কবি গুরু রবি ঠাকুর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর এর একটি কাল্পনিক কথোপকথন (০১)

henry-baroiহেনরী পঙ্কজ বাড়ৈ

 

১২৬৮ বঙ্গাব্দ। ২৫শে বৈশাখ। সোমবার। ইংরাজি তারিখ ৭ মে, ১৮৬১। রাত ২টায় ২৮ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড। মঙ্গলবার কবি গুরু জন্মগ্রহন করলেন কলকাতায়, জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে। আজ তিনি শান্তি নিকেতনে তার প্রিয় বাড়িটির বারান্দায় বসে আছেন সফেদ সোফায়। আলখেল্লা পরিহিত মৌন ধ্যানমগ্ন কবি গুরু তাকিয়ে আছেন পুর্বে উদিয়মান সুর্যের দিকে। কবির কাছে আর একটি সোফায় বসা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ট সন্তান। ইতিহাসের মহানায়ক। জতির জনক ও স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের রূপকার। ব্যাকব্রাশ করা সাদা পাকা ঘন চুল। পড়নে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট। দেদীপ্যমান আয়ত চোখে কাল ফ্রেমের চশমা। যার জন্ম না হলে এই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতো না। সেই মহাপুরুষটির জন্মে ছিলেন ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ পরিবারে। ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি মহাপুরুষ বসে আছেন সামনা-সামনি। বঙ্গবন্ধু অপলক দৃষ্টি তাকিয়ে আছেন কবিগুরু দিকে। হৃদয়ের ভিতর মৃদু কম্পন তবু দৃষ্টি তার কবির ভাস্কর ধ্যানমগ্ন অবয়বের দিকে। সৌম্যকান্তি সফেদ শ্মশ্রুশোভিত মুখমন্ডল মুদ্রিত মায়ামহ চোখ দুটি আস্তে আস্তে উন্মোচন করলেন। বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলেলন, মজিব, অনেক দিন ধরে ভাবছি তোমাকে ডেকে আলোপ করব।

-মজিব: হ্যা, গুরুদেব, আমার সে সৌভাগ হয়নি আপনাকে স্বচক্ষে দেখার। আপনার গান কবিতা ছিল আমার কারা জীবনের অনুপ্রেরণা। আজ বলুন মনে উুজাড় করে শুনবো।

-রবি ঠাকুর: মজিব, তোমাকে প্রায়ই আজকাল স্মরণ করি।

-শেখ মজিব: কেন গুরদেব. আমাকে কেন আপনার মনে পড়ে আজকাল।

-রবি ঠাকুর: শুধু কি তোমার কথা মনে পড়ে, সুভাষের কথাও প্রায় আজকাল মনে পড়ে। তোমরা দুজনেই আমার কাছে বড় প্রিয়। আরও অনেকের কথা মনে পড়ে যেমন, মাস্টারদা সুর্য সেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার স্বদেশের জন্য নিঃর্স্বাথ আত্ম ত্যাগের কথা।

-শেখ মজিব: গুরুদেব, অবশ্যই কোন কারণ আছে আমাদের মনে পড়ার।

tagor_bangobandhu

-রবি ঠাকুর: অবশ্যই কারণ আছে, আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে আমি সভ্যতার সঙ্কট উপর বিশ্বভারতিতে একটা প্রবন্ধ পাঠ করে ছিলাম। সে সময় ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের। চারিদিকে কেমন হানাহানি, মৃত্যু, যুদ্ধ, মানুুষের প্রতি মানুষের মমতাবোধহীনতা আর ধ্বংসলীলায় মত্ত ছিল সারা ইউরোপ। ওরা ছিল আমাদের তুলনায় শিক্ষা-দীক্ষায় সর্ব বিষয় উন্নত। অথচ উগ্র দেশপ্রেমের মত এক ঠুনকো অহমিকার জন্য ধ্বংসের দাড় প্রান্তে পৌছে গিয়েছিল বিশ্ব। সেদিন মনুষ্যত্বের হার হয়েছিল পশুত্বের কাছে।

-শেখ মজিব: গুরুদেব, আজ আপনা মনটা এত ভারাক্রান্ত কেন একটু হলেও আচ করতে পারছি। সেই ৭৫ বছর আগে যে দুরদৃষ্টি মন নিয়ে সভ্যতার সঙ্কট উপলদ্ধি করেছিলেন। আজকের পৃথিবী এত উন্নত হয়ে মানুষের নিরাপত্তা নেই। প্রতিটি মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুনতা, প্রেমশীতলতা, ভ্রাতিৃত্ববোধহীনতা, সহমর্মিতার অভাব বিরাজ করছে। বিশ তিরিশ বছর আগেও মানুষ এত নিরাপত্তাহীনতায় মধ্যে বাস করে নাই। পৃথিবীটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে ক্রমশ।

-রবি ঠাকুর: তুমিতো আপাদমস্তক একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি তাই আমার মনের অবস্থাটা সহজে অনুমান করতে পেরেছ। কিন্তু মজিব, এই মানবজাতিই সৃষ্টি গোড়া থেকেই যেমন নিজেদের অস্তি¡ত্তের জন্য প্রকৃতি কাজে লাগিয়ে প্রভুত উন্নতি করে চলেছে। আবার নিজেদের স্বার্থে ধ্বংস করেছে প্রকৃতিকে। সৃষ্টি আর ধ্বংস বিপরিত মুখি অবস্থান চলছে এবং ভষিতে চলবে। কিন্তু সৃষ্টি, সৃজনশীলতা যখন ধবংসের কাছে অসহয় তখনি প্রশ্ন জাগে এই সভ্যতার সঙ্কট থেকে উত্তোরণের পথ মানব সমাজের কাছে খোলা আছে কিনা।

-শেখ মজিব: গুরুদেব বর্তমান গোটা মানব সমাজ এক মহা সঙ্কটের ভিতর দিয়ে চলছে। বিশ্ব উষ্ণতা, ধনি গরিবের বৈষম্য, উন্নত প্রযক্তি মানুষকে যেমন দুরকে কাছে করছে, আবার অবাধ ব্যবহারের খারাপ প্রভাব কোমল মতি কিশোর-কিশরিদের উপর পড়ছে। আর এক নতুন সঙ্কটে জন্ম হয়েছে তার নাম উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিবাদ। এক সময় আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। জীবনের কত মুল্যবান সময় জেলের নিভৃতিতে নিঃস্ব একা কাটিয়েছি দিনের পর দিন মাসের পর পর মাস বছরের পর বছর । স্বপ্ন এবং লক্ষ ছিল দেশের মঙ্গল আর নিরান্ন দুঃখী মানুষের মুখে দুবেলা খাবার, বাসস্থান আর নিরাপদ জীবন জাপনের ব্যবস্থা করা।

-গুরুদেব: মজিব, এই তুমি যে বল্লে, মহা সঙ্কট মধ্যে দিয়ে পৃথিবী গোটা মানব সমাজ চলছে। এই সঙ্কটের পরিনিতি কি এর থেকে উত্তীর্ণ হবার পথ কি। গোটা বিশ্বের নেতারা নিরলশ চেষ্ট করে নিরাশ। আমিও তো সব সময় বলে আসছি, মানুষের উপর বিশ্বাস হারান পাপ। মানুষের উপর আস্থা আমার আছে, ইতিহাসের বাকেঁ বাঁকে খুঁজে পাবে, মানুষই সঙ্কটের সাথে লড়াই করে সমাধানে পথ খুঁজে বের করেছে। কিছু মানুষ বিভ্রান্ত কিন্তু অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই শুভ চৈতন্য এবং মানবতা আজও বিরাজমান। তবু মাঝে মাঝে মন খারাপ হয় কেন এত অস্থিরিতা, কেন এই মানুষের মনে এত লোভলালসা, কেন এত বৈষম্যতা, উগ্রতা, অসষ্ণিতা, প্রতিটা ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্ম বাণী হচ্ছে শান্তি আর মানবতার। সবার উপরেই তো মানুষ। এইটাই তো চড়ম সত্য।

-মজিব: গুরুদেব, আপনি আমি ভাবি এই সব নিয়ে কিন্তু আমরা এখান থেকে কি করতে পারি। শুধু মহান সৃষ্টির্কতার কাছে প্রার্থণা করি যেন তিনি মানুষের মনে শুভ বুদ্ধি দেন। গুরুদেব অন্য প্রসঙ্গে আসি, আপনি আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, দেশের সঙ্কট মধ্যে দিয়ে জীবনের আশিটি বসন্ত পাড় করে ইহলোক থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। ইতিহাসের কত কিছুর সাক্ষী আপনি। বিশ্বজোড়া খেতাব, যশ, মান-সন্মান পেয়েছেন। আবার দুরের কাছের কত প্রিয়জনদের কাছ থেকে আপনি অপমান, অসৈজন্যমুলক ব্যবহার পেয়ে ব্যথিত হয়েছেন। হিমালয়ের মত মৈনতা নিয়ে ওদের ক্ষমা করেছেন। শেষ বয়সে শান্তিনিকেতন নির্জনে বারান্দায় বসে গোধলির বেলার শেষ লাল আভা ছড়িয়ে যখন সূর্য অস্তমান তখন নীরবে চোখের জলের ধারায় আপনার আচকান ভিজে যেত। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে হিসাব কষেছেন কি নিয়ে যাবেন. কি দিয়ে গেলেন।

-গুরুদেব: মজিব, এই যে সুন্দর করে বল্লে, জীবন-মৃত্যুর শেষ প্রান্তে এসে হিসাব কষেছি। কি পেলাম আর কি দিলাম। পেয়েছি অনেক দিয়েছি কম মনে হয়। আমার জন্ম না হলেও এই সমাজ ব্যবস্থা ্একই ভাবে বির্বতনের ভিতর দিয়ে নিজের পথে এগিয়ে চলত। বাংলা ভাষা, সাহিত্য তার সমৃদ্ধির ধারা বিপুল পল্লবে পল্লবিত হত। ভাবতে ভাল লাগে তোমারা পুর্ব বাংলার লোকেরা মাতৃভাষার জন্য পথে আন্দোলন করেছ। তরুন যুবকরা বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছে। তোমাদের এই মাতৃভাষার প্রতি দরদ আমাকে অভিভুত করে। ৫২-র ভাষা আন্দোলনে তোমার বলিষ্ঠ ভুমিকা চিরদিন বাংলার মানুষ স্মরণ করবে।

-মজিব: গুরুদেব আপনার জন্ম না হলে এইটুকু একজন সচেতন বাঙালি হয়ে বলতে দ্বিধা নাই। আপনার প্রতিটি সাহিত্য কর্ম, বিশেষত আপনার গান, কবিতা বাঙালির হূদয় মননে মিশে গেছে। জন্ম থেকে মৃত্যু, ষঢ় ঋতুকে আপনার কাব্য মাধুর্যের প্রচুর্য দিয়ে প্রাঞ্জল করে রেখেছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়কে। আমাকে পাক বাহিনি একাত্তরের পচিশে মার্চ যখন ধরে নিয়ে যায় তখন বাঙালিরা দিশাহারা। লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে শেষ বিকেলের পড়ন্ত বেলায় ১৯৭১ শালের আমার ৭ই মার্চের ভাষণে অনুপ্রনিত হয়ে ঝাপিয়ে পড়ে হাজার হাজার যুবক মুক্তিযুদ্ধে । আর মুক্তিসংগ্রামে আপনার দেশাত্মবোধক গান আর কবিতা সাহস যুগিয়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে স্বাধীনতার জন্য লড়তে। আমার জীবনের নির্জন কারান্তরালে আপনার গীতবিতান আর পবিত্র কোরান ছিল উজ্জীবিত শক্তি যা আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে ভষিতের জন্য লড়তে। ১৯৪৮ পাকিস্তানে ভ্রমন কালে কয়াক জন পাকিস্তানিকে আপনার গান ” আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” আবৃত্তি করে শুনিয়ে ছিলাম। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যেনে উদত্ত কন্ঠে বলে ছিলাম, ফাসির মঞ্চে যাওয়ার সময় বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। গুরুদেব আরও গর্ব এবং বিশ্বাস নিয়ে বলেছিলাম আপনাকে উদ্দেশ্য করে. ”সাত কোটি বাঙালীকে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি”কবি গুরু সেদিন আরও বলেছিলাম, ”দেখে যাও, তোমার . সাত কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।” একটু খানি নীরবত দুজনের মাঝে।

-কবি গুরু: মুজিব তুমি আজ একটু ভাব প্রবন হয়ে পড়েছ। থামলে কেন, বল মন উজাড় করে দেও আজ, আমি শুন বলেই তো তোমাকে স্মরণ করেছি।

-মজিব: কি বলবো গুরুদেব, যে আশা-অকাংখা নিয়ে জীবনের ১২টি বছরের বেশী সময় জেলের অন্তরালে কাটিয়েছি। পকিস্তানে শাসকগোষ্টীর শাসন-শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়ন, বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছি। সেইদিন থেকে বুঝেছিলাম, জাতীয় মুক্তি অর্জন ছাড়া বাঙালির সর্বিক উন্নতি হবে না। আমার জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকামার টুঙ্গিপাড়া অজপাড়াগায়। আমার শৈশব-কৈশর বয়ঃপ্রাপ্তকাল থেকে দেখে আসছি গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের অবস্থা, জমিদারদের শাসন-শোষন। কলেজে পড়ার সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালিন বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, মানুষের মৃত্যু, হাহাকার। ঝঁপিয়ে পড়লাম লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সেবায়। তবু আমি জেল-জুলম, র্নিযাতন, মৃত্যৃকে ভয় করিনি কখনও। মৃত্যুও শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে ভালবেসেছি।

-কবি গুরু: মজিব তোমার চোখের জল আমাকে বিহবল করে। তোমার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় জেল-জুলাম, অনাহার, শারীরিক র্নিযাতন, মৃত্যু ভয় তুচ্ছ করে তোমার অভিষ্ট লক্ষে পৌছাতে পেরেছিলে। কত বড় বড় মানুষ তো তাদের অভিষ্ট লক্ষে চেষ্টা করের পৌছাতে পারে নাই। তুমিই তো সেই কিংবদন্তি রূপকার যার নেতৃতে একটি স্বাধীন দেশ জন্ম লাভ করেছে। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসের বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করে নিজেকে প্রমান করলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালী। (চলবে)

মন্তব্য