কানাডায় সিংহভাগ অভিবাসী সুখী, সুখী বাংলাদেশীরাও

Khurshid Alam
॥ খুরশিদ আলম ॥
কানাডায় নিজ নিজ পেশায় চাকরী না পাওয়ার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসা প্রথম প্রজন্মের অনেক অভিবাসীকে খেদোক্তি করতে শুনা যায়। খেদোক্তি করা এই অভিবাসীদের কেউ কেউ আবার নিমজ্জিত হয়ে আছেন হতাশার গভীরে। এই হতাশাগ্রস্তদের কেউ কেউ একপর্যায়ে মানসিক রোগীতে পরিনত এমন নজীর কম নেই। কয়েক বছর আগে টরন্টোতে বাংলাদেশী এক চিকিৎসকের কথা শুনেছিলাম যিনি নিজ পেশায় প্রবেশ করতে না পেরে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং চিকিৎসক পেশায় নিজের ক্যারিয়ার গড়তে না পেরে নিজেই এক পর্যায়ে মানসিক রোগী হয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।
ভাল বেতনের চাকরী না পাওয়ার কারণে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের আয় স্বল্প, অনেকেই দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছেন। কঠিন জীবন সংগ্রাম মোকাবেলা করতে না পেরে কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কানাডা ছেড়ে চলেও গেছেন। কেউ নিজ দেশে আর কেউবা তৃতীয় কোন দেশে। অনেকে আবার পরিবার এখানে রেখে তৃতীয় কোন দেশে গিয়েছেন ভাল চাকরীর প্রস্তাব পেয়ে।
কানাডায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসা অভিবাসীদের এ এক বিষন্নময় অন্ধকার দিক। তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এর পরও কানাডায় অভিবাসীদের আসা বন্ধ হয়নি। যাঁরা এসেছেন তাঁদের মধ্যে অতি অল্প সংখ্যাক অভিবাসী বাদে প্রায় সবাই এ দেশটিতে থেকে গেছেন এবং সুখেই আছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে – এটি কি করে সম্ভব? চাকরীর বাজারে সমস্যা, আয় স্বল্প, কঠিন জীবন। তার পরেও মানুষ সুখী হয়ে কি করে?
তার আগে দেখতে হবে সুখের সংজ্ঞা কি। আমরা জানি, সুখের সংজ্ঞা আসলে একেক জনের কাছে একেক রকম। কেউ অর্থ-বিত্তে সুখ খুঁজেন, কেউ ভালবাসায় সুখ খুঁজেন আবার কেউ কেউ সব ভুলে গিয়ে নেশার মাঝে সুখ খুঁজেন। কিন্তু নিজের জন্মভূমি ছেড়ে আসার মাঝে সুখ কোথায়? সুখ কোথায় বাবা-মা, ভাই-বোনসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের ছেড়ে আসার মধ্যে? প্রবাসের জীবন অভিবাসীদেরকে কি এমন পরম সুখ বা স্বর্গ সুখ দিচ্ছে যার কারণে এ চরম বৈরী আবহাওয়া ও বিজাতীয় সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে থাকতে হবে?
এর কোন সহজ উত্তর নেই। তবে কানাডায় সুখ যে আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সুখ না থাকলে কোন অভিবাসীই এ দেশটিতে পড়ে থাকতেন না।
আরো আলোচনায় যাওয়ার আগে কানাডা সম্পর্কে এখানে কয়েকটি তথ্য তুলে ধরা হলো :
০ প্রায় শতভাগ কানাডিয়ানের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে অভিবাসীদের প্রতি (সূত্র : ওঢ়ংড়ং-জবরফ)
০ শতকরা ৮৪ ভাগ কানাডিয়ান কানাডার নাগরিক হওয়ায় নিজেদেরকে সুখী মনে করেন। (সূত্র : গধপষবধহ’ং)
০ কানাডা বিশ্বের সর্বোচ্চ গড় আয়ুর দেশের মধ্যে একটি (কানাডায় মানুষের গড় আয়ু ৮১.২৩)
০ কানাডা তার প্রতিটি নাগরিক/পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট এর জন্য বিশ্বের সেরা চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে বিনা খরচে।
০ কানাডা বিশ্বের সেরা নিরাপদ দেশগুলোর একটি।
কানাডা সবচেয়ে বন্ধুবৎসল দেশ। (সূত্র ঐঝইঈ ইধহশ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ )
০ কানাডায় উচ্চশিক্ষিতের হার অনেক বেশী। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের চেয়েও। কানাডার নাগরিকদের মধ্যে শতকরা ৪৭ ভাগ পোস্ট সেকেন্ডারী স্কুলে ভর্তি হন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে এই হার যথাক্রমে ৩৯% ও ৩০%।
০ কানাডিয়ানরা সততাপরায়ণ। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের দেশসমূহে দুর্নীতি যেমন লক্ষণীয়ভাবে বিদ্যমান সেই তুলনায় কানাডা বাস্তবিক অর্থেই দুর্নীতিমুক্ত। বিশ্বে কানাডিয়ানরা সততা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য বিশেষভাবে স্বীকৃত।
০ কানাডিয়ানরা কৌতুক প্রিয় এবং নিজেদেরকে খুব বেশীমাত্রায় গুরুগম্ভীর করে করে রাখেন না।
০ কানাডিয়ানদের মধ্যে বাড়ির মালিকানা সর্বোচ্চ পর্যায়ের এবং বাড়িগুলো প্রশস্ত। শতকরা ৭৭ ভাগ কানাডিয়ানের বাড়ি ৫ বা তারো বেশী কক্ষবিশিষ্ট।
০ কানাডায় অভিবাসীরা তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুশীলন করতে পারেন বিনা বাধায় এবং বিনা আপত্তিতে।
০ এবং কানাডা তার নাগরিকদেরকে সর্বোচ্চ মানের জীবন যাপন পদ্ধতি প্রদান করে থাকে। (সূত্র : টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঐঁসধহ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওহফবী)
এরকম একটি সর্বোচ্চ মানের জীবন যাপন পদ্ধতি রয়েছে যে দেশটিতে সে দেশে এসে অভিবাসীরা সুখী হবেন না তো কোথায় হবেন? গত বছর ডিসেম্বরে প্রকশিত স্ট্যাটিসটিক্স কানাডার এক জরীপেও দেখা গেছে প্রায় শতভাগ অভিবাসীই তাদের মাতৃভূমির তুলনায় কানাডায় সুখে আছেন। কানাডায় মূলধারার বাইরে ৪৩টি অভিবাসী বা এথনিক গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি এথনিক গ্রুপ দাবী করেছেন যে তাঁরা তাঁদের মাতৃভূমির তুলনায় কানাডায় সুখে নেই। এই তিন এথনিক গ্রুপ হলো নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ড এবং কলম্বিয়া থেকে আসা অভিবাসীরা। তবে সাম্প্রতিক সময় আসা কলম্বিয়ানরা নিজেদেরকে সুখীই ভাবেন কানাডায়। বাকি ৪০টি এথনিক গ্রুপের সদস্যরা বলেছেন তাঁরা সুখে আছেন এবং এর মধ্যে বাংলাদেশীরাও আছেন।
কানাডায় কোন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা কতটা সুখে আছেন সে বিষয়ে জরীপ চালানোর জন্য স্টাটিসটিক্স কানাডা ১ থেকে ১০ মাত্রার একটি মানদন্ড তৈরী করে। মাত্রা ১ হলো খুব অসন্তুষ্ট বা খুব অখুশী এবং মাত্রা ১০ হলো খুব সন্তুুষ্ট বা খুব সুখী। সুখের এই মানদন্ডে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা যে রেটিং দিয়েছেন তা হলো ৭.৩। অন্যদিকে বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তাঁদের সুখের মাত্রা ৬.৬১ ছিল বলে জানিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় কানাডায় তাঁরা সুখেই আছেন। অন্যান্য দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের মতামত কমবেশী প্রায় একই রকম। তবে জিম্ববুয়ে থেকে আসা অভিবাসীদের বেলায় দেখা গেছে সুখের ব্যবধানটা অনেক বেশী। মাতৃভূমিতে তাঁদের সুখের মাত্রা ছিল ৪.৪১। আর কানাডায় তাঁদের সুখের মাত্রা ৭.৯৪। ইরাক থেকে আসা অভিবাসীরাও প্রায় একই অভিমত দিয়েছেন। মাতৃভূমিতে তাঁদের সুখের মাত্রা ছিল ৫.১৮ ছিল বলে জানিয়েছেন। আর কানাডায় এখন তাঁদের সুখের মাত্রা ৭.৮৩। পাকিস্তান থেকে আসা অভিবাসীদের অবস্থা ইরাকীদের প্রায় সমান সমান। ভারতীয়রা কানাডায় বাংলাদেশীদের তুলনায় অনেক বেশী সুখে আছেন। কানাডায় তাদের সুখের মাত্রা ৭.৯৪ এবং দেশে তাঁদের সুখের মাত্রা ছিল ৬.২। তবে চিন থেকে আসা অভিবাসীরা কানাডায় খুশি কিন্তু খুব খুশী নয়। দেশে তাঁদের সুখের মাত্রা ছিল ৭.০৫ আর কানাডায় এসে তাঁদের এই সুখের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ৭.৫০ এ।
আমরা জানি জাপান পৃথিবীর অন্যতম ধনী একটি দেশ। মজার ব্যাপার হলো, এই দেশটি থেকে আসা অভিবাসীরাও নিজ দেশের তুলনায় কানাডায় সুখে আছেন বলে জানিয়েছেন। জাপানে তাদের সুখের মাত্রা ছিল ৭.০৮ এবং কানাডায় তাদের সুখের মাত্রা ৭.৬২। ফ্রান্স থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁরা বলেছেন কানাডায় তাঁরা ফ্রান্সের তুলনায় বেশী সুখে আছেন। দেশে তাঁদের সুখে মাত্রা ছিল ৭.২ এবং কানাডায় তাঁদের জন্য এই মাত্রা ৮.৩৭। জার্মানরাও তাঁদের দেশের তুলনায় কানাডায় বেশী সুখে আছেন বলে জানিয়েছেন। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পৃথীবির সর্বাধিক ক্ষমতাধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আসা অভিবাসীরা জানিয়েছেন দেশে তাঁদের সুখের মাত্রা ছিল ৭.৬৭ মাত্রার এবং কানাডায় এই মাত্রা ৮.১৪!
ওঢ়ংড়ং-জবরফ এর জরীপ তথ্য অনুযায়ী উপরে আমরা দেখলাম প্রায় শতভাগ কানাডিয়ানের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে অভিবাসীদের প্রতি। তবে প্রায় ‘শতভাগ’ শব্দটি নিয়ে হয়তো কারো কারো আপত্তি থাকতে পারে। কারণ অভিবাসী বিরোধী মনোভাব কানাডায় আগেও ছিল এখনো আছে। সময় সময় এটি কমে বাড়ে। এর পিছনে মূলত অর্থনীতি ও রাজনীতি কাজ করে। বর্ণবাদও আছে কম বেশী। তবে লক্ষ্যনীয় যে শতভাগের আগে ‘প্রায়’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ কিছু কানাডিয়ানের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে এটি ওঢ়ংড়ং-জবরফ এর জরীপেও উঠে এসেছে। অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরীপ খতিয়ে দেখলেও দেখা যাবে কানাডায় অভিবাসীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব কিছুটা হলেও রয়েছে। তবে সুখের কথা এই যে, অভিবাসীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারী কানাডিয়ানদের সংখ্যা বা হার অনেক কম। ফলে কানাডা অভিবাসীদের জন্য এটি পছন্দের দেশ হওয়ারই কথা।
এর পর আমরা দেখতে পাচ্ছি কানাডা বিশ্বের সর্বোচ্চ গড় আয়ুর দেশের মধ্যে একটি দেশ (কানাডায় মানুষের গড় আয়ু ৮১.২৩)। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু ৭০.২৩। গত বছরের হিসেব এটি। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্ব বা অনুন্নত দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের কাছে কানাডার মানুষদের এই গড় আয়ু এটি একটি প্লাস পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এটি সত্যি যে, একটি নির্দিষ্ট বয়স পার করে ভৌগলিক অবস্থান পরিবর্তন করলেই মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পায় না। এর সাথে আরো অনেক কিছু জড়িত। দুষণমুক্ত খাদ্য, উন্নত পরিবেশ, উন্নত চিকিৎসা সেবা, মানসিক প্রশান্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো মানুষের দীর্ঘ জীবনলাভের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই অর্থে বলা যায় অনুন্নত দেশ থেকে কানাডায় আসলে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা অবশ্যই থাকে। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। সেখানে খাদ্যের মধ্যে দুষণের মাত্রা কি রকম? আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি তারা সবাই এ বিষয়টি কমবেশী জানেন। মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক পেস্টিসাইড, ফরমালিন ইত্যাদির ব্যবহারতো হরহামেশাই হচ্ছে। প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই। সরকার আইন করে। সেই আইন কেউ মানেন না। পরিবেশের কথায় যদি আসি সেখানেও একই অবস্থা। গাড়ির ধোঁয়া থেকে শুরু করে পরিবেশ নষ্টকারী কোন কিছুর উপরই কোন নিয়ন্ত্রণ নেই দেশটিতে। উন্নত চিকিৎসা সেবা? বাংলাদেশে তা কল্পনা করা বিলাসিতা বই কিছুই নয়। বাংলাদেশের ডাক্তাররা নিজেরাই উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান!
এর পর আসা যাক কানাডার বিশ্বসেরা চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়ে। কানাডা তার প্রতিটি নাগরিক/পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট এর জন্য বিশ্বের সেরা চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে বিনা খরচে। সুখী হওয়ার পিছনে এখানকার অভিবাসীদের জন্য এটি একটি বড়রকমের কারণ। কানাডায় অভিবাসীরা যে উন্নত চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকেন তার সঙ্গে নিজ নিজ মাতৃভূমির চিকিৎসা ব্যবস্থা তুলনা করলে প্রতিটি অভিবাসীই সুখী হতে বাধ্য। বাংলাদেশের কথাই যদি ধরি তবে দেখবো সেখানে অধিকাংশ চিকিৎসক চিকিৎসা সেবার নামে কসাইদের মতো রোগীদের গলা কাটেন। চিকিৎসার খরচ দিতে না পারায় বা পুরোপুরি পরিশোধ করতে না পারায় লাশ আটকে রাখার মত ঘটনাও ঘটে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত। ট্রাফিক ব্যবস্থায় চূড়ান্ত অনিয়ম থাকায় অনেক জরুরী রোগীকে এম্বুলেন্সেই মৃত্যুবরণ করতে হয়। এক থেকে দুই বা তিন ঘন্টা লেগে যায় বাসা থেকে জরুরী রোগীকে এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। এম্বুলেন্সে থাকেনা প্যারামেডিক্স। আর কানাডায়? ফোন করার ৫ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যে এম্বুলেন্স চলে আসে। অনেক সময় দেখা যায় ফোনে রোগীর অবস্থার বর্ণনা দেওয়া শেষ হওয়ার আগেই এম্বুলেন্স চলে আসে। এখানকার এম্বুলেন্সেই থাকে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি। আরো থাকে প্যারামেডিক্স। মূলত এম্বুলেন্স বাসায় আসার সময় থেকেই জরুরী চিকিৎসার প্রাথমিক পর্ব শুরু হয়ে যায়। এখানকার হাসপাতালে মন্ত্রী-আমলাদেরকেও সিরিয়াল মোতাবেক আসতে হয়। কে বড়লোক আর কে গরীব, কে ক্ষমতাশালী আর কে ক্ষমতাহীন সেটি এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিবেচ্য নয়। কেউ ক্ষমতার বলে সিরিয়াল ভঙ্গ করবেন তা ভাবাই যায় না। কানাডার হাসপাতালগুলোতে রয়েছে উন্নত ও আধুনিকসব চিকিৎসার যন্ত্রপাতি। রয়েছে বিশ্বসেরা অনেক চিকিৎসক ও হাসপাতাল। সেসব চিকিৎসক ও হাসপাতালে কেউ গরীব বলে যেতে পারবে না তা হয় না এখানে। সবারই রয়েছে সমান অধিকার। বাংলাদেশে নকল ওষুধের আতংকে থাকতে হয়। ব্লাড টেস্ট বা অন্য কোন টেস্ট এর উপর ভরসা করা যায় না। কারো সন্দেহ থাকলে তিনি একাধিক ল্যাব থেকে টেস্ট করাতে পারেন। কিন্তু দেখা যাবে তিন জায়গা থেকে টেস্ট করানো হলে তিন রকম রেজাল্ট আসবে। কানাডায় এসবের ভয় নেই। বাংলাদেশে আরো রয়েছে ভুল চিকিৎসার ভয়। কানাডায়ও যে ভুল চিকিৎসা হয় না তা বলা যাবে না। তবে বাংলাদেশের বা অন্যান্য অনুন্নত দেশের তুলনায় তা একেবারেই নগন্য। এসব দিক বিবেচনা করে অভিবাসীরা দেখেন যে কানাডায় তাঁরা সুখেই আছেন।
কানাডা বিশ্বের সেরা নিরাপদ দেশগুলোর একটি। আমরা যারা অনুন্নত বা গরীব দেশ থেকে কানাডায় এসেছি তাদের কাছে ‘নিরাপদ’ শব্দটি অনেক
কিছুই বহন করে। নিরাপত্তা নেই বলেই আমাদের অভিবাসীদের অনেকেই মাতৃভূমি ত্যাগ করে কানাডায় চলে এসেছি। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা যে কি ভয়াবহ সমস্যা তা একমাত্র ভূক্তভুগী যাঁরা তাঁরাই বলতে পারবেন। রাস্তা-ঘাটে নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি নিজ ঘরেও। বাংলাদেশে সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনীর নৃসংশ হত্যাকান্ডের পর খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বলেছিলেন “ড্রইংরূমের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের নয়”। অথচ আমরা জানি নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রের। সাগর-রুনী হত্যাকান্ডের বিচার আজো হয়নি। ধারণা করা হয়, প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষার কারণেই এই হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছে না। এরকম আরো বহু হত্যাকান্ডের কোন বিচার হয়নি বা হবেও না বাংলাদেশে। সাম্প্রতিক কালের পেট্রোল বোমায় আহত ও নিহতদের জন্য যারা দায়ী তাদেরও বিচার হবে না কোনদিন। রাজনীতির নামে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের নামে বাংলাদেশে মানুষ হত্যা কত সহজ! কোন বিচার নেই। এমনকি ব্যক্তিগত শত্রু হত্যা করলেও কোন বিচার হয় না যদি হত্যাকারী কোন প্রভাবশালীর আত্মীয়-বন্ধু হন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও তারা পেয়ে যান তাদের অপরাধের মধ্যে একটুখানি রাজনীতির ছোঁয়া লাগিয়ে! আরো দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সিংহভাগ সদস্যই দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘিœত হয় পদে পদে। কথায় বলে, জনগনের শেষ আশ্রয়স্থল হলো আদালত এবং মিডিয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের এ দুটি শেষ আশ্রয়স্থলও দুর্নীতিমুক্ত নয়। অথচ আমরা জানি কানাডায় একটি কুকুর বা বিড়াল হত্যা করলে এমনকি আঘাত করে আহত করলে তার জন্যও বিচার করা হয়। কানাডায় অপরাধকারী যত বড় পদে আর যত প্রভাশালীই হন না কেন, অপরাধ করে ধরা পরলে তাঁর রক্ষা নেই। বিচারের মুখোমুখি তাঁকে হতেই হবে। এমন একটি আইনের শাসনের দেশে বাস করে অভিবাসীরা সুখী হবে না তা কি হয়?
আমরা দেখেছি কানাডায় উচ্চশিক্ষিতের হার অনেক বেশী। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের চেয়েও। কানাডার নাগরিকদের মধ্যে শতকরা ৪৭ ভাগ পোস্ট সেকেন্ডারী স্কুলে ভর্তি হন। আর এদের মধ্যে অভিবাসীদের সংখ্যা বেশী! স্ট্যাটিসটিক্স কানাডার হিসেব (২০০৯) অনুযায়ী দেখা যায়, ষাটের দশকে আসা অভিবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেয়ার হার কানাডায় জন্ম নেয়া ছেলে-মেয়েদের চেয়ে শতকরা ৬ ভাগ বেশী ছিল। আশির দশকে এসে দেখা গেছে এই হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সময়কার শতকরা ৩২ ভাগ অভিবাসী ছেলে-মেয়ে ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করতো এবং কানাডায় জন্ম নেয়া ছেলে-মেয়েদের তুলনায় তাদের সংখ্যা ছিল শতকরা ২০ ভাগেরও বেশী। উল্লেখ্য যে, আশির দশকে কানাডায় এশিয় অভিবাসীদের আগমন অনেক বৃদ্ধি পায়। এশিয় অভিবাসীদের কানাডায় আসার যতগুলো কারণ আছে তার মধ্যে তাদের ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা একটি অন্যতম কারণ। ২০০৬ সালে কানাডার আদম শুমারীর হিসেবে দেখা গেছে অভিবাসী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শতকরা ৩৬ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। উপরে যা হিসেব দেখা গেলে তাতে অভিবাসীগণ সুখী না হয়ে যাবেন কোথায়?
আমরা আরো দেখেছি – কানাডিয়ানরা সততাপরায়ণ এবং দুর্নীতিমুক্ত। এ দেশটির যে কোন সরকারী অফিস আদালতে গিয়ে কখনো কোন দুনম্বরী কাজ করতে দেখা যায় না কাউকে। সবকিছুই নিয়ম মাফিক হয়। এখানে পাসপোর্ট নবায়ন করতে লাগে ৫ মিনিট, গাড়ির লাইসেন্স প্লেট বা ড্রাইভার্স লাইসেন্স নবায়ন করতে লাগে দুই মিনিট। বাংলাদেশে পাসপোর্ট নিয়ে কি পরিমান ঝামেলা পোহাতে হয় তা প্রতিটি প্রবাসীই জানেন। পদে পদে ঘুষ ছাড়া কোন কাজই হয় না। তারপরও নতুন পাসপোর্ট পাওয়া বা নবায়ন করার জন্য বিস্তর ঝামেলা ও সময় ব্যয় করতে হয়। যে কোন কিছুর লাইসেন্স পেতে হলে বা নবায়ন করতে হলে ঘুষ দিতেই হবে। এর কোন মাফ নেই। যারা ঘুষ লেন-দেনকারীদের দমন করবেন সেই আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সিংহভাগ সদস্যরাই ঘুষ খান। তাহলে ঘুষ দমন করবেন কে? দেশের নীতিনির্ধারক যাঁরা সেই মন্ত্রি-এমপি-সচিবদেরও অনেকেই দুর্নীতিপরায়ন। সাধারণ সরকারী কর্মচারীরা ঘুষ খান হাজার টাকার হিসাবে। আর নীতিনির্ধারকেরা ঘুষ খান কোটি টাকার হিসেবে। ফলে সাধারণ মানুষের সততার কোন মূল্যই নেই বাংলাদেশে। বরং সৎ থাকতে গেলে অনেককে বিপদে পরতে হয়। একটি দেশের মাথা যাঁরা অর্থাৎ নীতিনির্ধারক যাঁরা তাঁরাই যদি সৎ বা দুর্নীতিমুক্ত না হন, আদালত পাড়ায় যদি টাকার বিনিময়ে রায় পাল্টে যায়, মিডিয়া যদি টাকার বিনিময়ে রাতকে দিন দিনকে রাত বানিয়ে ফেলে তবে সে দেশটিতে সততার সংকট তো দেখা দিবেই। দুর্নীতিতো সেদেশটির জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিনত হবেই এবং প্রতি বছর দুর্নীতেতে সেরা বা সেরার কাছাকাছিই থাকবেই। প্রতিবছর টিআইবির রিপোর্টেও আমরা দেখতে পাব বাংলাদেশ দুর্নীতিতে সেরা বা সেরার কাছাকাছি অবস্থানে থাকছে।
দুর্নীতি যে কানাডায় হয় না সে কথা অবশ্য জোর দিয়ে বলা যাবে না। দেশটিতে কর্পোরেট লেভেলে দুর্নীতি কিছু কিছু হয়। কানাডার নির্মান প্রতিষ্ঠান ‘লাভালিন’ তার প্রমাণ বা উদাহরণ। বাংলাদেশের
পদ্মা সেতুর দুর্নীতিতে এই লাভালিন নামের প্রতিষ্ঠানটিও জড়িয়েছিল। কিস্তু তাদেরকেতো আইনের আওয়াতায় আনা হয়েছে। আর বাংলাদেশ কি হয়েছে? সংশ্লিষ্ট সবাইকে দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন! বাংলাদেশে দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়। ধরা পরলেও রক্ষা পাওয়া যায় যদি অপরাধকারী ক্ষমতাসীনদের কেউ হন বা তার যদি অঢেল অর্থ থাকে। এটি সম্ভব হয় কারণ, বাংলাদেশের পরতে পরতে দুর্নীতি। কিন্তু কানাডাতো সেই অবস্থার ধারে কাছেও নেই। আর সবচেয়ে ভরসার কথা হলো, এখানে ধরা পড়লে রক্ষা নেই। অপরাধীর বিচার হবেই। কিন্তু বাংলাদেশেতো তা হয়না। সুতরাং কানাডা অভিবাসীদের জন্য সুখের দেশ হবে এইটাই স্বাভাবিক।
কানাডায় অভিবাসীরা আরো সুখী এই কারণে যে এখানে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম অনুশীলন করতে পারেন বিনা বাধায় এবং বিনা আপত্তিতে। কানাডার “চার্টার অব রাইটস এন্ড ফ্রিডমস” সকল নাগরিককে এই সুবিধা ও অধিকার দিয়েছে। আরো অধিকার দিয়েছে স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশের ও স্বাধীন চিন্তার। এ সকল অধিকার অবশ্য অনেক দেশেই আছে। তবে তা বাস্তবে নয়। কাগজে কলমে। কিন্তু কানাডায় তা রয়েছে সত্যিকার অর্থেই। ফলে এ দেশটিতে আগত মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ অন্যান্য ধর্মের লোকেরা নির্বিঘেœ তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন প্রকাশ্যেই। যদি অভিবাসীদেরকে তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে না দেওয়া হতো তবে হয়তো কানাডার বর্তমান অভিবাসীদের সিংহভাগই এ দেশটি আসতেন না। কানাডায় অভিবাসীদের জন্য এটি একটি বড় পাওয়া। সাম্প্রতিককালে অবশ্য ইসলাম বিরোধী একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে কিছু কিছু কানাডিয়ানের মধ্যে। এর কারণও আছে। বিপদগামী কিছু মুসলমানের জঙ্গীপনা এর জন্য দায়ী। তবে এই জঙ্গীপনার বিরুদ্ধে কানাডার মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও পন্ডিত ব্যক্তিদের সোচ্চার প্রতিবাদের কারণে ইসলাম বিরোধী মনোভাব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। অবশ্য সম্পূর্ণভাবে নয়। তবু বলবো কানাডা এখনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য চমৎকার একটি দেশ। অভিবাসী বিশেষত মুসলিম অভিবাসীদের জন্য এটি একটি শুভ বার্তা এবং কানাডায় সুখী হওয়ার কারণও বটে।
সবশেষে আমরা বলতে পারি, কানাডা তার নাগরিকদের জীবন মান উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে দেশটি আজ বিশ্ব দরবারে একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। জাতি সংঘের ঐঁসধহ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওহফবী থেকেও এই একই তথ্য পাওয়া যায়। এই সংস্থাটিও বলেছে, কানাডা তার নগরিকদেরকে সর্বোচ্চ মানের জীবন যাপন পদ্ধতি প্রদান করে থাকে। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার কানাডা বসবাসের জন্য বিশ্বের সেরা দেশের সম্মান পেয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। পাশাপাশি টরন্টো, ভ্যাংকুভার এবং মন্ট্রিয়ল বসবাসের জন্য বিশ্বের সেরা শহরের মর্যাদা পেয়ে আসছে বহু বছর ধরেই। আর কানাডার অভিবাসীদের সিংহভাগই থাকেন এই তিনটি বড় শহরে। এই শহরগুলোতে অপরাধের মাত্রা অনেক কম, পরিবেশ দুষণমুক্ত, বিভিন্ন এথনিক গ্রুপের মধ্যে পরষ্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাবোধের কমতি নেই এবং পুলিশও জনবান্ধব। সব মিলিয়ে কানাডায় অভিবাসীরা সত্যিকার অর্থেই সুখী। চুড়ান্ত মাত্রায় না হোক, নিজ নিজ দেশের তুলনায়তো অধিক মাত্রায় সুখী অভিবাসীরা। এবং সুখী বাংলাদেশীরাও। সেটাই বা কম কিসে?
খুরশিদ আলম , সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রবাসী কন্ঠ

মন্তব্য