মুশফিকের এক দশক

musfiq

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

লর্ডস! পড়তে পড়তে এই ভেন্যুর ইতিহাস জড়ানো। ড্রেসিংরুম, ব্যালকনি, অনার্স বোর্ড, স্কোর বোর্ড থেকে শুরু করে ঘাসগুলো যেন ইতিহাসের কথা বলে। সেই ইতিহাস মাড়িয়ে ২০০৫ সালের এক শুভ সকালে ধীর পায়ে এখানে ব্যাট করতে নেমেছিলো ছোট্ট একটি ছেলে।

ঠিক কিশোর বললেও ভুল হয়। আকার, চোখ-মুখ ও হাঁটার ধরন বলে দিচ্ছিল, টেস্ট খেলতে নয়; কোনো এক স্কুল ক্রিকেটের ম্যাচ খেলতে গিয়ে ভুলে এই ইতিহাসমন্বিত স্টেডিয়ামে চলে এসেছে ছেলেটি। পৃথিবীর সবচেয়ে নামজাদা স্টেডিয়ামে ক্যারিয়ারের প্রথম সেই ম্যাচে তেমন বলার মতো কিছু করেনি ছেলেটি; মাত্র ১৯ রানের এক ইনিংস খেলেছিলো প্রথম ইনিংসে। এর মধ্যে ফ্লিনটফ, হগার্ড ও হার্মিসনকে মারা তিনটি চার অবশ্য তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো সারা ক্রিকেট দুনিয়াকে।

লর্ডসে ‘শিশুসুলভ’ সেই ছেলেটির ৮৫ মিনিট ধরে বুক চিতানো ব্যাটিং দেখে মিডিয়াতে লেখা হয়েছিলো-মাইটি অ্যাটম অব বাংলাদেশ।

হ্যা, কেউ তাকে ‘মাইটি অ্যাটম’ বলেন, কেউ পকেট রকেট বলেন, কেউ বলেন একালের রান মেশিন। ডাক নাম যাই হোক তিনি আমাদের মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলে দেয়া মুশফিক, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যানদের একজন মুশফিক।

শুনতে একটু অবাক শোনালেও এই সেদিনের সেই পকেট রকেট মুশফিক নয় নয় করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঠিক দশ বছর পূর্ণ করে ফেললেন গত ২৬ মে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ ১০ বছর কাটালেন মুশফিক, নিশ্চিত করেই বাংলাদেশের টেকসই ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর অলরাউন্ডার এই মুশফিক।

২০০৫ সালে তার টেস্ট অভিষেকটাকে তখনকার প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদের একটা ‘ভুল’ হিসেবেই দেখা হচ্ছিলো। মাত্রই ১৮ বছর পূর্ণ করা প্রায় অজ্ঞাতকুলশীল এই মুশফিককে ইংল্যান্ডে পাঠানোটা রীতিমতো সমালোচিত সিদ্ধান্ত ছিলো। এরপর খালেদ মাসুদ পাইলটকে সরিয়ে দুই বছর পর বিশ্বকাপে মুশফিককেও উইকেটরক্ষক করে ফেলায় ফারুক আহমেদকে রীতিমতো সমালোচনা ও গালিগালাজ হজম করতে হয়েছে।

কালক্রমে অবশ্য প্রমাণিত হয়েছে ফারুক আহমেদ তার সেই সময়কালে আরও কয়েকটি বাংলাদেশ বদলে দেয়ার সিদ্ধান্তের মতো এটিও এক অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১০ বছর কাটানোটা খুব বিরল কোনো ব্যাপার নয়। ১৯৮৬ থেকে মিনহাজুল আবেদীন, ফারুক আহমেদ, আতাহার আলী খানরা অনেকেই দশ বছর পার করেছেন। কিন্তু তারা না পেয়েছেন টেস্ট খেলার সুযোগ, না নিয়মিত ওয়ানডে খেলতে পেরেছেন। এরপর শাহাদাত হোসেন রাজীব, মাশরাফি বিন মুর্তজা, মোহাম্মদ আশরাফুলরা পার করেছেন এক দশক। মাশরাফি ছাড়া বাকী দুই জন কখনোই প্রতিভার প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি; মাশরাফিকে সেটা করতে দেয়নি ইনজুরি।

সদ্যই এই মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলবেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালরাও। তার আগ পর্যন্ত বলা যায়, মুশফিকুর রহিমই বাংলাদেশের সফলতম দশক মেয়াদী ক্রিকেটার।

এই জায়গাতে আসতে অবশ্য মুশফিককে কম লড়াই করতে হয়নি। ২০০৫ সালে রোমাঞ্চকর অভিষেক হলেও পায়ের নিচে মাটিটা শক্ত করতে সময় লেগেছে। লড়াই করেই নিজেকে দেশের প্রধানতম উইকেটরক্ষক অলরাউন্ডারে পরিণত করেছেন। আর গত বছর তিনেক ধরে তো ‘রান মেশিন’ হয়ে উঠেছেন। সব ফরম্যাটে মুশফিক ক্যারিয়ারের সোনালী সময়টা কাটাচ্ছেন এই সময়ে এসে।

মুশফিক এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট নতুন এক ধারাও তৈরি করেছেন- কিশোর বয়সে অভিষেক মানেই অল্পে হারিয়ে যাওয়া নয়। বরং মুশফিক দেখিয়েছেন, কিভাবে কালক্রমে আরও পরিণত এবং সফল হয়ে উঠতে হয়।

রেকর্ডই বলছে, মুশফিকের অভিষেকের সময় থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যে কয় জন উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান কমপক্ষে ৪০টি টেস্ট খেলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম সেরা তিনিই। পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে পৃথিবীর চতুর্থ সেরা রান সংগ্রাহক উইকেটরক্ষক মুশফিক।

এই সময়কালে মুশফিকের সঙ্গে একমাত্র সাকিব আল হাসানকে তুলনা করা চলে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবদান রাখার ক্ষেত্রে। মজার ব্যাপার হলো, দুই জনেরই উত্থান প্রক্রিয়া একই – বিকেএসপি থেকে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে হাই পারফরম্যান্স ইউনিট।

আর এই হাই পারফরম্যান্সেই মুশফিকদের গড়ে পিটে তুলেছিলেন রিচার্ড ম্যাকিন্স। ম্যাকিন্স অবশ্য বলছিলেন, মুশফিক এমনই ছিলেন শুরু থেকে। এই যে সাফল্যের সোনালী দুয়ারে তিনি পৌঁছেছেন এই সম্ভাবনা সেই শুরু থেকেই তার মধ্যে ছিলো, ‘মুশফিক খুব একটা বদলায়নি। ও সবসময়ই এমন নিজের কাজে মনযোগী, আরও শিখতে চায় এবং সবচেয়ে পরিশ্রমী।’

এই ‘পরিশ্রমী’ শব্দটাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যাখ্যা করতে পারে মুশফিককে।

খেলা নেই, অনুশীলন নেই, এমন কোনো সরকারি ছুটির দিনে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে প্রাণের চিহ্নও থাকে না। ধু ধু গ্যালারি, ফাঁকা বিসিবি অফিস, প্রাণশূন্য মাঠ; এমনকি নিচের ফার্নিচারের দোকানগুলোতেও সেদিন আপনি কাউকে খুঁজে পাবেন না। তবে একটু কষ্ট করে ইনডোর স্টেডিয়াম বা অ্যাকাডেমির মাঠের দিকে হাঁটাহাঁটি করলে একাকী নক করতে থাকা বা দৌড়াতে থাকা ছোটখাটো একজন মানুষকে পেয়ে যাবেন। ক্রিকেট দুনিয়ার সব বন্ধ থাকতে পারে, তার অনুশীলন বন্ধ থাকবে না।

ফরেস্ট গাম্পের মতো করে দৌড়াতেই থাকবেন; দৌড়াতেই থাকবেন মুশফিকুর রহিম!

পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি: এ জাতীয় আপ্তবাক্যে আপনার যদি আস্থা না থাকে, তাহলে সে ফ মুশফিককে দেখতে পারেন। মুশফিক নিজেও প্রায়ই বলেন, পরিশ্রমই তাদের সাফল্যের মূল মন্ত্র।

আর এই মূল মন্ত্র ধরে রাখতে পারলে নিশ্চয়ই আশা করা যায়, আবারও এক দশক পর এমন লেখা লিখতে হবে। -তথ্য সূত্র :  - ইত্তেফাক

মন্তব্য