গুলশান ট্র্যাজিডি ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ

জাপানি সহায়তা নিয়ে একটি পর্যালোচনা

Mahbub Reza

ড. মাহবুব রেজা

ইদানিং সন্ত্রাসী ঘটনায় নিরীহ নিরাপরাধ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে তা নয়, এটি এখন প্রায় নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে বিশ্ব জুড়েই। কারণ না হয় নাই ই বিশ্লেষণ করলাম।
গুলশানের মর্মান্তিক ঘটনায় একসাথে এতগুলো জীবন! তাও আবার বিদেশী! ভাবতেও জানি কেমন লাগে। লজ্জা ও তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেও মনকে বুঝ মানানো যায় না।
ঢাকার গুলশানে অবস্থিত হোলি আরটিজান রেস্তোরার মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে (দেশে ও বিদেশে) এর কারণ, কারা জড়িত, পেছনে কার হাত ইত্যাদি নিয়ে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আমি আজ ঐসব বিষয়ে কিছুই লিখবো না তবে এই ঘটনা বাংলাদেশের উন্নয়নে কি প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব ফেলতে পারে বিশেষ করে জাপানিজ সহায়তার উপর, তারই একটা সাধারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো। কারণ, গুলশানের ঘটনায় ৭ জন জাপানি নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে।
আমরা জানি ১৯৭২ সাল থেকেই জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান সহ এ দেশটির উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তার হাত নিয়ে এগিয়ে আসে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর জাপান সফর করেন। ঐ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। ১৯৭৭ সালে জাপান এয়ারলাইন্স-এর একটি যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করে ঢাকায় অবতরণ করতে বাধ্য করে হাইজ্যাকাররা। ঐ সময় ম্যারাথন এবং কৌশলী নেগোশিয়েসনের মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাধানে পৌঁছে ঐ বিমানের ১৫৬ যাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় মুক্ত রতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ঐ ঘটনার মাধ্যমে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। এমন একটি কঠিন কাজে বাংলাদেশের দূরদর্শিতার প্রমান প্রতিটি জাপানি নাগরিকের মনে দাগ কেটেছিল। এরপর থেকেই জাপান সরকার এবং জাপানের জনগন বাংলাদেশের প্রতি আলাদা একটা মনোভাব পোষন করে আসছিলো। প্রথম থেকেই তারা গ্র্যান্ট-এইড, ও-ডি-এ ঋণ, কারিগরি সহায়তাসহ জে,ও,সি,ভি ভলন্টিয়ার দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে একজন প্রকৃত বন্ধুরমত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে আসছে। এরই ধাঁরাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে জাপান বাংলাদেশের একনম্বর সহায়তাদানকারী দেশ হিসেবে তার স্থান করে নেয়।

Abe - Hasina

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে

সাম্প্রতিক কালে বন্ধুপ্রতিম এই দুই দেশের প্রধানমন্ত্রিদের পারষ্পারিক দেশ ভ্রমন এই সহযোগিতার মাত্রায় আরো বেগ সঞ্চার করে। ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার স্বপ্ন দেখে আসছে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য একজন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পাশে এসে দাড়ায় জাপান। ঘোষণা দেয় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এর সহায়তার। ২০১৪ সালে ঘোষণা করে বিগ-বি ইনিশিয়েটিভ-এর। এটা জাপানিজ প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে-র ২০১৪ সালের একটা প্লান-যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গড়ে উঠবে অনেক শিল্প-কারখানা এবং সেখানে ব্যবহার হবে জাপানিজ এডভান্সড টেকনোলজি। এই প্লান এর আওতায় ঢাকা, চিটাগং এবং কক্সেস বাজারে গড়ে উঠবে নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া এবং সেখানের উৎপাদিত পণ্য ছড়িয়ে পড়বে বিভিন্ন রিজিওন এ।
জাপান এপর্যন্ত (২০১৪) বাংলাদেশকে ও-ডি-এ ঋণ হিসেবে দিয়েছে ৯৫০ কোটি মার্কিন ডলার, গ্র্যান্ট-এইড হিসেবে দিয়েছে ৪৭২ কোটি মার্কিন ডলার এবং কারিগরি সহযোগিতা হিসেবে দিয়েছে ৬১ কোটি মার্কিন ডলার।
ও-ই-সি-ডি-র ড্যাটা (২০১৩) থেকে জানা যায় যে ২০১৩ সালেও জাপান ছিল বাংলাদেশের এক নম্বর দাতা দেশ, ঐ বছরের ২.৬৭ বিলিয়ন ঋণ এর মধ্যে জাপানের শেয়ার ছিল ৩২% এবং আই-ডি-এ/বিশ্বব্যাংক-র শেয়ার ছিল ৩০%, কানাডার ছিল ৩.৬%।
২০১৫ সালের ড্যাটা থেকে জানা যায় যে বাংলাদেশে মোট ৯৮৫জন জাপানিজ নাগরিক বসবাস করে। বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালে জাপান ১,০৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার-এর পণ্য আমদানি করেছে। একই সালে জাপান থেকে বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ-এর পরিমান ছিল ৯৬.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপান মনে করে বাংলাদেশ একটি বড় কনজুমার মার্কেট এবং এর সস্তা শ্রম উৎপাদন ক্ষেত্র এনে দিতে পারে এক নতুন মাত্রা। তাই এই মার্কেটকে ধরার এবং তুলনামূলকভাবে সস্তায় পণ্য উৎপাদনের জন্য ২৪০টি জাপানিজ কোম্পানি এখন বাংলাদেশে তাদের অফিস খুলেছে।
এবারে আসছি ২০১৬ সালে জাপান এর আর্থিক সহায়তার দিক নিয়ে। এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ। ২০১৬ এর ২৯ জুন জাপান বাংলাদেশের সাথে তার ৩৭তম ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তিতে ঋণ-এর পরিমান হলো ১৬৪ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ দেয়া হবে ৬টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে।
যেমনঃ
1. Dhaka Mass Rapid Transit Development Project,
2. Matarbari Utra Super Critical Coal-fired Power Projject,
3. Cross-Border Network Development Project,
4. Energy Efficiency and Conservation Promotion Project,
5. Disaster Risk Management Enhancement Project and
6. Jamuna Railway Bridge Construction Project.
উপরের প্রত্যেকটা প্রকল্পের নাম থেকে অনুধাবন করা যায় যে এগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য কতটুকু জরুরী।
এছাড়াও জাপানি সহায়তায় বাংলাদেশে অগনিত চলমান প্রকল্প আছে। এর মধ্যে ঢাকা-চিটাগং রোডে ৩টি নুতন ব্রিজ উল্লেখযোগ্য। সেই প্রকল্পগুলোতে অনেক জাপানিজ কনসালটেন্ট কাজ করছিলো। গুলশান ট্র্যাজিডির পর এম,আর,টি সহ এই প্রকল্প গুলোর কাজ ভীষণভাবে ব্যাহত হবার আশংকা দেখা দিয়েছে।
এখন যদি আমরা গুলশানের ঘটনার সাথে আমাদের জাতীয় উন্নয়নের যোগসূত্র বের করার চেষ্টা করি তাহলে কি দাড়ায়?
জাইকা-র প্রেসিডেন্ট মিঃ কিতা-ওকা বলেছেন যে, আমরা যে কোন প্রতিকুল অবস্থাতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে পিছ পা হবনা। কিন্তু তবুও কথা থাকে – জাইকা কি রিস্ক নিয়ে তাদের কন্সালটেন্টদের বাংলাদেশে রাখবে? কিংবা আবারও আসার অনুমতি দিবে?
এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, জুলাই মাসের প্রথম দিকে জাইকার একটি প্রোজেক্টে কাজ করার জন্য টরন্টো থেকে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল আমারও। কিন্তু এপর্যন্ত দুবার আমার যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে। এখন আমার কোন সহকর্মীই বাংলাদেশে নাই। কবে আবার যাবার অনুমতি পাবো তাও অনিশ্চিত।
এখন দেখা যাক গুলশানের ঘটনা কিভাবে আমাদের উন্নয়নের অগ্রগতিতে নিগেটিভ প্রভাব ফেলবে -
১) কন্সালটেন্টরা না থাকার কারণে প্রত্যেকটা চলমান প্রকল্প স্থবির হয়ে যাবে – কিংবা এক সময় বন্ধই হয়ে যাবার সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। যদি বন্ধ নাও হয় তবে প্রকল্পের খরচ অনেক বেড়ে যাবে।
২) ৩৯তম ঋণ সহায়তার আওতায় প্রত্যেক প্রকল্প শুরু করতে বিলম্ব হবে। কিংবা ঋণ এর অপেক্ষামান চলমান প্রকল্পগুলো মাঝপথে এসে বসে থাকবে। আর অবশ্যই প্রকল্প খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এর কারণে হয়ত আবার ঋণ নিতে হবে।
৩) সব সময়ই কিছু না কিছু প্রকল্প পাইপ-লাইন এ থাকে যা গ্রহীতা দেশের কূটনীতির উপর নিরভর করে পরবর্তিতে ঋণ, কারিগরি সহায়তা বাঁ গ্র্যান্ট-এইড ক্যাটাগরিতে এনে বাস্তবায়ন করা হয়। গুলশানের ঘটনায় ঐসব প্রকল্পগুলিও পাইপলাইন থেকে বের হয়ে আসতে পারবেনা।
৪) জে,ও, সি, ভি- ভলান্টিয়ার বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এবং গ্রামীণ সমাজ উন্নয়ন এ স্বাধীনতার পর থেকেই এক অসাধারণ অবদান রেখে আসছিলো। তারা গ্রামের মানুষের সাথে মিশে কারিগরি সহায়তা দিয়ে অর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জে ও সি ভি ভলান্টিয়ারদের সমতুল্য আর কেউ নেই। তাদের অনুপস্থিতি বাংলাদেশ বিশেষ করে গ্রামের অর্থনীতি ভীষণ ভাবে ক্ষতিগস্ত হবে।
জাপান বাংলাদেশের জন্য একটা বড় মার্কেট হতে পারে – বিশেষ করে গার্মেন্টস সামগ্রির জন্য। ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বাজার এখন চীন একচেটিয়াভাবে ধরে রেখেছে। সেখানে বাংলাদেশকে জায়গা করে নিতে হলে পণ্যসামগ্রির মান এবং কমিটমেন্ট-এর উন্নতি করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই সরকার জাপানের জন্য আলাদা ইকনোমিক জোন তৈরি করার পদক্ষেপ নিয়েছিলো। যদি সেটা সময়মত বাস্তবায়িত হয় তাহলে জাপান থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এর পরিমান কয়েকগুণ বেড়ে যাবে এবং জাপানিজ মার্কেটে বাংলাদেশের পণ্য ঢোকার পথ সুগম হবে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কে আসবে জীবন বাজি রেখে বিনিয়োগ করতে?
গুলশান এর ঘটনাতে আমরা কি হারাতে যাচ্ছি বাঁ হারালাম? জাপানকে একটি উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাবার জন্য বঙ্গবন্ধু একটা ক্ষেত্র তৈরি করে গিয়েছিলেন…তারই ধাঁরাবাহিকতায় তার সুযোগ্য কন্যা ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকবার জাপান গিয়ে সেই ক্ষেত্রকে আরও অটুট করেছেন – বাংলাদেশ এগিয়ে চলছিল তার নিজ গতিতে যাতে করে ২০২১ সালের মধ্যেই একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিতে পারে। শত্রুরা কি বুঝতে পেরেছিল যে বাংলাদেশের উন্নতিকে ব্যাহত করতে হলে এটাই ছিল মোক্ষম সময় এবং সঠিক পদ্ধতি?
না এটাকে মেনে নেওয়া যায়না। আমাদেরকে ঘুরে দারাতে হবেই। এ ব্যাপারে কূটনীতিকে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ব্যাবহার করতে হবে। ব্যাক্তিগতভাবেও আমাদেরকে কাজ করতে হবে… আমাদের জাপানিজ বন্ধুদেরকে বুঝাতে হবে যে, যা ঘটেছে তা প্রকৃত বাঙ্গলাদেশীরা ঘটাতে পারেনা- এরা বিদেশিদের ব্রেইনওয়াশ করা পুতুল, এরা ইসলামের কেউ নয়…বাংলাদেশ সরকার তোমাদের সিকিউরিটি দিতে বদ্ধ-পরিকর। এরই মধ্যে সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে, আরও নিচ্ছে। তোমরা আমাদের সহযোগী হিসেবে যেভাবে ছিলে সেভাবেই থাকো।
ড. মাহবুব রেজা
টরন্টো
লেখক পরিচিতিঃ উচ্চতর পরাশুনা ও চাকরীর সুবাদে ১৯৮২ সাল থেকেই জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ড. মাহবুব রেজা। জাইকা, বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়া ব্যাংক এর কন্সালটেন্ট হিসেবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই কাজ করে আসছেন লেখক। তার কাজ করার ক্ষেত্রগুলো প্রধানত পানি সম্পদ উন্নয়ন, এনভাইরনমেন্ট এবং কমুউনিটি-বেইজড্ দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা (বিশেষ করে ভূমিকম্প দুর্যোগ)। তিনি এখনও একটি জাপানিজ কোম্পানির সাথেই জড়িত এবং বাংলাদেশে তার একটি চলমান প্রকল্পও আছে। বাংলাদেশী কানাডিয়ান এই কনসালটেন্ট বর্তমানে টরন্টোতে অবস্থান করছেন।

মন্তব্য