মধ্যপ্রাচ্য শোষণে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি হাতিয়ার আইএস

islamic state

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট : গত বছরের ২৯ জুন ইরাক-সিরিয়া সীমান্তে কথিত খলিফা আবু বকর আল বাগদাদির নেতৃত্বে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ঘোষণা দেয়া হয়। এর আগে সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের নাম শোনা না গেলেও গত ১২ মাসে তাদের উন্মত্ততা, হত্যা, নৃশংসতা ও বর্বরতার সঙ্গে সারা পৃথিবী পরিচিত হয়ে উঠেছে। আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইয়ের ফল এই হয়েছে যে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। নিকট ভবিষ্যতে তাদের প্রভাব কমার কোনো লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রই আইএসের জন্মদাতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে ও তেল-গ্যাস লুণ্ঠনে জঙ্গিগোষ্ঠীকে হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ব্রিটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএস মোকাবেলায় মার্কিন রণকৌশল জঙ্গিদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। ইরাকের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় আইএসের উত্থানের পর তারা ক্রমশই বিজয়ের দিকে এগুচ্ছে। সর্বশেষ ১৭ মে রামাদি দখলে নিয়ে কার্যত সমগ্র ইরাকেই তাদের বিজয় ঘোষণা করেছে। এর চার দিন আগেই সিরিয়ার বিখ্যাত প্রাচীন শহর ও আধুনিক পর্যটন রুট পামিরার পতন ঘটায় তারা। এ দুই বিজয়ে এটাই প্রমাণিত এখন শত শত মাইল দূরেও একই সঙ্গে বহুপক্ষীয় যুদ্ধফ্রন্ট খুলতে সমর্থ আইএস। জঙ্গিরা ইরাক-সিরিয়ার সেনাবাহিনীকেও পরাজিত করেছে। আইএসকে পাল্টা প্রতিরোধ করার মতো কোনো সেনাবাহিনীও আর নেই। বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল গ্রেট ব্রিটেনের চেয়েও বড়। সিরিয়ার ৫০ শতাংশের জায়গা তাদের দখলে এবং দেশটির ১৪ প্রদেশের ১০টিতেই তাদের সরব উপস্থিতি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এত অল্প সময়ের মধ্যে তারা এ শক্তি কীভাবে অর্জন করলো এবং তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোই পেল কোথায়? ইন্টারন্যাশনাল পলিসি ডাইজেস্টের মতে, আইএস টিকে থাকাটাই মার্কিন স্বার্থের জন্য মঙ্গলজনক।

মার্কিন রণকৌশল পর্যালোচনা করে ইন্ডিপেনডেন্ট বলছে, আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর কোনো কৌশল গ্রহণ করছে না। বরং তাদের সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। ২০১৪ সালের আগস্টে আইএসবিরোধী বিমান হামলা শুরু করে ওয়াশিংটন। সেবছরের অক্টোবরেই তা সম্প্রসারিত হয় সিরিয়ায়। পেন্টাগনের দাবি, এ পর্যন্ত ৪ হাজার বিমান হামলায় আইএসের ১০ হাজার সদস্য নিহত হয়েছে। তাদের বক্তব্য সত্য হলেও আইএসের নিয়মিত বাধ্যতামূলক যোদ্ধা নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাছে তা কোনো কাজেই আসেনি। অন্যদিকে, ইরাকি সেনাবাহিনীকে দিয়ে সম্মুখযুদ্ধের যে কৌশল নিয়েছে, সেটাও বাস্তবতাবিমুখ। ইরাকের সেনা সদস্য আসলে কতজন তা কেউ জানে না। তাদের ভুতুড়ে সৈন্যসংখ্যা কেবল খাতা-কলমেই রয়েছ। মাস দুয়েক আগে বাগদাদই স্বীকার করেছে তাদের ৫০ হাজার সৈন্য অস্তিত্বহীন, যাদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা হয়। মাঠে যারা আছে, তাদের বড় অংশ বেতনের অর্ধেক বড় কর্মকর্তাদের দিয়ে গোপন সমঝোতা করেছে যে, তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। আইএসের মোকাবেলায় তাই তারা মাঠ ছেড়ে চলে আসে। এ সবকিছু জেনেও যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো কৌশল নিচ্ছে না।

অন্যদিকে, সিরিয়ায় বাশার আল আসাদবিরোধী মডারেট বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাশারের পতন হলে তার বিকল্প হিসেবে বিদ্রোহীরা মোটেই উপযুক্ত নয়। সেই শূন্যতা পূরণে সহজেই ক্ষমতা পেয়ে যাবে আইএস ও আল নুসরা ফ্রন্ট। ইরাকের চেয়ে সিরিয়ায় আইএসের প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি। কারণ দেশটির ৬০ শতাংশই সুন্নি মুসলিম, যা ইরাকে মাত্র ২০ শতাংশ।

গ্লোবাল রিসার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ প্রধানত তেল ও ইসরাইলকেন্দ্রিক। পাশাপাশি ইরানকে ঠেকানো। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিপুল তেলসম্পদ লুণ্ঠন করলেও এখন দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আইএস। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা মতোই ইরাকে মার্কিন হামলার রুটটাই ব্যবহার করেছে আইএস। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা এজেন্সির (ডিআইএ) নথিতে দেখা গেছে ২০১২ সালেই মসুল পতনের পরিকল্পনা করেছিল আইএস। মসুলের তেল উৎপাদন ও ইরাক-সিরিয়ার প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদগুলো খুব সহজেই চালান হচ্ছে ইউরোপ আমেরিকায়। মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত আইএস তাই পরিকল্পনা মতোই কয়েক দশক রাজত্ব চালাবে। এছাড়া কিশোর-শিশুযোদ্ধাদের আশংকাজনক অন্তর্ভুক্তিতে ধারণা করা হচ্ছে আগামী প্রজন্মও জর্জরিত হবে আইএস অভিশাপে। -যুগান্তর

মন্তব্য