আমেরিকার কড়চা

Fahim Reza Noor
- ফাহিম রেজানূর

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোন দলের কোন প্রার্থী জয়ী হয়ে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা যেতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই প্রথমবারের মত কি মার্কিনীরা তাদের দেশ পরিচালক হিসেবে কোন মহিলাকে বেছে নেবেন কিনা সেটিই সব থেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ করে আমেরিকানরা দেশ মুক্ত করেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ধন ও শক্তি প্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের দরবারে মান বাড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। আর সেই দেশের মর্যাদা উচ্চ রাখার জন্য আইনী-বেআইনী ভাবে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে, কোন কোন দেশে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। যার ফলে তার গায়ে সাম্রাজ্যবাদের তঘমা সেটে গেছে।

বলাবাহুল্য নিজ দেশের উন্নতির সাথে সাথে বহির্বিশ্বে ও আধুনিক প্রযুক্তিতে অবদান রেখে চলেছে মার্কিনীরা সর্বোচ্চ পদে। কিন্তু দেশীয় রাজনীতিতে কখনই মহিলাদের সুযোগসুবিধা দেননি। তবে এখন সময় এসেছে এর পরিবর্তনের। দেশ পুনঃনির্মাণে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কালো মানুষদের ধরে এনে ক্রীতদাস বানিয়ে রেখে ছিল। তাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফলে ক্ষেতে ফসল হয়েছে, বড় বড় বাড়ী-ঘাট-সেতু নির্মিত হয়েছে অথচ তাদের ছিলনা কোন নাগরিক অধিকার। কিন্তু সময় পাল্টে গেছে এখন। তারা শুধু ভোটাধিকারই পাননি, ভোট প্রয়োগও করেছেন। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণধার হচ্ছেন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা।
এবার মহিলারা কি পারবেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পোঁছাতে। বর্তমানে ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে আপাতত মনোনয়ন প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক ফার্স্টলেডী ও সাবেক পররাষ্ট্র সেক্রেটারী (মন্ত্রী) ও সাবেক সিনেটর ও আইনজীবী রডহ্যাম হিলারী ক্লিনটন প্রার্থী হয়েছেন। তারই সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে এ কথাও ঠিক এখন শুধু প্রাথমিক অবস্থা। নির্বাচনে শেষ মুহুর্তে কোনপ্রার্থী এগিয়ে থাকবেন এবং শেষ বাশি বাজার সময় সবাইকে পিছে ফেলে কে অভিষ্ট লক্ষ্যে পোঁছাবেন তা সময়ই বলে দেবে।
এখন পর্যন্ত ডেমোক্রেটিক পার্টির ৭ জন প্রার্থী ও রিপাবলিকান পার্টির ১৭ জন প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের প্রাইমারীতে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির হিলারী ক্লিনটন এবং রিপাবলিকান পার্টির সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের ভাই জেব বুশ শীর্ষেও অবস্থান করছিলেন।

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে রিপাবলিকান পার্টির প্রথম আনুষ্ঠানিক ডিবেট অনুষ্ঠিত হয় আগস্টেও প্রথম সপ্তাহে ওহাইয়োর ক্লিভল্যান্ডে ফক্স নিউজের আয়োজনে। সেখানে ১৭ জনপ্রার্থীর মধ্যে ১০ জন অংশ নেন। আর এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে রিপাবলিকান পার্টিও বর্তমানে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছেন রিয়েল এস্টেট ও হোটেল ব্যবসায়ী ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় শো ‘এপ্রেনটিস’এর হোস্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লোরিডার সাবেক গভর্ণর জেব বুশ। পিছিয়ে আছেন কম করে হলেও ১৩ পয়েন্টে।
তিন-তিন বার বিয়ে করে নানা অঘটনঘটনপটিয়সী ট্রাম্প, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হিসেবে এখন পরিচয় দিতে উৎসুক হচ্ছেন। তিনি নিজেকে মনে করেন, তিনি অত্যন্ত স্মার্ট এবং কোনক্রমে যদি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন তা’হলে তিনিই হবেন সর্বকালের সেরা প্রেসিডেন্ট। কারণ হিসেবে মনে করেন, সবার চেয়ে তার নিতম্ব জোড়া অধিক সুন্দর। আর তার আঙ্গুল, আর জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি ধনী, ভীষন ধনী, সেজন্য সবার প্রিয়। অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ ভালভাবেই বোঝেন এবং জানেন যে, উল্টা-পাল্টা কথা বল্লে জনপ্রিয়তা খুব সহজে মেলে। মানুষ উৎসুক হয়। প্রথম বিতর্কেই ফক্স চ্যানেলের মহিলা সাংবাদিককে গালিগালাজ করেন। পরবর্তী পর্যায়ে হিস্পানিক টিভি চ্যানেল তেলেমুন্ডোর সাংবাদিককে সংবাদ সম্মেলন থেকে বের করে দেন। মেয়েদেও তিনি ‘শুকুরের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। মেক্সিকানদের বলেছেন, ধর্ষক ও মাদক ব্যাবসায়ী, তাঁদের এদেশে আসা ঠেকানোর জন্য দুই দেশের মাঝখানে খুব সুন্দর, খুবই সুন্দও একটি দেয়াল তোলারও প্রস্তাব করেছেন। তিনি আমেরিকার সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসীকে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যও মত প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে আমেরিকা জন্ম গ্রহনকারী শিশুদের (অবৈধঅভিবাসী) মার্কিন নাগরিকত্ব প্রদানের যে আইন চালূ রয়েছে তাও বাতিলের দাবি করেছেন। ট্রাম্প আরও বলেছেন, চীনারা আমেরিকানদের চেয়ে বেশি চালাক। ব্যবসায়ে তারা আমেরিকানদের ঠকাচ্ছে, সেজন্য তাদের উপর করারোপ করা উচিৎ। তিনি ওবামা কেয়ার বাতিলের পক্ষে এবং ক্ষমতায় যেতে পারলে স্বাস্থ বীমা বাতিল করে এমন একটি স্বাস্থ্য বীমা করবেন যাতে সবাই উপকৃত হয় তবে কি রকম বা কিধরনের সেই বীমা হবে সে ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত দিতে রাজী হননি। তবে তিনি একটার পর একটা কথা বলে ও ঘটনা ঘটিয়ে ও কারও কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে রাজি নন। তিনি ভুল বকছেন সেটাও স্বীকার করতে নারাজ।
টেক্সাসের সাবেক গভর্ণর রিক পেরি, যিনি নিজেও একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, তিনি ট্রাম্পকে ‘ক্যানসার’এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। একথা সত্য ট্রাম্প এর অগোছালো ও দাম্ভিক কথাবার্তায় অনেকে ভূয়সী প্রসংশাই শুধু করছেননা তারা তা প্রচারনাও করছেন যে এবং মনের গহীনে আশা প্রকাশ করছেন যে, সাবেক আগাগোড়া একজন ডেমোক্র্যাট, বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিনীদের নয়া প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন।
আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এ দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের অধিক হবে অশ্বেতাঙ্গ। জনসংখ্যার বৃদ্ধিও চলতি হার এভাবে অব্যাহত থাকলে ২০৪৪ সাল নাগাদ এদেশের অশ্বেতাঙ্গরা হবে ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আর এই জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ হবে হিস্পানিক। বলাবাহুল্য জনসংখ্যার উক্ত চিত্র অনুধাবন করে সাদা আমেরিকানরা আতঙ্কিত ও ভীত আর এর ফলে অভিবাসীদের ব্যাপারে যে নেতা যত কঠিন ভূমিকা নেবেন ততই জনপ্রিয় হবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় হিস্পানিক টিভি সাংবাদিক রিকার্ডোসানচেজ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘তাজাকার্তুজ বোঝাই বন্দুকহাতে এক বাদর’ বলে অভিহিত করেছেন।
বছরের শুরুতেই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারী ক্লিনটন এগিয়ে ছিলেন কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই তাঁর বিপক্ষে দলের অন্য প্রার্থীদের অবস্থান শক্ত হচ্ছে যার ফলে সাবেক ফার্স্ট লেডী হিলারী খুব সহজে মনোনয়ন পাবেন সেটা বলা মুশকিল। বিশেষ করে ই-মেইল ইস্যুতে নানা তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতির সম্মুখীন বলে স্পস্টত প্রতীয়মান হচ্ছে। তারপরও হিলারী ক্লিনটনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তিনি বেশিরভাগ ডেমোক্রেটদের কাছে খুব পরিচিত। আর এই পরিচিতিই তাকে জনগনের মধ্যে পরিচিত করে তুলছে যা প্রাথমিক (প্রাইমারী) নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে তাকে সাহায্য করবে। উল্লেখ্য, তিনি প্রচারে মধ্যবিত্তদের গুরুত্ব দিচ্ছেন আর আমেরিকার নির্বাচনী ইতিহাসে তিনিই সম্ভবত তহবিল সংগ্রহে এগিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জোকইডেল এর পক্ষে দলের এলিটদের বিরাট একটি অংশের সমর্থন রয়েছে সেই বিবেচনায় পরবর্তী নির্বাচনী প্রচারনায় দেখার বিষয় আছে কার পাল্লা ভারী থাকবে। তবে দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সামনে যিনি হুমকী স্বরূপ তিনি আমেরিকার মূলধারার রাজনৈতিক নন। তবে ভারমন্ট থেকে একমাত্র স্বতন্ত্র সিনেটর যিনি নিজেকে সোসালিস্ট হিসেবে দাবী করেন তিনি হলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডাস। সাম্প্রতিক জনমত গণনায় দেখা গেছে হিলারী ও বার্নি স্যান্ডার্সের প্রায় সমান জনসমর্থন রয়েছে। উল্লেখ্য, মার্কিন কংগ্রেসে সিনেটর স্যান্ডার্স নিজেকে ‘সোসালিস্ট’ দাবী করেন কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে।
দেশজুড়ে এখন প্রাইমারী নির্বাচনের তোরজোড় চলছে। উভয় দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা জোরপ্রচারনায় ব্যস্ত। তারপরও জনগন শুধু অবলোকনই করছে না দলের ও প্রার্থীদের কার কি ইস্যু রয়েছে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষনও করছে। দেখা যাক সময়ই বলে দেবে মার্কিন জনগন কোন প্রার্থীকে বেছে নেয় তাদের দেশ পরিচালনা করার জন্য।

মন্তব্য