বিষন্নতা : টরন্টোর দুই তরুণের চলে যাওয়া কমিউনিটির জন্য ওয়েকআপ কল

 

বিষন্নতা একটি গুরুতর ব্যাধি। ছবি : pts4chg.ca

বিষন্নতা একটি গুরুতর ব্যাধি। ছবি : pts4chg.ca

গত ৭ এপ্রিল ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল -আসুন ডিপ্রেশন নিয়ে কথা বলি।

গত ৯ এপ্রিল টরন্টোর বাংলাদেশ সেন্টার এন্ড কমিউনিটি সার্ভিসেস এর মিলনায়তনে আমাদেরকে সত্যি সত্যি কথা বলতে হয়েছে ডিপ্রেশন নিয়ে। আসলে কথা বলতে আমরা বাধ্য হয়েছি। কারণ, অতি সম্প্রতি টরন্টোতে সাবিত খন্দকার ও ফাহমি অরিফ রহমান নামের দুই তরুণ বিষন্নতার শিকার হয় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বিষয়টি আমাদের কমিউনিটিকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়ে যায়। প্রমিজিং এই দুই তরুণকে হারিয়ে তাদের বাবা-মায়ের পাশাপাশি কমিউনিটিতেও নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। এই পরিস্থিতিতে শোকের পাশাপাশি সবাই সচেতন হয়ে উঠার তাগিদও অনুভব করেন ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আর এই কারণেই আয়োজন করা হয়েছিল বিষন্নতার বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এক আলোচনা সভার।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সাবিত খন্দকারের বাবা সেলিম খন্দকার। জনাব সেলিম বলেন, সাবিতের এই চলে যাওয়া আমাদের কমিউনিটির জন্য একটি ওয়েকআপ কল। তিনি বলেন, ডিপ্রেশন নিয়ে আমার আরো আগেই সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু ডিপ্রেশন বিষয়ে আমার কোন ধারণা ছিল না।

আসলে সাবিতের বাবা একা নন, ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা বিষয়ে আমাদের অধিকাংশ মানুষেরই জ্ঞান সীমিত। বিষন্নতা যে একটি গুরুতর ব্যাধি এই ধারণাই অধিকাংশ মানুষের নেই। যাদের কিছুটা ধারণা আছে তারা একে আমলে নিতে চান না। বা লোক লজ্জার ভয়ে আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে চাই না। এই প্রবণতাটি তুলনামূলকভাবে বেশী লক্ষ্য করা যায় পুরুষদের মধ্যে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় কানাডায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ লোক বিষন্নতায় ভুগেও চিকিৎসা করান না।

ইমিগ্রেন্ট কমিউনিটিতেও একই প্রবণতা। বিশেষ করে যারা এশিয়া বা সাউথ এশিয়া থেকে কানাডায় এসেছেন তাদের মধ্যে যারা বিষন্নতায় ভুগেন তাদের নিয়ে তামাশাও করতে দেখা যায়। পাগল বলে আখ্যায়িত করা হয় বিষন্নতায় আক্রান্ত লোকদেরকে। কিন্তু এটি যে খুবই গুরুতর অসৌজন্যতা এ কথা আমরা মানি না। আমাদের সংস্কৃতিটাই এরকম।

প্রবাসে এসে ডিপ্রেশনে বা বিষন্নতায় ভুগছেন এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কেউ হয়তো বেশী কেউ কম। কারোর টা সহজেই প্রকাশ পায়, কারোরটা সহজে প্রকাশ পায় না। আর কেউ একে চেপে রাখেন।

বিষন্নতা প্রকাশ না পাওয়াটা আরো বিপজ্জনক। কারণ, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাটুকু তার আত্মীয়-বন্ধুরা ঠিক মত উপলব্দি করতে পারেন না। রোগী নিজেও বিষয়টি উপলব্দি করতে পারেন না। এই পরিস্থিতিতে ধীর ধীরে স্লো-পয়জনিং এর মত এই বিষন্নতা মানুষকে কুড়ে কুড়ে খায়।

মনে রাখতে হবে, ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি। এই রোগকে আজ আর অহবেলা করার উপায় নেই। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অচিরেই এই বিষন্নতা রোগটি বিশ্বের এক নম্বর কিলার ডিজিজ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে। বর্তমানে বিশ্বে মোট আত্মহত্যার ৬০ ভাগই বিষন্নতার কারণে হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে ৩০ কোটি মানুষ বিষন্নতায় ভুগছেন। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিষন্ন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮ শতাংশ। এই রোগের কারণে আত্মহননের প্রবণতা, নেশাগ্রস্ত হওয়া, ডায়াবেটিস ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তাই একে অবহেলা করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। বাংলাদেশ সেন্টারে যারা এই বিষন্নতা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন তাদের সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বাবা-মায়ের বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলাটা খুবই জরুরী এই প্রবাসে। আর ছেলে-মেয়েদের উপর যাতে অযথা মানসিক চাপ সৃষ্টি না হয় সে জন্য অপর কারো সঙ্গে তুলনা না করারও আহ্বান জানান তারা। সেদিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অনেকেই অশ্রুসজল হয়ে পড়েন।

আমরা অনেকেই কমবেশী এই বিষন্নতার শিকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই রোগের চিকিৎসা রয়েছে। শুধু লজ্জা ও সংকোচ পরিত্যাগ করে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়াটাই এখন জরুরী। সেটা আমাদের প্রথম প্রজন্মের বেলায় হোক বা দ্বিতীয় প্রজন্মের বেলাই হোক, সবাইকেই এই বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

মন্তব্য