বিমান যাত্রার সময় যে কাজগুলো কখনোই করা উচিৎ নয়

Service onboard

অসুস্থ হলে বা খারাপ অনুভব করলে সাথে সাথেই তা ফ্লাইট এটেন্ডেন্টকে অবহিত করুন। প্রতিটি ফ্লাইট এটেন্ডেন্টেরই প্রশিক্ষণ রয়েছে মেডিক্যাল এমার্জেন্সীতে কি করতে হবে। ছবি : রি. ডাইজেস্ট

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : আমরা যারা প্রবাসে থাকি তাদের জীবনে বিমানযাত্রা এটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বছরে একবার বাংলাদেশে অথবা অন্য কোন দেশে যাতায়ত করি। কেউ কেউ আবার দুই/তিন বছর পর পর একবার করে কানাডার বাইরে যাই। সেটা বাংলাদেশেও হতে পারে অথবা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কোন দেশেও হতে পারে। অনেকে আবার সাউথে অর্থাৎ কিউবা কিংবা সেন্ট্রাল আমেরিকার অন্যান্য দেশে যাই ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু যে যেই উদ্দেশ্যেই যাই না কেন এবং যে দেশেই যাই না কেন আমাদেরকে বিমানে চড়তেই হয়। এমনকি আলবার্টা, সাচকাচুন বা ভেঙ্গুভারে গেলেও বিমানই পছন্দের তালিকায় প্রথম থাকে। কারণ, গাড়িতে বা ট্রেনে গেলে ৩/৪ দিন লেগে যায়।

বিমান পথে হোক বা সড়ক পথে হোক, দূর যাত্রায় আমরা প্রথমেই যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি সেটা হলো নিরাপদ যাত্রা। নিরাপদ যাত্রা বলতে আমরা বুঝি দুর্ঘটনায় না পড়া, যাত্রা পথে কোন রকম উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়া, সাথের জিনিষপত্র খোয়া না যাওয়া বিশেষ করে পাসপোর্ট ও অন্যান্য ট্রাভেল ডকুমেন্ট খোয়া না যাওয়া। আরেকটি বিষয়ও আমাদের চিন্তায় থাকে। সেটি হলো অসুস্থ্য না হওয়া।

সম্প্রতি রিডার্স ডাইজেস্টে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমান ভ্রমণের সময় ১৪ বিষয়ে প্রতিটি যাত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে যদি তিনি ভ্রমণকালীন এবং ভ্রমণ পরবর্তী সময়ে সুস্থ্য থাকতে চান। নিচে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।

১.    বিমানের ভিতর খালি পায়ে হাটবেন না

বিমানের ভ্রমণের সময় কেউ কেউ বমি করেন। যদিও সিটের পিছনে ব্যাগ রাখা হয় বমি ফেলার জন্য, কিন্তু সেই ব্যাগ সবসময় ব্যবহার করা হয়ে উঠে না ঠিক মত। ফলে কখনো কখনো সেই বমি গিয়ে পড়ে ফ্লোরের কার্পেটের উপর। অনেক সময় হাত থেকে গ্লাস ফ্লোরে পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়। সেই গ্লাসের ধারালো টুকরা থেকে কেউ কেউ আহত হতে পারেন খালি পায়ে হাটলে। এভাবে বিমানের ফ্লোরে বমি, রক্ত ইত্যাদি  লেগে থাকতে পারে পরিষ্কার করার পরও। আর সেগুলো থেকে আপনার নগ্ন পায়ে ক্ষতিকারক জার্ম বা জীবাণু লাগতে পারে।

২.       পানীয়তে বরফ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন

২০০৪ সালে এনভাইরনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সী কর্তৃক পরিচালিত এক জরীপে দেখা গেছে বিমানে যে পানি ব্যবহৃত হয় তা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। স্বাস্থ্য মান রক্ষা করে পানি ব্যবহার করে মাত্র ১৫% বিমান। তবে ২০০৯ সালে ‘এয়ারক্রাফ্ট ড্রিংকিং রুল এ্যাক্ট’প্রণীত হওয়ার পর পানির স্বাস্থ্যমান উন্নীত হয়েছে এবং অধিকাংশ বিমান টেপের পানি ব্যবহার করে না। কিন্তু আইস বা বরফ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবস্থার উন্নতি হয়নি। এ ক্ষেত্রে এখনো প্রায়ই টেপ এর পানি ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া বিমানের ওয়াটার ট্যাকংগুলোও অনেক পুরানো। পরীক্ষা করে দেখা গেছে ওগুলোতে ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। প্রায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞ ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট লিন্ডা ফরগুন বলেন, বিমানে আমি অবশ্যই বোতলজাত পানি পান করার পক্ষে। আর বিমানগুলোও এখন বোতলজাত পানি ব্যবহার করে।

৩.    পুরাটা পথ সিটে বসে থাকবেন না

বিমান পথে দীর্ঘ যাত্রার সময় যাত্রীদের অনেকেই ‘ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস’এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেধে যেতে পারে। এটিকে অনেক সময় ‘ইকনমী-ক্লাস সিন্ড্রম’হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়। ইকনমী ক্লাসের সিটগুলো খুব সংকীর্ণ হয়। সামনের দিকে ফাকা জায়গা থাকে না। ফলে বসা অবস্থায় পা নাড়ানোর কোন সুযোগ থাকে না। সাম্প্রতিক কালে ইকনমী ক্লাসের সিট গুলো আরো সংকীর্ণ হয়ে এসেছে।

পায়ে রক্ত জমাট বেধে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার উপায় হলো মাঝে মাঝে উঠে দাড়ানো এবং কিছুক্ষণ পায়চারী করা। তবে মনে রাখতে হবে, খালি পায়ে হাটা ঝুঁকিপূর্ণ যেটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। আর বিমান ভ্রমনের সময় আটসাট পোষাক না পরাই ভাল। কারণ, এই আটসাট পোষাকের কারনেও শরীরে রক্তচলাচল বিঘিœত হতে পারে। স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটির হেলথ কেয়ার বিভাগে চিকিৎসক ক্যাথেরিন ফরসেট বলেন, আপনি যদি উঠে দাড়াতে না পারেন তবে সিটে বসে থাকা অবস্থায় হাটু ভাজ করে বুকের কাছে নিয়ে আসতে পারেন এবং একটু ডান বাম করে নিতে পারেন।

৪.    ট্রে টেবিলে পড়ে যাওয়া খাবার খাবেন না

আপনার আসনের সামনে যে ট্রে টেবিল থাকে (যার উপর খাবার পরিবেশন করা হয়) তাতে যদি কোন খাবার পড়ে গিয়ে থাকে তবে সেটি ফেলে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, যাত্রী বদলের সময় ঐ  ট্রে গুলো যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয় না। তাই আপনি যদি নিজের কোন ম্যাট সাথে না নিয়ে থাকেন অথবা জীবাণুমুক্ত করার জন্য ডিসপোজএবল কোন টাওয়েল সাথে না থাকে তবে ঐ ট্রে-তে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে নিয়ে খেতে যাবেন না। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এপিডিমোলজি ডিপার্টমেন্ট এর অধ্যাপক স্টিফেন মুরস্

বলেন, এই ট্রে গুলো কুখ্যাত। ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট লিন্ডা ফারগুসন বলেন, এই ট্রে গুলো সাধারণত দিনে একবার পরিষ্কার করা হয়। যাত্রীগণ এগুলো ব্যবহার করেণ নানান কাজে। আমি নিজে দেখেছি কোন কোন পিতা বা মাতা বাচ্চাদের ডায়পার চেঞ্জ করেন এই ট্রে-র উপরই। এমনও যাত্রী দেখেছি যারা এই ট্রে-র উপর খালি পা রাখেন।

৫.    বিমানে যাত্রীদের জন্য সরবরাহকৃত কম্বল/বালিশ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা ভাল

বিমানে যে সকল কম্বল বা বালিশ যাত্রীদেরকে দেয়া হয় ব্যবহার করার  জন্য সেগুলো ওয়ানটাইম ইউজের জন্য নয়। অর্থাৎ একই কম্বল ও বালিশ বারবার ব্যবহার করা হয়। আর এগুলো দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সঠিকভাবে ধোয়া হয় না। ফলে এগুলো জীবাণু, উকুন এবং ছারপোকা এক যাত্রী থেকে আরেক যাত্রীর গায়ে ছড়ানোর একটি সহজ মাধ্যম। ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট লিন্ডা ফারগুসন বলেন, আমি দেখেছি অনেক যাত্রী তাদের পা মুড়িয়ে রাখেন এই কম্বল দিয়ে। হাঁচি দেয়ার সময় কেউ কেউ এই কম্বল দিয়ে মুখ ঢাকেন।

৬.    পর্যাপ্ত পানি পান করুন

যাত্রা পথে গলা শুকিয়ে গেছে? এ জন্য লবনাক্ত চিপস বা অন্য কোন স্ন্যাকস্ কে দোষারোপ করবেন না যা হয়তো আপনি ইতিমধ্যে খেয়েছেন। বিমানের কেবিনগুলোতে বাতাসের আদ্রতা থাকে খুবই কম। তাই বিমানে ভ্রমনের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

৭.    এয়ার ভেন্ট এর বাতাস বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না

বিমান যাত্রীদের আসন বরাবর মাথারদিকে এয়ার ভেন্ট থাকে। এই এয়ার ভেন্ট থেকে বাতাস সরবরাহ করা হয়। কোন কারণে যদি আপনি শীত অনুভব করেন তবে সেই ভেন্টটি বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা না করে একটি সোয়েটার বা কোট গায়ে দিতে পারেন। ডাক্তারগণ বলে থাকেন এই এয়ার ভেন্ট থেকে সরবরাহকৃত বাতাসের গতি মিডিয়াম বা হাই ভলিয়মে থাকা জরুরী। কারণ, বিমানের ভিতর বাতাসে ঘুরে বেড়ানো কোন জীবাণু তখন আপনার আসনের কাছাকাছি চলে আসতে পারবে না।

৮.   মদ্যপান সীমিত রাখুন

বিমান ভ্রমণের সময় গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত ওয়ান ড্রিংক (আনুমানিক ১২ আউন্স) হয়তো আপনার যাত্রাকে আনন্দময় করতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন বিশেষজ্ঞদের মতে এই পানীয়টি শরীরে অতিমাত্রায় পানিশূণ্যতা সৃষ্টি  করতে পারে। এর সাথে বিমানের কেবিনে যে শুষ্ক বাতাস থাকে সেটিও যোগ হয়ে এই পানিশূণ্যতা আরো বৃদ্ধি করতে পারে। তাছাড়া অতিরিক্ত মদ্যপান আপনার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে দূর্বল করে দেয়। তাই বিষয়টির প্রতি বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। আর বিমানে উঠার আগে বিমান বন্দরে অবস্থিত কোন রেস্টুরেন্টে বসে যদি মদ্যপান করে থাকেন সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। বিমানে উঠে ওয়ান ড্রিংক পান করা আর বিমানে উঠার আগে মাটিতে অবস্থানকালে টু ড্রিংক পান করার ফলাফল একই হয়।

৯.    বিমানের টয়লেটে কোন কিছুই সরাসরি হাত দিয়ে ছুবেন না

বিভিন্ন পাবলিক প্লেসের মত বিমানের টয়লেটও জীবাণু ছড়ানোর একটি জাঁকাল স্থান। তাই নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য টয়লেটের দরজা খোলার সময় টিস্যু পেপার ব্যবহার করতে পারেন। ভিতরে প্রবেশ করে প্রথমেই হাত ধুয়ে নিন লিকুইড সোপ দিয়ে। পানির কল বন্ধ করার সময়ও টিস্যু বা টাওয়েল পেপার ব্যবহার করুন। টয়লেট ব্যবহার করার সময় টয়লেট সিটে টিস্যু পেপার বিছিয়ে নিন। ফ্লাস করার সময় টিস্যু বা টাওয়েল পেপার ব্যবহার করুন। আবারো হাত ধুয়ে নিন এবং টয়লেটের দরজা খুলার সময় আবারো টিস্যু বা টয়লেট পেপার ব্যবহার করুন।

১০.   বিমানের জানালায় গ্লাসের উপর মাথা হেলিয়ে বা ঠেকিয়ে ঘুমাতে যাবেন না

বিমানে ভ্রমণ করার সময় যারা জানালার পাশে বসেন তাদের অনেকেই তন্দ্রা পেলে বা ঘুম পেলে জানালায় লাগানো গ্লাসে মাথা হেলিয়ে বা ঠেকিয়ে তন্দ্রায় যান বা ঘুমান। মনে রাখবেন, যাত্রীদের অনেকেই হয়তো হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় পাশের যাত্রীর যাতে অসুবিধা না হয় সেই জন্য জানালার দিকে মুখ করে হাঁচি বা কাশি দেন। এতে করে জানালার গ্লাসে জীবাণু সঞ্চিত হয়। আপনি যখন ঐ গ্লাসে মাথা হেলিয়ে ঘুমাতে যাবেন তখন ঐ জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন। দেখা গেছে ভ্রমণের সময় কেউ কেউ লাইসল টাওয়েল সাথে বহন করেন। আপনিও এটি করতে পারেন। তাহলে আপনার সিটের সামনে অবস্থিত ট্রে, পাশের জানালার গ্লাস, আসনের হাতল এই সমস্ত জায়গাগুলো জীবাণু মুক্ত করে নিতে পারেন। আর একটি কাজ করা জরুরী। তা হলো, বিমানে ভ্রমণের সময় আপনার হাত বা আঙ্গুল কখনো মুখের ভিতর প্রবেশ করাবেন না বা মুখমন্ডলের কোথাও স্পর্র্শ করবেন না। জীবাণু সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার এটিও একটি উপায়।

১১.                স্বল্পবসনা হবার চেষ্টা করবেন না

বিমানে ভ্রমণ করার সময় চেষ্টা করবেন যাতে হাত ও পা ঢেকে থাকে এমন পোষাক পরতে। কারণ, বিমানের অন্যান্য অংশের মতো এর আসনও প্রতি জার্নি শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিষ্কার করা হয় না।  ফলে বিমানের আসন থেকে আপনার শরীরে জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে যদি আপনার উন্মুক্ত ত্বক তার সংস্পর্ষে আসে।

১২.   অসুস্থতা অনুভব করলে ফ্লাইট এটেন্ডেন্টকে জানাতে বিব্রতবোধ করবেন না

বিমানে ভ্রমণের সময় অসুস্থ হলে বা খারাপ অনুভব করলে সাথে সাথেই তা ফ্লাইট এটেন্ডেন্টকে অবহিত করুন। এ ক্ষেত্রে বিব্রত বোধ করার কোন কারণ নেই। সংকোচ অসুভব করারও কোন কারণ নেই। প্রতিটি ফ্লাইট এটেন্ডেন্টেরই প্রশিক্ষণ রয়েছে মেডিক্যাল এমার্জেন্সীতে কি করতে হবে। এমনকি প্রবসকালীন সেবা প্রদানের ট্রেনিংও তাদের রয়েছে। আপনার জরুরী অবস্থায় আপনাকে সেবা দেয়া তার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

মন্তব্য