সেই রুবেলই নায়ক

rubel

অ্যাডিলেডে না-ই তো থাকতে পারতেন তিনি! হয়তো আদালতপাড়ায় কিংবা জেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। তাহলে? তাহলে কী মিস করত মাশরাফি বিন মর্তুজার দল, কাল সেটি দেখিয়ে দিলেন রুবেল হোসেন। এই পেসারের জাদুকরী দুটি বলেই যে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার স্বপ্নপূরণ হলো বাংলাদেশের!

বোলিং-ব্যাটিং-অনুশীলন কিংবা রান-উইকেট। এসব শব্দই তো অনুক্ষণ উড়ে বেড়ানোর কথা রুবেলের চারপাশে। আশৈশব থেকে তাই হয়ে আসছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে হঠাৎ এক ঝড়ে পাল্টে গেল সব। পুলিশ-মামলা, আদালত-জেল এসব শব্দের চক্করে পড়ে গেলেন রুবেল। শুধু কি তাই! এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর করা প্রতারণার মামলার সূত্র ধরে জেল পর্যন্ত ঘুরে আসতে হয়েছে তাঁকে। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে আগে কালের কণ্ঠকে তাই রুবেল বলে গিয়েছিলেন, ‘আমার ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বকাপের ওপর। এখানে ভালো করতেই হবে। নইলে ক্রিকেট-জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে একেবারে।’

কালকের উল্কার মতো চোখধাঁধানোর পারফরম্যান্সের পর এটি তো অন্তত নিশ্চিত, বাংলাদেশের ক্রিকেটাকাশ থেকে রুবেলের উল্কাপাত সহসা হচ্ছে না। বিশ্বকাপ উপলক্ষে স্কোয়াডের ১৫ ক্রিকেট-বীরের প্রোফাইল নিয়ে বিস্তারিত আয়োজন করেছিল কালের কণ্ঠ। সেখানে নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী বলেছিলেন রুবেল, পড়ে নেওয়া যাক, ‘অধিনায়ক যখন ব্রেক থ্রুর জন্য আমার হাতে বল তুলে দেবেন, তখনই যেন উইকেট পাই। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে দুই-তিনটি করে উইকেট নিতে চাইব। বিধ্বংসী বোলিং দিয়ে বাংলাদেশকে জেতাতে চাই দু-একটি ম্যাচ।’ আর দলীয় লক্ষ্য? ‘আমাদের কাছে সমর্থকদের প্রত্যাশা যে অনেক, তা জানি। তাদের তাই নিরাশ করতে চাই না। অন্তত প্রথম রাউন্ড টপকানোর লক্ষ্য আমাদের’- বলেছিলেন বাগেরহাটের এই পেসার। কালকের এক ম্যাচে সেই দুটি লক্ষ্য কী দারুণভাবেই না পূরণ করলেন রুবেল!

২৭৫ রানের পুঁজি পাওয়ার পর নিজের নতুন বলের সঙ্গী হিসেবে রুবেলকে বেছে নেন অধিনায়ক মাশরাফি। স্পেলটি ভালো হয়নি খুব। তিন ওভারে ২০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। পরের স্পেলের প্রথম দুই ওভারে দিলেন আরো ৯ রান। ইংল্যান্ড ততক্ষণে জাঁকিয়ে বসেছে বেশ। দুই উইকেটে ১২১ রান। উইকেট না নিলে আর চলছিলই না বাংলাদেশের! রুবেল যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অধিনায়ক ব্রেক থ্রুর জন্য হাতে বল তুলে দিলে উইকেট নেবেন, সেটি কি তাহলে কথার কথা থেকে যাবে!

যাঁর ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বকাপের ওপর, তিনি সেটি হতে দেন কী করে! নিজের ষষ্ঠ ওভারের প্রথম বলে তাই ভয়ংকর হয়ে ওঠা ইয়ান বেলকে (৬৩) আউট করলেন রুবেল। আর এউইন মরগানকে (০) তো ভয়ংকর হয়ে ওঠার সুযোগই দিলেন না! দুই বল পর ফেরালেন ইংলিশ অধিনায়ককে। চার বলের মধ্যে এই দুই উইকেট ম্যাচে প্রবলভাবে ফেরাল বাংলাদেশকে।

এরপর নানা নাটকীয়তা, হরেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এলো সেই দমবন্ধ করা মুহূর্ত। ম্যাচের ৪৯তম ওভার। ১২ বলে ১৬ রান চাই ইংল্যান্ডের, বাংলাদেশের চাই দুই উইকেট। রুবেলের হাতে আবার বল তুলে দিলেন মাশরাফি। যেন তাঁর ক্যারিয়ারটাই তখন হাতের মুঠোয়! ক্রিকেট রূপকথার স্বপ্নিল চিত্রনাট্য এরপর লেখা হলো রুবেলের বোলিংয়ে। প্রথম বলে স্টুয়ার্ট ব্রডের স্টাম্পে আঘাত হানে। বাজ পড়ে ইংলিশদের হৃদয়ে। মাঝে এক বলের বিরতি। তৃতীয় বলে শেষ অ্যান্ডারসনেরও অভিন্ন পরিণতি। জয়োল্লাসের ঢেউ আছড়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ঢাকা থেকে অ্যাডিলেডে।

রুবেল তখন শূন্যে দুই হাত মেলে উড়ে যেতে চান মুক্ত বিহঙ্গের মতো। বিশ্বকাপের আবহের ওই দুঃসময় থেকে মুক্তি বলে কথা। আর সেটি যে এমনভাবে হবে, দূরতম সুখকল্পনাতেও কি সেটি ভাবতে পেরেছিলেন রুবেল?

-কালের কন্ঠ

মন্তব্য