এয়ার টার্বুলেন্স : কেন হয় এবং কতটুকু বিপজ্জনক?

Turbulance

প্রবাসী কন্ঠ ডেস্ক : জীবনে প্রথম বিমানে উঠে স্বপ্নের দেশে কানাডায় আসছে শফিকুল ইসলাম। দুবাইতে ৬ ঘন্টার বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু। বিমানে পরিচিত কেউ ছিল না তার সঙ্গে। একাই আসছিল কানাডায়। যাত্রী সংখ্যাও ছিল কম। শফিকুল যে সিটে বসেছিল সেই সারির পাশাপাশি চার সিটে আর কোন যাত্রী ছিল না। ফলে ইচ্ছেমত হাত-পা ছড়িয়ে ঝিমিয়ে-ঘুমিয়ে আর থেকে থেকে মিনি পর্দায় ভিডিও দেখে আরাম করে দূর পথের যাত্রা উপভোগ করছিল সে।

কিন্তু এই আরামের যাত্রা পথে হঠাৎ বাধ সাধলো এয়ার টার্বুলেন্স। বিমান তখন আটলান্টিকের উপর দিয়ে পারি দিচ্ছিল। বিমান যাত্রার অভিজ্ঞতা এই প্রথম তার। কিন্তু এ কোন বিমানে উঠলো? থেকে থেকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে কেন বিমানটি? কড় কড় করে আওয়াজও হচ্ছে ঝাঁকুনির সাথে সাথে। ভেঙ্গে পড়বে নাকি বিমানটি! পাইলট মাঝে মাঝে ঘোষণা দিচ্ছে সিট বেল্ট বাঁধার জন্য।

এয়ার টার্বুলেন্স কি জিনিষ তা সে জানতো না। এই নামটিও সে কোনদিন শুনেনি। শফিকুলের আত্মারাম পাঁজরের খাঁচা থেকে বের হয়ে যাবার যোগার। এয়ার হোস্টেজের কাছে বার কয়েক জানতে চাইল বিমান এ ভাবে লাফাচ্ছে কেন? কিন্তু এয়ার হোস্টেজ যা বললো তার মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝল না সে।

শফিকুলের মনে পড়লো দেশে ফেলে আসা প্রিয় মুখগুলো। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয় পরিজন সবার কথা মনে আসতে লাগলো একে একে। তাদের সঙ্গে কি আর দেখা হবে না?

মিনিট দশেক পর বিমানের লাফালাফি বন্ধ হলো। স্বস্তি ফিরে এলো শফিকুলের মনে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবারো সেই লাফালাফি! এভাবে কয়েক দফা চললো। তবে শেষ পর্যন্ত কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনা ছাড়াই বিমানটি টরন্টো এসে পৌঁছালো।

কানাডা ও আমেরিকায় যারা নিয়মিত যাত্রী তাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে এই এয়ার টার্বুলেন্স সম্পর্কে। অনেকের কাছে এয়ার টার্বুলেন্স একটি আতংকের নাম। কিন্তু এই এয়ার টার্বুলেন্স এর বিষয়টা কি? কেন এয়ার টার্বুলেন্স হয়? কতটুকু বিপজ্জনক বিমানের এই ঝাঁকি খাওয়ার বিষয়টি। এয়ার টার্বুলেন্সের ঝাঁকুনিতে কি বিমান ভেঙ্গে মাটিতে বা সমুদ্রপৃষ্ঠে পড়ে যেতে পারে? এরকম ঘটনার নজির কি আছে বিমান চলাচলের ইতিহাসে?

গত ডিসেম্বর মাসে এয়ার কানাডার একটি বিমান সিভিয়ার এয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হলে ২১ জন যাত্রী আহত হয়েছিলেন। বিমানটিকে জরুরী অবতরণ করতে হয়েছিল ক্যালগারিতে। ঐ ঘটনার পর সিবিসি নিউজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এয়ার টার্বুলেন্স এর উপর। নিচে তা তুলে ধরা হলো।

এয়ার টার্বুলেন্স আসলে কি : এয়ার টার্বুলেন্স এর বিষয়টি ঘটে বাতাসের চাপজনিত কারণে। বাতাসের একটি অংশ যখন একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলতে গিয়ে অন্য একটি অংশের সঙ্গে (যে অংশের গতি ভিন্ন) মিলিত হয় বা সংঘর্ষ বাধে তখন টার্বুলেন্সের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। ঝড় বা বজ্রবিদ্যুতপূর্ণ ঝড়বৃষ্টি বা জেট স্ট্রিমের প্রভাবে বাতাসে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর একেক আবহাওয়াতে একেক ধরণের এয়ার টার্বুলেন্স সৃষ্টি হতে পারে।

টার্বুলেন্স এর ধরণ :

মাত্রা অনুযায়ী এয়ার টার্বুলেন্সকে চার ভাগে ভাগ করা হয়।

লাইট টার্বুলেন্স।

মডারেট টার্বুলেন্স।

সিভিয়ার টার্বুলেন্স ।

এক্সট্রিম টার্বুলেন্স।

বিমান চলার পথে লাইট টার্বুলেন্স খুবই সাধারণ ব্যাপার। লাইট টার্বুলেন্স এর শিকার হয় প্রায় প্রতিটি বিমান। অনেকে হয়তো লাইট টার্বুলেন্স টেরই পান না।

মডারেট টার্বুলেন্স টের পাওয়ার মতই একটি ব্যাপার। যারা নিয়মিত ট্রাভেল করেন তারা সকলেই এই টার্বুলেন্স এর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। মডারেট টার্বুলেন্স এর শিকার একটি বিমান ৬ মিটার পর্যন্ত উপরে নিচে উঠা নামা করতে পারে। হাতে পানি বা কোন ড্রিংস এর গ্লাস থাকলে তা থেকে কিছু তরল অংশ উপচে পড়ে যেতে পারে সিটে বা মেঝেতে ঝাঁকুনির কারণে। সিটবেল্টেও টান অনুভব করতে পারেন কেউ কেউ।

কোন বিমান যদি সিভিয়ার টার্বুলেন্স এর শিকার হয় তবে যাত্রীগণ সিট বেল্ট পরা না থাকলে সিট থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে এদিক সেদিন ছিটকে পড়তে পারেন। সে ক্ষেত্রে আহত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। এই সময় বিমানের পাইলটও ক্ষণিকের জন্য বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। তবে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সময় লাগে না পাইলটের। সিভিয়ার টার্বুলেন্স এর সময় বিমান ৩০ মিটার পর্যন্ত উঠানামা করতে পারে উপরে নিচে।

এক্সট্রিম টার্বুলেন্স খুবই বিপজ্জনক। তবে এক্সট্রিম এয়ার টার্বুলেন্স এর ঘটনা অতি বিরল। এক্সট্রিম টার্বুলেন্স ঘটে থাকলে বিমানের পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বিমানেরও ক্ষতি সাধন হতে পারে। সিট বেল্ট পরা না থাকলে যাত্রীগণ মারাত্মকভাবে আহত হতে পারেন ছিট থেকে সিটকে পড়ে গিয়ে।

সিভিয়ার বা এক্সট্রিম টাইপের এয়ার টার্বুলেন্স সচরারচ ঘটে না। টরন্টোর সেনেকা কলেজের এভিয়েশন ইন্ট্রাকটর জনসন তার অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, গত ৩০ বছরের পেশা জীবনে তিনি মাত্র কয়েকবার মারাত্মক ধরণের এয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হয়েছিলেন। আর এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল কার্গো প্লেন চালানোর সময়। যাত্রী বিমানে নয়।

উল্লেখ্য যে, বিমানের পাইলটগণ আগে থেকেই কিছুটা টের পেতে পারেন এই এয়ার টার্বুলেন্সের ব্যাপারে। যাত্রা শুরু আগে তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নেন। তারা যে পথে যাত্রা করবেন সেই পথে কিছুক্ষণ আগে যে বিমানগুলো গিয়েছে তাদের কাছ থেকেও আগাম রিপোর্ট পেতে পারেন। যাত্রা পথে পাহাড় থাকলে বা ঘন মেঘের অবস্থান থাকলে এয়ার টার্বুলেন্সের কবলে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই বিষয়গুলোও পাইলটগন দেখে নেন যাত্রা শুরুর আগে। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমও পাইলটদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করে।

এয়ার টার্বুলেন্সের কারণে যাত্রী সাধারণের আহত বা নিহত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, আহত হওয়ার ঘটনা বিরল। বিশেষ করে সাধারণ এয়ার টার্বুলেন্সের বেলায়। ট্রান্সপোর্ট কানাডার হিসাব মতে গত বছর মাত্র ৩১ জন যাত্রী আহত হয়েছেন বিমান ভ্রমনের  সময় এয়ার টার্বুলেন্সর শিকার হয়ে। আর এসব আহত হওয়ার ঘটনা ছিল খুবই স্বল্পমাত্রার। তবে গত বছর ডিসেম্বর মাসে চীনের সাংহাই থেকে টরন্টো আসার পথে একটি বিমান সিভিয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হয়েছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে বিমানটিকে ক্যালগারিতে জরুরী অবতরণ করতে হয়। সিভিয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হয়ে ঐ বিমানের যাত্রীদের মধ্যে ২১ আহত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে ইউএস ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন এর তথ্য মতে দেখা যায় ১৯৮০ সাল থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে অর্থাৎ প্রায় ৩০ বছরের ইতিহাসে ৩ জন যাত্রীর মৃত্যু ঘটেছে এয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হয়ে। এর মধ্যে একজন ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট এবং বাকি দুইজন সাধারণ যাত্রী।

এয়ার টার্বুলেন্সের কারণে বিমান ভেঙ্গে নিচে পড়তে পারে? এ প্রশ্নের জাবাব হলো, হ্যা এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তা এতই বিরল যে সেটি হিসাবের মধ্যে পড়ে না। এরকম একটি দুর্ঘটনা

ঘটেছিল আজ থেকে ৫০ বছর আগে। ঐ সময় এক্সট্রিম এয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হয়ে ব্রিটিশ এয়ারের একটি বিমান ভেঙ্গে পড়েছিল। তবে আধুনিক কালের বিমানগুলো এমনভাবে তৈরী যে সেগুলো এয়ার টার্বুলেন্সকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী। ফলে এয়ার টার্বুলেন্সের কারণে ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনাও একেবারেই বিরল। অবশ্য এর পরও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা যে একেবারেই নেই তা বলা যাবে না। ১৯৯৩ সালে আলাস্কার আকাশ পথ দিয়ে উড়ে যাওয়ার একটি কার্গো বিমানের ইঞ্জিন বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এয়ার টার্বুলেন্সের শিকার হয়ে। কিন্তু তারপরও বিমানটি আকাশ পথে ভেঙ্গে পড়েনি। নিরাপদেই ল্যান্ড করতে পেরেছিল।

এয়ার টার্বুলেন্স বিমান যাত্রার অবশম্ভাবী সঙ্গী। যেমনটা নগরপথে গাড়ি চালানোর সময় পটহোল বা সামান্য উচুনিচু পথের কারনে গাড়ি দোলা খাওয়ার ঘটনাও। সড়ক পথে নিরাপদ থাকার জন্য যেমন সিটবেল্ট খুবই জরুরী, তেমনি জরুরী আকাশ পথেও সিটবেল্ট পরে থাকা। এয়ার টার্বুলেন্সকে ভয় পাওয়ার কোন কারণই নেই। তবে সিটবেল্ট পরে থাকাটা জরুরী যখন এয়ার টার্বুলেন্স শুরু হয়।

মন্তব্য