গানের পাখি সেলিন ডিয়ন  জিরো থেকে হিরো

celine-dion

ফাবিহা তনিকা : সেলিনের বয়স যখন ১২, তখন সাহস করে নিজের লেখা গানের একটি পরীক্ষামূলক রেকর্ড পাঠিয়ে দেন খ্যাতিমান সঙ্গীত প্রযোজক রেনে আঞ্জেলিলের কাছে। ১২ বছর বয়সী ক্ষুদে গায়িকার গানে মুগ্ধ হয়ে রেনে সিদ্ধান্ত নেন নিজ খরচে প্রকাশ করবেন সেলিনের গানের অ্যালবাম। রেনে তার নিজ বাড়ি বন্ধক রাখেন সেলিনের অ্যালবাম প্রকাশে যাবতীয় খরচের জন্য। রূপকথার মতো শোনালেও এমনটিই ঘটেছিল সেলিনের জীবনে।

সুরের মূর্ছনায় জীবনকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও জীবনবোধ, ভালোবাসা, মমতা- এসবের কমতি ছিল না। অনেকের মতো চাইলেই সবকিছু হাতের মুঠোয় না পেলেও আজ শুধু সুরের মুগ্ধতায় বিশ্ব মাতান তিনি।

১৯৬৮ সালের ৩০ মার্চ। কানাডিয়ান এক কসাই পরিবারে ১৪তম সন্তানের জন্ম হলো। বিশাল পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানের জন্য সেদিন কোনো উৎসব ছিল না। মা টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হলেও বিশাল সংসারেই সময় চলে যেত বেশি। খুবই ছোট একটি ঘরে বাকি ভাইবোনদের সঙ্গে বেড়ে উঠতে লাগলেন ছোট্ট সেলিন। মা-বাবার সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ সন্তানদের ওপরও প্রভাব ফেলে। সামান্য টাকা হলেই সেলিনের পরিবার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত, গান করত। সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি তখন থেকে একটু একটু করে টের পেতে থাকেন তিনি।

খুব ছোটবেলা থেকেই চমৎকার গান গাইতেন সেলিন। তার বাবা সন্তানদের উৎসাহ প্রদান এবং সঙ্গে কিছু বাড়তি আয়ের জন্য তৈরি করেন পারিবারিক একটি ব্যান্ড দল। সেই সঙ্গে খোলেন একটি পিয়ানো বার। সন্তানদের গানের চর্চা যেমন হবে, পাশাপাশি দু-পয়সা আয়ও হবে। সেই বারেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয় ছোট্ট সেলিনের। তখন তার বয়স ছিল পাঁচ। গানের শেষে শ্রোতাদের করতালি তাকে স্বপ্ন দেখতে প্রেরণা জোগায়। মনে মনে ঠিক করেন, যেভাবেই হোক সঙ্গীতের মাঝেই থাকবেন। কিন্তু পথটা খুব মসৃণ ছিল না। পরিবারে আর্থিক টানাপড়েন ছিল। সেলিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই ছিল। আমাদের দেওয়ার মতো কিছু ছিলই না। পরিবার থেকে আমরা কেবল ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বেড়ে ওঠার জন্য যা আমাদের জন্য ছিল যথেষ্ট।’

সেলিনের বয়স যখন ১২, তখন সাহস করে নিজের লেখা গানের একটি পরীক্ষামূলক রেকর্ড পাঠিয়ে দেন খ্যাতিমান সঙ্গীত প্রযোজক রেনে আঞ্জেলিলের কাছে। ১২ বছর বয়সী ক্ষুদে গায়িকার গানে মুগ্ধ হয়ে রেনে সিদ্ধান্ত নেন নিজ খরচে প্রকাশ করবেন সেলিনের গানের অ্যালবাম। রেনে তার নিজবাড়ি বন্ধক রাখেন সেলিনের অ্যালবাম প্রকাশে যাবতীয় খরচের জন্য। রূপকথার মতো শোনালেও এমনটিই ঘটেছিল সেলিনের জীবনে।

এভাবেই সেলিনের প্রতিভা প্রকাশ হতে থাকে। জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সেলিন। কিন্তু সচ্ছলতা তখনও সোনার হরিণ ছিল। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু শিক্ষার প্রয়োজন ছিল তা আর অর্জন করতে পারেননি। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয় সেলিনের আরও ছয়টি অ্যালবাম। ফরাসি অধ্যুষিত এলাকায় বেড়ে ওঠার কারণে মোটেই ইংরেজি জানতেন না সেলিন। ঠিক করলেন ইংরেজি শিখবেন। টানা দু’বছর তা শেখার পর গান শুরু করেন ইংরেজিতে এবং সেই সঙ্গে সেলিন নজরে চলে আসেন সবার। ইংরেজিতে প্রকাশিত গানের অ্যালবামটি এবার বিক্রি হয় এক লাখ কপির মতো। ১৯৯২ সালে তার ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ গানটি সাড়া ফেলে বিশ্বজুড়ে। বিলবোর্ডে নয় নাম্বারে স্থান করে নেয় গানটি। তারপর কেবলই সাফল্যের গল্প। পেছনে পড়ে থাকা কষ্টের স্মৃতিগুলো ধূসর হতে থাকে। সেলিন ডিয়ন একের পর এক অসাধারণ গান উপহার দিতে থাকেন শ্রোতাদের। সম্মানিত হন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে।

এরপর কাজ করেন বিশ্বজুড়ে আলোচিত ‘টাইটানিক’ চলচ্চিত্রে। এ চলচ্চিত্রে তার গাওয়া গান ছুঁয়ে যায় দর্শকহৃদয়। অসাধারণ এবং হৃদয়স্পর্শী গায়কী তাকে খ্যাতির চূড়ায় তুলে দেয়। গানটির জন্য ছয়টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসহ গোল্ডেন গেল্গাব অ্যাওয়ার্ডও পান তিনি। এর মাঝেই ঘর বাঁধেন তার দীর্ঘ পথের সেই সঙ্গীর সঙ্গে। যিনি একসময় সেলিনের অ্যালবাম প্রকাশের জন্য নিজের বাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন। সেলিন বুঝেছিলেন, খ্যাতি কিংবা অবস্থান নয়- একজন মানুষের জীবনসঙ্গী হিসেবে তাকেই গ্রহণ করা উচিত যে তার চলার পথের সঙ্গী হবে। একদিন সেলিনের কিছুই ছিল না, সামান্য কসাই পরিবারের মেয়ে ছিলেন। সেই সেলিন দেখতে পেলেন জীবনের অন্য এক রূপ। ২০০০ সালের শুরুর দিকে পা বাড়ালেন ব্যবসাতে। বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন অনুষঙ্গের পাশাপাশি বের করেন সেলিন ডিয়ন পারফিউম, যা ৮৫০ লাখ ডলারের ব্যবসা করে। দীর্ঘ পথ চলায় সেলিন খুব কাছ থেকে দারিদ্র্যকে দেখেছেন। নিজের অপারগতা সম্পর্কেও জেনেছেন কখনও কখনও। সেখান থেকে নতুন করে শিখেছেন। কিন্তু হার মানেননি কখনও। ২০১৩ সালে স্বামী রেনে আঞ্জেলিলের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর সেলিন তার ২০১৪ সালের এশিয়া ট্যুর বাতিল করে দেন। আড়ালে থেকেও সেলিন ‘সবসময়ের সেরা গায়িকার’ খ্যাতিকে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। ঠিক যেমনটি পারেননি নিজের ভেতরের অদম্য ইচ্ছাটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া থেকে দূরে থাকতে। অনেক আগের সেই কসাই পরিবারের শিশুকন্যার জীবন আজ তাই তার নিজের কাছেও যেন রূপকথা। আর যারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে স্বপ্ন দেখছেন তাদের কাছে প্রবল এক অনুপ্রেরণা। - সমকাল

মন্তব্য