টরন্টোতে ‘আধুনিক যুগের দাসত্বের শিকলে’ আবদ্ধ অনেক ইমিগ্রেন্ট মহিলা কর্মী

pic-for-news-9

নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত চাকরী ইমিগ্রেন্ট মহিলাদেরকে আধুনিক যুগের দাসত্বের শিকলে বেধে রেখেছে। ছবি : বিবিসি

সারা মোজটাহেজাডাহ্ : জব এজেন্সির মাধ্যমে পাওয়া নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত চাকরী ইমিগ্রেন্ট মহিলাদেরকে আধুনিক যুগের দাসত্বের শিকলে বেধে রেখেছে। স্বল্প বেতন ও অধিক পরিশ্রমের এক চক্রের মধ্যে পড়ে এই ইমিগ্রেন্ট মহিলাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এ কারণে টরন্টোর জনস্বাস্থ্যও সংকটের মধ্যে পড়েছে। সব মিলিয়ে টরন্টোর অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদী  চাপের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্যে উঠে এসেছে।

গ্রেটার টরন্টো এরিয়াতে নতুন ইমিগ্রেন্ট এবং উদ্বাস্তুদের উপর পরিচালিত এক জরীপে দেখা গেছে ইমিগ্রেন্ট ও উদ্বাস্তুদের অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন জব এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করতে।

গবেষণায় দেখা গেছে গ্রেটার টরন্টো এলাকায় নতুন এসেছেন এমন মহিলা, যাদের মধ্যে রয়েছেন কিছু উদ্বাস্তু মহিলাও – তারা বাধ্য হচ্ছেন জব এজেন্সীর মাধ্যমে কাজ করার জন্য। তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে শোষণ করা হচ্ছে এমন অভিযোগ উঠেছে। জব এজেন্সীর মাধ্যমে কাজ করে তারা যা আয় করেন তা থেকে চাইল্ড কেয়ারের খরচ যোগাতে হয়। আরো আছে পে চেক থেকে জব এজেন্সীগুলোর ডিডাকশন। হিসাবে দেখা যায় এই মহিলারা দিন শেষে বাড়িতে নিয়ে যান ঘন্টায় ৩ ডলারের আয়। অর্থাৎ ঘন্টায় ন্যূনতম ১১.৪০ ডলার করে পেলেও বস্তুত তারা চাইল্ড কেয়ার এবং অন্যান্য ডিডাকশন বাদ দিয়ে হাতে পাচ্ছেন ঘন্টায় ৩ ডলার করে।

‘এটি অধুনিক যুগের দাসত্ব’, এ কথা বলেন সেরিং পালডন যিনি রায়ারসন ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা কার্যক্রমটি সহায়তা করেন। পালডন নিজেও একজন ইমিগ্রেন্ট মহিলা যিনি একসময় রেস্টেুরেন্টে কাজ করেছেন নিম্ম বেতনে। পরে তিনি কমিউনিটি সার্ভিস ওয়ার্কার এর উপর ডিপ্লোমা করেন।

রায়ারসন ইউনিভার্সিটির স্যোসিয়াল জাস্টিস এন্ড ডেমোক্রেসি বিভাগের চেয়ারপার্সন ওইনি এনজি বলেন, আমাদের মনে কোন সন্দেহ নেই যে, এই নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত কাজ মহিলাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং তাদের অমঙ্গল করছে।

তিনি আরো বলেন, “একই সাথে এই পরিস্থিতি তাদের পরিবার, তাদের সন্তান এবং তাদের কমিউনিটিতেও বিরুপ প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতির দীর্ঘ মেয়াদী পরিনতি গিয়ে পড়ছে আমাদের অর্থনীতিতে, সামাজিক কাঠামোতে এবং বিশেষ করে পাবলিক হেলথ সিস্টেমের উপর।

এই গবেষনাটি পরিচালনা করতে গিয়ে টরন্টোতে বসবাসরত ৪০ জন মহিলার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে যাদের প্রায় ৭৫% কম বেতনের নিশ্চয়তাহীন কাজ করেন। এদের কেউ পার্টটাইম জব করেন, কেউ অনকলের জব করেন, কেউ বা জব এজেন্সীর মাধ্যমে কাজ করেন। তারা যে কাজ গুলো করেন তার মধ্যে আছে পার্সোনাল সাপোর্ট ওয়ার্ক, ফুড প্রসেসিং জব অথবা রিটেইল জব। আর এদের মধ্যে প্রায় ৬৫% মহিলা একাধিক কাজ করেন।

এই মহিলাদের অনেকেই অভিযোগ করেন যে, তাদের কর্মস্থলে তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসতে হয় বলে। তার সাথে আছে প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাব, ট্রেনিং এর অভাব, ওয়ার্কপ্লেস ভায়োলেন্স, কর্মস্থলে জখমের উচ্চমাত্রা যা সাধারণত চেপে রাখা হয় ইত্যাদি। এই মহিলাদের অনেকের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে মাথা ধরার রোগ, আর্লি মনোপজ, নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকে জ্বালা, লাল লাল ফুসক–ড়ি ইত্যাদির সমস্যা।

ওইনি এনজি বলেন, জব এজেন্সীর মাধ্যমে কাজ করা একটি ধাঁচে পরিনত হয়েছে আজকাল। তিনি বলেন, যারা ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে বা সার্ভিস সেক্টরে আছেন তাদের বেশীরভাগই বিপজ্জনক কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের জন্য নেই ইন্সুরেন্স প্লান, নেই কর্মস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রেই তারা নির্যাতিত হন, শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে কাজ থেকে বাদ পড়ে যান।

রায়ারসন ইউনিভর্সিটির গবেষনায় আরো দেখা গেছে মহিলাদের মন্দ শারীরিক স্বাস্থ্য তাদের মানসিক অবস্থার ওপরও খারাপ প্রভাব ফেলে। টরন্টোর একটি পটেটো ফ্যাক্টরীতে কাজ করেন সেরিং সেমচো নামের এক মহিলা যার বয়স ৩৭। জব এজেন্সীর মাধ্যমে তিনি এ কাজটি খুঁজে পেয়েছেন। তিনি জানান, একাউন্টিং এ রয়েছে তার অভিজ্ঞতা এবং ইংরেজীতেও তার রয়েছে দক্ষতা। অনর্গল ইংরেজীতে কথা বলতে পারেন তিনি। ভাল একটি কাজ যোগার করতে পারেননি। পটেটো ফ্যাক্টরীতে তাকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কখনো কখনো দিনে ১৬ ঘন্টাও! তিনি জানান এতে করে তার শারীরিক সমস্যা হচ্ছে এবং তার বিপর্যয়কর মাইগ্রেন রোগ দেখা দিয়েছে। “কোন কিছুই তোমার নিয়ন্ত্রনে নেই” এরকম একটি ভয়ের অনুভূতি সমসময়ই আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে এই মহিলাদের মধ্যে যারা খেয়ালী সময়ে অর্থাৎ একেক দিনে একেক শিফটে (সকালে বা বিকেলে অথবা রাতে) কাজ করতে বাধ্য হন তারা দ্বিগুন চাপের মধ্যে থাকেন। এই চাপের মধ্যে আছে কর্মস্থলে দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিক ডেইজে বেতন না পাওয়া ইত্যাদি। আরো আছে কিছু কিছু জব এজেন্সীর অবৈধ কার্যক্রম। সেরিং পালডন বলেন, এই এজেন্সীগুলো অরক্ষিত এই মহিলাদেরকে সম্পূর্ণভাবে শোষণ করে।

রায়ারসন ইউনিভার্সিটির এই গবেষনা প্রতিবেদনটি এমন এক সময় প্রকাশিত হয়েয়ে যখন অন্টারিওতে এম্পøয়মেন্ট এন্ড লেবার ল রিভিও করা হচ্ছে এখানকার শ্রমিকদের ভাল সুরক্ষা প্রদান করার জন্য। গবেষণায় কয়েকটি বিষয়ের ত্রুটিমোচনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে যার মধ্যে আছে অসুস্থ অবস্থায় কর্মীদের বেতন কর্তন না করা, বাধ্যতামূলক দুই সপ্তাহের ওয়ার্ক সিডিউলিং নোটিশ, জব এজেন্সীগুলোর উপর কড়া নজরদারী, কর্মীদের জন্য উত্তম এবং আরো সুগম ওয়ার্কাস কমপেন্সেশন এর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি জোরালো এম্পøয়মেন্ট স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার আইন জোরালো করা। -টরন্টো স্টার

মন্তব্য