সন্ত্রাসবিরোধী মক্কা সম্মেলন প্রসঙ্গে

 

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বাংলাদেশে যখন বিএনপি ও জামায়াত রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারার অভিযান চালাচ্ছে এবং সিরিয়া ও ইরাকে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট নামধারী সন্ত্রাসীরা চালাচ্ছে গলা কেটে মানুষ মারার বর্বরতা, তখন সৌদি আরবের মক্কা শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সন্ত্রাসবিরোধী এক আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন। ‘ইসলাম এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ (ওংষধস ধহফ ঈড়সনধঃরহম ঃবৎৎড়ৎ) শীর্ষক এই তিন দিনব্যাপী সম্মেলনটি মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের (গডখ) উদ্যোগে ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার শেষ হয়।
আমার সৌভাগ্য, এ সময় আমি মক্কা শহরে অবস্থান করছিলাম। জেদ্দা শহরের দুটি বাংলাদেশী পরিচালিত স্কুল-কলেজের আমন্ত্রণে তাদের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। সেই সুযোগে মক্কা ও মদিনায় গমন এবং ওমরাহ পালনও করেছি। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ছিলাম সৌদি আরবে। ফলে ২৫ তারিখে সব সন্ত্রাসবিরোধী ইসলামী সম্মেলন সম্পর্কে বিশদ অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।
এ সম্মেলনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও আলেম-ওলেমা ও ধর্ম বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। আমি মক্কা শহরে কাবা শরিফ সংলগ্ন হোটেল হিলটনে অবস্থান করছিলাম, সেই হোটেলে এই সম্মেলনের দু’একজন প্রতিনিধিও উঠেছিলেন। তাদের সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে এবং এই সম্মেলন সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পেরেছি।
মক্কায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের পেছনে সৌদি সরকারের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল প্রকাশ্য। সম্মেলন শেষে যে ইশতেহার প্রকাশ করা হয় তাতে সন্ত্রাসকে কঠোরভাবে নিন্দা করে ইসলাম ধর্মবিরোধী আখ্যা দেয়া হয়েছে। সম্মেলনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর যুক্ত কার্যক্রম গ্রহণের পন্থা আলোচিত হয়। সম্মেলনের ইশতেহারে বলা হয়, ঞযব ওংষধসরপ ংপযড়ষধৎং পধষষবফ ভড়ৎ নড়ড়ংঃরহম ওংষধসরপ ংড়ষরফধৎরঃু ধহফ ধংংরংঃরহম ঢ়ড়ড়ৎ পড়ঁহঃৎরবং ঃড় ভরমযঃ ঢ়ড়াবৎঃু ধহফ ঁহবসঢ়ষড়ুসবহঃ ধং ঃযবংব বহপড়হৎধমব ঃবৎৎড়ৎরংঃ ড়ৎমধহরংধঃরড়হং ঃড় বীঢ়ষড়রঃ ঃযড়ংব ুড়ঁঃয সরহফ রহ ফবঢ়ৎরাধঃরড়হ.
(সার কথা, সম্মেলন সন্ত্রাস দূর করার জন্য দরিদ্র দেশগুলোতে দারিদ্র্র্য ও বেকারত্ব দূর করার ওপর জোর দেয়। কারণ, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এর সুযোগ নিয়ে তরুণদের বিপথগামী করে)।
এই সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলনে সন্ত্রাসের পথ থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনার জন্য রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসী সংগঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সংগৃহীত তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে সরবরাহের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মক্কার এ সম্মেলনটির কথা জানার পর আমার মনে হয়েছে, সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ সন্ত্রাসবিরোধী যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের সর্বতোভাবে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে ধর্মের খোলসে, ধর্ম রক্ষার নামে জামায়াত ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সন্ত্রাস যে ইসলামসম্মত নয়, বরং ইসলামের ঘোর বিরোধী এ সত্যটা জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। বিএনপি’র তথাকথিত রাজনৈতিক আন্দোলনও চলছে জঙ্গি মৌলবাদীদের সহায়তায়।
কেবল আইনশৃংখলা বাহিনীর দ্বারা সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। সম্ভব হলে ভয়াবহ মার্কিন ড্রোন হামলা দ্বারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সন্ত্রাস দমন সম্ভব হতো। আমেরিকার বহু বিঘোষিত ‘ওয়ার অন টেরর’ এখন ইরাক ও সিরিয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিপথগামী তরুণদের সন্ত্রাসের পথ থেকে ফেরানোর জন্য চাই আদর্শের অস্ত্রও। মানবতা, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের এ অস্ত্রটি পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে নিজেরাই ধ্বংস করে ফেলেছে।
বাংলাদেশেও জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের ক্যাডার রিক্রুট করে দরিদ্র, বেকার তরুণদের মধ্য থেকে। একশ্রেণীর মসজিদ-মাদ্রাসা দখল করে জামায়াত তাদের ক্যাডার সংগ্রহ ও তাদের সন্ত্রাসে নিযুক্ত করার ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এই তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় টোপ ধর্মের টোপ। ফলে দেশের বুদ্ধিজীবীদের কুপিয়ে হত্যা করে দেশকে মেধাশূন্য করতে এ বিভ্রান্ত তরুণদের হাত কাঁপে না। বিএনপি তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের কাজেও জামায়াতের সহায়তায় এই বিপথগামী তরুণদেরই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে। এরা উৎসাহিত হচ্ছে বাইরের তথাকথিত আইএস বা ইসলামিক স্টেটের জেহাদের ডাকেও।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনার কোনো শক্তি বিএনপির নেই। জনসমর্থনও তাদের পেছনে নেই। আন্দোলনের নামে যে সন্ত্রাস তারা চালাচ্ছে, তার পেছনে মূলশক্তি জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী। এদের দ্বারা বিভ্রান্ত তরুণদের সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তুলতে হলে মানবতা ও গণতন্ত্রের জীবন্মৃত আদর্শকে সঞ্জীবিত করে আবার এদের সামনে তুলে ধরতে হবে। কেবল দমননীতির অস্ত্র দ্বারা সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না। আদর্শের অস্ত্রও দরকার।
ব্রিটিশ আমলে রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে ব্রিটিশ সরকার একটি চমৎকার পন্থা গ্রহণ করেছিল। যুগান্তর ও অনুশীলন এই দুই সন্ত্রাসী দলের শীর্ষ সন্ত্রাসী নেতাদের ফাঁসি দিয়েও যখন সন্ত্রাস দমন করা যায়নি, তখন তারা সন্ত্রাসীদের ফাঁসি না দিয়ে জেলে পুরতে শুরু করেন এবং তাদের কমিউনিজম ও মার্কসবাদ সংক্রান্ত বই পড়তে দেন। তরুণ বন্দিরা শিগগিরই এই নতুন আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং জেলে বসেই কমরেড মোজাফ্ফর আহমদ থেকে শুরু করে তখনকার বহু সন্ত্রাসী নেতা কমিউনিজমে দীক্ষা নেন। জেল থেকে বেরিয়ে এসে তারা সন্ত্রাসবাদের পথত্যাগ করেন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম দেন। গত শতকের শেষদিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতনের পর এমন কোনো বলিষ্ঠ আদর্শবাদ ছিল না, যা বিশ্বের তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে পারে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সামনে নিয়ে তারা সন্ত্রাসবাদের পথে ঝুঁকেছে। বাংলাদেশেও তার অন্যথা হয়নি। বাংলাদেশে বাম গণতান্ত্রিক দলগুলো দুর্বল ও বিভক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আদর্শের দুর্গেও ধস নামে এবং সেই শূন্য স্থানটি দখল করে নেয় জামায়াতসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তাদের সন্ত্রাসবাদ। ইসলামে যে সন্ত্রাসের স্থান নেই এবং ধর্ম নিয়ে মুক্ত আলোচনায় অভিজিৎ রায়ের মতো তরুণ ব্লগার ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিধানও নেই, এই সত্যটি এই তরুণদের জানানো হয় না। তাদের আবেগপ্রবণ মস্তিষ্ককে এই বলে ধোলাই করা হয় যে, ধর্ম সম্পর্কে মুক্ত আলোচনাও ইসলামে নিষিদ্ধ এবং আলোচনাকারীকে হত্যা করাই ধর্মের বিধান।
সন্ত্রাসকে এখন একটি আদর্শের আলখেল্লা পরিয়ে শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের মুসলিম তরুণদের সামনেই তুলে ধরা হয়েছে। এই সন্ত্রাস দমনের জন্য আদর্শের অস্ত্র প্রয়োজন। কেবল দমননীতি নয়। বিশ্বের কথা আমি এই আলোচনায় টানছি না। কেবল বাংলাদেশের কথাই বলছি। সরকার অবশ্যই মানুষ পুড়িয়ে মারার ও বোমাবাজির সন্ত্রাসীদের কঠোর হাতে দমন করবে। কিন্তু সেই সঙ্গে এ সন্ত্রাসের উৎসমুখটিও সচেতনভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা দরকার।
সেই ব্যবস্থা হচ্ছে সন্ত্রাসবিরোধী মক্কা সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বেকারত্ব থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষার বাস্তব কর্মসূচি প্রণয়ন এবং মানবতা ও গণতন্ত্রের আদর্শের দিকে তাদের আবার ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ। মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে জামায়াতিদের কব্জা থেকে মুক্ত করা এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তোলা। এজন্য দেশের গণতান্ত্রিক দলগুলো ও সরকারের সম্মিলিত ব্যাপক কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। কেবল জামায়াতের কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে, মৌলবাদকে মুখে মুখে নিন্দা করে দেশ ও জাতিকে এ যুগের এক অন্ধকার বলয় থেকে মুক্ত করা যাবে না। সন্ত্রাসবিরোধী মক্কা সম্মেলন আমার কাছে এক আলোর ইশারা। সৌদি রাজতন্ত্র বাংলাদেশের জামায়াতসহ বিশ্বের বিভিন্ন তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলোর পেছনের সহায়ক শক্তি বলে বহুদিন ধরে একটা অভিযোগ বাজারে প্রচলিত। এই অভিযোগটি এখন ভালোভাবে খণ্ডনে যদি সৌদি সরকার তৎপর হয় এবং নতুন বাদশাহ সালমান উদ্যোগী হন তাহলে শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই সন্ত্রাস দমনে তা হবে প্রকৃত সাহায্য দান।
মক্কার সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলোর দিকে আমি বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এ সম্মেলনের উদ্যোগের সঙ্গে তাদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা করা উচিত। সন্ত্রাস দমনে সৌদিদের এই নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশেও বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস জোরালোভাবে নিরুৎসাহিত করবে বলে আমার ধারণা। -যুগান্তর
লন্ডন ৮ মার্চ, রোববার, ২০১৫

মন্তব্য