একটি চলচ্চিত্র ও একটি মুক্তিযুদ্ধ

Bidut Sarker

বিদ্যুত সরকার

‘দি ক্রেনস আর ফ্লাইং’ ছবিটির কথা মনে আছে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত একটি বিখ্যাত ছবি। সত্তরের দশকে আামরা যারা ছবিটি দেখার সুযোগ পেয়েছি মনে হয় সবারই কম বেশি মনে আছে। মনে রাখার মত একটি অন্যতম ছবি এটি। ছবিটির কিছু কিছু দৃশ্যতো এখনো দৃশ্যমান হয়ে উঠে চোখ বুজে একটু ভাবতে গেলে। বিশেষ করে ছবিটির শেষ পর্যায়ের দৃশ্যগুলো। দীর্ঘ সময় যুদ্ধ শেষে কাংখিত জয়লাভ নিয়ে পদাতিক বাহিনী ফিরে আসছে নিজ আস্তানায়, নিজ শহরে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর। শত্রুদের বোমার আঘাতে ভেঙ্গে পড়া দালান-কোঠা, ঘর-বাড়ি। কোথাও কোথাও নিভে যাওয়া আগুন থেকে তখনো ধোয়া উঠছিল। সদ্য বিজয়ের উল্লাস আর আনন্দ নিয়ে ফিরছে সেনা দল Ñ সাজোয়া বাহিনী, ট্যাঙ্কের বহর। রাস্তার দু-ধারে উল্লোসিত জনতা বীরদের অভিনন্দন জানাতে ফুলের তোড়া নিয়ে দাড়িয়ে। হাততালিতে মুখরিত করে তুলেছে চারিদিক। আনন্দ উল্লাসের বহমান স্রোত বিজয়ী সেনা ও শহরবাসীদের মধ্যে। অনেক দিনের অদেখা প্রিয়জনদের মধুর আলিঙ্গণ, আনন্দাশ্রু, নব-জাতকের উষ্ণতায় বিভোর ফিরে আসা যোদ্ধা পিতা। অনেক দিন পর মা তার সন্তানকে, স্ত্রী তার যোদ্ধা স্বামীকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে অনেক দিনের পুঞ্জিভূত সোহাগ ভালবাসা ছড়িয়ে দিচ্ছে। নব বিবাহিত বধু, প্রেমিকারা ফুল হাতে খুঁজছে তার প্রিয়জনকে। ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়ার অভিপ্রায় আর হৃদয়ের ভালবাসার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করার প্রগাঢ় ইচ্ছায় চঞ্চল-উচ্ছল।

indipendence-day

হঠাৎ এক সৈনিকের আহ্বানে সব কোলাহল থেমে গেল। সমস্ত যানবাহন থেমে আছে, সৈনিকেরা যে যার জায়গায় দাড়িয়ে। সৈনিকটি ট্যাংকের উপর দাড়িয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষণ দিলেন। সবাইকে শুভেচ্ছা, ভালবাসা ও অভিনন্দন জানালেন। শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বললেনÑ ‘আমাদের এ বিজয় সমগ্র জাতির বিজয়। দীর্ঘ সময় ধরে এ যুদ্ধে শত্রু সেনাদের যেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, আমাদেরও কম ক্ষতি হয়নি। শত্রুদের আক্রমণে আমাদের শহরগুলো বিধ্বস্ত, চলাচল ব্যবস্থা বিঘিœত, সর্ব্বোপরি সাধরণ জনগনের ভোগান্তি। শেষ অব্দি আমাদের বিজয় হয়েছে এটাই চরম সত্য। কিন্তু এ বিজয় ছিনিয়ে আনতে আমাদের অনেক সহ-যোদ্ধাকে হারাতে হয়েছে, অনেককে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। এ বিজয়ের জন্য যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের সমগ্র দেশবাসীর অশেষ শ্রদ্ধা, ভালবাসা থাকবে। আর যে সমস্ত পরিবার তাদের প্রিয়জনকে এ যুদ্ধে হারিয়েছেন তাদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি।’ ভাষণের এক পর্যায়ে কতগুলো সারস দলবেধে আকাশ পথে উড়ে যাচ্ছিল। ভাষ্যকার সেদিকে অঙ্গুলী উচিয়ে বললেন, “আপনারা সব্বাই লক্ষ্য করুন উড়ন্ত এ শ্বেত সারসগুলো আমাদের জন্য সুখের বাণী বয়ে এনেছে, আসুন আমরা আমাদের সকল শোক ভুলে বৃহত্তর এ জয়ের আনন্দে সামিল হই। আসুন আমরা সবাই পরষ্পরের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময় করি।” এক রমনী যে ফুলের তোড়া নিয়ে তখনো অপেক্ষায় ছিল তার যুদ্ধ ফেরত সৈনিক প্রেমিককে খুঁজে পেতে ও ফুল দিয়ে বরণ করে নিতে। সে বুঝি নিশ্চিত হলো তার প্রেমিক আর কোন দিনই ফিরবে না। মেয়েটি তার হাতের ফুলগুলো একটি একটি করে প্রেমিকের সহযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়ে বুঝি শোককে প্রশমিত করতে চাইলো।

এ দৃশ্যের সাথে শতভাগ না হলেও অনেকাংশে মিল আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ উত্তর বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের সাথে। বনগাঁ থেকে যশোর অভিমুখে আমরা ক’জন জীপে করে ফিরছিলাম। আমাদের সম্মুখে-পিছনে মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়ির বহর। হুড খোলা জীপ, ট্রাক, বাসে করে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা মহান বিজয় শেষে নিজ দেশে ফিরছে প্রিয়জনদের সান্নিধ্য পেতে। রাস্তার দু’ধারে লাখো জনতার জয়ধ্বনি, হাতে ফুলের তোড়া। যশোর শহর অব্দি আসতে মুক্তিযোদ্ধা বহনকারী যানবাহন কেমন শোভিত হয়েছিল ফুলের পাপড়ির রং বাহারে। সবাই অপেক্ষায়মান প্রিয় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগতম জানাতে। দীর্ঘ নয় মাসের পুঞ্জিভূত ভালবাসা, ভাললাগা পরষ্পরের মাঝে এক বেগবান আবেগের ধারায় প্লাবিত করে তোলে। আনন্দাশ্রু প্রিয়জনদের হারানোর শোক মিলে-মিশে সহযাত্রী এ কাফেলায়। মুক্তি যুদ্ধকালীন

সময়ে হাজারবার শ্রুত গানের সুর- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা আমরা তোমাদের ভুলবোনা’ তখনো বেজে যচ্ছিল সমস্ত কোলাহলকে ছাপিয়ে। যুদ্ধ এবং শব্দের মধ্যে একটি নিবির সম্পর্ক বিদ্যমান, যুদ্ধে মাতি শব্দ নিয়ে। কিছু কিছু শব্দ তাই বেজেই চলে অনন্তের অহ্বানে। মন-প্রাণ ডুকরে উঠতে চায় কখনো শোকে কখনো সুখে। আমাদের চির চেনা আকাশেও সেদিন অগুনিত শ্বেত কপোত উড়েছিল শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে দিকে দিকে দেশ জুড়ে। এ যেন আরো একটি “দি ক্রেনস আর ফ্লাইং” ছায়া ছবির পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল সে দিনগুলোতে আমাদের মনের রূপোলী পর্দায়।

বিদ্যুত সরকার

টরন্টো

মন্তব্য