ললিতার গল্প

Monsur

পিংক কালারের আই ফোন সিক্সের এলার্ম ক্লকে পরপর চারটা রিং বাজতেই কম্বলের ভিতর থেকে খুব কষ্ট করে  হাতটা বের করে এলার্মটা পজে দিয়ে আবার শুয়ে  থাকল দশ মিনিট ললিতা। তারপর বিছানা থেকে উঠে কিচেনে কফির পানি গরম করতে দিয়ে ওয়াশরূমে ঢুকল। সারা দিনের জন্যে নিজেকে সাজিয়ে গুজিয়ে পরিপাটি করতে প্রায় আধা ঘন্টা লাগে যায় ললিতার ওয়াশরূমে। তারপর

পরিপাটি হয়ে নাস্তার টেবিলে বসে। এক কাপ কফি আর একটা স্ক্রেম্বেল এগ আর দুটো ব্রাউন টোস্ট দিয়ে নাস্তা সারতে সারতে আটটা বেজে যায়। নাস্তা করতে করতেই  সিপি টোয়ান্টি ফোরের নিউজ দেখা হয়ে যায়। শীতের দিনে ওয়েদার ফোরকাস্টাই সবচেয়ে ইমপর্টেন্ট নিউজ। ললিতার ডাউন টাউনের তিরিশ তলা এপার্টমেন্টের পেন্থাউজের ডাইনিং টেবিল থেকেই দেখা যাচ্ছে এবছরের নতুন লাল রংয়ের স্ট্রিট কারগুলো। ধবল তুষার ঠেলে ঠেলে আসছে। স্নো ক্লিনিং ট্রাকগুলো রাস্তায় নেমেছে সেই কাকভোর থেকেই। প্রকৃতি এবং প্রযুক্তির  যেন যুদ্ব চলছে। এক দিকে আকাশ থেকে ঝরছে পেজো তুলার মতন তুষার আর স্নোপ্ল­াও ট্রাকগুলো তা পরিস্কার করেই চলছে। গত রাতে প্রায় সারাক্ষণই  দমকা হাওয়ার সাথে ছিল তুষারনৃত্য। ২০ সেন্টিমিটার তুষার ঠেল – ঠেলে ঘড়ির কাটায়  -কাটায় ছুটছে শহর।

আজ বিশ মিনিটের পথ যেতে লাগল পুরো পয়ত্রিশ মিনিট। ২০ সেন্টিমিটার তুষার ঠেলে ঠেলে যেতে যেতে সময় নিল প্রায় ডাবল। ললিতা আজ আগেই বের হয়েছিল যাতে কাজে সময় মত পৌঁছানো যায়। আজ অবশ্য ওয়েদার খারাপ। দেরি হয়ে যেতে পারে এটা সবাই জানে। অন্যদিন  দেরি করে কাজে গেলে তার বস  এলেন গোমেজ  মুখ খুলে কিছু বলেনা কিন্তু তবে একটা  লংফেইস করে আড়চোখে তাকায়। সেটা  আরো বিরক্তকর। ললিতা কাজের যায়গায় খুবই পাংঞ্চুয়াল। ঘড়ির কাটায় কাটায় সারে নয়টায় পৌঁছে যায় প্রতিদিন।

আজ ঝড় তুষারের দিনে খুব একটা ভীড় হবেনা। ললিতা চাকুরি করে আমেরিকান একটা চেইন রেস্টোরেন্টের হোস্ট হিসেবে। সারাদিন নানা ধরনের লোকজনের সাথে ভালই কেটে যায় সময়। বিভিন্ন ধরনের কাস্টমার এবং অনেক  বিজনেস এক্সিকিউটিভরা এসে লাঞ্চ করে এই রেস্তোরায়। সার্ভারা তাকে মাঝে মাঝে হার্ড

টাইম দেয়। অভিযোগ থাকে তারা ভাল ভাল কাস্টোমার পায় না। তাদের কাজের সেকসন ভাল না তাতে ভাল টিপস পায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম ছোঠাখাট কিছু সমস্যা ছাড়া সবমিলিয়ে তার কাজের পরিবেশ ভালই বলা চলে। সবাই ফ্রেন্ডলি হেলপফুল কেয়ারিং আর আওয়ার নিয়েও কোন ঝুট ঝামেলা নেই। সুপারভাইজার এলেন গোমেজও খুব একটা বসিং বা বদার করেনা।

রব আসে সপ্তাহে প্রায় তিন চারদিনই লাঞ্চে।  তার নির্দিষ্ট একটা টেবিলে বসে। তাকে সারর্ভাররা খুব পছন্দ করে। খুব গল্পবাজ মানুষ সে। মজার মজার গল্প আছে তার ঝুলিতে। ললিতার সাথে খুব গল্প করে। চকুরি করে সিবিসি’তে। প্রগ্রাম প্রডিওসার। নানা ধরনের অভিজ্ঞতায় ভরা তার এই পয়ত্রিশ বছরের জীবন। ইন্ডিয়ায় থেকেছে প্রায় এক বছর রায়ারসন ইউনিভারসিটি থেকে পাশ করার পর পর। খুব ভাল লেগেছে তার ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ান কালচার ফুড দেশ খুবপ্রিয় তার। সে কারনেই ভারত উপমহাদেশের লোকদের প্রতি তার আলাদা একটা আর্কষন  আছে। আর ললিতার প্রতি একটু বাড়তি আর্কষন আছে রবের সেটা এখানে সবাই জেনে গেছে। ললিতাকে গত মাসে কয়েক বার বাইরে  ডিনারে নিয়ে যেতে আমন্ত্রন জানিয়েছিল রব। ললিতা তার সাথে বাইরে ডিনারে যেতে রাজি হয়নি। কিন্তু রবকে তার খুব ভাল লাগে। সুদর্শন র্স্মাট  প্রতিষ্ঠিত ভদ্র অমায়িক সব মিলিয়ে  চমৎকার ছেলে রব। আজ রব এই ওয়েদারে ঝড় বরফ ভেংগে লাঞ্চে করতে আসেনি। আজ ললিতা এক ঘন্টা আগেই কাজ শেষ করে স্ট্রিট কার ধরে বাসায় ফিরল। বাসায়  ফিরতে ফিরতে সন্ধা পাচটা। বাইরে তখন আবারো অন্ধকার নেমে গেছে। এদেশে শীতের দিনে সুর্য কয়েক ঘন্টা দেখা করে চলে যায়। ললিতা বাসায় এসে  ছোট্ট একটা  স্নেক্স খেয়ে নেয়। সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে নেয় এক ঘন্টা নেপ নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে  বড় এক মগ কফি নিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে  টিভির  রিমোট নিয়ে বসল। একটু পরে ফোন আসে ডেলেনের । ঝন ঝনে গলায় ওপার থেকে ডেলেনের কন্ঠস্বর ভেসে আসে- হেই বাডি  হোয়াটস আপ। তোর ফোনটোন নাই কদিন, কি ব্যপার দোস্ত ? নাকি খুব বিজি? ডেলেন কথা বলতে শুরু করলে আর থামতেই চায় না একটার পর একটা গল্প চলতে থাকে তার। ললিতা জোড় করেই থামায় ওকে। বলে, তোরতো দম টম একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে  দোস্ত। এবার একটা ব্রেক নে আর সেই ফাকে আমি কিছু বলি ।

ডেলেন তার কলেজ বন্ধু । ঢাকাতে কলেজে পড়ার সময় তার সাথে তেমন খুব একটা খাতির ছিল না ললিতার । তারা একই গ্রুপে হেংআউট করত তবে খুব একটা ক্লোজ ছিল না ওর সাথে। এখানে টরন্টোতে আসার পর তাদের সর্ম্পকটা খুব গভীর হয়েছে। ললিতার খুব ভাল বন্ধু সে। প্রবাসের এই নিঃসংগ জীবনের আনেক সুখদুখ শেয়ার করে দুজনে। প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় দুজনের। তিন চার সপ্তাহ পর পর কফি শপে বসে আড্ডা মারে মাঝে মধ্যে। ললিতা কারি চিকেন ডাল ভাত করে নিমন্ত্রন করে খাওয়ায় ডেলেনকে। ডেলেনের কাছে দেশের বন্ধু বান্ধবদের লেটেস্ট খবর পাওয়া যায়। ও খুব কানেক্টেট। ডেলেন একটা আমেরিকান ইন্সোরেন্স কম্পানিতে ভাল একটা চাকুরি করে।

এই শোন আজ রাতে আমরা ডিনারে যাব ইটালিয়ান রেস্টোরেন্টে, ডেলেন বলে।

এবার আবার কারে ফাসালি দোস্ত? ললিতা আই ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্পিকারে দিয়ে বলে।

ধোৎ তোর যে কথা ! আমি ফাসাতে যাব কোন দুঃখে। মেয়েরাইতো আমার পিছু ছাড়েনা। এই ছেমড়ি জুলিয়া আমার পিছু লেগেছে মাস খানিক ধরে একদম কাঠালের আঠা বুঝলি! ছাড়তেই চায়না কত চেষ্টা করলাম। কোন কাজ হলো না দোস্ত । কেন ওর কথাই তোকে বলেছিলাম না কয়েক সপ্তাহ আগে। এত করে না না বললাম  কিন্তু কে শোনে কথা পিছ ছাড়েনা। তাই একবার হাত ধরাধরি করে কেন্ডেল লাইট ডিনারে যাওয়া আরকি! বুজলি দোস্ত।

ললিতা মনে মনে বলে তুমি  ছাড়াতে  চেয়েছ ! ভালই বলেছ। তুমি যে কি চিজ সেটাতো আমি ভাল করেই জানি।

ললিতা বলে তুই ভালই আছিস। দেশেও ছিলি মজায় গার্লফ্রন্ডদের নিয়ে আর এখানেতো মজাই মজা। কয়েক মাস পর পর গার্লফ্রেন্ড বদলাস।

দোস্ত তুমি হইলা গিয়া একটা বেকডেটেড মাইয়া। কানাডায় এসেও তুই আগের মতন রয়ে গেলি। তুইতো জানিস আমি কিন্তু আবার  খুব এডভাঞ্চার পছন্দ করি রোমান্স দোস্ত রোমান্স। লাইফ ইজ সর্ট। লেটস ইনজয় ইট থ্রো এন্ড থ্রো।

তোর জীবন তোর যেটা ভাল মনে করবি সেটাই করবি। এখানেতো আমাদের ভাল মন্দ দেখার কেউ নেই, ললিতা বলে টিভির চ্যানেল বদলাতে বদলাতে। শোন পরে আবার কথা হবে আমার কিছু কাজ করতে হবে এখন এই বলে ফোন রেখে দেয় ললিতা।

ললিতার প্রিয় ডিসকভারি চেনেলে ইজিপ্টিসিয়ান কালচার এবং মমিদের ইতিহাস নিয়ে দারুন একটা ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছে সেটার দিকে মনোযোগ দিল ললিতা ফোন রেখে। ইতিহাসের পুরানো দিনে  ফিরে যেতে খুব ভাল লাগে ললিতার।  ইচ্ছে করে জানতে কেমন ছিল রাজা রানীদের জীবন হাজার হাজার বছর আগে। কেমন ছিল তাদের গড়া সমাজ শহর নগর জনপদ। হাজার বছরের পুরানো দেওয়ালে কান পেতে শুনতে ইছে করে কি ছিল তাদের ইতিহাস। সম্রাজ্য জয়ের আনন্দে কিভাবে উৎসবে মেতে উঠত তাদের রূপসী নগরী।

হ্যলো মা কি খবর কেমন আছ তোমরা? বাবা কেমন ? শরীর কেমন আছে বাবার? বাবার টেস্টের রিপোরটগুলো হাতে পেয়েছ? ললিতা একটানে কথাগুলো বলে যায় আইফোনে তার মা’র সাথে। কথা বলতে বলতে প্রায় একঘন্টা চলে যায় তখন চোখ পরে দেওয়ালে টানানো ঘড়িটার দিকে। রাত এগারটা বাজে এখন। ললিতা  মাকে বলে আজ রাখি মা, রাত হয়ে গেছে। আমার ঘুমতে যেতে হবে, কাল আবার কথা হবে। টিভিতে কালকের ওয়েদারটা দেখে  রাত এগারটার  নিউজ দেখে ঘুমাতে যায়  ললিতা। ললিতা ইমিগ্রেন্ট হয়ে এদেশে এসেছে তিন বছর হল। দেশে একটা প্রাইভট কম্পানিতে চাকুরী করেছে চার বছর। ভাল বেতন বোনাস সুযোগ সুবিধা ছিল। ভাল ভবিষ্যত ছিল। তারপরেও যখন কানাডা আসার সুযোগটা পেয়ে গেল তখন আর সেটা হাতছাড়া করতে চায়নি। পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দেশ, সুযোগ সুবিধা, ভবিষ্যত কানাডিয়ান পাসপোর্ট। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্মস্থান হবে পৃথিবীর একটা অন্যতম দেশে। এই সব ভেবে চিন্তে বাবা মা ভাই বোন ছেড়ে একা এদেশে চলে আসা। একা একা থাকা নিজ হাতে ঘরে বাইরের সব কাজ কর্ম করা সব মিলিয়ে এক কঠিন প্রবাস জীবন। মাঝে মাঝে ভীষন একাকি দুখী  নিঃসংগ মনে হয়। ডিসেম্বরে এই  উত্তর আমেরিকার পৃথিবীতে নামে  পেজো তুলার মতন তুমুল বরফ ঝড় আর কখনো থাকে সেইসাথে দমকা হাওয়া। আর বরফ ভেজা সন্ধ্যায় ললিতা চলে যায়তার জন্মশহর  ঢাকায় আজিমপুরে। ললিতার মনের ভিতর চলে  প্রচন্ড দহন পোড়ন আর তার দুচোখে নামে বর্ষার বাধনহীন স্রোত।

মাঝে মাঝে এই নিঃসঙ্গ স্পন্দনহীন প্রবাস জীবনের ইতি টেনে মা বাবার কোলে ফিরে যেতে  মন চায়। ফিরে যেতে খুব ইচ্ছে করে ভাই বোনদের ভালবাসাসিক্ত আড্ডায়। বাবার আদুরে ঢাক লিলু লিলু শুনতে। মার শাসনে বাধা সন্ধ্যায় অনুযোগী কন্ঠে বন্ধু বান্ধবদের আনন্দ কোলাহলপুর্ন

কোন এক সন্ধায়। মা’র হাতের মজার মজার রান্না এখন খুব মিস করে ললিতা। এখানে নিজের হাতের একই রান্না খেতে খেতে বোর হয়ে যায় জীবন। শরীরটা এইদেশে থাকলেও মনটা পরে থাকে

জন্মভুমিতে। রবের সাথে ললিতার সম্পর্ক দুই বছর হতে চলল। এখন প্রতি ওইকন্ডে ললিতা রবের এপার্টমেন্টে এসে থাকে। পুরো ওইকেন্ডটা একত্রে কাটায় দুজনে। বিভিন্ন রেস্টোরেন্টে  ডিনার করে মুভি থিয়েটার বেইসবল গেম  দেখে আবার কখনো  শহর ছেড়ে আন্য কোথাও চলে যায়। ভালবাসার নীল সমুদ্রে উদাম হাওয়ায় ললিতা আর রব ভেসে বেড়ায়। আজ ফ্রাইডে। কাল সকালে তারা নায়াগ্রাতে গিয়ে এই ওইকেন্ড কাটাবে। ললিতা রাতেই তাদের দুটো ব্যাগ  গুছিয়ে রেখেছে। রেডিসন হোটেলে বুকিং দেওয়া আছে দুদিনের। গতবার ওরা থেকেছিল মেরিওটে। চমৎকার  কেটেছিল পুরো ওইকেন্ডটা। রাতের বেলায় আলোকসজ্জায় এক অপরূপা ষোড়শির রূপ ধারন করে নায়াগ্রা ফলস।  সকালে  নাস্তা রেডি করে রবকে ঘুম থেকে ডেকে উঠাল ললিতা। রব রব  গেট আপ ডারলিং ব্রেকফাস্ট ইস রেডি। রব তার পরও শুয়ে থাকে বিছানায়। এপাশ ওপাশ করে মিনিট পোনের পরে বিছানা ছাড়ে। কিচেন  থেকে ললিতা ডাকে ডার্লিং  ব্রেকফাস্ট ইজ গেটিং কোল্ড, হারি আপ।

চেরোকি জীপে বসে গাড়ি  স্টারট দেয়  রব। মুখ বাড়িয়ে চুমু খায় ললিতাকে বলে, আই লাভ ইউ ললিতা। এর পর লেটস গো ডারলিং বলে গাড়ী পার্কিংলট থেকে  বেড় করে রাস্তায় নেমে যায়। সিডিতে ভেসে আসে ফরেনার্স দলের বিখ্যাত গান -‘সো লং আই হেভ বিন ওয়েটিং ফর ইউ’ বব মার্লির, ‘নো নো ওমেন নো ক্রাই’। ললিতা মনে  মনে গায় ‘সখি ভালবাসা কারে কয়’। ভালবাসার বর্ষায় ভিজতে ভিজতে  ললিতা আর রব প্রায় দুই ঘন্টা ড্রাইভ করে নায়াগ্রা  পৌছে দুপুরে। আজ রব খুব বেশি মুডে আছে মনে হচ্ছে। এমনিতেই ও খুব হাসিখুশি মানুষ, ভীষন প্রানবন্ত। ওর সাথে  থাকলে কোন কষ্টই ছুতে পারেনা ললিতাকে। প্রবাসের নিরানন্দ স্পন্দনহীন জীবনে সুর ছন্দ আর আনন্দের রঙ্গধনু  এনে দিয়েছে ললিতাকে রব। হোটেলের রেস্টোরেন্টে বুকিং দেওয়া ছিল আগেই। রেস্টোরেন্টের হোস্ট চমৎকার একটা  টেবিলে বসিয়ে দিয়ে তাদের  ‘এনজয় ইউর ডিনার’ বলে চলে গেল ।

কেন্ডেল লাইটের আলোর তলায় কাটা চামচের টুংটাং শব্দের সাথে ভেসে আসছে লুই আমর্স্ট্রংয়ের দরদিয়া কন্ঠে  ‘হোয়াট এ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড’। জাজ মিউজিকের সাথে ভসে বেড়ায়  সেক্সোফোনের সুরের নৃত্য। জানালার ওপারে জল প্রপাতের অবিরাম বর্ষন।

হাজার হাজার টুরিস্টের পদচারনায় মুখরিত প্রান চঞ্চল এই নায়াগ্রা ফলস। প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা যেন  বার বার বলে যায় -

মন ছুয়েছে মন। ডিনার শেষে ডের্জাট আসল দুটো  টিরামিসু ইন ব্রেন্ডি শেল সাথে এক গ্ল­াস আইস ওয়াইন রবের জন্য।

ললিতা হাত বাড়িয়ে  চামচ দিয়ে কিছুটা ডিজার্ট মুখে তুলে নেয়। মোম বাতির মৃদু আলোর তলায় এক স্বপ্নময় পরিবেশ খেলা করছে। আইস ওয়াইনে চুমুক দিয়ে রব পকেট থেকে ছোট্ট একটা প্যাকেট টেবিলে রাখল। প্যাকেট দেখে ললিতা রবের দিকে তাকিয়ে বলল এটা কি ডারলিং। যেন ললিতা কিছুই বুঝতে পারে না। রব কিছ্ক্ষুন  কিছুই বলে না। ললিতা দেখতে পায় রবের নীল চোখের ভিতর  স্বপ্ন উড়ে উড়ে খেলা করছে। রব  ললিতার হাত টেনে নিয়ে অনামিকায়  পরিয়ে দেয় এক হীরক অংগুরীয়। হীরকগুচ্ছের টুকরো টুকরো আলোতে রব ললিতার মুখে নামে আনন্দের বন্যা। ললিতার কাপা হাতে ভাসতে থাকে প্রবাস দ্বীপের  সোনালী রোদ বরফ ভেজা সন্ধা যৌবনের ঢাকা শহর  বাবা মা ভাই বোনের মুখ। ললিতার চোখে বিন্দু বিন্দু অশ্রুর ঝলক। রেস্টোরেন্টের জানালা দিয়ে দেখা যায় নায়াগ্রার জল প্রপাতে লাল নীল সাদা হলুদ রংগের রূপসী আলোর মিছিলের গড়াগড়ি ।

এই দুই সপ্তাহ ধরে ললিতার কাজে ভীষন চাপ ছিল এর উপর শরীরটাও  ভাল ছিল না। দুই দিন ধরে প্রচন্ড জ্বর হাতে পায়ে সমস্ত শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। ডাক্তার বলেছে ফ্লু  কয়েক দিন পর সেরে যাবে। সন্ধায়  রব আসবে ললিতাকে দেখতে। এখন ছয়টা বাজে যে কোন সময় এসে যাবে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে কথা হয় না। রব হাতে টিম হর্টনের কফি আর চাইনিজ খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল।  কফি আর খাবার গুলো টেবিলে রেখে  ললিতাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল । হাউ ইউ ডুয়িং  টুডে হানি। টেবিলে রাখা কফি এনে ললিতাকে দিয়ে বলল হেভ সাম কফি ইউ উইল ফিল বেটার।

রাতে একসাথে ডিনার  করে রব দশটার দিকে চলে যায়। ললিতা এই কয়েকদিনে ঘুমাতে ঘুমাতে এখন  আর  চোখে  ঘুম নেই। টিভির চ্যানেল চেঞ্জ করতে করতে রাত এগারটা বেজে যায়। হটাৎ চ্যানেল ২৪- এ দেখতে পায় ঢাকায়  গুলসানে ডিপ্লে­ামেটিক  জোনে এক স্পেনিস রেস্টোরেন্টে আইএস এর হামলা। ওহ মাই গড! আইএস এটাক ইন ঢাকা বলতে বলতে  ললিতার হাত থেকে  টিভির  রিমোটটা পরে যায়। এক অজানা আশংকায়  মনটা কাপতে থাকে। ঘুম আসছেনা ললিতার। রাত বারোটার দিকে  আই ফোনটা বাজতে থাকে। সোফায় থাকা ফোনের স্ক্রিনে ভেসে আসে ঢাকার মায়ের নাম্বার। তাড়াতাড়ি ফোনটা  ধরতে গিয়ে ফোনটা হাত থেকে ফ্লোরে  পরে যায়। ফোনটা  ওঠিয়ে  কানে লাগিয়ে ললিতা  বলে  হ্যালো মা কেমন আছো? অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে ললিতার মায়ের কন্ঠস্বর – হ্যা, আমরা ভাল। তোর  ফোন পাইনা বেশ কিছু দিন তাই ফোন করলাম। তুই ভালতো মা?  জিজ্ঞাস করে ফাহমিদা খাতুন। হ্যা, আমি ভাল।  কাজে খুব প্রেসার ছিল গত দুই সপ্তাহ আর শরীরটাও  একটু খারাপ ছিল কয়েক দিন। সে কারনেই  তোমাকে ফোন  করা হয়নি । আর তোমরাতো  একটু হলেই  ভীষন টেনসনে পড়ে যাও তাই  জানাইনি তোমাদের। ললিতা ফ্রিজ থেকে অরেঞ্জ জুস ঢালতে ঢালতে বলে। ফাহমিদা খান  বলে তুই একা একা সুদুর প্রবাসে হাজার হাজার মাইল দুরে থাকিস এতে আমাদের টেনশনের শেষ নেই। এখন সেটা বুঝবি না, যখন মা হবি তখন বুঝবি আমি কেন রতে ঘুমাতে পারিনা। আর শোন মা তোর বাবার শরীর  এক দম ভাল না। টেস্টের রির্পোট ভাল আসে নাই। তুই তাড়াতাড়ি দেশে আয় মা। কেন, বাবার কি হয়েছে? ললিতা জিজ্ঞেস করে।  মা কোন উত্তর দেয় না। আবার বলে শীঘ্রী দেশে আয় মা। ললিতার মা এই বলে ফোন রেখে দেয়। ললিতার হাত থেকে আই ফোনটা ফোনটা ফ্লোরে পরে যায়। হাতটা কাপছে মাথা ঘুরাচ্ছে, কাপুনি দিয়ে জ্বর আসছে আবার ললিতার।

 

মোয়াজ্জেম খান মনসুর

টরন্টো

মন্তব্য