রহস্যে ঘেরা

Farida Rahman
ফরিদা রহমান

(এমন একটা মা দেনা, যে মায়ের সন্তানেরা কান্দে আবার হাসতে জানে।) পপশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ মঞ্চে ও টিভি পর্দায় এ গানটি করে থাকে।
পাশ্চাত্যের শিল্পীদের ইমেজে আমাদের দেশের আধুনিক শিল্পীরাও সঙ্গীতের সঙ্গে শরীর ও কন্ঠের ভঙ্গীমায় সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকে। তাতে শ্রোতা দর্শকের আবেগ ও আকর্ষণ বড় হয়ে দেখা দেয় গানের গভীরতার চেয়ে শিল্পীর সৌন্দর্য ও স্মার্টনেসের প্রতি। জনপ্রিয় ওই সঙ্গীতের প্রথম বাক্যেই সংযোজিত তিনটা শব্দ: মা, সন্তান ও কান্দে-হাসে গুরুত্ববহ। সন্তানের মা হলেই হবেনা, হতে হবে বা দিতে হবে এক উপযুক্ত সন্তান। সন্তানেরা শুধু কাঁদবে না- তারা হাসতে পারবে এমন এক সুন্দর দর্শন নীহিত গানের সুরে। গানতো শুধু গান নয়- তার অর্থবোধক সূচনা জীবনের সঙ্গে গ্রথিত।
সঙ্গীত বিশ্লেষণ এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। ‘মা’ ও ‘সন্তান’ শব্দের সঙ্গে দয়া-মায়া-মমতা, স্নেহ- বাৎসল্য আর আবেগে ভরপুর। এই মা-কে নিয়ে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক তো বটেই- দার্শনিক, বিজ্ঞানীর আবেদনও কম নয় (আমাকে ভালো মা দাও, আমি তোমাদের ভালো জাতি দেবো) বিশ্ব সৃষ্টির নানা অধ্যায়। বলা হয় মাতৃত্বে নারীর নারীত্ব ও সম্পূর্ণতা। মা ও শিশুর অমিয় ধারায় সম্পৃক্ত মধুর ও সুন্দর চিত্র ফরাসি চিত্রকরের ক্যানভাসে আঁকা ছবি বিশ্ব নন্দিত।এই একান্ত সম্পর্কের ছেদ পড়েনা যদি কোন আকস্মিক ঘটনা বা দুর্ঘটনা না ঘটে। অনাদিকাল থেকে যে যাত্রা শুরু আর তার বাঁধন অনাদিকালের গর্ভে।
পরিবর্তনের ঝাপটায় বিশ্ব কেবলই নবরূপে ধরা দেয়। এই প্রযুক্তির যুগে মানুষ ভাবতে চায়না জীবনের সমস্যাকে। এ কথাও ভুলে যায়- জন্মলাভের প্রতিশ্রুতি হ’ল সমস্যা। এক মেয়ে, মহিলা, নারী তারপর মা নামের স্বীকৃতি।এই পথপরিক্রমায় প্রথমে ‘মানুষ’ নামে পরিচিতি পেতে কেটে গেলো যুগ, শতাব্দী,কাল। এখন এই বাংলায়ও ‘মাদারস ডে’ বা ‘মা দিবস’ পালিত হয় সানন্দে।
মাকে নিয়ে জন্মভুমি, মাতৃভূমির কতোনা বিজয়গাঁথা সবদেশে, সবকালে। বিষয়টা মা ও সন্তান সংক্রান্ত।এক এক মাকে ধারন করতে হয়, জন্ম দিতে হয় ডজন ডজন সন্তান। তাতে কত অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। প্রায় মাকে সে দুর্ভোগ ও বিপর্যয় ভোগ করতে হচ্ছে, তাতে অতীত চলে আসে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে। কবি গোলাম মোস্তফার কাব্যময় পঙতিতে “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে”। উল্টো টা যদি হয় “শিশুর মাতা” তাহলে কি খুব অন্যায় হবে? বাবা বা পিতার চেয়ে মা’র অবদান আনন্দের চেয়ে কষ্টে জড়িত। সেই মাকে কতনা অবমাননাকর পরিস্থিতিকে মুখ বুজে মেনে নিতে হয়। সন্তানের সার্থকতায় তাঁকে যতনা মূল্যায়ন করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশী নির্যাতিত হতে হয় সন্তানের ব্যর্থতায়। মা বিশ্বজনীন, সংজ্ঞার অভাব নেই। এজন্য অবশ্য বিশেষ কোন অভিধান রচিত হয়নি। কতো প্রবাদ আছে সমাজে এই, “যেমন বাবা তেমন ছেলে”, “কোন বংশের দেখতে হবে না”?
শিশুর কোন লিঙ্গ ভেদ নাই। তাকে উপযুক্ত মানুষ করে গড়ে তোলা এবং যোগ্যতার ভূমিকায় অধিষ্ঠিত করা অভিবাবকের পরিকল্পনা ও পরচালনার ওপর বর্তায়। তাতে ছেলে মেয়ে বিভাজন করা হলে নয়, করা হয় যার জন্য একসময় মেয়েরা পথ চলায় পিছিয়ে ছিল পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায়। নাহ নারী পুরুষের তর্কে যেতে চাই না- ওতে মূল প্রসঙ্গের জটিলতা বাড়ায় মাত্র।
আমার এই লেখনি সনাতন তর্ক বিতর্কের ঊর্ধে। বিংশ শতাব্দী ছিল সমাজ ধর্মের কুসংস্কার ও কূপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। শিল্পে সাহিত্যে ছিল জাতীয় (বাঙ্গালী) সৃষ্টি কৃষ্টির ঐতিহ্যকে ধারন করে এক বিপ্লব সাধন। বিশেষ করে পাকিস্থানী রাহু মুক্তির রক্তক্ষয়ী একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম সার্থকতায় বাঙালীর মানস চেতনার অভ্যুদয় ঘটে একাত্মতায়। তারপরও পরিবারতন্ত্রের আনাচে কানাচের ঘেরাটোপে অবক্ষয়। সমাজ বিধির আড়ালে এই প্রযুক্তির যুগে এক বিধবা নারীর অবস্থান কেমন? স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে হয় একার। তার যদি বেশ কয়েকজন শিশু সন্তান থাকে-তাদের খাওয়া পড়া চালানোর ভার তার উপর, অথচ কোন চাকুরী করে না সে – না কোন ব্যবসা-বাণিজ্য। তখন তার সাংসারিক অবস্থা কি দাঁড়ায়? হিম শিম খেতে খেতে এক সময় ছেলে মেয়ে বড় হল-হয়তো স্বনির্ভর হল ছেলেরা, মেয়েরা ঐ সমস্ত সংসারে শিক্ষালাভে বঞ্চিত হয় প্রায়ই। তাদের বিয়ে দেয়া হয় বা দিতে বাধ্য হয় – মার দায়িত্বে সব কাজ সম্পাদন করতে হয় বলা যায়।

motherসম্প্রতি কন্যাদায়গ্রস্থ বিধবা মা-এক দুর্বল মা এবং তার অসহায় সন্তানকে দেখলে ঐ পপগানের কথা মনে পড়বে – প্রথমে, মা কি পারবে তার সন্তানের কান্না দূর করে হাসি ফুটাতে, নাকি সে নিজে হাসতে পারবে? পারে না, কারন তার আপন আত্মীয় স্বজন বাধ সাধে বিয়ে সাদির ব্যাপারে। তা্রা সহযোগিতার চেয়ে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দুর্বল মাকে দায়িত্ব দিতে হয় মেয়ে বড় হলে তার বিয়ের পাত্র যোগাড় করে দেয়ার ভার বড় ভাই বোনদের ওপর। এই সময় মা কে নিয়ে কবির গুরুর গানের পঙক্তি মনে পড়ার কথা,-“মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি”-কিন্তু কে জলে ভাসে? সে কে?-তারা কি নিজেকে প্রশ্ন করে-‘আমি কে?’ সমাজে কি তার অবস্থান, পরিচিতি। এ সমস্ত অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম, ত্যাগ ও তিতিক্ষার দরকার- সেক্ষেত্রে তার বা তাদের, আছে কোন অবদান? যে অর্জনে বা কালচারে তাদের মধ্যে মানবিক ও মানবতার চেতনাবোধ জমাতে পারে। সংসারে নারীর ভূমিকা আত্মকেন্দ্রিক সম্বলিত হলে-যেটা নারীপুরুষ উভয়েই হয়ে থাকে তবে পুরুষের পরিচয় বাইরের জগতের সঙ্গে বেশি সে জন্য তারা অনেকটা মুক্ত হতে বাধ্য। নারীদের ক্ষেত্রে তখনই মুক্ত মনের আশা করা যায় তারা যদি স্বাবলম্বী হয়ে- স্বাধীনমত চলার শক্তি অর্জন করতে পারে।তার স্যাক্রিফাইস? বা ত্যাগ?
খুব সহজ কথায় বলা হয় কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয় বা কষ্ট করতে হয়। সংগ্রাম করতে হয়। এমন দেখা যায় সাংসারিক পরিবেষ্টনে খুব আপনজনের কোন কথায়, ব্যবহারে কষ্ট পেতে হল। এমনও হয় যে দিকটা কল্পনা করেনি-সেখান থেকে আঘাত পেল বা ঘটে গেল কোন সমাজ বিগর্হিত ঘটনা। অর্থাৎ মৃত্যু, অপমৃত্যু বা অপঘাতে মৃত্যু ছাড়াও মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে বা হয়ে থাকে। তাতে করে নারী-পুরুষ যেই হোক না কেন তার ভেতরে অভিঘাতের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যে সমস্ত ব্যক্তি শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত, চর্চা ও করে অর্থাৎ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কবি গুরুর একটা কথা ‘know thy self’-‘নিজেকে জানো’, বিশ্ব কে জান (ভুমাই সুখ, নাল্পে শুখমস্তি) অল্পে সুখ নেই’।
বিধবা মা, মেয়ে নারী তার চারপাশেও তাদেরই সংখ্যা বেশি। জীবনের জন্য পরিবার অপরিহার্জ-মানুষ মানুষের সান্নিধ্যে দিন কাটায়। বড় ভাই-বোনের ভাবতে হবে তাদের বিধবা মায়ের মেয়ে ছোট বোনটা যেন সময় মতো স্বামীর সংসার-সন্তান নিয়ে বসবাস করতে পারে। বিধবা মার কষ্ট দূর করতে যেমন সহযোগিতার প্রয়োজন-তেমনি ভাবতে হবে বোনের মঙ্গল কামনায় কিছুটা ছাড় দিতে হয় বিয়ে-সাদির ব্যাপারে তা ভাইবোন বা ছেলে মেয়ের ক্ষেত্রেও। অনেক ক্ষেত্রে বিধবা মার মতামতের গুরুত্ব দেয়া হয় না। পাত্রপক্ষরা বিধবা মা ও মেয়েকে অনুকম্পার দৃষ্টিতে দেখে। তাদের প্রতি কোন মমত্ব বা মহত্বের উদারতা তো পরের কথা। ওদের চাহিদার পরিমান দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই যেমন প্রথমে বলে লম্বা, সুন্দর মেয়ে হতে হবে-তাকে দেখাও হল। তারপর প্রশ্ন অনার্স পড়ল না কেন? কম্পিউটার জানে তো? ঢাকায় স্থায়ী বাড়ী ঘর আছে তো? নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে কেটে পড়ে। তাহলে কি করে তাদের কাছ থেকে মানবতার আশা করা যায়?
অন্যএকটা দিক আজকের যুগে যেন আরও প্রকট হয়ে সামনে উপস্থিত হয়। যৌতুক লেনদেন, যার জন্য শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজন, স্বামীরও হাতে গৃহবধূকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হতে হয়। একজন বিধবাও রেহাই পায়না। যৌতুক না দিলে তার মেয়েও মানুষ নামের নরপিশাচদের হাতে বলিদান দিতে হয়। পাত্রপক্ষরা সামাজিক ও পারিবারিক, অর্থনৈতিক বিষয় অবগত থাকা সত্ত্বেও চাহিদাকে সংযত করার ধার ধারে না। অনাদায় নৃশংসতায় মেতে ওঠে আইন বিধি অমান্য করে।
প্রশ্ন আসতে পারে একজন শিক্ষিতা মেয়ে কেন স্বাবলম্বী হয়েও নিজের পছন্দমত কাউকে জীবন সঙ্গী করে নিতে পারেনা বা নেয় না কেন? ওতে ও বাধা আছে –ভয়ানক অপরাধ হয় ওতে। ছেলেদের যদি মন দেয়ানেয়া হয়-যেটা প্রকৃতি গত উভয়ের জন্য এমনকি বিয়ে করে ফেললেও মেনে নেয়া হয়।পুত্রধন কিনা। এদিকে আত্মীয় স্বজন অনেকে গর্ব করে, ‘আমাদের ফ্যামিলি তে কেউ প্রেম-প্রীতি করে না’। এই ঠুনকো অভিব্যক্তি শিক্ষিতদের মুখ থেকেও প্রকাশ পায়। যেখানে অনগ্রসর মন মানসিকতায় তরুন তরুণী ভুগে এবং বয়স বেড়ে যায়। এর ফলে বিধবা মা তার তিরিশ বছরের যুবতী মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়ে। এখানে অবশ্য উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের শ্রেনীভেদ নেই। তবে মধ্য বিত্তের সমস্যা প্রগাড়। তবুও তারা বাস্তব কে মেনে নিতে পারে না।
সমাজ বদলানোর তোরজোড় হলেও কতোগুলো অবক্ষয় সমাজে বিরাজমান। সংস্কারের চেষ্টা হয়- তারপর ও কুসংস্কার ও কুপমন্ডকতার অজ্ঞতা দূর হয় না বরঞ্চ আঁকড়ে থাকতে পছন্দ করে। সময় মতো মেয়ে বিয়ে না হলে মাকে নিগ্রহ ভোগ করতে হয়, পরোক্ষ হলেও আর অন্যদের কাছে তারা উভয় হয়ে ওঠে গলগ্রহ। দেখা যায় আত্মীয় (কাজিন) স্বজনদের সংসারে বিধবা মার মেয়েকে বেবিসিটিং করতে হয়। দিন মাস অতিক্রম হয়- এটা ঠিক নয়, ওটা ভাল নয় বলে যোগ্য পাত্র কে বিদায় করা হয় নিজের কোন অযোগ্য ভাই, আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার মতলবে। এমন সব প্রহ্সন চলে। এছাড়া সুন্দরী, যুবতী বোন কে ‘দ্বিতীয় গিন্নী’ বলে ঠাট্টা করে দুলাভাইয়ের ঘাপটি মেরে থাকা আসক্তি প্রশ্রয় পায়।মানে হল নীরবে,বিয়ের কন্যাকে ইউসড হতে হয় অন্যের দ্বারা। ঘটে যা সমাজ ধর্ম বিগর্হিত অনেক ঘটনা- আর তার ফল ভোগ করতে হয় অসহায় মা ও মেয়েকে। বলা যায় সব দিক থেকেই আক্রান্ত হতে হয় উভয়কে। মায়ের বিরম্বনা বেড়ে যায় দিন দিন বিবাহযোগ্যা মেয়ে কে নিয়ে।
বহির্বিশ্বের অনেকদিক আলোচিত হয় মিনি পর্দায়- প্রতিদিন টক শো দেশের নানা দিক নিয়ে। নিভৃতে ঘটে যাওয়া ঘ্টনা বা সমস্যাগুলকে নিজেদের বিবেক দিয়ে বিচার করতে হয় এবং সমাধানের দায়ীত্ব নিতে হয়।অন্তত পরিবারের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করার মানষিকতায় তরুন তরুনিকে এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এগিয়ে আসার পরিকল্পনায় হতে হবে একাত্ম। না হলে দূর্বল মা কিছুতেই তার সন্তানকে কান্না হাসিতে স্বাবলম্বী করতে পারবে না। দুখী মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে সন্তান কেই এগিয়ে আসতে হবে, নিঃস্বার্থ কর্তব্যবোধে। জীবনের রহস্য জীবন দিয়ে উন্মুক্ত করতে হয়। মায়ের সন্তানরা কেন কেবল কাঁদবে?তারা কেন হাসবে না?
লেখিকা ও কথাশিল্পী- ফরিদা রহমান, টরন্টো প্রবাসী।

 

মন্তব্য