টরন্টোতে সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হলে কি করবেন?

 

২০১৬ সালে গড়ে প্রতিদিন ১৯২ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে টরন্টোতে

গতবছর টরন্টোতে ৭০,০০৪ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ছবি : সিবিসি

গতবছর টরন্টোতে ৭০,০০৪ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ছবি : সিবিসি

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : ২০১৬ সালে টরন্টোতে ৭০,০০৪ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাস্তায় স্নো বা আইসি কন্ডিশন থাকলে দুর্ঘটনার হার বেড়ে যায়। এর সঙ্গে মদ্যপ ড্রাইভার, বেপোরোয়া ড্রাইভার ও আইন অমান্যকারী ড্রাইভারের উৎপাত তো টরন্টোর সড়কগুলোতে আছেই। আপনি যত ভাল ড্রাইভারই হোন না কেন, রাস্তায় যদি উৎপাতকারী ঐ ড্রাইভারদের উপস্থিতি থাকে তবে দুর্ঘটনার কবলে পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। টেইল গেটিং, যেখানে লেন পরিবর্তন করার নিয়ম নেই সেখানে লেন পরিবর্তন করা, স্পিড লিমিট ৫০ এর জায়গায় ৬০ বা ৭০, ৬০ এর জায়গায় ৭০ বা ৮০, কিংবা ১০০ এর জায়গায় ১৩০, ১৪০ বা তারো বেশী স্পীডে গাড়ি চালানোর প্রবণতা কিছু কিছু ড্রাইভারের মধ্যে আছে এই টরন্টোতে।

সুতরাং দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নিয়েই গাড়ি চালাতে হয় টরন্টোর সড়কগুলোতে। এখন দুর্ঘটনা যদি ঘটেই যায় তবে কি করবেন? ইন্সুরেন্স কোম্পানীগুলোতো ওত পেতেই বসে থাকে কখন কি ভাবে আপনার প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে। টরন্টোতে গাড়ির ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম এমনিতেই অনেক বেশী। গ্লোব এন্ড মেইল এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, কানাডায় সবচেয়ে বেশী প্রিমিয়াম দিতে হয় অন্টারিওবাসীদেরকে। ২০১২ সালে অন্টারিওর ড্রাইভারদেরকে গড়ে ১৫৪৪.৮৬ ডলার প্রিমিয়াম দিতে হয়েছে প্রতিটি গাড়ির জন্য। আলবার্টার তুলনায় এটি ৪৫% বেশী।

কানাডার অন্যান্য শহরের তুলনায় টরন্টোর ড্রাইভারগণ কতটা বেশী প্রিমিয়াম প্রদান করে থাকেন তার একটি তুলনামূলক হিসাব তুলে ধরা হয় গ্লোব এন্ড মেইল পত্রিকায়। হিসাব টা এরকম – একজন ২০ বছর বয়সী পুরুষ ড্রাইভার যার কোন এক্সিডেন্ট রেকর্ড নেই তিনি যদি উইনিপেগে ২০০৮ সালের হোন্ডা সিভিক ডিএক্স টু ডোর গাড়ি চালাতে যান তবে তাকে বছরে অটো ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হবে ১,৩৯৬ ডলার। এই কোটেশন ছিল কেনিটিস্ক.সিএ ইন্সুরেন্স কোম্পানীর। কোটেশনের জন্য অন্যান্য যে তথ্য দেয়া হয়েছিল তা হলো, বেড়ানোর জন্য গাড়িটি বছরে ১৫ হাজার কিলোমিটার চলবে। (স্কুলে বা কর্মস্থলে যাবার জন্য নয়)। সেই একই ব্যক্তিকে ক্যালগারিতে এই গাড়িটির জন্য ইন্সরেন্স করতে গেলে প্রিমিয়ামের জন্য পে করতে হতো ২,৯৭৩ ডলার থেকে ৩,৭৮৯ ডলার। আর টরন্টোতে? ৪,২৩৯ ডলার থেকে ৯,২৭০ ডলার!

অন্টারিওর ড্রাইভারগণ জিম্মি হয়ে আছেন ইন্সুরেন্স কোম্পানীগুলোর কাছে। কোন প্রতিকার নেই। এখানে প্রভিন্সিয়াল নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে রাজনীতিবিদগণ প্রতিশ্রুতি দেন নির্বচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে অটো ইন্সুরেন্স এর প্রিমিয়াম কমিয়ে আনবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ঐ প্রতিশ্রুতির পরিনতি কি হয়েছে তা প্রতিটি ড্রাইভারই জানেন।

টরন্টোতে সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হলে কি করবেন সেই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। সিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হলে প্রথমেই আপনাকে পুলিশ ডাকতে হবে। সেই সাথে প্রয়োজনে এম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের লোকদেরকেও ডাকতে হবে।

এরপর বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই যা হয় তা হলো, আপনাকে হয়তো নিকটস্থ কলিশন রিপোর্টিং সেন্টারে যেতে হবে দুর্ঘটনার তথ্যগুলো জানানোর জন্য।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে টরন্টোর পুলিশ কিছু নতুন নিয়ম করেছে গাড়ি দুর্ঘনাস্থলে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে। ঐ সময় সিটি নিউজের এক খবরে বলা হয়, টরন্টো পুলিশ এখন থেকে আর ছোটখাট সড়ক দুর্ঘটনাস্থলে আসবে না। এমনকি কেউ সামান্য আহত হলেও না। মার্চ মাসের ২৯ তারিখ থেকে টরন্টো পুলিশের এই নতুন নিয়ম চালু হয়।

ঐ খবরে আরো বলা হয়, ২০১৫ সালে টরন্টো পুলিশ ৬৪ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত বা পরিদর্শন করতে যায় যার প্রায় শতকরা ৭০ ভাগই ছিল ছোটখাট দুর্ঘটনা। পুলিশ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে টরন্টো পুলিশ এখন থেকে গুরুতর বিষয়সমূহের দিকে বেশী নজর দিতে পারবে। তারা আরো জানায় টরন্টোর রাস্তায় দিনে দিনে গাড়ির সংখ্যা এবং পথিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না টরন্টো পুলিশ তাদের বর্তমান র্কর্মী সংখ্যা নিয়ে।

ছোটখাট দুর্ঘনায় পতিত ড্রাইভারদেরকে এখন থেকে নিকটস্থ কলিশন সেন্টারে যেতে হবে রিপোর্ট করার জন্য।

সিটি নিউজের খবরে আরো বলা হয়, তবে টরন্টো পুলিশ ছোটখাট সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত বা পরিদর্শন করতে এখনো যাবে যদি এর সাথে অপরাধমূলক কোন ঘটনার সম্পর্ক থাকে, মাদক বা এ্যলকোহলের এর কোন সম্পর্ক থাকে এবং পথিক বা সাইকেল চালকের আহত হওয়ার কোন ঘটনা ঘটে থাকে।

অর্থাৎ ছোটখাট দুর্ঘটনায় পতিত ড্রাইভারদের জীবন আরো কঠিন করে তোলা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে পুলিশ না আসলে কিছু কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায় না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি সুযোগ বুঝে পরিস্থিতি নিজের অনুকুলে আনার চেষ্টা করেন।

আপনি যদি ছোটখাট দুর্ঘটনায় পতিত হন তবে আপনাকে নিকটস্থ কলিশন রিপোর্টিং সেন্টারে যেতে হবে। সেখানে আপনি আপনার দুর্ঘটনার যাবতীয় তথ্য দিবেন। কলিশন রিপোর্টিং সেন্টারে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা আপনার তথ্য সংগ্রহ করবেন, দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ির ছবি নিবেন। তারা যাবতীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে তা সংশ্লিষ্ট ইন্সুরেন্স কোম্পানীর দফতরে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। ইন্সুরেন্স কম্পানী তখন সেই তথ্য দেখে নির্ধারন করবে ক্ষতিপূরণ কত দেয়া হবে বা আদৌ দেয়া হবে কি না। কলিশন রিপোটিং সেন্টারে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে পারেন দুর্ঘটনার ব্যপকতা দেখে বা দায়ী ড্রাইভারের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে।

স্টেট ফার্ম ইন্সুরেন্স কোম্পানীর মিডিয়া রিলেসন্স ডিরেক্টর জন বর্ডিংনন বলেন, কলিশন রিপোর্টিং সেন্টারের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ড্রাইভারকে ইন্সুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

 

দুর্ঘটনায় আপনি যদি দায়ী না হন

আপনি যদি মনে করেন সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আপনি দায়ী নন তবে সে ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে যা আপনার জন্য ভাল হবে।

পারসনাল ইনজুরী ল-ইয়ার মাইকেল স্মিটিয়াস জানান, সম্প্রতি হ্যামিলটনে তিনি একটি কেস জিতেছেন যেখানে তার ক্লায়েন্ট দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আদালতে বিচারক তার রায়ে বলেন, ঐ দুর্ঘটনার জন্য সিটি কর্তৃপক্ষও অর্ধেক দায়ী। কারণ, তারা দুর্ঘটনাস্থলের স্টপ লাইনটি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করেনি। স্টপ লাইনটির রং উঠে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল যা সহজে গাড়ি চালকের নজরে আসেনি। বিচারক আরো বলেন সিটি মাত্র ১০০ ডলার ব্যয় করে স্টপ লাইনটি পুনরায় রং করতে পারতো। কিন্তু তা না করার কারণে ৩৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে।

মাইকেল স্মিটিয়াস বলেন, একই যুক্তি খাটানো যেতে পারে যদি শীতের সময় রাস্তার স্নো বা আইস ঠিকমত পরিষ্কার করা না হয় এবং সে কারণে কেউ যদি দুর্ঘটনায় পতিত হন তার বেলায়ও।

দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিগণও তাদের ওয়ার্ক প্লেসের মাধ্যমে সর্ট টাইম বা লং টাইম ডিজএবিলিটি ফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন। ইন্সুরেন্স পলিসি অনুযায়ী আপনি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হন বা না হন, বেসিক এক্সিডেন্ট বেনিফিটের জন্য যোগ্য হতে পারেন। আপনি ইন্সুরেন্স করার সময় অতিরিক্ত কভারেজও কিনতে পারেন বিভিন্ন ধরণের আঘাত বা জখমের জন্য।

 

আপনি কি লিগ্যাল একশনে যেতে পারেন?

হ্যা, আপনি লিগ্যাল একশনে যেতে পারেন। আপনি যদি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী না হন তাহলে যে দায়ী তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। পারসনাল ইনজুরী ল-ইয়ার মাইকেল স্মিটিয়াস বলেন, আপনার ইন্সুরেন্স কভারেজে যদি পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের সুযোগ না থাকে তবে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। তবে আপনি যদি মনে করেন মামলা করলে আদালতে তা ফয়সালা হতে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং আপনার যদি সন্দেহ থাকে যে, মামলায় জয়ী নাও হতে পারেন তখন পারসনাল ইনজুরী ল-ইয়ারগণ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিতে পারেন। অধিকাংশ ল-ইয়ার তখন সম্ভাব্য মক্কেলের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বিনা পারিশ্রমিকে। আপনাকে লিগ্যাল ফি নিয়েও চিন্তা করতে হবে না যতক্ষণ না মামলায় আপনি জিতেন। মামলায় জিতলে পরে ল-ইয়ারের পারিশ্রমিকের বিষয়টি আসবে। আর মামলায় না জিতলে কোন পারিশ্রমিকই দিতে হবে না।

মাইকেল স্মিটিয়াস বলেন, সাধারণভাবে সবারই উচিৎ দুর্ঘটনায় পতিত হলে সব প্রমানাদি সঠিকভাবে সংগ্রহ করা ও তা সংরক্ষিত করা। কারণ ভবিষ্যতে মামলা করতে হলে এই প্রমাণপত্রগুলোই কাজে দিবে জিতার জন্য।

 

আপনার ইন্সুরেন্স প্রিমিয়ামের কি হবে?

ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম কম রাখার জন্য সবচেয়ে সঠিক পথ হলো, ড্রাইভিং রেকর্ড ক্লিন রাখা। অর্থাৎ রাস্তায় যতটা সম্ভব সতর্ক ও সযত্মভাবে ড্রাইভ করা যাতে করে কোন দুর্ঘটনায় পতিত না হতে হয়।

তবে প্রথমবারের মত দুর্ঘটনার শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে ইন্সুরেন্স কোম্পানীগুলো প্রিমিয়াম বৃদ্ধি করে না। ‘ফার্স্ট টাইম ফরগিভনেস’ নামের একটি প্রথা চালু আছে এই ক্ষেত্রে। তবে অনেক ইন্সুরেন্স কোম্পানী এর জন্য আলাদা একটি ফি জুড়ে দেয় প্রিমিয়ামের সঙ্গে। তবে দ্বিতীয়বার দুর্ঘটনায় পতিত হলে প্রিমিয়াম বৃদ্ধি হয়তো ঠেকানো যাবে না। প্রিমিয়াম বৃদ্ধি বা হ্রাসের বিষয়টি নির্ভর করে আপনার ড্রাইভিং রেকর্ড, ইতিপূর্বে ক্লেইম করেছেন কি না, আপনার ইন্সুরেন্স প্রভাইডার কে ইত্যাদির উপর।

মন্তব্য