দুর্গাপূজার সেকাল-একাল

mondir

দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ছবি -বাংলাদেশ কানাডা হিন্দু মন্দির

সৌমিত্র শেখর

শৈশবে দুর্গাপূজার সময় দেখতাম জঞ্জালু নামের এক মালি ছিল- সে আজ প্রয়াত- ওই জঞ্জালু পূজার সব আয়োজন করছে। এমনকি যে ফুল দিয়ে অঞ্জলি দেওয়া হবে সেগুলোও তুলে আনছে দূর-দূরান্ত থেকে। কিন্তু তাকে মন্দিরে সবার সঙ্গে অঞ্জলি দিতে দেখিনি; পরেও সে অঞ্জলি দিতে পেরেছে বলে মনে পড়ে না। কায়স্থ বউরা সাহা বউদের প্রায় ছুঁতো না বললেই চলে। জাত্যাভিমানীদের নাক-উঁচু ভাবটা আরো প্রবল ছিল। আসলে জাতিভেদের কাচের দেয়াল হিন্দুসমাজকে শুরু থেকেই বিভক্ত করে রেখেছে। উনিশ শতকে যে প্রগতিবাদী হিন্দুরা কলকাতায় অনেকটা বিদ্রোহ করে খ্রিস্টান হয়েছিলেন, তাঁদের জীবনাচরণেও এর প্রতিফলন ছিল ব্যাপক। ব্রাহ্মণ থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরা নিচু জাত থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করত না। অর্থাৎ খ্রিস্টান হওয়ার পরও জাতটি বজায় থাকে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুর পর তাঁর শব সমাধিস্থ করা নিয়ে যে গোল বেধেছিল, তার কারণ তিনি ছিলেন ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান, জাত খ্রিস্টান নন। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যেও জাতের ব্যাপারটি কিন্তু উপেক্ষণীয় নয়। ব্রাহ্মণদের যে জাত্যাভিমান ছিল, নমঃশূদ্রদের এখন সেটাই হয়েছে। তারা কুলীনদের দেখে সাপে-নেউলের মতোই। তাদের ধর্মগুরুর জন্ম দিবস বা অন্য যেকোনো সভায় উপস্থিত হলে কুলীনদের সম্পর্কে যে বিষোদ্গার শোনা যায়, তাতে নমঃশূদ্রদের জাত্যাভিমানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতার বাঙালি সমাজে উনিশ শতকে রেনেসাঁসের ছোঁয়া লেগেছিল সত্যি, কিন্তু এই জাতভেদটি একেবারে উঠে যায়নি। কিন্তু শিশুদের কাছে এসবের বালাই নেই। যখন স্কুলের নিম্ন শ্রেণিতে পড়তাম, পূজার আনন্দ তখনই যেন বিশেষভাবে মাতিয়েছিল আমাদের। ঋতুচক্রে ওই সময় আশ্বিন-কার্তিক মাসে বেশ শীত পড়ে যেত। আমরা পূজার প্রায় মাসখানেক আগে থেকে প্রতিমা গড়া দেখতাম। বাড়ির পাশেই ছিল মুন্সিবাজার ক্লাবের বারোয়ারি পূজা। সেখানে বিকেল হলেই গিয়ে দাঁড়াতাম। কাঠামো শুভক্ষণ, খড় বাঁধা, মাটির প্রলেপের পর প্রলেপ দেওয়া, প্রতিমার মুন্ডুসংস্থাপন, আঙুল সংযোজন ইত্যাদি করতে করতে আমাদের চোখের সম্মুখে প্রতিমাটি জীবন্ত হয়ে উঠত যেন। এক মাস ধরে আন্তরিক দরদে কারিগর প্রতিমা গড়েছেন। হ্যাঁ, আমরা তাঁকে ‘কারিগর’ই বলতাম, যিনি প্রতিমা বানাতেন। এরপর একদিন রঙের প্রলেপ পড়ত। দুর্গা, লক্ষ্মী আর কার্তিক এক রঙের; সরস্বতী আর গণেশের রংটা ছিল ভিন্ন।

পূজার আগের রাতটাই ছিল সবচেয়ে বেশি উত্তেজনার। কারণ ওই রাতে প্রতিমাকে বসন পরানো হবে এবং করা হবে চক্ষুদান। মুন্সিবাজার ক্লাব আমাদের শেরপুর শহরে বরাবরই এ দুটি ব্যাপারে এগিয়ে থাকত। গুপুনাথ কর্মকার, সবাই যাঁকে ‘গুপুদা’ বলে ডাকে, তিনি নিখুঁতভাবে করতেন এ কাজ দুটি। এত চমৎকার করে তিনি প্রতিমাকে শাড়ি পরাতেন, যা অন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব হতো না। তাঁকে সহায়তা করতেন বাদল দে। বসন পরিধান করানো শেষ হয়ে গেলে একেবারে ভোররাতে হতো চক্ষুদান; ‘গুপুদা’ই এ কাজটি করতেন। যে কারিগর প্রতিমা গড়লেন তিনি নির্দ্বিধায় তুলি তুলে দিতেন তাঁর হাতে। আমরা সারা রাত জেগে বসে থাকতাম। ঠান্ডা বাড়ছে, রাত গভীর হচ্ছে; কিন্তু আমাদের চোখে ঘুম নেই উত্তেজনায়। চক্ষুদান করামাত্রই মনে হতো দেবী আবির্ভূত হলেন, আমারই সম্মুখে যেন ঘটে গেল এই ঐশী লীলাটি। পূজার সে অনুভূতি আজ খানিকটা ধূসর। সমাজ ও ব্যক্তির ক্রমপরিবর্তনের কারণে ও আমার চেতনাগত ভিন্নতার জন্যও হয়তো পূজার সে উত্তেজনা আজ আর নেই।

বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বৃহৎ পূজা হলো দুর্গাপূজা। এটি সর্বজনীন দুর্গোৎসবও। পূজাটি সর্বজনীন উৎসব হতে পারার একটি বড় কারণ এই যে দুর্গাপূজায় এমন খাদ্য পরিবেশিত হয় না, যা অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বা তাদের বিচারে ‘নিষিদ্ধ’। উৎসব শুধু বড় হলেই সর্বজনীন হয় না, সব মানুষকে ধারণ করার বৈশিষ্ট্যও থাকতে হয়। দুর্গাপূজাতে তা আছে। পূজার কথাই অবশ্য ভক্তদের কাছে প্রধান, আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে আত্মশক্তির জাগরণ এর মূলে। ভক্তরা প্রতিবছর এই পূজার সময় দেবীর কাছে বর মাগেন শক্তি-সামর্থ্য-সুখের সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বিজয়ী হওয়ার। সর্বজনীন এই দুর্গোৎসব সৌভ্রাতৃত্ব আর অসীম প্রীতির বন্ধনে জড়িত। বিজয়া দশমীর দিনে একে অন্যের বুকে বুক মিলিয়ে বা নমস্কারের প্রণতিতে যে আন্তরিকতার ফল্গুধারায় স্নাত হয়ে ওঠা, তা নিশ্চিতভাবেই ভেদাভেদহীন অখন্ড মানবতার দ্যোতক। সত্যি যদি এই মনোভাব সঞ্চারিত করা যেত পুরো সমাজে, প্রত্যেক মানুষে-মানুষে! সনাতন সমাজের নানা সংস্কার করেই প্রাতঃস্মরণীয় হয়েছেন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ। কিন্তু সেই ধারা স্মরণ করলেও মান্য তো করা হয় না।

দুর্গার পূজা থেকে উৎসব এক দিনে হয়নি। দুর্গাপূজা যে আজ সর্বজনীন উৎসব, সে কথা আমার বাল্যবন্ধু বিমল, মিলন, আশীষের সঙ্গে রওশনেরও ঠিক মনে আছে নিশ্চয়। ছেলেবেলাতে রওশনকে মনেই করতে দিইনি যে ওটা ওরও উৎসব নয়। অথবা ও ছিল বলে আমাদেরও মনে হয়নি দুর্গোৎসব শুধু হিন্দুদের। পূজাতে নতুন জুতা-কাপড় ছাড়া আর সব প্রাপ্তিই ঘটেছে ওর। ছেলেবেলায় জামা-জুতা কেনা

ওর হাতে ছিল না। কিন্তু আর কোনো আনন্দে ঘাটতি ওর হয়নি। মনে পড়ে, পূজার যেকোনো এক দিন সকালে দল বেঁধে আমরা রেস্টুরেন্টে যেতাম; রাতে রেস্টুরেন্টে খেয়ে তবে ঘরে ফেরা! শখ করে হোটেল বা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার শুরুটা হয়েছিল দুর্গোৎসবেই। প্রতি রাতে একসঙ্গে বন্ধুরা দল বেঁধে পূজা দেখতে বের হতাম। এ সময় দিনে বসত মেলা; বাহারি আর লোভনীয় অনেক কিছুই সেখানে থাকত। এলাকার তিনটি সিনেমা হল পাল্লা দিয়ে নতুন ছবির মুক্তি দিত পূজায়। ছবি দেখাও চাই আমাদের।

পুরাণের রামের অকালবোধন থেকে বিশ শতকের আটের দশকের রওশনসহ আমাদের দুর্গাপূজা সত্যি কি এক? রাম করেছিলেন শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে। তাঁর মনে একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষাও ছিল। ১০৮টি নীলপদ্মের মধ্যে একটি কম হলো বলে তিনি নিজের চোখ উপড়ে দিতে চাইলেন দেবী দুর্গার পাদপদ্মে! আজ সে রকম ব্যক্তিগত কোনো মনোবাঞ্ছা নিয়ে কেউ দুর্গাপূজা করেন বলে মনে হয় না। বাবাকে দেখেছি ধুতি পরে সকালেই রঘুনাথ মন্দিরের দুর্গাপূজাতে উচ্চ স্বরে চন্ডীমন্ত্র আওড়াতে। জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, পূজার সময় এটি করতে তাঁর ভালো লাগে। তাঁর সঙ্গে প্রথম প্রথম দু-এক পূজাতে অঞ্জলিও দিয়েছি, মনে পড়ে। কিন্তু কলেজে যাওয়ার পরই আমি দড়িছেঁড়া। বন্ধুরা মিলে আমরা দুর্গাপূজায় টইটই করে ঘুরেছি, রেস্টুরেন্টে গেছি, মুরগি-পোলাও খেয়েছি, সিনেমা দেখেছি, কাশতে কাশতে সিগারেটও টেনেছি দু-একটি।

অবাঙালি হিন্দুদের কাছে রাম যতটা পূজিত, বাঙালি হিন্দুদের কাছে ততটা নন। কিন্তু বাঙালিরাই রামের সেই অকালবোধনকে অনেক বড় করে পালন করে। তারা অবশ্য সময়-পরম্পরায় দুর্গাপূজাকে সর্বজনীন করে ফেলেছে। ধর্মের শাঁসটুকু রেখেই একে নিয়ে এসেছে ধর্মের ঊর্ধ্বে। তাই দুর্গা ‘পূজা’ থেকে আজ ‘উৎসবে’ পরিণত। ইতিহাসে দেখা যায়, দুর্গাপূজাটা মূলত সীমাবদ্ধ ছিল ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে। ব্রিটিশ আমলে প্রতি গ্রামের দু-তিন ঘর সম্পন্ন পরিবার এই পূজা করত। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষও আনন্দ পেয়েছে বটে, তবে সেটা প্রসাদ-পাওয়ার আনন্দ; বাদ্য-বাজনা শোনার আনন্দ, দূর থেকে দেখার আনন্দ! কামার-কুমোররা এটা-ওটা বানিয়েছে বিক্রি করার জন্য। সম্পন্ন পরিবারের সন্তানরা অর্থনৈতিক কারণে নতুন যুগের হাতছানিতে এগিয়ে যায়। তারা ব্যবসা বা লেখাপড়াতে নিবিষ্ট হয়। সে সূত্রে বাড়ির বাইরে, অন্যত্র অবস্থান বা প্রতিষ্ঠা ঘটে তাদের। দেখা গেছে,

পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা হওয়ায় পূজার সময় সেসব পরিবারের সন্তানরা বাড়িতে একত্র হয়। এ থেকেই ঐক্য ধরে রাখে পরিবারটি। অবশ্য একই বড় পরিবারে একাধিক পূজাও হয়েছে; ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয়। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক একটা প্রতিযোগিতার ভাবও গড়ে ওঠে তাদের। আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্ন সংসার করেছে এমন ভাইয়েরা যৌথভাবে দুর্গাপূজা করেছে, এমন উদাহরণও বিরল নয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন বাড়ির নারী ও শিশুরা যে বেড়াতে যেত বা নাইওর করত আর পূজার সময়ে পূজাবাড়িতে ভিড় করে রাখত, ১০০ বছর আগেও এ চিত্র ছিল স্বাভাবিক। দুর্গাপূজা তারা না করতে পারলেও এই পূজা থেকে তারা নিজেদের বিযুক্ত ভাবত না কখনো। উৎসবের আবহ থাকত সবার মনেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক মন্দা ভাব ও এর অব্যবহিত পরে ভারতীয় রাজনীতিতে বিষবৃক্ষ দ্বি-জাতিতত্ত্বের ‘মাকাল’ চাষের কারণে বাঙালি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ব্যাপক ভাঙন ঘটায়। সম্পন্ন বহু হিন্দু পরিবারের পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ জীবন যাপন করা, ইতিহাসের সে এক করুণ অধ্যায়! পরে সাধারণ হিন্দুদের অনেকে বাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এ ধারা অব্যাহত থাকে। যেসব সম্পন্ন পরিবার এ দেশে থেকে যায়, তাদের বেশির ভাগ নিজেদের নিরাপত্তা ও শাসক সম্প্রদায়ের নিপীড়নের কারণে পূজা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এ অবস্থায় দুরু দুর বক্ষের অসচ্ছল কিন্তু উদ্যোগীদের আগ্রহে বারোয়ারি দুর্গাপূজার প্রচলন ঘটে এবং তা আর শুধু সম্পন্নদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আগে অসচ্ছলদের পক্ষে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হতো না। এরপর সম্মিলিতভাবে পূজার আয়োজনও তারা করে। পশ্চিমবঙ্গেও পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষের আগ্রহ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ফলে বারোয়ারি দুর্গাপূজার প্রসার ঘটে। এভাবেই যে পূজা একসময় কোনো পরিবারের ঐক্য স্থাপনে ভূমিকা রেখেছে, সেই পূজা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও বন্ধন দৃঢ়তর করতে ভূমিকা রাখে। সময় অতিক্রান্তির সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সমাজে মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটে। লেখাপড়া ও আর্থিকভাবে অনেকে খুবই এগিয়ে যায়। চিন্তাতেও এগিয়ে আসে কেউ কেউ। তাই পরে দেখা গেছে, দুর্গা যখন বারোয়ারিভাবে পূজিত হন, তার জন্য চাঁদা বা অন্য আয়োজনে জাত-পাত-নির্বিশেষে হিন্দুদের নানা বর্ণের যেমন অংশগ্রহণ থেকেছে, তেমনি অনেক অহিন্দুও এতে অংশ নেয়। শাস্ত্রীয় পর্বটুকু বাদে পুরো দিনের আয়োজন হয়ে ওঠে সব ধর্মের মানুষের। এভাবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক পূজামন্ডপ পাওয়া যাবে, যেখানে সব জাত-পাতের হিন্দু-মুসলিম ও অন্য ধর্মের মানুষদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ আছে।

লেখক : নজরুল-অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালের কণ্ঠ

মন্তব্য