লিয়ার লেভিন এর ক্যামেরার “মুক্তির গান” মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শাণিত করা এক চলচ্চিত্র

Monish

মনিস রফিক

বাঙালি বিস্মৃতিপ্রিয় জাতি। নিজের জাতি সর্ম্পকে এমন কথা কেউ উচ্চারণ করলে তার নিজের ভিতরটায় নিশ্চই হুহু করে বেদনার স্রোত বয়ে যায়। ১৯৭১ সালে এই জাতি যে ত্যাগ স্বীকার করেছে পৃথিবীর ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এটা নজিরবিহীন। এত মানুষের মৃত্যু, এত দীর্ঘ রক্তের স্রোত ; কিভাবে ভুলে যাবে মহাকাল? কিন্তু এই বাঙালি জাতি বার বার তা ভুলে যায়। আর এই বার বার ভুলে যাওয়া থেকে আমাদেরকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাছে বার বার নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশে প্রথম যে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি পরম দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের মুক্তির গান। এটা বলা নি¯প্রয়োজন, বাংলাদেশে মুক্তির গানই একমাত্র প্রামাণ্য চলচ্চিত্র যেটা যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ লাইন ধরে টিকিট কেটে দেখেছেন এবং অনেকেই ছবিটি দেখতে দেখতে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছেন। মানুষের এমন কান্না আসে হয়তো চোখ দিয়ে নামে নিজেকে চিনতে পারার বেদনায় অথবা নিজের বিস্মৃতির গ্লানি ধুঁয়ে দেওয়ার মনোবাসনায়। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের দীর্ঘ অধ্যাবসায়, স্বপ্ন আর ইতিহাসকে অস্বীকার করা সব মানুষদের চাবুকের সপাৎ আঘাত করার কৌশল মুক্তির গানকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করে।

mukti

১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামক একটি  সাংস্কৃতিক দলের নিত্যদিনের তৎপরতা ও অভিজ্ঞতাকে সেলুলয়েডে ধরে রাখেন  মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন। বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামী শিল্পীরা ট্রাকে করে তখন ছুটে বেড়াতেন পশ্চিমবঙ্গের পথে প্রান্তরে। গান গেয়ে উজ্জীবিত করতেন যুদ্ধের জন্য তৈরি মুক্তিযোদ্ধাদের আর রিফিউজী ক্যাম্পের সব অসহায় মানুষদের। ট্রাকের পেছনেই থাকতো আরেকটি বাহন যেটাতে থাকতেন লিয়ার লেভিনের ক্যামেরার যন্ত্রপাতি আর শ্যুটিং দল। সেলুলয়েডের ক্যারাভানে ঘুরতে ঘুরতেই লিয়ার লেভিন সৃষ্টি করেছিলের আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অমূল্য দলিল। লিয়ার লেভিন শ্যুট করতে গিয়ে যেসব মানুষদের উনি দেখেছেন যোদ্ধা হিসেবে, তাদের তীক্ষèচোখ আর বলিষ্ঠ মনোবল দেখে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবে আর তিনি থাকবেন মাটির বিজয়ী সন্তানদের পেছনে ক্যামেরা নিয়ে শ্যুট করতে করতে তিনি ঢাকায় প্রবেশ করবেন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কোলকাতায় উপকণ্ঠে শ্যুটিং

করার সময় ডিসেম্বরের কোন এক দিনে তাকে কলকাতা পুলিশ মার্কিন গুপ্তচর সন্দেহে ভারত থেকে বহিস্কার করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে তখন ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক কঠিন সম্পর্ক।

লিয়ার লেভিনের শ্যুটিংকৃত সেই ক্যানের পর ক্যান তিনি ফেলে রেখেছিলেন তাঁর বাড়ীর বেইজমেন্টে। তিনি আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধারণকৃত ফুটেজগুলো হয়তো তিনি আর সম্পাদনার টেবিলে নিয়ে যেতে পারবেন না।

১৯৯০ সালে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ লিয়ার লেভিনের সেই ক্যানগুলোর সন্ধান পেয়েছিলেন। তাঁরা তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টাটেন আইল্যান্ডে বসবাস করছিলেন। লিয়ার লেভিনের কাছে গিয়ে তারা যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা জানালেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার ধারণকৃত ফুটেগুলোর কথা বললেন, লিয়ার লেভিন তাদেরকে তাঁর বাড়ীর বেইজমেন্টে নিয়ে গিয়েছিলেন। ‘বাংলাদেশ’ স্টিকার লাগানো বেইজমেন্টটায় ছিল ক্যান আর ক্যান। লিয়ার লেভিন জেনেছিলেন, তারেক মাসুদ বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার শ্যুটিংকৃত দলনেতা মাহমুদুর রহমান বেনুর চাচাতো ভাই। লিয়ার লেভিন তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের আগ্রহ ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং মনের অজান্তেই বলে ফেলেছিলেন, এই মাহেন্দ্রক্ষণটার জন্যই তিনি এতদিন অপেক্ষা করেছেন।

learlevin1206

লিয়ার লেভিন

taraq-masud

তারেক মাসুদ

catharin

ক্যাথরিন মাসুদ

১৯৯০ সালে উদ্ধারকৃত এই ফুটেজকে ভিত্তি করে এবং তার সাথে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দৃশ্যসমূহের সংযোজন ও সমন্বয় করে নির্মিত হয়েছে মুক্তির গান প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি। ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট দৈর্ঘের ‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির প্রধানতম উলে¬খযোগ্য দিক হচ্ছে এটা দর্শকদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাছে নিয়ে যায়। দুর্লভ সেই ফুটেজগুলোতে দর্শক জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধের ভয়ারহতা কেমন ছিল আর পাকিস্তানী সেনা সদস্য ও শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতা ও কর্মকান্ড কতটা পাশবিক আর নিষ্ঠুর ছিল।

মুক্তির গান এর শুরুতেই পর্দায় ভেসে আসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষন। বার্ড আই ভিউ মুভিং শট। একদিকে এক বিশালত্বের গতির সাথে গণমানুষের সম্মিলিত অংশ আর সাউন্ড ট্যাকে হাজার হাজার মানুষের সংগ্রামী কন্ঠস্বরের বিস্ফোরণ। তারপর বঙ্গবন্ধুর ভরাট কণ্ঠের দিক নির্দেশনা শুরুর দৃশ্যই দর্শকদের জানিয়ে দেয় কঠিন কিছু একটা হতে যাচ্ছে। এর পরই শুরু হয় গোলাগুলির শব্দ, মানুষের প্রাণপনে ছুটে চলা আর আহাজারি। বাংলার লাখ লাখ মানুষ তাদের শেষ সম্বলটি মাথায় বা কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেছে অজানা গন্তব্যে। শত শত পথ হেঁটেই পাড়ি দিয়েও তারা জানে না তারা কোথায় যাচেছ। তারা শুধু পাকিস্তানী বর্বর সেনাদের লেলিহান আগুনের আঁচ থেকে একটু বাঁচার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালানোর শেষ চেষ্টা করছিলেন আর একটু শান্তিতে মরতে চেয়েছিলেন।

‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রের শুরুর এই চলচ্চিত্রিক বিন্যাসের গতি ছবিটি শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায়। দর্শক একেবারে চলে যায়, ১৯৭১ সালের পশ্চিম বঙ্গের মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে অথবা শরণার্থী শিবিরগুলোতে। থরথরে অনিশ্চিয়তার দিকে তাকে সব অসহায় মানুষগুলো যে বাংলার সাধারণ গণ মানুষ, মুক্তির গান আমাদের সেই জ্ঞানকে প্রগাঢ় করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যাদের অবদান আমাদের সবার প্রথমে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা উচিৎ তারা হচ্ছেন ! বাংলার সলিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, জগাই, মাধাই, আম্বর আলী, তাম্বর আলী। একেবারে সাধারণ খেটে গাওয়া সব মাটির মানুষ। মা-মাটির প্রয়োজনে শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। খালি পা, নেংটি মেরে, মাথায় গামছা বেধে কাঁধে বন্দুক নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে লড়াই চালিয়েছেন পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে।

 

মুক্তির গান’ই আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র গুটি কয়েক আর্মি, পুলিশ, রাজনীতিবিদ বা ছাত্রদের নয়, এটা গণমানুষের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ দেশ মাকে রক্ষার যুদ্ধ যাতে অংশ নিয়েছিলেন সবশ্রেণীর মানুষ।

মুক্তির গান এ বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার যে দলটি ট্রাকে করে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের বা অসহায় মানুষদের গান শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব নিয়েছিল, সেই শিল্পীদের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ার একটি দিক হলেও তার দর্শকদের সামনে পরিস্কার হয়ে যায়। এগার জনের এই দলে মাহমুদুর রহমান বেনু ছাড়াও অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন, শাহীন মাহমুদ, নায়লা জামান, লুবনা মরিয়ম, স্বপন চৌধুরী, বিপুল ভট্টাচার্য, শারমীন মুরশিদ, দেবব্রত চৌধুরী, লতা চৌধুরী, দুলাল চন্দ্র শীল ও তারিক আলি। আর এই এগার জনের পেছনে ছিলেন লিয়ার লেভিন আর তাঁর ইউনিটের পাঁচজন, মার্শা এ্যাপেট, রিচার্ডে লেভাইন, হেনরী মিল¬াত, লিন্ডা মিল¬াত ও ফ্রাংক জেল।

প্রায় কুড়ি ঘন্টার ফুটেজগুলো তিন চার বছর অবিরাম পরিশ্রমে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন সেটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রামাণ্য দলিল হিসেবে রয়ে গেছে।

সঙ্গীত নির্ভর এই প্রামাণ্য চলচ্চিত্র আমাদেরকে প্রতি মুহূর্তে আবেগায়িত করে। তখন হু হু করে কেঁধে উঠি আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কি অমানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই দেশের মানুষ আর এ দেশের মাটিকে। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের সফল হয়েছেন এই জায়গাতেই যেখানে তারা মুক্তিযুদ্ধের বেদনা সাধারণ দর্শকদের স্পর্শ করাতে সক্ষম হয়েছেন।

কুড়ি ঘন্টার ৩৫ মিলি মিটারের রীলগুলো বছরের পর বছর দেখে দেখে ঠিকঠাক করে তাঁদের সম্পাদনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া এ কাজ সম্পাদন করতে হয়েছে। মুক্তির গানের কাঠামো সাজিয়ে শটের পর শট সাজিয়ে সম্পাদনার টেবিলে যে ছবিটি তৈরি করেছেন তাতে সিংহভাগ কৃতিত্ব দিতে হয় সম্পাদকদ্বয়কে যার দায়িত্ব এই দম্পত্তিই পালন করেছেন। সেই সাথে এ ছবির তৈরি হওয়ার পক্রিয়ায় বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলেন এবং যাঁদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া ছবিটির কাজ শেষ করতে আরো সময় লাগতো তারা হচ্ছেন ছবিটির সহকারী পরিচালক দিনা হোসেন ও চলচ্চিত্র সংসদ ব্যক্তিত্ব জুনায়েদ হালিম।

নব্বই এর দশ ছিল বাংলাদেশের জন্য এক মহাক্রান্তিকাল। মাত্র কুড়ি বছর আগে ঘটে যাওয়া এত বড় এক ঘটনা আমরা ভুলে যেতে বসেছিলাম। সেই সময় তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’ আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের কাছে নিয়ে যান এবং ফিরে ফিরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দেন। হৃদয়ের সমস্ত শ্রদ্ধা এই দুইজন প্রিয় মানুষকে। আর মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা আমাদের সবার সামনে তুলে ধরতে যে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা সময়ের প্রয়োজনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন সেই লিয়ার লেভিন এর প্রতি আমাদের ঋণ কোন দিন শোধ হবার নয়। লিয়ার লেভিন অনন্তকাল ধরে অতি সম্মানের সাথে বেঁচে থাকবেন বাংলার শান্তিকামী প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

মনিস রফিক, টরন্টো।

মন্তব্য