আবার ভূতের ভয় দেখা শুরু করেছে ইউরোপ  

EU

ফারুক ওয়াসিফ

আবার ভূত দেখা শুরু করেছে ইউরোপ। সেই ভূতের ভয়ে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে নিল। অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়, দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার ভয়ের চেয়েও ব্রিটেনের বেশির ভাগ ভোটারের মন জয় করেছিল এই ভয়। আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে সেই ভয় হানা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচলিত ছক উল্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে উড়ে এসে জুড়ে বসছেন, তাঁকেও সাহায্য করছে ওই ভয়। এই ভয়ের নাম অভিবাসীদের ‘আগ্রাসন’। ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’ এসে পড়ছে রাজনীতিতে। জীবন-জীবিকা নিয়ে সমস্যায় পড়া সাধারণ শ্রমিকশ্রেণির মানুষের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে ভোটারদের মন জয় করে নিচ্ছে ডানপন্থী দলগুলো। বাম দিকও যখন সমাধান দিতে পারছে না, তখন যে ধরনের মরিয়াপনার জন্ম হয়, ব্রিটেনের ব্রেক্সিট আর আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উদাহরণ।

ব্রিটেনে যা ব্রেক্সিটিয়ার, যুক্তরাষ্ট্রে তা ট্রাম্পের জোয়ার। গতকাল যা উদ্ভট মনে হচ্ছিল, আজ তা ঘটমান বর্তমান।

ইউরোপ, তথা পাশ্চাত্য সময়ে-সময়ে বিভিন্ন ভয়ের তাড়ায় ভুগেছে। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো শুরু হয়েছিল এই প্রসিদ্ধ বাক্য দিয়ে: ‘ইউরোপকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এক ভূতের ভয়-কমিউনিজমের ভূত। সাবেকি ইউরোপের সব শক্তি এই ভূত তাড়াতে ঢুকেছে এক পবিত্র জোটের মধ্যে।’ মার্ক্সের সময় শাসকদের ভয় ছিল কমিউনিজম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পুরোনো ইউরোপকে পেয়ে বসল ইহুদিদের ভয়। ইহুদিদের প্রতি ঘৃণাকে পুঁজি করে হিটলার জার্মানির ও বিশ্বের ভাগ্যবিধাতা হতে চাইলেন। বাদবাকি ইউরোপেও ইহুদিবিদ্বেষ চাঙা হয়েছিল। পরিণতি এক ভয়াবহ গণহত্যা ও হিংস্রতার ইতিহাস।

ইউরোপের আজকের ভয়ের নাম, চেহারা ও পরিচয় ভিন্ন। তার নাম অভিবাসী। মূলত মুসলিম অভিবাসীর ভয় ইউরোপের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্রেক্সিটিয়ারদের পক্ষের একটি বিলবোর্ড ভোটারদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। ওই বিলবোর্ডে দেখানো হয়, হাজারো আরব ও মুসলমান শরণার্থীর স্রোত ব্রিটেনের দিকে আসছে। এই ছবির ওপর বড় করে লেখা ছিল: ব্রেকিং পয়েন্ট। নিচে যা লেখা বাংলায় তার অর্থ: ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের উচিত সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়া। ব্রেক্সিটপন্থীরা ভোটারদের বুঝিয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকলে অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্রোত ঠেকানো যাবে না। ইউরোপীয় ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বায়নের চেতনার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল পরজাতিবিদ্বেষ। গ্রেট ব্রিটেন আর গ্রেট থাকতে পারল না।

অসম বিশ্বায়নের কুফল ফলতে শুরু করেছে। ফ্রান্স থেকে বেলজিয়াম, সুইডেন থেকে নরওয়ে; অভিবাসী ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের পারদ সব খানেই উঠছে। অনেকেরই বিশ্বাস, অভিবাসীদের কারণে মূল জাতির লোকেরা চাকরি পাচ্ছে না, মজুরিসীমা নিচে নেমে যাচ্ছে, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা নষ্ট হচ্ছে, সামাজিক সেবা খাতের টাকা তারাই নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন নিজ দেশেই তারা পরবাসী হয়ে পড়বে বলে প্রচারণা জারি আছে। একে সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যায় না। তা ছাড়া ইউরোপের হাজার বছরের ইতিহাসে অশ্বেতাঙ্গ-অখ্রিষ্টানদের সঙ্গে সহাবস্থানের নজির নেই। বারবারই ‘বহিরাগত’ তাড়িয়ে তারা বিশুদ্ধ জাতি গঠন করতে চেয়েছে। ব্রিটেনকেও পেয়েছে সেই ‘বিশুদ্ধতা’র বাতিক। ভেতর-বাইরের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো এই আবেগকে আরও জাগিয়ে দিয়েছে। ইউরোপে আবারও সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে মতাদর্শের রাজনীতির যুগ। কখনো তা ছিল কমিউনিজম, কখনো তা হয়েছে ফ্যাসিবাদ। বাম পথে সমাধান না হলে ডানের খাদ বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।

মতাদর্শিক ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দরকার হয় প্রত্যক্ষ শত্রুর। সেই ভূমিকায় ফেলা হচ্ছে অভিবাসী মুসলিমদের। ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্সসহ এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় দেশ নেই, যেখানে অভিবাসীবিরোধী ডানপন্থী দলগুলো শক্তিশালী হচ্ছে না। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে সুইডেনে মসজিদের মিনার তৈরি করার বিপক্ষে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং মিনারবিরোধীরা বিজয়ী হয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ। জার্মানির মতো উদার দেশকেও সামলাতে হচ্ছে নব্য-নাৎসিবাদী তান্ডব।

বিদ্বেষে চোখে সত্য আবছা হয়ে যায়। দুটি হত্যাকান্ড ঘটে। একটি ঘটে লন্ডনে, অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডোতে। খুনিরা একজন মুসলিম, অন্যজন খ্রিষ্টান। একজন আফগান-আমেরিকান, অন্যজন ব্রিটিশ। প্রথম দিকে বলা হচ্ছিল, অরল্যান্ডোর সমকামী ক্লাবে গুলিবর্ষণকারী ওমর মতিন আইএসপন্থী জঙ্গি, সমকামীদের প্রতি ধর্মীয় ঘৃণা থেকে তিনি এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো, ওমর মতিন নিজেও সমকামী ছিলেন এবং অন্য একজন সমকামীর দ্বারা এইডস ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তিনি সমকামী ক্লাবে গুলি করে ৪৯ জনকে হত্যা করেন। (সংবাদের লিংক: ((http://goo.gl/7IrG4g) অথচ ঘটনার পরপরই গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা গণমাধ্যমে মতিনকে মুসলিম জঙ্গি বলে প্রচার দেওয়া হলো। এমনই চাপ যে বারাক ওবামাকেও ট্রাম্পের সুরেই গলা মেলাতে হলো।

অথচ ব্রিটেনের প্রগতিশীল এমপি জো কক্স খুনের আসামি টমাস মায়েরকে সন্ত্রাসী না বলে বলা হতে থাকে মানসিক অসুস্থ। টমাস মায়ের বর্ণবাদী গোঁড়া ব্রিটিশ। জো কক্সকে গুলি করার সময়ে তিনি ‘ব্রিটেন ফার্স্ট’ বলে চিৎকার করেন। তাঁর বাড়িতে নাৎসিবাদী পতাকা ও বইপত্র পাওয়া গেছে। ২০১১ সালে নরওয়েতে সন্ত্রাসী হামলায় ৭৭ জনকে হত্যাকারী খ্রিষ্টান ফ্যাসিস্ট অ্যান্ডার্স ব্রেইভিককেও মানসিক অসুস্থ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলে। পরে অবশ্য তাঁর বিচার হয়।

দুনিয়াজুড়ে মন্দা ও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা, সন্ত্রাসবাদী ও আগ্রাসী যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় স্থানীয় সংখ্যাগুরুদের মধ্যে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব দানা বাঁধছে। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে একে উসকে দেওয়া চলছে। ব্রেক্সিট ও ট্রাম্প তাই শান্তির জন্য অশনিসংকেত। ভারত থেকে ব্রিটেন, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার; সবখানেই সংখ্যালঘুরা সমস্যায়। এসব সমস্যার প্রকৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধান আড়াল করে দুর্বলকেই শত্রু হিসেবে দেখানো রাজনৈতিক ধাপ্পা। যখন আসল নেই, তখন মানুষ ধাপ্পাতেই ভুলবে। এটাই হয়ে আসছে।

জাতিপরিচয়, ধর্মপরিচয় সব সময়ই রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল। একে ঘিরে ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ হয়েছে। বলকান রাষ্ট্রগুলোতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেশি অতীতের কথা নয়। আবারও তা বিপজ্জনক শত্রুতার বাস্তবতা সৃষ্টি করছে। একই সীমান্তের ভেতরে যুগের পর যুগ পাশাপাশি বসবাসকারী জাতি ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। পরিচয়ের রাজনীতি হয়ে উঠছে অশান্তি ও বিদ্বেষের জ্বালানি। এসবই বিশ্বায়ন ও নয়া-উদারতাবাদের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দাম যারা দিচ্ছে বেশি, তারা গরিব, শ্রমিক, অভিবাসী প্রিক্যারিয়েত ও সংখ্যালঘু। শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শ্রমিককে অভিবাসী মুসলিমের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া গেলে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কর্তাদের সুবিধা হয়। তাদেরই দরকার অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক সংকটগুলো থেকে দৃষ্টি সরাতে কৃত্রিম ভয়ের পরিস্থিতি ও কৃত্রিম শত্রুর নির্মাণ। এই গভীর রাজনীতি কতটা সফল হতে পারে, ব্রিটেন তা প্রমাণ করল। অচিরেই অন্যান্য দেশও করবে।

-সূত্র : প্রথম আলো

মন্তব্য