কানাডাব্যাপী এলিভেটর সমস্যা : প্রতিদিন ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরে আটকা পড়ছে বহু লোক

কানাডাব্যাপী অনেক লোক প্রতিদিনই ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরে আটকা পড়ছেন। আধাঘন্টা থেকে শুরু করে দেড়-দুই ঘন্টা পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর ও আতঙ্কজনক অবস্থায় আটকে থাকতে হচ্ছে কাউকে কাউকে । ছবি : macedonia-info.org

কানাডাব্যাপী অনেক লোক প্রতিদিনই ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরে আটকা পড়ছেন। আধাঘন্টা থেকে শুরু করে দেড়-দুই ঘন্টা পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর ও আতঙ্কজনক অবস্থায় আটকে থাকতে হচ্ছে কাউকে কাউকে । ছবি : macedonia-info.org

কেবল অন্টারিওতেই গত বছর ৪,৪৬১ টি আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে

প্রবাসী কন্ঠ ডেস্ক : কানাডাব্যাপী অনেক লোক প্রতিদিনই ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরে আটকা পড়ছেন। আধাঘন্টা থেকে শুরু করে দেড়-দুই ঘন্টা পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর ও আতঙ্কজনক অবস্থায় আটকে থাকতে হচ্ছে কাউকে কাউকে। গত বছর কেবল অন্টারিওতেই ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরের আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে ৪,৪৬১টি। গড়ে প্রতিদিন এক ডজনেরও বেশী। ২০০১ সালের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুন। খবর কানাডিয়ান প্রেসের।
অনেক হাই রাইজ বিল্ডিং এই সব ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরের কারণে বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আটকে পড়া ছাড়াও আছে এলিভেটরের আউট অব সার্ভিসের ভোগান্তি। টরন্টোর আবাসিক হাই রাইজ বিল্ডিংগুলোতে সাধারণত দুই থেকে তিনটি এলিভেটর থাকে। অফিস বিল্ডিংগুলোতে থাকে আরো বেশী। এই সব ভবনে অনেক সময় দেখা যায় এক বা একাধিক এলিভেটর নষ্ট হয়ে আছে। এরকম পরিস্থিতিতে বিশেষ করে স্কুল টাইমে বা অফিস টাইমে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় এলিভেটর ব্যবহারকারীদেরকে।
ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার এবং এলিভেটর কনসালটেন্ট রব ইসাবেলি বলেন, “আমি মনে করি না যে আমরা একটা সংকটের দিকে এগুচ্ছি, আমি বিশ্বাস করি যে আমরা বাস্তবিক অর্থে সংকটের মধ্যেই আছি।”
রব ইসাবেলি জানান, গত বছর টরন্টোতে ২,৮৬২ টি এলিভেটর আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যা কানাডার বিভিন্ন শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মন্ট্রিয়লে ঐ একই সময়ে এলিভেটর আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে ১,৫৩২টি এবং ভেঙ্গুভারে ৪২৮টি। রাজধানী অটোয়াও বাদ যায়নি। সেখানে ২০১৪ সালে ৩১৪টি ঘটনা ঘটেছে।
ক্রটিপূর্ণ এই সব এলিভেটর আটকে পড়লে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ৯১১ এ কল করে ফায়ার সার্ভিসকে ডাকতে হয়।
যারা শারীরিকভাবে বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা যারা দুর্বলচিত্তের মানুষ তাদের বেলায় এলিভেটরে আটকে পড়াটা বেশ সংকটময় হয়ে উঠে। বাইরে যখন হিট এলার্ট থাকে অর্থাৎ তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা অনেক বেশী থাকে তখন কেউ এলিভেটরে আটকা পড়লে ভোগান্তি চরম হয়ে উঠে। এলিভেটরে আটকা পড়া অবস্থায় কারো বাথরূম পেলে সে আরেক ভয়াবহ যন্ত্রণা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এলিভেটরের সংখ্যা বৃদ্ধি সংকট সৃষ্টির পিছনে একটি কারণ। হিসাবে দেখা গেছে গত ৫ বছরে অন্টারিওতে এলিভেটরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১০%। তবে সংকট সৃষ্টির পিছনে মূলত দায়ী বহু পুরানো যন্ত্রপাতি ও কাঠামোগত বিষয়। কানাডায় যে কয়টি এলিভেটর প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে সেগুলো হলো Otis, Schindler, Kone and ThyssenKrupp। এই কোম্পানীগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে কানাডার এলিভেটর মার্কেট দখল করা নিয়ে।
ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার এবং এলিভেটর কনসালটেন্ট রব ইসাবেলি বলেন, আজ থেকে তিরিশ বছর আগে এলিভেটর টেকনিশিয়ানরা যে পারিশ্রমিক পেতেন এখন তার চেয়ে অনেক কম পান এবং কাজের চাপ অনেক বেশী। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। টেকনিশিয়ানরা কম সময় পাচ্ছেন প্রিভেন্টিভ মেইনটেনেন্সের জন্য। প্রিভেন্টিভ মেইনটেনেন্স যত কম হবে যন্ত্রপাতির সমস্যাও তত বেশী হবে।
এদিকে কানাডায় এলিভেটর সাপ্লাই দেয় প্রধান যে চারটি বৃহৎ কোম্পানী তারা এই চলমান সংকট নিয়ে কোন কথা বলতে রাজী হয়নি। উল্লেখ্য যে, এই চারটি কোম্পানীকে ২০০৭ সালে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশী অর্থ জরিমানা দিতে হয়েছে ইউরোপে তাদের ব্যবসা পরিচালনায় গোপন আঁতাতের আশ্রয় নেয়ার জন্য। এলিভেটর সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চায়নি কানাডিয়ান এলিভেটর কন্ট্রাক্টরস এসোশিয়েশনও। তারা ছোটখাট এলিভেটর কোম্পানী ও সাপ্লাইয়ার্সকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।
প্রপার্টি ওনার্স এবং ম্যানেজারগণ বিশেষ করে যারা অনেক পুরাতন ভবন নিয়ে ডিল করে আসছেন, এলিভেটর নিয়ে সবচেয়ে বেশী সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে তাদেরকেই। বহুদিনের পুরাতন এলিভেটর যারা এখনো ব্যবহার করে আসছেন তারা ঐগুলো মেইনটেনেন্স করার জন্য প্রয়োজনীয় পার্টস পাচ্ছেন না বা পেতে হলে অনেক বেশী অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কোন কোন এলিভেটরের পার্টস বাজার থেকে একেবারেই উধাও হয়ে গেছে অনেক দিনের পুরাতন বলে।
প্রপার্টি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মেটক্যাপ লিভিং এর প্রধান নির্বাহী ব্রেন্ট মেরিল বলেন, পুরাতন এলিভেটর অব্যাহতভাবে মেরাত করাতে গিয়ে বিস্তর চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন আধুনিক টেকনলজীর এলিভেটর ইনস্টল করতে যা অনেক ব্যয়বহুল। প্রতিটি এলিভেটরের জন্য দেড় লক্ষ থেকে তিন লক্ষ ডলার ব্যয় করতে হয়। তিনি আরো বলেন, বড় বড় এলিভেটর কোম্পানীগুলোর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণেও সমস্যা তৈরী হচ্ছে। তাদের কারণে ছোট কোম্পানীগুলো কোনঠাসা হয়ে যাচ্ছে। এক ধরণের মনোপলি সৃষ্টি করে রেখেছে বড় কোম্পানীগুলো। বড় কোম্পানীগুলো এলিভেটর বিক্রির পর আর কোন সার্ভিস দেয় না যেমনটি আগে দিত। আমরা এদের হাতে অনেকটা জিম্মী হয়ে আছি।
অন্টারিওর ১৮ হাজার রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং এর মধ্যে ১,৫৫০ টি বিল্ডিং এর এলিভেটর অর্ধ শতাব্দীর পুরানো এবং অন্য ১০ হাজার বিল্ডিং এর এলিভেটর ২৫ থেকে ৫০ বছর পুরানো। তবে এই পুরানো এলিভেটরগুলোতেই যে কেবল সমস্যা হচ্ছে তা নয়, আধুনি কন্ডোগুলোতে ব্যবহৃত চকচকে এলিভেটরও সমস্যা মুক্ত নয়।
এলিভেটর সমস্যার পিছনে বিল্ডিং মালিকদের কার্পন্যতাও একটি অন্যতম কারণ। এই অভিযোগ তুলেন এজাক্সে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব এলিভেটর কনস্ট্রাক্টর এর বিজজেন ম্যানেজার বেন ম্যাকেনটায়ার। তিনি বলেন, কোন কোন বিল্ডিং এর মালিক এলিভেটরের পিছনে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে অপরাগ বা সামর্থ্য থাকলেও তারা অর্থ ব্যয় করতে চায় না। তবে সত্যিকারের সমস্যাটা হলো এলিভেটরের রুটিন রক্ষনাবেক্ষনের কাজটা ঠিক মত হয় না। অলরেডি ওভারলোডেড টেকনিশিয়ানদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে তাৎক্ষনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সমস্যাগুলো নিয়ে।
এলিভেটর ব্যবহারকারীরা এলিভেটরে ভিতর আটকে পড়া ছাড়া দুর্ঘটনারও শিকার হচ্ছেন। গত বছর অটোয়াতে এক ব্যক্তি এলিভেটর দুর্ঘটনায় পড়ে একটি পা হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে গত বছর অন্টারিতে ৮জন স্থায়ীভাবে আহত হয়েছেন। স্বল্প আহত হয়েছেন ১৯৯ জন। অন্টারিওর ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেফটি রেগুলেটর এর মতে এই দুর্ঘটনার বেশীর ভাগই ঘটে এলিভেটর ব্যবহারকারীদের আচরণের কারণেই। আর লক্ষ্য করা গেছে, গত ৮ বছরে এই ধরণের দুর্ঘটনা প্রতিবছরই ৬% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কানাডায় এলিভেটর সমস্যা সবচেয়ে বেশী লক্ষ্য করা গেছে টরন্টো হাউজিং এর বিল্ডিংগুলোতে। টরন্টো কমিউনিটি হাউজিং করর্পোরেশন এর মুখপাত্র লিসা মুরে জানান, ২৭০ টি বিল্ডিং এর ৫৯১ টি এলিভেটরকে কার্যক্ষম রাখাটা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে, কারণ এর অনেকগুলোই অর্ধ শতাব্দীরও প্রাচীন।
এলিভেটর কনসালটেন্ট রব ইসাবেলি বলেন, কিছু একটা পরিবর্তন আনা জরুরী। এভাবে অচল বসে থাকলে হবে না।

কানাডাব্যাপী অনেক লোক প্রতিদিনই ত্রুটিপূর্ণ এলিভেটরে আটকা পড়ছেন। আধাঘন্টা থেকে শুরু করে দেড়-দুই ঘন্টা পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর ও আতঙ্কজনক অবস্থায় আটকে থাকতে হচ্ছে কাউকে কাউকে ।

মন্তব্য