শা শা এক পরিযায়ী পাখি

Bidut Sarker

বিদ্যুৎ সরকার

শাশার সাথে দেখা নেই, কথা নেই আজ অনেক দিন। হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে যাবে কোন অনুষ্ঠানে Ñ এমনটা ভাবতে ভাল লাগে। আর, সত্যি সত্যি যদি ভাবনাটা বাস্তবে ঘটে, আনন্দটা এমনিতেই দ্বিগুণ হয়ে যায়। শাশার সাথে শেষ দেখা কবে, কোথায় হয়েছিল বলতে গেলে ভাবতে হবে। নিশ্চই কোন অনুষ্ঠানে। অবশ্য আমার জানা থাকে না, আদৌ সে আসবে কি না। আমি আমার সাথে বাজিতে অবতীর্ণ হই, কাউকে কিছু বলি না। এ এক ‘লস্ট এন্ড ফাউন্ড’খেলার ঝক্মারি Ñ আমার ভাল লাগে। হেরে গেলেও তেমন কষ্ট পাই না। আর জিতে গেলে সুখটা অন্তরে অন্তরে ঝন্ঝনিয়ে বেজে যায়।

পরিযায়ী পাখির মত শাশা এক পাখি হয়ে উড়ে উড়ে এসে আবার চলেও যায় কিছু না বলেই। হাকালুকি, টাঙ্গুয়া হাওরগুলোতে শীতের পাখির মতো শাশা বুনো হাঁস হোয়ে পাখা মেলে শাঁই শাঁই শব্দ করে উড়ে। কখনো উড়তে উড়তে শিস দিতে দিতে বিলের জলে ছোট ছোট ঢেউ তুলে। আমার হৃদয় কি সত্যি সত্যি তখন টাঙ্গুয়ার জলের মতো কেঁপে কেঁপে উঠে যখন শাশাকে দেখি আমার মনের আকাশে জীবনানন্দের বুনো হাঁস হয়ে উড়ে, পাখা ঝাপটায়, শিস দেয় মনের সুখে? আবার কখন পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে যায় অজানা ঠিকানায়।

প্রতি বছর শীত এলেই পরিযায়ী পাখিদের কথা মনে পড়ে যায় আমার। সিলেটের হাকালুকি বা মেঘালয়ের ঢাল বেয়ে ঝরে পরা জলের ধারায় সৃষ্ট জলাশয় টাঙ্গুয়ায় নানা রঙ্গের বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের আগমন ঘটে। ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন জলাশয় ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে হাজার হাজার পাখিদের বিচরণ। প্রতি বছর প্রায় পঞ্চাশ প্রজাতির কয়েক লাখ পাখি উড়ে আসে নানান দেশ হতে। পাখিদের এ আসা – যাওয়া আমাকে বিচলিত করে দিত, মনকে মুক্ত করে দিত। অমি যেন এক নীল আকাশ হয়ে যেতাম প্রতিবার। আর গুন গুনিয়ে গেয়ে উঠতাম পাখিদের জন্য Ñ ছুঁয়ে নাও আকাশ। ওদের চলে যাওয়ার ব্যথা অনুভব করতাম, পরক্ষণেই আগামী বছরের স্বপ্নে বিভোর হতাম। স্বপ্নটাকে সযতনে তুলে রাখতাম এক নতুন সকালের জন্য।

এখানেতো সবটাই উল্টো, বছরের সিংহভাগ সময় থাকে শীতের চাদরে ঢাকা। ক্রমেই শীতের তীব্রতা প্রকট হতে থাকে এবং মার্চের দিকে আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসে। পাখিরা শীতের তীব্রতা সহ্য করতে পারে না বলেই তুলনামূলক স্বল্প শীতের দেশগুলোতে দল বেঁধে পারি দেয়। আবার, গ্রীষ্মের প্রারম্ভে ফিরে আসতে থাকে নিজ বাসভূমে। তবে কী শা শা পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে গেছে ভীন দেশে টরন্টোর আকাশ শূণ্য করে অন্য পাখিদের সঙ্গী হয়ে! তবে কী আরেক গ্রীষ্মের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দুঃখ মেশানো শূণ্যতাকে বুকে নিয়ে? আমারতো একটিই আকাশ, একটি সবুজ আঙ্গিনা। এ আকাশ কখনো কালো মেঘে ঢেকে যায় আবার, সোনালী রোদের ঝিলিকে আলোকিত করে সবুজ প্রান্তর। শীতের ছোঁয়ায় পাতারা ঝরে যায়, তুষার ধবল জনপথ, বসত বাটি। জন-মানব শূণ্য পথ-ঘাট, পোষাকের ভিতর চেনা মুখ অচেনা লাগে Ñ বিব্রত, বিভ্রম। সবুজ প্রান্তর অবুঝের মতোন বিবর্ণ হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় অজান্তেই। সময় দীর্ঘায়িত হতে থাকে অসময়ের টানা পোড়েনে। কষ্ট করে দুঃখকে ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। জীবন-মৃত্যুর সমান্তরাল পথ চলা, কথা বলা দীঘার সৈকত ছেড়ে লেক অন্টারিওর বালুকা বেলায়। হিমাংকের নিচে তাপমাত্রা, জল জমে জমে হীম শীতল বরফ। হঠাৎ তুষার ঝড়ে দৃষ্টি ঝাপসা, গাড়ির উইনডশীল্ড ওয়াইপারের দ্রুত সঞ্চালন, বরফ কনার সফেদ পলেস্তারা শহরের শরীরে।

আমার চেতনায় কুয়াশায় ঢেকে আছে দূরের গ্রাম, দৃশ্যমান ঘর-বাড়ি পলকেই অদৃশ্য। পূঁইয়ের ডগায় স্ফটিকের মতোন শিশির বিন্দু, লাউয়ের  মাচায় বাতাসে দোল খাওয়া  শুভ্র লাউফুল। আমের বোলের ম ম গন্ধে মৌমাছির গুঞ্জন। টিনের চালে টুপটুপ ঝরা বকুলের ছন্দময় শব্দ। রসশিক্ত নিরস জনেরা কেমন রসময় হয়ে উঠে এক চুমুকেই। উঠানে ধুমায়িত রসের পায়েশ। মুড়ি-মুড়কি চাদরে মাখা সকালের সোনা-রোদ। করিম চাচা মাঠের কাজ শেষে ফিরে এসেছে। কন্কনে শীতে কাক-ভোরে করিম চাচার প্রথম প্রহর শুরু, উঠানের রোদে চায়ের আসরে ছেলে বেলার গল্প Ñ মুক্তিযুদ্ধের সাহসী উপাখ্যান। আরো কত কি। আমরা অবাক হয়ে তাঁর গল্প শুনছি।  আসর শেষে সবাই নিজ নিজ কাজে ফিরে যাব। উঠতে উঠতে করিম চচার স্বগত সংলাপ Ñ আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ চাই।

 

বিদ্যুৎ সরকার

টরন্টো

মন্তব্য