বেঁচে থাকো সুদূরিকা

হাসান জাহিদ

 

hassan

একটা ভ্যাপসা গরম বিরাজ করছে। গতকাল থেকে বৃষ্টি হবো-হবো করছে, কিন্তু বৃষ্টি হয়নি। জলাশয়ের কিনারে পা ছড়িয়ে বসে আজিজুর রহিমের মনে হলো, বর্ষাকালে বৃষ্টি না হলে এই ঋতুর অন্য নাম হওয়া উচিৎ‒যেমন, অনাবৃষ্টিকাল। নিজের এই উদ্ভাবনে নিজেকে মনে মনে বাহবা দেন তিনি এবং খানিকটা হাসলেন নিঃশব্দে।
তিনি কালো পানির বিশাল জলাশয়ের কিনারায় বসে শ্যামলা আকাশ দেখছিলেন। তিনি কেন এত মেঘ চাইছেন‒নিজেও জানেন না। শুধুই কি ভ্যাপসা গরম থেকে রক্ষা পেতে? তাঁর সেরকম মনে হলোনা। কিছুক্ষণ পর উত্তর পেলেন তিনি‒একটু স্বস্তি পেতে চান। আকাশে জমে থাকা ওই মেঘ হলো স্বস্তি‒আর সেই স্বস্তিটা নেমে আসছে না বলে তিনি অশান্তিতে ভুগছেন। মনে হলো, শান্তি যেন ধরা দিই-দিই করে তাঁর সাথে লুকোচুরি খেলছে।
স্থানটা তাঁর খুব প্রিয়। বড় জলাশয়, ওই পাড়ে সবুজ বনানী। ঢাকা শহরে এমন নিরিবিলি প্রশান্তময় স্থান আর হতে পারেনা। হলেও সেটা বিস্ময়কর। তিনি আবার ভাবলেন, অস্থির শহরের অস্থির মানুষগুলো যদি এখানে এসে একটু বসত, প্রকৃতির কাছাকাছি হতো, তাহলে মনের কালিমা দূর হয়ে যেত। তিনি তাকিয়ে থাকেন কালো পানিতে শ্যামলা মেঘের প্রতিবিম্বের দিকে। পশ্চিম আকাশে একটা ইষৎ আভা। তিনি তাঁর পুরনো সিকো অটোমেটিক ঘড়িতে সময় দেখলেন, বিকেল পাঁচটা। অন্যদিন বিকেল পাঁচটায় তিনি এখানে আসেন, থাকেন সাতটা পর্যন্ত। আজ চারটায় এসেছেন, এবং এখন চলে যাওয়ার মনস্থ করলেন।
তিনি ঢাল থেকে উঠে ঘেসো জায়গায় দাঁড়ালেন। আরেকটু ওপরে চিকণ মসৃণ রাস্তা দিয়ে দর্শনার্থীরা যাওয়া-আসা করছে। দূর থেকে বাঘের গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে।
হঠাৎ তাঁর নজরে এলো ঘাসের ওপর এক অতি বৃদ্ধ কী যেন খুঁজছেন আঁতিপাঁতি। আজিজুর রহিম সেদিকে অবাক হয়ে তাকালেন। তিনি কৌতুহল সামলাতে না পেরে অতি বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন বৃদ্ধ কী খুঁজছেন।
‘পাথর খুঁজছি,’ অতি বৃদ্ধ লোকটি আজিজুর রহিমের দিকে না তাকিয়েই বললেন।
‘পাথর!’ আজিজুর রহিম উচ্চারণ করলেন।
‘হ্যাঁ, অবাক হচ্ছেন কেন? আমি পাথর খুঁজছি।’ এবার তিনি এক পলক তাকালেন আজিজুর রহিমের দিকে।
‘এখানে পাথর পাওয়া যায়?’ আজিজুর রহিম জানতে চাইলেন।
অতি বৃদ্ধ লোকটা কটমট করে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি আমার হারিয়ে যাওয়া পাথর খুঁজছি। রত্ম পাথর।’
‘কী রঙের পাথর?’ আজিজুর রহিম আবার প্রশ্ন করলেন।
অতি বৃদ্ধ এবার দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘আপনি যদি খুঁজে পান, তবে তো দেখতেই পাবেন কী রঙের।’
‘না, মানে বলছিলাম এজন্য যে,’ আজিজুর রহিম কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন, ‘যদি পাথরটার রং সবুজ হয়, তাহলে এই ঘাসে একে পাওয়া মুশকিল হবে। আপনি কি নিশ্চিত পাথরটা এখানে হারিয়েছে?’
‘আমি এটা এখানেই হারিয়েছি ’ বলে বৃদ্ধ ফের পাথর খোঁজায় ব্যস্ত হলেন।
‘আপনার সাথে সাথে যদি আমিও খুঁজি?’ আজিজুর রহিম আবারও বললেন।
‘খুঁজুন, কিন্তু পেলে আবার নিয়ে যাবেন না যেন।’
আজিজুর রহিম এবার উষ্ণ হয়ে বললেন, ‘আপনার তো দেখি মাথা বিগড়ে গেছে। নিয়ে যাওয়ার হলে তো আমি পরে এসে চুপিচুপি পাথরটা খুঁজতাম। আপনার কাছে এখন পাথর খোঁজার অনুমতি নিতাম না।’
অতি বৃদ্ধ কিছু বললেন না। এবার দুই বুড়ো পাথর খুঁজতে লাগলেন। একজন অতি বৃদ্ধ, অন্যজন বৃদ্ধ, মানে একষট্টি বছর বয়সের। একটু দূরে, সরু রাস্তাটায় দর্শনার্থীদের মধ্যে কয়েকজন দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা উৎসুক দৃষ্টিতে দুই বৃদ্ধকে ঘাসের বুকে দৃষ্টি রেখে একবার এদিকে, আরেকবার অন্যদিকে দ্রুত পদে হাঁটতে দেখে ভাবল‒চিড়িয়াখানায় আবার এই দু’টো কোন্ জন্তু?
দুই বৃদ্ধ এমনভাবে পাথরটা খুঁজছিলেন যেন তাঁরা মাটি শুঁকছেন এবং তাঁদের ভঙ্গি ছিল হাস্যকর। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন আজিজুর রহিম। তিনি ছুটে গেলেন অশীতিপর বৃদ্ধের দিকে‒তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন ক্ষুদ্র বস্তুটা। অতি বৃদ্ধ ভদ্রলোক বিমূঢ়ের মতো তাকালেন আজিজুর রহিমের দিকে‒‘পেলেন! আপনার দিব্যদৃষ্টি আছে মশাই।’ আজিজুর রহিম বিগলিত হয়ে বললেন, ‘ঘটনাক্রমে পেয়ে গেলাম। দিব্যদৃষ্টি আমার নেই; তা যদি থাকত তাহলে এত ভুগতাম না জীবনে।’
‘দীর্ঘজীবি হোন, ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন।’ অশীতিপর বৃদ্ধ পাথরটা চোখের সামনে ধরে পরখ করতে করতে বললেন। আজিজুর রহিম বললেন, ‘দয়া করে এই উপকারটুকু আমার করবেন না। আমি দীর্ঘজীবি হতে চাইনা।’
একথায় অতি বৃদ্ধ আজিজুর রহিমের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন। আর আজিজুর রহিমও এবার ভালো করে তাকালেন লোকটার দিকে। তাঁর ঘোলাটে দুই চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আজিজুর রহিম নজর দিলেন লোকটার সর্বাঙ্গে। চোখ দু’টি ছাড়া তাঁর সমস্ত কাঠামোয় কোনো অসাধারণত্ব নেই। মুখমন্ডলে আদিমতার ছাপ‒যেন কোনো জাদুঘরে রাখা নিয়ান্ডারথাল মানবের ফসিল জ্যান্তÍ মানব হয়ে আজিজুর রহিমের সাথে কথা বলছেন। লোকটার দুই চোখ ঘোলাটে হলেও সেখানে একটা দার্শনিক প্রজ্ঞা প্রতিফলিত হচ্ছে। আজিজুর রহিম সবচেয়ে বিস্মিত হলেন এই অতি বৃদ্ধের চোখে কোনো চশমা না দেখে। অথচ তিনি নিজে এই জীবনে অসংখ্যবার চোখের ডাক্তার দেখিয়েছেন, চশমা বদল করেছেন শতবার। কিছুদিন আগে ছানির অপারেশন করিয়েছেন। এখন তাঁর চোখে উচ্চ শক্তির চশমা।
‘এটা কি খুব মূল্যবান পাথর?’ আজিজুর রহিমের প্রশ্নে অতি বৃদ্ধ জন বললেন, ‘মূল্যবান বৈকি। আর শুধু মূল্যবান হলেই তো চলেনা‒এটা পরীক্ষিত এবং আসল। অনেকে বহু মূল্য দিয়ে পাথর কেনেন এবং সারাজীবন আসল ভেবে নকলের পুজো করেন। আমি জীবনে দুইটি পাথরের সাধনা করেছি‒পান্না আর টাইগার স্টোনের।’
‘আকিক কেমন পাথর?’ আজিজুর রহিম প্রশ্ন করলেন।
‘আকিক? মানে এগেট? কিছু না, কিছু না পান্না আর টাইগার স্টোনের তুলনায়।’ বৃদ্ধের কন্ঠে আত্মবিশ্বাসের ঝলকানি খেলল।
‘কেন বলুন তো, আকিক কিছু না কেন?’
‘বসুন। বলছি, ঘাবড়াবেন না। বৃষ্টি হবেনা, হওয়ার ভান করছে কিন্তু আমি জানি বৃষ্টি আগামী দুইদিনেও হবেনা।’ অতি বৃদ্ধ বসলেন ঘাসে। আজিজুর রহিমও বসলেন বাধ্য ছেলের মতো। কিন্তু তিনি টের পেলেন তাঁর বেগ পেয়েছে। আগেই পেয়েছিল কিন্তু চেপে রেখেছিলেন। অতি বৃদ্ধ বললেন, ‘যান, ওইদিকে গিয়ে কাজ সেরে আসুন। ছোটো কাজ তো ঝামেলার কিছু নেই।’
আজিজুর রহিম অবাক হয়ে লোকটার পানে তাকালেন আবার। লোকটা বুঝল কী করে যে তাঁর প্রস্তাব পেয়েছে! আজিজুর রহিম বললেন, ‘এখানে পানি নেই। আমি পবিত্র থাকতে চাই। আপনি বরং বলুন, সংক্ষেপে শুনে চলে যাই। বাসায় গিয়ে কাজ সারব।’
‘বৃষ রাশি, তুলা ও মিথুন রাশির জাতকদের জন্য পান্না অত্যন্ত উপকরী। আমি নিজে বৃষ রাশির জাতক। আমার জন্ম ২২ এপ্রিল ১৮৬৬ সালে।’
আজিজুর রহিম চমকে উঠলেন এবং তিনি প্যান্ট, ঘাস ও মাটি ভিজিয়ে ফেললেন। সারাজীবন হিসাবরক্ষকের কাজ করেও তিনি হিসাব করে উঠতে পারলেন না ১৮৬৬ সালে জন্ম হলে লোকটার বয়স এখন কত। তবে আন্দাজ করলেন দুই তিন শ’র কম হবেনা। আজিজুর রহিমের দিকে তাকিয়ে হাসলেন অতি বৃদ্ধ, বললেন, ‘পবিত্র আর থাকতে পারলেন না। বলেছিলাম একটু ঢালুতে গিয়ে কাজ সেরে আসুন, আপনি শুনলেন না।’
আজিজুর রহিম গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কাজটা যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা। আপনি গল্প চালিয়ে যান।’
অশীতিপর বৃদ্ধ বললেন, ‘গল্প নয়। আমার জীবনের সত্যি কাহিনি। যাইহোক, আপনি ভাবছেন আমার বয়স কত, তাইনা? ওই শুনতেই যা ১৮৬৬। আসলে তো এই সেদিনের কথা। আমার বয়স দেড়শ’ আর আমাকে সবাই পান্না দাদা বলে ডাকত।’
‘ডাকত মানে কী? এখন আর ডাকেনা? আপনি কি প্রেতাত্মা গোছের কিছু, মানে মৃত?’ আজিজুর রহিম একটু নড়েচড়ে বসলেন, তাঁর অস্বস্তি লাগছিল। সেদিকে তাকিয়ে পান্না দাদা বললেন, ‘না আমি মরিনি, বা প্রেতাত্মাও নই। তবে আমার সময়ের সবাই মরে গেছে; তাই কেউ এই নামে ডাকেনা।’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু দেড়শ’ বছরই বা কম কীসে? আপনার তো গিনেস রেকর্ডে স্থান পাবার কথা।’
‘ওইসব গিনেস-টিনেসের ধার ধারিনা আমি। সারাজীবন নিজের মতো করে চলেছি। পাথর চর্চা ও জ্ঞান আহরণ করেছি। নাম করতে চাইলে নাম পেতাম, ধনবান হতে চাইলে তা-ও পারতাম। কিন্তু আমি সেসব কিছু চাইনি। আধ্যাত্মিক সাধনা করেছি।’ পান্না দাদা থামলেন।
‘আচ্ছা দাদা ১৮৬৬ সালে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য কী ঘটেছিল?’ আজিজুর রহিমের চোখে শয়তানির ঝিলিক খেলে গেল।
তিনি বললেন, ‘ভারতের উড়িষ্যায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের ভেটো সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে সিভিল রাইটস অ্যাক্ট প্রবর্তিত হয়।’
আজিজুর রহিম চশমা খুলে শার্টের কানায় মুছলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘পান্না ও টাইগারের গুণের কথা কী যেন বলছিলেন?’
এবার পান্না দাদা নড়ে বসলেন। ধুতির ফাঁকে তাঁর শুকনো, কালো ও খটখটে পায়ের অনেকটা অংশই দেখা যাচ্ছে। তিনি পান্নার টুকরোটা রুমালে জড়িয়ে মলিন পাঞ্জাবির পকেটে ভরলেন। তারপর বললেন:
‘আমার এই পান্নটা ব্রাজিলের। অনেক মূল্য এর, নব্বুই হাজার তো হবেই। বেশিও হতে পারে। সাধারণত খাঁটি পান্নার মূল্য ক্যারেট প্রতি ৬০০ টাকা থেকে ২০০০০ টাকা। দামের হেরফের হয় এর প্রাপ্তিস্থান, রং ও সৌন্দর্য ভেদে। দাম যা-ই থাকুক এমারেল্ড খাঁটি হলে রাশিরত্ন হিসেবে এর কার্যকারিতা থাকবেই। প্রথম কথা, এটা মস্তিষ্কের ওপর সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করে। মানে আসল জায়গায় কাজ করে। তাছাড়া, বুধ গ্রহের খারাপ অবস্থানের কারণে যাদের দিন খারাপ যাচ্ছে, তারা এটা ব্যবহারে অবশ্যই সুফল পাবেন। পান্নার আজব গুণের কথা বলতে গেলে রাত পোহাবে।’
‘আর টাইগার স্টোন?’
‘টাইগার স্টোন আরেকটি অমূল্য পাথর, মানে উপকারের দিক দিয়ে। এটা রাশি বুঝে না ধারণ করলেও চলে। যে কোনো রাশির জাতক এটি পরতে পারে। টাইগার স্টোন হলো পাওয়ার। মজার ব্যাপার হলো, এই পাথর যুবকদের চেয়ে মাঝবয়সী লোকদের ক্ষেত্রে বেশি কাজ করে। আমি কয়েকজন লোককে টাইগার স্টোন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলাম। এদের সবাই উপকার পেয়েছে বলে আমাকে জানায়। দুইজন আবার তিনটি করে বিবাহ করে তিন বউকেই ধরে রাখতে পেরেছিল। সে অনেক আগের কথা।’
এতক্ষণ নড়েচড়ে বসছিলেন আজিজুর রহিম, এবার মোচড় দিলেন। বললেন, ‘আপনার কাছ থেকে অনেক জ্ঞান আহরণ করলাম, দাদা। এখন অনুমতি দিলে উঠব। আর আমার সবশেষ প্রশ্ন হলো, আপনি চিড়িয়াখানার ভেতরে কেন? এখানে থাকেন, মানে বাসায় নাকি কোনো খাঁচায়?’
বৃদ্ধ সরু চোখে তাকালেন আজিজুর রহিমের দিকে‒‘মশকারা করছেন?’
‘না, দাদা। মশকারা করছিনা। আমিও এখানে থাকি। বাসায়, তবে অতি শীগগিরই কোনো খাঁচায় জীবন যাপন শুরু করব।’
পান্না দাদা প্রীত হয়ে বললেন, ‘বুঝেছি জীবনে অনেক ঘা খেয়েছেন। পাথর ধারণ করুন। অনেক উপকার পাবেন।’
আজিজুর রহিম ক্লাউনের মতো হাসতে লাগলেন। সেদিকে বোকার মতো চেয়ে থাকেন পান্না দাদা। হাসি থামিয়ে আজিজুর রহিম বললেন, ‘হাসালেন দাদা। সারাটা জীবন হিসাব বিভাগে চাকরি করে জীবনটাকে হিসাবের লেজারে বন্দি করেছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারিনি; এখন এক ঠ্যাং কবরে, আর আপনি বলছেন পাথর ধারণ করতে?’
পান্না দাদা রাগ করলেন না। বিড়বিড় করে কিছু বললেন। তারপর সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলেন‒‘পাথরের গুণ আছে, তবে সেই গুণ কার্যকরী করতে গেলে বিশ্বাস থাকতে হয়। আপনার পাথরের প্রতি কোনো বিশ্বাস নেই, তাই এই বিষয়ে আর কিছু বললাম না।’ তিনি যেতে উদ্যত হলেন। আজিজুর রহিম বললেন, ‘দাদা বললেন না চিড়িয়াখানায় আগমনের উদ্দেশ্য?’
‘কোনো উদ্দেশ্য নেই। চিড়িয়াখানায় কখনো-সখনো আসি। বিনে পয়সায় ঢুকতে পারি, তাই। গেটের লোকজন আমাকে বিনে পয়সায় ঢুকতে দেয়। আমি পয়সা ছাড়া ঢুকলে বাঘ-সিংহের চামড়া খসে পড়বে না, তাইনা?’
‘কিন্তু আসেন কেন?’
‘এইদিকেই থাকি, বিকেল বেলাটায় ঘুরতে আসি। তাছাড়া জায়গাটা খুব ভালো লাগে। আপনি এখানে থাকেন বলছেন?’
আজিজুর রহিম বললেন, ‘আমি এখানেই থাকি। না, খাঁচায় নয়। বাসায়। এখানে আমার মেয়েজামাই ভেটেরিনারি চিকিৎসক।’
‘তাই বলুন। আপনার নামটা…।’
‘আমার নাম আজিজুর রহিম। আগে একটা সরকারি দপ্তরের হিসাব বিভাগের অফিসার ছিলাম। এখন পেনশনপ্রাপ্ত।’
‘সরকারি চাকুরেদের এই সুবিধা। মাসে মাসে পেনশন। ভগবান মাঝেমধ্যে আমাকে কিছু দেন, সেটাই আমার পেনশন।’ বলতে বলতে পান্না দাদা প্রস্থান করলেন। সেদিকে হা করে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে আজিজুর রহিম ঘরমুখো হলেন।
বাসায় এসে তাঁর প্রথমেই মনে হলো, লোকটাকে তিনি আগে কোথায় যেন দেখেছেন। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না। সন্ধ্যার পর তিনি ফ্রেশ হয়ে নতুনভাবে ভাবতে বসলেন কোথায় দেখেছেন এই আজব লোকটাকে। স্মৃতি হাতড়ালেন, কিন্তু মনে পড়ল না। মেয়ে রোকেয়া বাইরের রুমে তাঁকে চা-নাশতা দিয়ে গেছে। তিনি চা না খেয়ে চিন্তামগ্ন রইলেন‒নিকট অতীত ঘাঁটতে লাগলেন।
ভ্যাঙ্কুভার নামের একটি অতি উন্নত শহর ছেড়ে তিনি বদরউদ্দিন নামের এক কলিগের বাসায় উঠলেন। বদর সাহেবই পরে তাঁকে প্রবীণ হিতৈষী কেন্দ্রে স্থান করে দিলেন। বদর সাহেব নিজে থাকেন পরিবারের সঙ্গে, এই বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর খুব কদর। সবাই তাঁকে মাথায় করে রাখে, কারণ তিনি প্রচুর অর্থের মালিক, আর সেই অর্থ ও সম্পত্তি এখনও তিনি ভাগ করে দেননি। বদরউদ্দিন ও আজিজুর রহিম একই অফিসে চাকরি করতেন। তবে বদর সাহেব চাকরি জীবনে প্রচুর উপরি নিতেন। তাঁর দর্শন ছিল‒সময় থাকতে খেয়ে নাও। শেষজীবনে নামাজ-কালাম পড়ে নিজকে শুধরে নাও।
আজিজুর রহিম জানেন এবং বিশ্বাস করেন বদরউদ্দিনের কদর বেশিদিনের নয়। টাকা ও সম্পত্তি ভাগের পর এই আদর ও সম্মানের মানমাত্রা নিম্মগামী হবে। তবে বদর সাহেবকে তিনি পছন্দ করেন। চাকরিজীবনে হিসাব বিভাগের অনেক সমস্যায় একমাত্র বদর সাহেবই পাশে দাঁড়াতেন।
আজিজুর রহিম হিতৈষী কেন্দ্রে ডিপ্রেশনে ভুগতে লাগলেন। ঢাকায় এসে মেয়েকে খবর দেননি তিনি ইচ্ছে করেই। কিন্তু বদর সাহেব খবর দিলেন।
মেয়ে রোকেয়া হিতৈষী কেন্দ্রে এসে পিতাকে নিয়ে তার বাসায় তুলল। ব্যস, তারপর থেকে তিনি চিড়িয়াখানার বাসিন্দা। রোকেয়া তাঁর বড় মেয়ে। ছেলে আবীর ও তার মা হোসনে আরা ওরফে শিরিন ক্যানেডায় অবস্থান করছে। আজিজুর রহিম প্রেম করে তাঁর বয়সের চেয়ে অন্তত বারো বছরের ছোটো শিরিনকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি শিরিনকে পড়াতেন কমলাপুরের মেস থেকে শিরিনদের গোপিবাগের বাসায় গিয়ে। তিনি তখন এমকম পাস করে দীর্ঘদিন যাবৎ বেকারত্বের বোঝা বইছিলেন, আর শিরিন কিছুতেই নবম শ্রেণীর গ-ি পার হতে পারছিলেন না অংক ও ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে। আজিজুর রহিমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একসময় পাস করেন শিরিন এবং শিক্ষকের প্রেমে পড়ে যান। তারপর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
দেড়বছর পর তাদের প্রথম সন্তান হয়। তখনও চাকরিপ্রাপ্ত হননি আজিজুর রহিম। সরকারি চাকরি করার বয়স পার হয়ে যাচ্ছিল, এইসময় তিনি চাকরি পেলেন। খুব উচ্চ পদে নয়; তবে সরকারি চাকরি বলে কথা। তিনি সংসার জীবন চালিয়ে যেতে লাগলেন, তবে দু’জনের বুঝাপড়া হয়নি কখনও। ধুঁকে ধুঁকে চলছিল সংসার। তাঁর স্বল্প বেতনে সংসার ঠেলেঠুলে চলছিল। একসময় ছোটো ছেলে খোকন জন্মাল। অভাব-অনটন বেড়েই চলল, সেইসাথে বেড়ে চলল খিটিমিটি।
এই অশান্ত পরিবেশেই তাঁর লক্ষ্মী মেয়ে রোকেয়া প্রেম-জালে জড়িয়ে যায়। সে লুকিয়ে বিয়ে করে এক মেডিক্যালের ছাত্রকে। মনে মনে প্রীত হলেন আজিজুর রহিম‒মেয়ে তাঁর বুদ্ধিমতী‒একেবারে এমবিবিএস ছাত্রের সাথে প্রেম! তিনি মেয়ের এই প্রেমময় সময়ে মেয়েকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেন।
কিন্তু শিরিন জ্বলে উঠলেন। সংসার জীবনের সমস্ত ঝাল ঝারলেন স্বামীর ওপর। অভিযোগ করলেন, আজিজুর রহিমের অক্ষমতার কারণেই সংসার বিষিয়ে গিয়েছে। তিনি বাপের বাড়ি চলে গেলেন ছেলেকে নিয়ে। আর আসেননি ফিরে।
এদিকে রোকেয়া বিবাহ করে, সংসার ও পড়াশোনা একসাথে চালিয়ে যেতে লাগল। এই অবস্থায় শিরিন একদিন এসে নরম গলায় আজিজুর রহিমকে জানালেন, ছেলে বিদেশে পড়াশোনা করতে চায়। বললেন, খোকনকে নিয়ে তিনি ক্যানেডায় পাড়ি দিবেন। আজিজুর রহিম কিছুই বললেন না। ম্রিয়মাণ হয়ে থাকলেন। তারপর রাতভর তিনি কাঁদলেন। কেমন একটা অশনিসংকেত যেন পেলেন তিনি। পরদিন তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে অর্থ উত্তোলন করে শ্বশুরবাড়িতে দিয়ে এলেন খোকনের জন্য।
শিরিন একসময় ছেলেকে নিয়ে পাড়ি দেন ক্যানেডায়। ভ্যাঙ্কুভারে তিনি তার এক খালার বাসায় ওঠেন, পরে নিজে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে একটা সামান্য কাজ জোগাড় করে ক্যানেডায় জীবন যাপন করতে শুরু করলেন। তারপর একদিন তিনি মেয়েকে চিঠি লিখলেন ক্যানেডায় চলে আসতে। কিন্তু রোকেয়া রাজি হয়নি। সে তখন নতুন ডাক্তার স্বামীকে নিয়ে সংসার সাজাচ্ছিল, কোনো অনিশ্চয়তায় যেতে চায়নি। আজিজুর রহিম আবারও মেয়ের ওপর সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বছরদুয়েক বিবাগী জীবন যাপন করে একদিন ছেলে ও স্ত্রী কাতরতায় ভুগে শেষে টেলিফোন করলেন শিরিনকে।
শিরিন কাগজপত্র পাঠিয়ে দিলেন। প্রায় দেড়বছর পর আজিজুর রহিমের ভিসা হলো। তিনি আবারও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে প্লেনের টিকেট কেটে একদিন পাড়ি দেন ভ্যাঙ্কুভারে।
তিনি মোট সতেরো দিন ছিলেন ভ্যাঙ্কুভারে। তাঁর ভাষায় ‘না থাকার মতো।’ সেই খোকন আর আগের মতো নেই। সে বৃটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমেস্টারে পড়ে, আর সে তার পিতাকে ‘হাই দেয়ার’ বলল। আজিজুর রহিম বুঝতে পারেন, জীবনের হিসাব তিনি মেলাতে পারেননি। শিরিনের মন্ত্রণার কারণে বাপের ওপর প্রসন্ন ছিলনা খোকন। অথচ এই খোকনকে বুকে ধরে, তার গায়ের মিষ্টি গন্ধ নিয়ে আজিজুর রহিমের অনেক মধুর সময় কেটেছিল। তিনি মনস্থির করলেন চলে যাওয়ার। রাতভর তিনি কেঁদেছিলেন, শিরিন একবারও আসেনি সান্ত¦না জানাতে। তিনি ফিরে এলেন।
তারপর তো রোকেয়া তাঁকে ওর বাসায় নিয়ে আসে। আজিজুর রহিম অনেক অভিযোগ করলেন। রোকেয়া শুনেছে, কিন্তু কোনো কথা বলেনি। আজিজুর রহিম বুঝতে পারলেন তাঁর মেয়ে তাঁকে করুণা করছে। সেই করুণার ভান্ডার হয়তো তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে যাবে। তাঁর কোথাও যাবার স্থান নেই। কোনো সহায়-সম্বল নেই। আছে শুধু পেনশনের টাকা।
তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নামল। মেয়ে এসে বলল, ‘আব্বা চা খাননি!’
‘খাব,’ তিনি চট করে চোখ মুছে বললেন, ‘আচ্ছা রুকু, তুই পাথর বিশ্বাস করিস?’
‘পাথর, মানে জেম? এতে বিশ্বাসের কী আছে?’ রোকেয়া তাঁর মুখোমুখি সোফায় বসে বলল, ‘এই যেমন আমার ডানহাতের মধ্যমায় একটা ফিরোজা বসানো আংটি আছে। এটা সোহেলের সাথে নেপালে বেড়াতে গিয়ে ওখান থেকে কিনে এনেছিলাম।’
‘না, মানে কোনো কোনো পাথর আছে রাশি মিলিয়ে পরলে উপকার হয়। যেমন তুলারাশির কেউ যদি ক্যাটস আই পরে, তবে তার মঙ্গল হয়।’ তিনি বললেন।
রোকেয়া হেসে বলল, ‘আব্বা, আপনার বুঝি পাথর পরার শখ হয়েছে?’
‘ঠিক তা না। জানতে চাইছিলাম।’ আজিজুর রহিম বিড়বিড় করে আরো কী যেন বললেন।
রোকেয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চা খেয়ে একটু বিশ্রাম করুন, নয়তো টিভি দেখুন। আমি রাতের খাবার রেডি করে আপনাকে ডাকব।’ রোকেয়া চলে গেল অন্য কক্ষে।
…চায়ে চুমুক দিয়ে তাঁর মনে পড়ল তিনি পান্না দাদাকে টাউনহলে দেখেছিলেন। শিরিনের নানা বাতিক ছিল, তার একটা ছিল হাতে অষ্টধাতু পরা। সেই শিরিনের তাগাদাতেই তিনি একবার কি দু’বার টাউনহলের সেই মান্ধাতা আমলের ইমারতের নিচের অন্ধকার কোণে থামে ঠেস দিয়ে বসা পান্না দাদাকে দেখতেন। পান্না দাদা রত্ম ও অষ্টধাতু বিক্রি করতেন। তখনও তিনি তেমনই বৃদ্ধ ছিলেন।
উত্তেজনায় পায়চারি করতে লাগলেন আজিজুর রহিম। পান্না দাদার নামধাম জানা হয়নি। আসলে লোকটি কেমন হেঁয়ালি উত্তর দিয়েছিলেন তিনি কোথায় থাকেন জিজ্ঞেস করায়। তাতে সমস্যা নেই‒এই চিড়িয়াখানায় বা আশেপাশে পান্না দাদাকে তিনি নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন। তখন জানা যাবে তিনি টাউনহলে বসতেন কিনা…।
পায়চারি করতে করতেই ভাবছিলেন তিনি। শিরিন ভালোবাসত অষ্টধাতু। একবার এই নিয়ে দু’জনের তর্ক হয়েছিল।
শিরিন বলেছিল,‘মানুষ প্রাকৃতিক। মানুষের শরীরে নানা ধাতু থাকে। তার কোনো একটির ঘাটতি থাকলে বা একেবারেই না থাকলে অষ্টধাতু পরলে উপকার হয়।’
‘তোমার এটা ভুল ধারণা। ডাক্তারের কাছে যাও, তোমার শরীরে হয়তো কোনো ভাইটামিনের অভাব আছে, যার জন্য রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। ডাক্তার রাসায়নিক পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারবে তোমার শরীরে কোন্ ভাইটামিনের অভাব।’
শিরিন প্রবল আপত্তি করে বলেছিল, ‘অষ্টধাতুতে সোনা, রূপা, তামা, পিতল, কাঁসা, রাং, সিসা ও লোহা আছে‒এজন্যই একে অষ্টধাতু বলে।’
‘সোনা-রূপা থাকলে একটা অষ্টধাতুর ব্রেসলেটের দাম মাত্র আশি বা একশ’ বিশ টাকা হয়?’
‘সোনা-রূপা খুবই অল্প পরিমাণে থাকে, তাই।’
‘এসব ধাতু একসাথে কীভাবে মেলায়!’
‘কেন গলিয়ে!’
আজিজুর রহিম মেলাতে পারলেন না। এইচএসসি পর্যন্ত তিনি সায়ান্সে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন, ধাতুর মিশ্রণকে বলা হয় শংকর। আর এই শংকর তৈরি করা সহজ কাজ নয়। সব ধাতু একসাথে মেশানো উচ্চ প্রযুক্তির কাজ। একশ’ বিশ টাকার অষ্টধাতু কি তেমন উচ্চ প্রযুক্তির কারখানায় তৈরি হয়! কিন্তু তিনি আর তর্কে যাননি। শিরিনকে যে ওর ধারণা থেকে এক পা নড়াতে পারবেন না, তা তিনি জানতেন…।
‘আপনাকে খুব অস্থির মনে হচ্ছে! শরীর খারাপ? দেখে দেব?’ গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে বাইরের কক্ষে উঁকি দিয়ে বলল ডাক্তার সোহেল রহমান‒আজিজুর রহিমের মেয়েজামাই।
‘না, বাবা। আমি ঠিক আছি। মনে করার চেষ্টা করছিলাম একটা লোককে, তাকে আজ দেখে মনে পড়ছিল না আগে কোথায় দেখেছি। কিছুক্ষণ আগে মনে পড়ল।’
‘তাই,’ সোহেল রহমান মৃদু হেসে বলল, ‘কাউকে বা কোনোকিছু মনে করার চেষ্টা ভালো। তাতে স্মৃতিশক্তিটা ঝালাই হয়। আপনি রেস্ট করুন। রাতে খাবার সময় কথা হবে।’
সোহেল বিদায় নিলে আজিজুর রহিম একাকীত্ব অনুভব করলেন। নিজকে এত একা আর অসহায় তাঁর কখনও মনে হয়নি। তিনি আবার পায়চারি করতে করতে ভাবলেন‒রোকেয়ার সন্তান হবে সামনেই। ওর করুণার ভান্ডার শেষ হয়ে যাবে, কিংবা কে জানে, মায়ের প্রলোভনে পড়ে সে হয়তো বিদেশে পাড়ি দেবে। তারচেয়ে যতদিন বেঁচে থাকেন একা চলার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে তাঁকে।
তিনি হঠাৎ পায়চারি থামিয়ে দিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, পান্না দাদার সাথে ফের দেখা হলে উনার সাথে জীবন যাপন করার একটা বন্দোবস্ত করে ফেলবেন। তাঁর দুই গন্ড বেয়ে আবার অশ্রু ঝরল।
আর…আর একটা পাথর নেবেন তিনি পান্না দাদার কাছে, যেন তিনি পান্না দাদার মতো দেড়শ’ বছর আয়ুধারী না হন। কেননা, মানুষের আয়ু যত প্রলম্বিত হয়, তত তার ভোগান্তি বাড়ে।
সোফায় বসে চোখ বুজে বিড়বিড় করে বললেন আজিজুর রহিম: তুমি দীর্ঘজীবি হও। অনেক আয়ুধারী হও তুমি, শিরিন। অনেক বছর বেঁচে থাকো।

মন্তব্য