টরন্টোতে হৃদরোগীদের জন্য বহুতল ভবনে বাস করা বিপজ্জনক

apartment

হৃদরোগে আক্রান্ত হলে বাঁচার সম্ভাবনা অতি সামান্য

প্রবাসী কন্ঠ ডেস্ক : টরন্টো ও মিসিসাগায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যারা ১৫ তলা বা তারো বেশী উপরে অবস্থিত এপার্টমেন্টে বাস করেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাদের বাঁচার সম্ভাবনা অতি সামান্য। ৯১১ এর ডাটা পরীক্ষা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। খবর টরস্টারের।

হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশী ঘটে নিজ বাসস্থানে। বিষয়টি গবেষকদের জানা ছিল। কিন্তু যে বিষয়টি এখন পর্যন্ত জানা ছিল না তা হলো, হৃদরোগীরা যে যত বেশী উপর তলায় বাস করেন সে ততবেশী বিপদের মধ্যে বাস করেন।

গত জানুয়ারী মাসে কানাডিয়ান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর জার্নালে এ বিষয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরী করতে গিয়ে টরন্টো ও এর সংলগ্ন মিসিসাগা এবং ব্রাম্পটন এলাকাসমূহকে বেছে নেয়া হয়। কারণ এই এলাকা সমূহে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশী এবং সুউচ্চ ভবনের সংখ্যাও বেশী। গবেষকগণ যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেন তা হলো বাসস্থানের উচ্চতা রোগী বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেলায় কতটুকু প্রভাব ফেলে যখন তারা  বা তাদের হয়ে অন্য কেউ ৯১১ এ কল করেন। গবেষকগণ দেখতে চেয়েছিলেন উচ্চতা এই ক্ষেত্রে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয় কিনা।

গবেষণার ফলাফল? হ্যা, বাসস্থানের উচ্চতা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাঁচার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। উত্তরটা ভীতিকর হলেও এটিই বাস্তবতা।

গবেষকগণ ২০০৭ – ২০১২ সালের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত ৮০০০ রোগীর কেস পরীক্ষা করে দেখেন। এদের মধ্যে যাদের বাস ছিল প্রথম বা দ্বিতীয় তলায় তাদের মধ্যে বেঁচে যাওয়ার হার ছিল ৪.২%। আর যাদের বাস ছিল তৃতীয় তলা থেকে পনের তলার মধ্যে তাদের মধ্যে বেঁচে যাওয়ার হার ছিল ২.৬%। আর যাদের বাস পনের বা তারও উপরের তলায় ছিল তাদের মধ্যে বেঁচে যাওয়ার হার ছিল শতকরা এক ভাগেরও কম!

যাদের উপর এই গবেষণা চালানো হয়েছিল তাদের মধ্যে ৩০ জন ছিলেন পঁচিশ বা তারো বেশী উপরের তলার বাসিন্দা। গবেষকদের একজন ড. মরিসন জানান, ঐ ৩০ জনের একজনও বাঁচেননি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৯১১ এ কল করার পরও। ড. মরিসন সেন্ট মাইকেল হসপিটালের একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

গবেষকগণ বিভিন্ন ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখতে চেয়েছিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর মৃত্যুর হারের সঙ্গে এলাকাভিত্তিক বা সম্প্রদায়ভিত্তিক অথবা স্বচ্ছল/অস্বচ্ছল জনগোষ্ঠির মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য রয়েছে কি না। কিন্তু দেখা গেছে কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ কে ইউরোপীয়, কে আফ্রিকান বা কে এশীয় বংশোদ্ভূত অথবা কে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল/অস্বচ্ছল সেটি কোন বিষয় নয়। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কে কত উপর তলায় বাস করেন সেটিই প্রাথমিক একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাড়ায় বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু সে ব্যাপারে।

টরন্টো, মিসিসাগা ও ব্রাম্পটনে কিছু কিছু সুউচ্চ ভবনে অনেক সময় দেখা যায় বাইরে থেকে ভবনের ভিতরে দ্রুত প্রবেশ করতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে প্যারামেডিক টিমকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এই বাধার মধ্যে আছে তাৎক্ষণিকভাবে লবির মেইন গেট খুলতে দেরী হওয়া ও এলিভেটরের জন্য অপেক্ষা করা। হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য এই দেরী হওয়াটা খুবই বিপজ্জনক। কারণ, প্রতি এক মিনিট দেরী হওয়া মানে রোগীর বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ৭/৮% কমে যাওয়া যদি সময়মত প্যারামেডিক টিম এসে রোগীর হৃদযন্ত্র পুনঃসচল না করে।

ডিফাইব্রিলেশন (defibrillation) নামে একটি যন্ত্র আছে যেটি থাকলে রোগীর পাশে থাকা কেউ রোগীর থেমে যাওয়া হৃদযন্ত্রকে পুনঃসচল করতে পারেন প্যারামেডিক টিম আসার আগে। কিন্তু এই যন্ত্রটি সাধারণত কারো বাসায় বা এপার্টমেন্ট/কন্ডোতে রাখা হয় না।

গবেষকগনের মতে সিটিতে সাশ্রয়ী মূল্যের বাসস্থানের জন্য যতবেশী সুউচ্চ ভবন নির্মিত হবে সেটি ততবেশী খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে জনগণের বিশেষত হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপর।

গবেষক মনে করেন, কিছু উদ্যোগ গ্রহন করা হলে সুউচ্চ ভবনের বাসিন্দাদের মধ্য যারা হৃদরোগী তাদের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। উদাহরণ হিসাবে তারা ইউনিভার্সাল কি (চাবি) এর কথা বলেন। কানাডায় ফায়ারসার্ভিসের কর্মীদের হাতে ইউনিভার্সাল কি থাকে। ফলে তারা যে কোন ইমার্জেন্সীর সময় কারো অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই সরাসরি ভবনে প্রবেশ করতে পারে প্রধান ফটক খুলে। কিন্তু এই সুযোগটি প্যারামেডিকদের বেলায় রাখা হয়নি। ফলে রোগীর অবস্থা যতই বিপন্ন হোক, তারা সরাসরি ভবনে প্রবেশ করতে পারে না। অপেক্ষায় থাকতে হয় রোগীর লোকজনের জন্য বা অন্য কারোর জন্য যারা এসে ভবনের প্রধান ফটক খুলে দিবে। এ ক্ষেত্রে গবেষকদের পরামর্শ হলো, ইউনিভার্সাল কি প্যারামেডিক টিমের হাতেও থাকতে হবে। যথাসময়ে রোগীর সেবায় হাজির হওয়ার জন্য এটি একটি খুবই সহজ ও যুক্তিযুক্ত পন্থা। অথচ যুগ যুগ ধরে এই সুযোগটি ব্যবহার করা থেকে প্যারামেডিকদেরকে বিরত রাখা হয়েছে ।

গবেষকগণ ল্যান্ডলর্ড, প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী এবং কন্ডো বোর্ডকে আহ্বান জানিয়ে বলেন তারা যেন তাদের ভবনে automated external defibrillators  রাখেন এবং স্টাফদের ট্রেনিং দিয়ে রাখেন কিভাবে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করতে হয়।

মন্তব্য