আমরা বিশ্বাসটা ফেরাতে পেরেছি : মাশরাফি

masrafi
লোকে তাকে বলে, চিকিত্সা শাস্ত্রের বিস্ময়। বিশ্বকাপের সময় শেন ওয়ার্ন বললেন- একজন সত্যিকারের ক্রিকেট জাদুকর। হ্যাঁ, আমাদের নেতা, অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। বিশ্বকাপের ঘোর খানিকটা কেটে গেছে। সবাই একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার মাঠে নেমে পড়েছেন। মাঠে নামার আগে বিশ্বকাপের জাদুকরী পারফরম্যান্স, বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ এবং পেস বোলিং নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন মাশরাফি। বললেন, নিজেদের প্রতীজ্ঞা, প্রাপ্তি ও করণীয়র কথা।
মাশরাফি বিন মুর্তজার দীর্ঘ এই একান্ত সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়:

মাশরাফি, একটু সত্যি করে বলুন তো, বিশ্বকাপে নিজেদের পারফরম্যান্সে কী একটু অবাক হয়েছেন? হারতে থাকা একটা দল এমন বদলে গেল!
নাহ। সত্যি বলছি, অবাক হইনি। দেখুন যখন দল ঘোষণা করা হয়, তখনই আমি এরকম ফলাফল আশা করছিলাম। আমি দল দেখেই বলেছিলাম, এটা এখনকার আমাদের সেরা দল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, সবাই খুব ফর্মে ছিলো। ২০১৪ সালে আসলে আমরা কিন্তু ভালো খেলছিলাম। ভালো খেলছিলাম বলেই কাছে যেতে পারছিলাম। কিছু ছোট ভুলের কারণে হয়তো রেজাল্ট আসছিলো না। আমার মনে হয়েছিলো, এগুলো যদি ঠিক করা যায়, তাহলে আমাদের সুযোগ আছে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া।
আপনি নিজে বিশ্বকাপে আপনাদের পারফরম্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
আউটস্ট্যান্ডিং। আমি এক কথায় বলবো, আমরা বিশ্বাসটা ফেরাতে পেরেছি। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে এক ধরনের ফোকাসে থাকার চাপ থাকে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে এই ধরনের চাপ সেভাবে থাকে না, সবাই নজরে রাখে না। এখানে আপনার প্রতিটা রান, উইকেটে বল নজরে থাকছে। সেই চাপ মানিয়ে নিয়ে ছেলেরা ভালো খেলেছে বলে আমি অবশ্যই আনন্দিত। তবে তৃপ্ত পুরোপুরি নই।
অতৃপ্তিটা ঠিক কী নিয়ে?
আসলে অতৃপ্তির জায়গা তো থাকেই। আমরা যেমন খেলছিলাম, তাতে আরেকটা ধাপ এগোনোর আশা করতে পারতাম। এমন না যে, ভালো খেলে ফেলেছি বলে এটা বলছি। আসলে আরেক ধাপ এগোনোর যোগ্যতা আমাদের ছিলো। কিংবা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা জিততে পারতাম। এগুলো অতৃপ্তি থাকবেই।
বিশ্বকাপের এই লম্বা সময়ে খেলোয়াড়দের কোন ব্যাপারটায় সবচেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন?
আমার পনেরো বছরের ক্যারিয়ারে যেটা দেখেছি, দেড়-দুই মাস খেলে ফেলার পর হোম সিকনেস চলে আসে খেলোয়াড়দের। তখন মনে হয়, দল কবে দেশে যাবে। এই প্রথমবার দেখলাম যে, সবাই এপ্রিলের ২৯ তারিখ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে চায়! এটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার মনে হয়েছে।
পুরো টুর্নামেন্টে সেরা অভিজ্ঞতাটা কী ছিলো?
খেলায় সেরা অভিজ্ঞতা অবশ্যই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়। ম্যাচটা আসলে আমাদের জিততেই হতো। না জিতলেও একটা চান্স থাকতো। তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা দল নিউজিল্যান্ডকে তাদের দেশে হারাতে হতো। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে অবিশ্বাস্য চাপ ছিলো। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, আমরা খেলার সময় দেখলাম, এই চাপটা সেভাবে কেউ নিচ্ছে না। এটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিলো।
আমরা যে পর্যন্ত গেছি, আপাতত সেটাই বেঞ্চমার্ক হয়ে গেল। এই সাফল্যের রহস্যটা কী খোজার চেষ্টা করেছেন?
পুরো টুর্নামেন্টে আমাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিলো, খুব বেশি একটা দল হয়ে ছিলাম আমরা। কারো ভালো সময় এসেছে, খারাপ সময় এসেছে। হোটেলে বা ড্রেসিংরুমে সেগুলোকে আমরা ঢুকতে দেইনি। আমার ধারণা বাইরেও লোকেরা দেখেছে, আমরা কিভাবে একসাথে থেকেছি। এটাই আসলে একটা ভালো দলের বৈশিষ্ট্য।
আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে, কোয়ার্টার ফাইনালের কিছু ব্যাপার নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পর্যন্তউত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সে ব্যাপারে কিছু বলবেন?
এই যেগুলো হচ্ছে সেগুলো আসলে খেলোয়াড়দের বিষয় না। এই উত্তরটা আশা করছিলেন না মনে হয়! হা হা হা…। তবে এটাই সত্যি যে এভাবেই খেলোয়াড়দের অভ্যস্ত হওয়া উচিত। শুধুই খেলা নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে। বাইরের বিষয়টা বাকিরা আলোচনা করবে। খেলোয়াড়দের এগুলো নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। আর উচিতও না।
সামনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ। পাকিস্তানকে বেশ দুর্বল দল বলে মনে করছেন অনেকে; ফলে বাংলাদেশকে ফেবারিটও মনে করা হচ্ছে। আপনার কী মনে হয়?
পাকিস্তান অনেক শক্তিশালী দল। তারা দুর্বল অবস্থায় আছে, এটা আমি মনে করি না। আসলে বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলের প্রতি প্রত্যাশাটা তাদের সমর্থকদের আরো বেশি ছিলো। সেটা তারা করতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে, তারা খুব খারাপ করেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান এখনও অনেক শক্তিশালী দল। হ্যাঁ, দু’-একজন সিনিয়র হয়তো খেলবে না। তারপরও আমাদের সেরা ক্রিকেটই খেলতে হবে। আমরা বিশ্বকাপে যে ধরনের ক্রিকেট খেলেছি, সেটা ধরে রাখাটা খুব জরুরী।
বিশ্বকাপের মতো ক্রিকেট খেললে কী আমরা সিরিজ জয়ের মতো কিছু আশা করতে পারি?
হ্যাঁ, আমরা যদি বিশ্বকাপের ফর্মটা ধরে রাখতে পারি, তাহলে অবশ্যই ভালো কিছু করা সম্ভব। আসলে ১৪-১৫ দিন এবং ভিন্ন টুর্নামেন্ট; ফলে কিছু পার্থক্য হয়ে যেতে পারে। সে জন্যই এই বিসিএলটা আমাদের খেলোয়াড়দের ভালোভাবে কাজে লাগানো উচিত। আমি মনে করি, সে ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক ফলাফলই আশা করতে পারি সবগুলো ম্যাচে।
পুরো দলের জন্য বিশ্বকাপ ভালো খেলেও টপ অর্ডার তো বেশ দুশ্চিন্তার ব্যাপার হয়ে আছে।
এটা হতে পারে। আমি এটাকে স্বাভাবিক বলছি না। কিন্তু এমন হতে পারে। আসলে সব টুর্নামেন্টে সব জায়গা থেকে সমান সার্ভিস আসবে, এটা খুব একটা হয় না। কখনো কখনো দেখবেন টপ অর্ডার খুব ভালো করছে, মিডল অর্ডার থেকে রান পাচ্ছেন না। তাই টপ অর্ডার নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তা করার কিছু দেখি না। স্টিল তামিম কিন্তু আছে। তামিম যেভাবে প্র্যাকটিস করছে, তাতে ওর আবার বড় ইনিংস খেলা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর তামিম রানে নেই, এটা আমি ঠিক বলতে রাজী নই।
তামিম তো গত কয়েকটা ইনিংস শুরুই করতে পারছেন না…
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ওর ইনিংসটার কথা ভাবেন। ওর পঁচানব্বই রানের পরই কিন্তু আমরা তিনশ’ রানের বিশাল টার্গেটে যেতে পেরেছি। ওরকম একটা ইনিংস ও খেলেছে বলেই আমরা আসলে বিশ্বাস করতে পেরেছি যে, এটা করা সম্ভব। আমাদের পুরো ব্যাটিং লাইন আপকে ও একটা বিশ্বাস দিতে পেরেছে। যেটা পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে আমাদের কাজে লেগেছে। ফলে আমি মনে করি, তামিমের আবার বড় রানে ফেরাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সে তুলনায় মিডল অর্ডার বরং আপনাদের জন্য বেশ স্বস্তির ব্যাপার?
হ্যাঁ, মিডল অর্ডারে অসাধারণ একটা সার্ভিস পাচ্ছি আমরা। মুশফিক গত দুই-তিন বছর ধরে তো অবিশ্বাস্য ব্যাটিং করে যাচ্ছে। রিয়াদের কথা বলতে গেলে আমি বলি, ও আসলে নিজেকেই আবিষ্কার করেছে। আমার ধারণা, ও এখন বুঝতে পেরেছে, হোয়াট হি ক্যান ডেলিভার। সে ফ অ্যামাজিং! সাকিব তো সবসময়ই আমাদের জন্য ফ্যান্টাসটিক। নতুন দুজন দেখেন— সাব্বির ও সৌম্য, দুটো ছেলেই দারুণ করছে। আমি তো মনে করি, আমরা দারুণ একটা অবস্থায় আছি।
রুবেলের উত্থানটা কেমন লাগলো?
হ্যাঁ, রুবেল। আসলে বিশ্বকাপে সবাই টের পেয়েছেন। কিন্তু রুবেল গত কয়েক বছর ধরে অসাধারণ বল করে যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬ উইকেট নিলো, হ্যাটট্রিক করলো। আমি ওর ব্যাপারে একটা কথা বলি, ২০১৪ সালে আমরা ম্যাচ জিততে না পারায় সবচেয়ে বেশি ফোকাস মিস করেছে রুবেল। ও অসাধারণ বল করেছে। কিন্তু আমরা না জেতায় আসলে ওর ওপর চোখটা কারো পড়েনি। সে আসলে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চ পেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, সে কী পারে।
পেস বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছেন কে কে?
এই মুহূর্তের কথা যদি বলেন, সবাইকেই তো দারুণ মনে হচ্ছে। আসলে এখানে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনের একটা ভূমিকা আছে। ওখানে এখন আর সুইং খুব বেশি না থাকলেও দারুণ বাউন্স পাওয়া যায়। উইকেট থেকে বাড়তি পেস পাওয়া যায়। সবাই সেটাকে কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু আমাদের উইকেটে তো পেস-বাউন্স দুটোই কম থাকবে। ফলে যার একটু ভেরিয়েশন বেশি, সে ভালো করতে পারবে; মেধাটা কাজে লাগাতে হবে। স্লো উইকেটে ভালো করার চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে।
আপনি অস্ট্রেলিয়ায় বসে বলেছেন, বাংলাদেশের পেস বোলাররা প্রাপ্য সম্মান পান না। কিন্তু সত্যি সত্যি তাদের পারফরম্যান্সে কী আপনিও সারপ্রাইজড হননি?
না, সারপ্রাইজড হয়েছি বলবো না। আসলে পরিবেশটা তো একটা বড় ব্যাপার। বাংলাদেশে সবমিলিয়ে যে পরিবেশ থাকে, সেটাই ঠিক পেস বোলারদের পক্ষে নয়— মানুষের চাহিদা, উইকেটের চাহিদা; কিছুই পক্ষে থাকে না। তাই বোঝা যায় না, এরা কী করতে পারে। আপনি যখন ফাস্ট বোলারদের ধারাবাহিকভাবে অন্তত স্পোর্টিং উইকেটে খেলাবেন, তখন আসলে বুঝতে পারবেন যে, এদের মানটা আসলে কেমন। আমার মনে হয়, এবার বাংলাদেশের সবাই-ই দেখতে পেয়েছেন, এরা সেই সুযোগ পেলে কী করতে পারে। এখন অন্তত আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ে যা ধারণা করা হয়, তারচেয়ে যে এরা ভালো, সেটা প্রমাণিত। কারণ তারা ওই পরিবেশটা পেয়েছে।
তার মানে, দেশে আরেকটু ভালো উইকেট অন্তত আশা করতে পারেন আপনারা? সে ক্ষেত্রে পেসাররা নিজেদের মান অনুযায়ী পারফরমটা করতে পারেন…
আমি মনে করি, আমাদের উইকেটে আমাদের ফাস্ট বোলাররা যা ডেলিভার যখন করে, সেটাও অনেক। এখানে সারা বছরই আমাদের হয় পুরো ফ্লাট, নইলে নিচু বাউন্সের উইকেটে খেলতে হয়। একের বিপরীত পরিবেশ। অবশ্য আমি বলছি না যে, ফাস্ট বোলারদের এখানে আটকে থাকলেই চলবে। তাদের আসলে এই অপছন্দের কন্ডিশনে আরো ভালো করা শিখতে হবে। খেলোয়াড় হিসেবে আপনি সারা জীবনে পছন্দের কন্ডিশনে-উইকেটে খেলতে পারবেন না; পৃথিবীর কেউ পারে না।
বিশ্বকাপ খেলে আসার পর এখন নিশ্চয়ই প্রত্যাশার একটা চাপ আপনাদের ওপর চড়ে বসবে?
প্রত্যাশার চাপ কিন্তু থাকবে। এটার সঙ্গে আসলে আমাদের দিনকে দিন আরো মানিয়ে নিতে হবে। আমরা যত ভালো করতে থাকবো, প্রত্যাশার চাপ ততো বাড়তে থাকবে। এটার সঙ্গে মানিয়ে সামনে চলাটাই আসলে চ্যালেঞ্জ। – সৈজন্যে : ইত্তেফাক

মন্তব্য