট্রসমূহ প্রতিরোধের সমবেত ফ্রন্ট গঠন করলেও আইএসকে পরাস্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বাশার-এর মত একনায়ককে হঠানো যাচ্ছে না। ইরানের মত পারমাণবিক অভিলাষী এক রাষ্ট্রের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সদ্ভাব বজায় রাখতে হচ্ছে। ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার ‘ইতিহাসের ইতি’ তত্ত্ব অসার প্রতিপন্ন হচ্ছে এবং আগামী দিনে আরব এলাকাতে যে সহজে টিকে থাকা যাবে না তার বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। গর্বাচেভসহ অনেক বিশ্বনেতা স্নায়ুযুদ্ধের পুনরুত্থানের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। আরব বসন্তের আরেকটি কৌশলগত পরিবর্তন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নবতর বন্ধুত্ব  যুগের অবতারণা, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির মৌলিক পরিবর্তনের ইংগিতবহ। সর্বোপরি আরব বসন্তের বদৌলতে মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তিত নিরাপত্তা কাঠামো রচিত হচ্ছে বলে অনেক সামরিক বিশ্লে­ষক মতামত ব্যক্ত করছেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সদ্ভাবের সিঁড়ি বেয়ে ‘পারমাণবিক নিবারকতত্ত্বের অনেককে আরব এলাকায় অভিনব এক নিরাপত্তা কাঠামো  তৈরি হতে যাচ্ছে।

আরব বসন্তের আবির্ভাবে স্থানিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বলয়ে উপরিউক্ত পরিবর্তনসমূহ আবর বসন্তের সাফল্যের স্পষ্ট নির্দেশিকা। আরব রাষ্ট্রসমূহ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিভাবে খাপ খাওয়াবে তা নির্ভর করবে অত্রাঞ্চলের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিকবৃন্দের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠার উপর।

 

লেখক : উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য