আ মরি বাঙলা ভাষা

Rozana Nasrin 2

রোজানা নাসরীন

মানুষের সুকুমারবৃত্তি জীবনব্যাপী অন্বেষণ করে সৌন্দর্যের উপাত্ত। এর উপর নির্ভর করে আর্ট- কালচারের বিকাশ। মানব হৃদয়ের নিভৃত চরাচরে নিয়ত যে সৌন্দর্যের আবেগ আছে তা বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমকে আশ্রয় করে প্রকাশ পায়। মানবিক বৃত্তিগুলির মধ্যে সৌন্দর্য চেতনায় নির্মিত শিল্প সাহিত্য তার অনুভবের জায়গাগুলিকে প্রকাশ ও চর্চা করার জন্য কথার পর কথা গেঁথে সাহিত্য সৃষ্টি হয়। একজনের হৃদয়ের কথা অন্য হৃদকে দোলা দেয়, শিহরণ জাগায়। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের সেতু বন্ধন সৃষ্টি হয়। মানুষে মানুষে জানাজানির ক্ষেত্র প্রসারিত হয়।

সাহিত্য রচনার সর্বশ্রেষ্ঠ উপাদান ভাষা। ভাষার সুন্দরতম ব্যবহারে সাহিত্যের শিল্পগুণ এবং সাহিত্যমান বৃদ্ধি পায় এবং কালোত্তীর্ন হয়। তাই সাহিত্য সৃষ্টির একমাত্র উপাদান যে ভাষা তাকে বিশুদ্ধতার সাথে ব্যবহার করা একান্ত দায়িত্বপূর্ণ  বিষয়।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে বাঙলা সাহিত্যের চর্চা ও বিকাশের সময় তাকে অনেক বন্ধুর পথ পারি দিতে হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বেও বাংলা সাহিত্যের চর্চা অনেক হয়েছে তবে সেটা ততটা স্বচ্ছন্দ ছিলনা। ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দী জুড়ে ক্রমাগত বাংলা সাহিত্যের পরিপূর্ণতা, লাবন্যময়তা এবং বিশুদ্ধতার উৎকর্ষ সাধনের প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রাণময় প্রচেষ্টা এবং ধারাবাহিকতা অনুসারে যে সব কবি সাহিত্যকদের কথা স্মরণ না করলে আমাদের গৌরব ক্ষুন্ন হয় তাদের মধ্যে মাকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং অবদান বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমানের সাহিত্যে উন্নীত করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ভারতচন্দ্র রায় গুনাকর বুদ্ধিদীপ্ত, শিল্পমন্ডিত ভাষা ব্যবহার করে প্রমাণ করেছিলেন চর্যাপদ থেকে গুনাকর পর্যন্ত ভাঙ্গাগড়ার সময়টা শেষ করে যেন বাংলা সাহিত্যের নতুন পথ তৈরী হয়েছে। এর পরেই  বাংলার পূর্ন জমিনকে কর্ষণ করে সোনা ফলাতে সক্ষম হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ইংরাজী ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করে যে সম্পদ আহরণ করেছিলেন তা বাংলা সাহিত্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করে বাংলা সাহিত্যের একটা স্বর্ণযুগের অবতারণা করলেন। বাংলা সাহিত্যে সার্থক মহাকাব্য রচিত হল। বাংলা সাহিত্য যেন সীমাহীন গতি পেল ছুটে চলার। এ যেন মুক্ত আকাশে বিহঙ্গী আনন্দে ছুটে চলার চরম তৃপ্তি ও সার্থকতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলা সাহিত্য কেবলই কাব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল কিন্তু আধুনিক যুগে পা রেখে গদ্য সাহিত্যের সবুজ প্রাঙ্গণ উন্মোচিত হয়ে গদ্য চর্চার নতুন চলার ছন্দ-আনন্দে মুগ্ধ হয়ে যারা গদ্য সাহিত্যে মনোনিবেশ করলেন তাদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গদ্য রচনার একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র রচনা করলেন। সার্থক গদ্য রচনার ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সংস্কৃত ঘেঁষা ভাষা ব্যবহার করে পান্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছিলেন বটে পরবর্তীতে তার সমালোচনারও কমতি ঘটেনি। তবুতো  সেই প্রচেষ্টাই ছিল গদ্য সাহিত্যের প্রথম দৌড়। এ দৌড়ের পাল্লায় জিতে গেলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি সংস্কৃত ঘেঁষা প্রাচীন পন্থীদের সমালোচনা করে সুখপাঠ্য গদ্য রচনা করেছিলেন। তার অভিমত ছিল এইযে, ‘বিষয়ানুসারে ভাষার উচ্চতা ও নিচুতা নির্ধারিত হবে।’তার এ অভিমতকে পন্ডিতেরা স্বাগত জানালেন। তারপর বিংশ শতাব্দীকে যে মহা পন্ডিত তার জ্যোতিতে আলোকিত করলেন সেই  বাংলা সাহিত্যের এক বিরাট অধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা সাহিত্যকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে যে আধুনিকতায় উপনীত করলেন সে তার একার গৌরব নয়, নেপথ্যের দিগন্তে যে আলো রেখা দেখা দিয়েছিল বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের প্রচেষ্টায় সেটা ছিল সেই ধারাবাহিকতার ফসল। রবীন্দ্রনাথ একটি পূর্ণাঙ্গ গ্যালাক্সির মত আবির্ভূত হয়ে সমস্ত সূর্যদেরকে যেন টেনে নিয়ে গেলেন নিজের অস্তিত্বর ভিতর।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা সরলীকরণ, তার বিশুদ্ধতা, ও শিল্পরূপ এত চমৎকার ভাবে সমন্বিত করেছিলেন যে মনে হল এ যেন এক মহাপূর্ণতা। কিন্তু কাল থেমে থাকেনা, সাহিত্যও থেমে থাকেনা। রবীন্দ্রযুগে বসেই আর একটা নতুন দিগন্ত জুড়ে দিলেন প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্য সাহিত্যে। যদিও শুরুটায় ছিলেন প্যারচাঁদ মিত্র এবং কালিপ্রসন্ন শিংহ  তার ধারাবাহিকতা স্রোতের রূপ ধারণ করল প্রমথ চৌধুরীর হাতে। তিনিই গদ্য সাহিত্যে বাংলা ভাষার চলিত রীতির সার্থক প্রবর্তন করলেন। এতে গদ্য সাহিত্য আরো বেশি  সাবলীল ,  সৌন্দর্যময় এবং গতিময় হয়ে মানুষের হৃদয়ের একেবারে নিভৃত দুয়ারে এসে টোকা দিল যেন। রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে এই চলিত রীতিকে অভিনন্দন জানিয়ে মন্তব্য করেছিলেন,‘এর নিজের একটি কলধ্বনি আছে। আমার শেষ বয়সে কাব্য রচনায় আমি বাংলার এই চলিত-ভাষার সুরটাকে কাজে লাগাইবার চেষ্টা করিয়াছি। কেননা দেখিয়াছি-চলিত ভাষাটাই স্রোতের মত চলে।’বাংলা সাহিত্যের এ সময়টা ছিল চমৎকার তরঙ্গময়। যে তরঙ্গ বিভিন্নধারিক চরিত্রে বিশ্বজীবনের এপার ওপার আন্দোলিত করে তুলেছিল। তখন তরুণ কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, কালিদাস রায়, জীবনানন্দ দাশ , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে , অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর  বন্দোপাধ্যায়, এমনি অনেক বড়ো বড়ো প্রতিভার জন্ম হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা বাঁক নিল  উচ্ছ্বসিত অবাধ আধুনিকতায়।

উপর্যুক্ত যাদেরকে আমরা বাংলা সাহিত্য জগতে বিচরণ করতে দেখেছি তাদের পান্ডিত্য ছিল অসীম। তারা  ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত আমদের হাতে তুলে দিয়েছেন আধুনিকতার চাবিগুচ্ছ। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত মোহ থেকে মুক্ত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। ভাষাকে সরল ও শিল্পিত করে তোলার সার্থে বাংলা শব্দের বানানের বিশুদ্ধ প্রয়োগ করেছিলেন।

আমাদের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে বঙ্কিম যুগ থেকে রবীন্দ্র যুগ পর্যন্ত বিস্তারিত  ছিল। কারণ প্রথমে পর্তুগীজ পাদ্রী ন্যাথনিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড এবং পরে রাজা রামমোহন রায়  ইংরাজী ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সংস্কৃত পন্ডিতেরা এসে সংস্কৃত বৈশিষ্ট্য  অনুসরণ  করে বাংলা ব্যাকরণ রচনা করে একটি আচ্ছন্নতার সৃষ্টি করলেন। মনে হচ্ছিল বাংলা ভাষার উপরে একটা কৃত্রিম কুঁয়াশার আস্তরনে যেন ঢেকে আছে স্পষ্টতা। এর পরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করলেন, ‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই। সংস্কৃত ব্যাকরণের একটু ইতস্ততঃ করিয়া তাহাকে বাংলা ব্যাকরণ নাম দেওয়া হয়।’পরবর্তী পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রশাদ শাস্ত্রী,শরচ্চন্দ্র শাস্ত্রী,রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী,সতীশ চন্দ্র বিদ্যাভূষণ, শ্রীনাথ সেন প্রমুখেরা কেউ কেউ বাংলা ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসাবে বিবেচনা করে ব্যাকরণ বিষয়ে আলোচনা করেন। সেই থেকে বাংলা ভাষাকে স্বতন্ত্র রূপদানের প্রচেষ্টা ও স্বতন্ত্র ব্যকরণ রচনায় পন্ডিতেরা আত্মনিয়োগ করেন এবং শিক্ষিত জনের বাংলা ভাষা সম্পর্কে সচেতনতা ও সাধরণকে বিভ্রান্তিমুক্ত করার জন্য পরবর্তীতে  ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড.মুহম্মদ শহীদুল্ল­াহ, ড.মুহম্মদ এনামুল হক, ড.আবুল কালাম মঞ্জুর মোরশেদ, ড. হুমায়ুন আজাদ  যে বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেছেন তাতে স্পষ্টতা ও পূর্ণতা লক্ষণীয়। এ সব পন্ডিতদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিয়ত গবেষণার কারণ ছিল বাংলা ভাষাকে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য মন্ডিত রূপ দান করা। যে প্রচেষ্টা ছিল কেবল মাত্র বাংলা ভাষাকে একটি শক্তিশালী ভাষা হিসাবে পৃথিবীর ভাষা জগতে প্রতিষ্ঠিত করা। তাকে অক্ষুন্ন  রাখার প্রত্যয় বাঙালির হৃদয়ে থাকার গুরুত্ব অনেক। তাই সাহিত্যের মাধ্যম ভাষাকে সাহিত্য সৃষ্টির আগে রপ্ত করা একান্ত প্রয়োজন। আগে ভাষা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান তারপর সাহিত্য রচনার উন্মুক্ত গগন।

আজকাল বাঙালি মধ্যবিত্তের মধ্যে জীবনের শেষ সাফল্য হিসাবে কবি সাহিত্যক হয়ে আত্মপ্রকাশ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাই প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে। একুশের মাসব্যাপী বই মেলা এসব সাহিত্যকর্মীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে অগণিত প্রকাশনাকে একধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। এটি জাতীয় জীবনে একটি স্বাস্থ্যকর উদ্যোগ। কিন্তু যারা সাহিত্যকর্মী হিসাবে এ মহান দয়িত্বটি গ্রহণ করেন তাদের পূর্নাঙ্গ ভাষা জ্ঞান থাকা জরুরী। যথেচ্ছভাবে ভাষার ব্যবহার করা; যেমন অশুদ্ধ বাক্য গঠন, বাংলা বানান রীতি এবং সাধু চলিত রীতির পার্থক্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ  জ্ঞান না থাকা এই বিষয়গুলো লক্ষণীয় মাত্রায় ব্যাপকতা পাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রত্যেকটি প্রকাশনার জন্যে লেখকের সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ একটি বইয়ের পাঠক  সংখ্যা অনেক। পাঠক একটি বই পাঠ করে যেমন সাহিত্য রস গ্রহণ করবে তেমনি ভাষা সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করবে। কিন্তু সাহিত্য যদি মোটামুটি বিশুদ্ধ

ভাষা ভঙ্গিতে উপস্থাপিত না হয় তাহলে পাঠকের কাছে তার মূল্য হারায়। সকল পাঠক ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ নয়। অশুদ্ধ ভাষা ব্যবহারে বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়;  পন্ডিতদের অক্লান্ত পরিশ্রম দস্যুদের গদার আঘাতে পন্ড হয়ে যাওয়ার মত।বাংলা বানান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণার অভাবে সাধারণের মধ্যে যে বিভ্রান্তি দেখা যায় তা দুঃখজনক। অনেকেই মন্তব্য করেন, বাংলা ভাষায়  ইকার,

ঈকার, উকার, ঊকার  দুটি করে আবার ব্যঞ্জন বর্ণের একই  উচ্চরনে খ,ক্ষ ,জ,য ,ণ,ন,দুটি করে আবার  শ,ষ,স,একই উচ্চারনের তিনটি ব্যঞ্জন এতসবের কি প্রয়োজন? এগুলো ভাষার মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। মূলত মন্তব্যটি অমূলক। এ সম্পর্কে ব্যাকরণ গত একটি সংক্ষিপ্ত ধারনা থাকলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। আমরা শিক্ষার জন্য অনেক বিষয় পাঠ করি। অঙ্কের মত কঠিন বিষয়, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, মনোবিজ্ঞান এমনি অসংখ্য বিষয়ের মধ্যে মেধা নিয়োগ করি, এবং দায়িত্বের সাথে বিষয়গুলো রপ্ত করি কিন্তু বাংলা ভাষার এই সংক্ষিপ্ত বিষয়টুকু সম্পর্কে জ্ঞান লাভের অনীহা প্রায় সকলের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ যাই হোক এতে জাতি হিসাবে নিজেদেরকে যে অবমাননা করা হচ্ছে সেটুকু নিতান্তই উড়িয়ে দেয়ার মত বিষয় নয়। যে ভাষার সাথে আমাদের অস্তিত্ব জড়িত, যেখানে আমাদের শেকড়ের প্রশ্ন, যার জন্য আমরা বায়ান্নতে রক্ত দিয়েছি। যে ভাষার কারণেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে,সে ভাষাকে সাবলীল সৌম্য-সুন্দর, বিশুদ্ধ ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা কি আমাদের দায়িত্ব নয়?

এ আলোচনায় প্রথমেই আসা যাক বাংলা বর্ণমালা বিষয়ে। যেমন খ,ক্ষ,  ণ,ন,  জ,য,  শ,ষ,স,  এসব একই উচ্চারণের বর্ণ গুলো কেন বাংলা বর্ণমালার অন্তর্ভূক্ত। এ সব বর্ণ গুলো না থাকলে বাংলা ভাষার শব্দ বৈচিত্র ও তাদের ব্যবহার বিপন্ন হয়ে পড়ত। কারণ কোন ভাষাই হঠাৎ করে উন্মোচিত হয়নি , এর একটি ইতিহাস থাকে। পৃথিবীর সমগ্র ভাষাই এক ভাষার সাথে অন্য ভাষার আদান প্রদানের একটি সম্পর্ক রয়েছে। তেমনি ভাবে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ভাষা ও বিভিন্ন ভাষার প্রচুর শব্দ এসে যোগ হয়েছে। অনেক শব্দকে আত্তীকরণ করা হয়েছে। খ্রীষ্টপূর্ব (৫০০০-৩৫০০)অব্দে ইন্দো-ইউরোপীয় মূলভাষার বংশধর আজকের বাংলা ভাষা।  প্রথম পর্যায়ে  ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা থেকে কেন্তম, শতম  ভাষার সৃষ্টি হয়। শতম থেকে আর্মেনিয়, আর্য, বাল্টোশ্লভনিক, আলবেনিক,-এর সৃষ্টি হয়। এরপর আর্য ভাষা থেকে ইরানিক আর্য, ভারতিক আর্য, দারদিক আর্য  ভাষা গুলোর উৎপত্তি। ভারতিক আর্য থেকে উৎপত্তি লাভ করে বৈদিক ও সংস্কৃত, যাকে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা বলা হয়। এর পরবর্তী পর্যায়ে বৈদিক ভাষা থেকে পালি , প্রাকৃত এবং আপভ্রংশ যাকে বলা হয় মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা। প্রাকৃত থেকে শৌরসেনী প্রকৃত, মাগধী প্রাকৃত, গৌড়ী প্রাকৃত, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত , পৈশাচী প্রাকৃত এর উৎপত্তি। এর মধ্যে গৌড়ী প্রাকৃত থেকে উৎপত্তি লাভ করে গৌড়ী অপভ্রংশ। এই গৌড়ী অপভ্রংশ থেকে বঙ্গ কামরূপী ভাষা, উড়িয়া ভাষা।, বঙ্গকামরূপী থেকে বাংলা ও অসমিয়ার উৎপত্তি, যাকে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা বলা হয়। বাংলা, হিন্দি, মারাঠী, মৈথিলী। অসমিয়া এ সকল ভাষাই নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার অন্তর্ভুক্ত। এভাবে ক্রমাগত সামাজিক পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে জনস্রোতের প্রবহে এক সময় বাংলা ভাষার একটি স্বতন্ত্র রূপগত বৈশিষ্ট্য ও বর্ণমালা তৈরী হয়ে গেছে। বাংলা বর্ণমালার যে কটি স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জন বর্ণ রয়েছে তার একটিও বর্জন করার নয়। যেমন  উৎপত্তি গত দিক থেকে বাংলা শব্দে তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি এই পাঁচ ধরনের শব্দ রয়েছে। তৎসম

শব্দ অর্থাৎ যে শব্দ গুলো সরাসরি সংস্কৃতভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে, যেমন চন্দ্র, সূর্য ভ্রাতা, মস্তক,হস্ত ইত্যাদি। অর্ধতৎসম মানে যে শব্দ গুলো সংস্কৃত থেকে কিছুটা বিকৃত হয়ে  বাংলা ভাষায় এসেছে, যেমন গৃহিনী> গিন্নি, নিমন্ত্রন> নেমন্তন্ন  ইত্যদি। তদ্ভব  শব্দ মানে, যেসব শব্দের মূল সংস্কৃততে ছিল তা প্রাকৃতের ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে নতুন শব্দ রূপ লাভ করেছে। যেমন,হস্ত> হত্থ> হাত, চন্দ্র> চন্দ> চাঁদ ইত্যদি। এ ক্ষেত্রে বাংলা বর্ণমালায় ইকার,ঈকার,উকার, ঊকার, এবং খ,ক্ষ, ণ,ন, শ,ষ,স, এ বর্ণ গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

পালন করে থাকে। যেমন ক্ষতি, ভিক্ষা,পরীক্ষা, এমন ক্ষ বর্ণের বহু শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এ শব্দ গুলোকে আমরা ইচ্ছা করলেই খ বর্ণ দিয়ে যেমন ‘খতি’, ‘ভিকখখা’, ‘পরীকখখা’এভাবে লিখতে পারবনা। কারণ ‘খ’একটি ব্যঞ্জন আর ‘ক্ষ’হল ক+ষ=ক্ষ অর্থাৎ দুটি ব্যঞ্জন। এবং যে সব সংস্কৃত শব্দ গুলো সরাসরি বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয় তাকে বিকৃত করার  অধিকারও আমাদের নেই, একে বিকৃত করলে এর যথার্থ অর্থগত দিকটি বিপন্ন হয় অন্যদিকে উচ্চারনের বিকৃতি ঘটে। তাই এ সব শব্দের বিশুদ্ধতা রক্ষা করাও আমদের দায়িত্ব। যেমন আরবি শব্দ- নামাজ, হজ্ব, সালাম, আবার ইংরাজী শব্দ টেবিল, চেয়ার, পোস্ট অফিস, এগুলোকে আমাদের মর্জি হলেই বিকৃত করতে পারবনা, তা হলে ঐসব ভাষাকে অবমাননা করা হয়; তেমনি সংস্কৃত শব্দগুলো ব্যবহার করার প্রয়োজনেই আমাদেরকে স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জন বর্ণের উপর্যুক্ত বর্ণগুলো ব্যবহার করতে হয়। যেমন শ,ষ,স,এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন শব্দের বানানের পার্থক্যই মূল কারণ। সংস্কৃত শব্দ, তদ্ভব শব্দ, বিদেশি শব্দ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ঐ তিনটি বর্ণই ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এজন্য বাংলা ব্যাকরণে ণত্ব-বিধান ও ষত্ব-বিধান নামে নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছ । সেটুকু গুরুত্বের সাথে বুঝে নেওয়া এবং রপ্ত করা প্রতিটি বাঙালির জন্য একান্ত প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় কিভাবে ণ,ন, শ,ষ,স, ব্যবহার করা হয় শুধু ঐ বিধান টুকু জেনে নিলেই আর কোন প্রশ্ন থাকেনা। এভাবে ‘বাংলা বানান রীতি’বলে একটি নিয়ম বাংলা ব্যাকরণে প্রণীত আছে, প্রত্যেক বাংলা ভাষিকে সেটুকু রপ্ত করা নিতান্তই কর্তব্য। বিশেষ করে যারা গণমানুষের কাছে হৃদয় উপচানো সাহিত্য রস পৌঁছে দিতে চান তাদের অবশ্য অবশ্য এ নিয়ম গুলো শিখে নেওয়া এবং মেনে চলা প্রয়োজন। একটি উদাহরণ দিতে হচ্ছে ইকার ,ঈকার ,উকার ,ঊকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে। যেমন সকল দেশী, বিদেশী এবং বাংলা শব্দে কেবল মাত্র  ইকার এবং উকার ব্যবহৃত হবে। কেবল মাত্র সংস্কৃত শব্দে ইকার,ঈকার,উকার,ঊকার যেভাবে ব্যবহৃত  আছে ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করতে হবে। এই একটি নিয়মই অনেক গুলো সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। এভাবে খুবই সহজ নিয়মের মাধ্যমে বাংলা ব্যাকরণকে স্বতন্ত্র রূপদান করা হয়েছে এবং ভাষা ব্যবহারকে সরলীকরণ করা হয়েছে।

এমনিভাবে বাংলা ভাষার দু’টি রীতি রয়েছে, একটি সাধু রীতি অন্যটি চলিত রীতি। এ প্রসঙ্গে ড.হুমায়ুন  আজাদ বলেছেন, বাঙলা ভাষা ও বাঙালি জাতির প্রয়োজনে উদ্ভব হয়েছিল দুটি মান ভাষা রীতি- ‘সাধু’ও ‘চলিত’। দুটিই  সাধন করেছে ব্যাপক উপকার। তবে ,  এ দুটি সৃষ্টি করেছে দীর্ঘকাল ব্যাপী দ্বি-ভাষিক পরিস্থিতি।  সাধু ও চলিত এ দুটি রীতিকে একটি কথ্য ভাষা অন্যটি লেখার ভাষা  নির্ধারন করা হয়েছে। কথ্য ভাষা মানে ভাষার চলিত রীতি আর লেখার ভাষা মানে সাধু রীতি। বাংলা ব্যাকরণ এ দুটি রীতির সিদ্ধ রূপ দান করেছে।

ঊনবিংশ শতকে বাংলা ভাষার একটি লিখিত রূপ গড়ে উঠেছিল যার নাম সাধু রীতি। রাজা রামমোহন রায় একে সংস্কৃত ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন মানুষের ভাষা বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরবর্তীতে রামমোহন রায়, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এদের গদ্য সাহিত্যের একমাত্র ভাষা হিসাবে সাধু রীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাধু ভাষা রীতি সর্বদাই সুনির্ধারিত ব্যাকরণের অনুসারী এবং কাঠামো সাধারণত অপরিবর্তনীয়। এই অপরিবর্তনীয় সাধু রীতির চৌহদ্দিতে আবদ্ধ থেকে বাংলা গদ্য সাহিত্যিকরা যখন নতুন ছাঁচের সন্ধানে নতুন শিল্পের আবেদন অনুভব করলেন; প্যারিচাঁদ মিত্র এবং কালিপ্রশন্ন শিংহ তখন চলিত রীতি ব্যবহার করে গদ্য রচনা করেছিলেন। এতে সমালোচকদের দৃষ্টি কপালে উঠল। তারা এই নতুন উদ্যোগকে আলালী ভাষা ও হুতোমী ভাষা বলে খুব একটা বাদ বিসম্বাদের অবতারণা করলেন। পরবর্তীতে  প্রমথ চৌধুরী সার্থক, সুন্দর, শিল্পিত ভঙ্গিতে বাংলা গদ্য রচনায় চলিত রীতির প্রবর্তন করেন। চলিত রীতি বলতে বাংলা ব্যাকরণ মতে সামগ্রিকভাবে-দেশের সর্ব এলাকার মানুষের বোধগম্য মানসমৃদ্ধ যে ভাষারীতিতে সমাসবদ্ধ গুরুগম্ভীর ও সংস্কৃতানুসারী শব্দ সমূহ বর্জন করে মানুষের মুখের ভাষার মার্জিত রূপকে সরল,সহজ ও চটুলভাবে প্রকাশ করা হয় এবং যে ভাষায় ক্রিয়া , সর্বনাম  এবং নঞনার্থক অব্যয় পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয় তেমনি ভাষারীতিকে চলিত বা কথ্য বা মৌখিক ভাষারীতি বলে। তবে কথ্য ভাষা বা চলিত ভাষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী স্থানের ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজের ব্যবহৃত মৌখিক ভাষা, সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ কতৃক শ্রেষ্ঠ মৌখিক ভাষা বলিয়া গৃহীত হইয়াছে। এই মৌখিক ভাষাকে বিশেষভাবে ‘চলিত ভাষা’বলা হয়।’তবে যে যাই বলুক ব্যাকরণ বাংলা ভাষভাষীদের যে ভাষারূপ দুটি নির্ধারণ করে দিয়েছে  এ দু’টি রূপই আমাদের শিক্ষিতজনের ভাষা এবং শিল্প মাধ্যম হিসাবে ‘সংবিধান’রূপে গণ্য করা হয়ে থাকে। সেই হিসাবে সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্যটুকু সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা আমাদের একান্ত কর্তব্য।

যারা মানুষের কাছে সাহিত্য রস পৌঁছে দিতে চান তাদের বাংলা ভাষার এই সব দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। আজকাল অনেকেই সাহিত্য রচনা করছেন যেখানে প্রচুর পরিমানে গুরুচন্ডালী দোষে দুষ্ট এবং বাংলা বানান রীতি সম্পর্কে অজ্ঞতা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন আকাঙ্ক্ষা শব্দটি সর্বত্র আকাঙ্খা, আশিস শব্দটি আশীষ এভাবে লেখা হয়। এই আকাঙ্খা, আশীষ,বানান দু’টি সম্পূর্ণ  ভুল বানান। এমনি প্রচুর ভুল বানানের লেখা শব্দ ব্যাপক ভাবে কিছুটা দায়িত্বহীনের মত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেন এগুলোকে প্রচলিত ভুল বলে আখ্যায়িত করে চোখ বন্ধ করে মেনে নেয়ার একটা অলিখিত ইঙ্গিত। এমনিভাবে যথাতথা ইকার, ঈকার ,উকার ,ঊকারের ভুল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এতে বাংলা  ভাষাকে প্রতিনিয়ত অবমাননা করা হচ্ছে। যারা সাহিত্য রচনা করবেন তারা যদি বাংলা ভাষাকে অবমাননা করে অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করেন তাহলে তাকে সাহিত্যও বলা যায়না এবং বাংলা ভাষা সম্পর্কে তার কোন ধারনা আছে তাও বলা যায়না। আবার  কখনও কখনও দেখা যায় লেখায় গুরুচন্ডালী দোষ এত বেশী সুস্পষ্ট হয়ে আছে যা ভাষাকে অমর্যাদা করছে। যেমন চলিত ভাষারীতিতে লেখার মধ্যে উহা বাহির বিবাহ এই শব্দ গুলোর ব্যবহার যথেচ্ছভাবে করা হচ্ছে। এতে প্রমাণিত  হয় লেখকের বাংলা ভাষার দু’টি রীতি সাধু ও চলিত কোনটি সম্পর্কে তার পূর্ণ ধারণা নেই। সাধু ও চলিত রীতি  একবার ভালভাবে শিখে নিলে গুরুচন্ডালী দোষে দুষ্ট লেখা পড়ে শিক্ষিত জন হতাশ হবেননা।

বাংলা ভাষা দীর্ঘ দিনের চর্চায় এবং প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে একটি  স্বতন্ত্র মর্যাদা ও দীপ্তি নিয়ে। যে দীপ্তি টুকুকে বর্ধিত করার দায়ভার বাঙালিরই। পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর ভাষা গুলোর যেমন একটি আলো আছে, গুরুত্ব আছে এবং তাকে বিশুদ্ধ রাখার দায় আছে , তেমনি বাংলা ভাষারও একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে, দীপ্তি আছে। বাংলা ভাষাকে ছোট করে দেখা এবং তাকে দায়িত্বহীনের মত ব্যবহার করা এক ধরনের অপরাধ। বাঙালি জাতিকে সেই অপরাধ থেকে মুক্ত থাকা উচিত। ঔচিত্যবোধ না থাকলে কোন বিষয়ে সফলতা অর্জন করা যায়না। দোলাচল বৃত্তি কোন বিষয়কে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেনা। তাই আগে নির্ধারণ করতে হবে কি করা উচিত কি উচিত নয়, ঔচিত্যের আবেদন কতটুকু সুনির্দিষ্ট  ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুন্ন হতে না দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে লেখক মন্ডলীর অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। তাহলে টিকে থাকার নতুন পথ সৃজন সফল হবে।

রোজানা নাসরীন, টরন্টো

মন্তব্য