বিতর্কিত নির্বাচনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব

bodiul alam mojumder

বদিউল আলম মজুমদার

একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সুশাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। তাই যে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও অর্থবহ হতে হয়। প্রত্যেকটি নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের স্বার্থ জড়িত থাকে। তাই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিকভাবে যে কোনো নির্বাচনই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি সিটি নির্বাচনও ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ ছিল গণতন্ত্র রক্ষার জন্যও। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা সিটি করপোরেশন দুটিতে নির্বাচন না হওয়ায় এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিকরা বিভিন্ন সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত। সিটি নির্বাচন নিয়ে মানুষকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে। অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো তিন সিটি নির্বাচন। কিন্তু তিন সিটি নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এটাকে নির্বাচন বলা যাবে না, নির্বাচন তো নয়, গণতন্ত্রকে অবমাননা করা হয়েছে। ফলে বিনষ্টের আশঙ্কায় রয়েছে গণতন্ত্র ।

তিন সিটি নির্বাচনে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অনিয়মতান্ত্রিকতার প্রকাশ ঘটেছে। এ নির্বাচন ব্যাপক সংশয় ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় দেশের চালচিত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে। মিডিয়া ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ না থাকায় এ নির্বাচন সরকার ও ইসিকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

রাজধানীর বাংলাবাজার গার্লস স্কুল কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল (চেয়ারে বসা) আ.লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে ধরা পড়ে যান হাতেনাতে। এই সময় প্রতিবাদে সোচ্চার অন্য কাউন্সিলরদের প্রতিনিধিরা -প্র.আলো

রাজধানীর বাংলাবাজার গার্লস স্কুল কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল (চেয়ারে বসা) আ.লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে ধরা পড়ে যান হাতেনাতে। এই সময় প্রতিবাদে সোচ্চার অন্য কাউন্সিলরদের প্রতিনিধিরা -প্র.আলো

অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০২ সালের এপ্রিলে। ২০০৭ সালের ১৫ মে মেয়াদ শেষ হলেও বিগত কোনো সরকারই ডিসিসির নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়নি। মহাজোট সরকার ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ডিসিসিকে ভেঙে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করে। এরপর ২০১২ সালের ২৪ মে ওই দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হয়। সে সময় দায়ের করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ১৩ মে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সরকার। দীর্ঘদিন পর হলেও ঢাকার দুই সিটিতে এবং নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ছিলÑ তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে, যার মধ্য দিয়ে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু এ নির্বাচন জনগণের প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে। এ দূরত্ব গণতন্ত্র বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর এর অশুভ ফল ভোগ করতে হবে জনগণকে।

নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক পন্থা, যার মাধ্যমে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারেন। তাই নির্বাচন বহু মতের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলে সহায়তা করে। কিন্তু সে নির্বাচন যদি অযাচিতভাবে রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রভাবিত হয় তাহলে নির্বাচনী ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হতেই বাধ্য। যে কোনো নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারে তাদের কোনো তৎপরতা আমাদের কারও চোখে পড়েনি। কালো টাকা, পেশিশক্তির ব্যবহার, তথ্য গোপন এসবের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন শক্ত অবস্থানে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতায় তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। সিটি নির্বাচন নির্দলীয় হলেও সেই নির্দলীয় নির্বাচনের চরিত্রটা সেটা ধ্বংস করছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। আর নির্বাচনী নানা ধরনের অপরাধের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। আর এই নীরব ভূমিকাই সব নস্যাৎ করে দিয়েছে।

এমন নির্বাচন সমস্যার সমাধান না করে নতুন করে সমস্যারই সৃষ্টি করে। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ অগ্নিপরীক্ষায় পাস নম্বরও পায়নি, বরং ফেল করেছে। আমরা অনায়াসে বলতে পারি কমিশন পুরোটাই ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের।

সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হওয়াটা উচিত ছিল। আর এটা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ না হওয়ার কারণে জটিলতার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। ফলে আবার অস্থিরতা এবং সহিংসতা বাড়তে পারে। তবে সেটা কারও জন্য কাম্য নয়। অনেক প্রতীক্ষার পর ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশনের নগরবাসী পেল নতুন মেয়র। তাদের ঘিরে আশাবাদী নগরবাসী তথা সমগ্র দেশের মানুষ। নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ৫ বছরের জন্য ক্ষমতা লাভ করেছেন তাদের দায়িত্ব পালনের ওপর নির্ভর করবে নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ ও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার অর্থই হলো গণতন্ত্র কার্যকর হওয়া।

ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়ররা ইতোমধ্যে তাদের ইশতেহারের পাঁচটি অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের আশ্বাসও দিয়েছেন। ঢাকা উত্তরের আনিসুল হকের পাঁচটি অগ্রাধিকার হচ্ছে তার ভাষায়Ñ ‘পরিচ্ছন্ন ঢাকা’, ‘সবুজ ঢাকা’, ‘আলোকিত ঢাকা’, ‘শিশুদের স্কুল তৈরি’ এবং ‘দরিদ্রদের কর্মসংস্থান তৈরি’। ঢাকা দক্ষিণের সাঈদ খোকনেরও রয়েছে পাঁচটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি। এগুলো হচ্ছেÑ ‘যানজট নিরসন’, ‘দূষণমুক্ত, নাব্য ও নিরাপদ বুড়িগঙ্গা’, ‘পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎÑ প্রধান তিন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা’, ‘পরিচ্ছন্ন, দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর মহানগরী’ এবং ‘দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও নাগরিকজনের নিরাপদ জীবন’। আর চট্টগ্রাম সিটির আ জ ম নাছির উদ্দিনের অগ্রাধিকারে রয়েছে ‘আবর্জনামুক্ত পরিচ্ছন্ন নগর’, ‘সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত নগর’ এবং ‘জলাবদ্ধতা নিরসন’।

রাজধানীর পরিবেশ দূষণও মাত্রা ছাড়াতে চলেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে রয়েছে অসন্তুষ্টি। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সমস্যাও দেখা দেয় এই মেগাসিটিতে। ঢাকার দুই সিটির মতো চট্টগ্রামের সমস্যাও বহু ক্ষেত্রে অভিন্ন। তিন নির্বাচিত মেয়র তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নগর উন্নয়নে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে গেলে দেশের প্রধান তিন মহানগরীকে অচল নগরী থেকে সচল নগরীতে পরিণত করা কঠিন বলে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। তাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে, যেমন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, বিএনপির এই নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা, সেই সঙ্গে মনজুর আলমের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো- এক কথায় এসবই চরম হতাশাব্যঞ্জক। বিতর্কিত নির্বাচনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকলেও প্রত্যাশা থেকেই যায় নবনির্বাচিত তিন মেয়রের কাছে। এখন যদি নবনির্বাচিত মেয়ররা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন, সকল কাউন্সিলর ও নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেন, তাহলে হয়তো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। এ জন্য তাদের দলবাজি বন্ধ করে নিরপেক্ষতার আশ্রয় নিতে হবে। সব দুর্নীতি কঠোর হাতে মোকাবিলার মাধ্যমে সুপরিকল্পিত নগর গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। এমনি প্রত্যাশা আমাদের।

- লেখক : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) -সৈজন্যে : আমাদের সময়

মন্তব্য