কানাডায় হালাল পণ্য নিয়ে প্রতারণা ও বিতর্ক

halal

হালাল পণ্য নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ কানাডায় নতুন নয়। সেই সাথে রয়েছে বিতর্কও। দিন দিন হালাল পণ্যের ক্রেতা সংখ্যা যত বাড়ছে, প্রতারকদের প্রতারণাও তত বাড়ছে। বর্তমানে কানাডায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয় এই খাতে। আগামীতে এর পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে। কারণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরীপ থেকে জানা যায় কানাডায় মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মুসলমানের বাস কানাডায়। ধারণা করা হচ্ছে আগামী ২০ বছরে এই সংখ্যা ৩০ লাখে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। এ থেকেই অনুমান করা যায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কেন হালাল পণ্যের ব্যবসায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

হালাল মনিটরিং অথরিটি অব কানাডার চিফ অপারেটিং অফিসার ইমাম ওমর সুবেদার সম্প্রতি বলেন হালাল পণ্য নিয়ে প্রতারণা চলছে প্রচন্ডভাবে। তিনি ইতিপূর্বেও কানাডার গ্লোবাল নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি অনেক দিন আগেই জানতে পারি এই হালাল ফুড নিয়ে কোন কোন প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে আসছে। হালাল ফুড প্রসেসিং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকদের কাছ থেকেই আমি এরকম তথ্য পেয়েছি। প্রথম দিকে প্রতারণার বিষয়টি নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। কিন্তু পরে আমাদের নিজস্ব টিম যখন কয়েকটি স্থানে তদন্ত চালায় তখন আমরা নিশ্চিত হই যে আসলেই প্রতারণা চলছে।”

কানাডায় এখন সমস্যা হচ্ছে, এখানে কোন জাতীয় তত্ত্বাবধায়ক কমিটি নেই যারা হালাল সার্টিফিকেট প্রদানকারীদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দেখে তাদেরকে স্বীকৃতি দিবেন। বর্তমানে হালাল সার্টিফিকেট প্রদানকারী যে কয়টি সংগঠন বা সংস্থা রয়েছে তারা প্রত্যেকেই দাবী করেন তাদের প্রদত্ত সার্টিফিটেকই বিশুদ্ধ বা খাঁটি। কিন্তু কৌতুহলদ্দীপক বিষয় হলো, সার্টিফিকেট প্রদানকারী এই সংগঠন বা সংস্থাগুলোর অনেকেই একজন আরেকজনকে স্বীকৃতি দেন না। অর্থাৎ সংস্থা ‘এ’ বলে বেড়ায় যে সংস্থা ‘বি’ এর সর্টিফিকেট বিশুদ্ধ বা খাঁটি নয়। অপর দিকে সংস্থা ‘বি’ও বলে বেড়ায় যে সংস্থা ‘এ’ এর সার্টিফিকেট বিশুদ্ধ বা খাঁটি নয়।

সমস্যা আরো রয়েছে। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে বলা আছে, “বিসমিল্লাহ বলে যে কোন মুসলমানের জবাই করা পশু হালাল। এমনকি নাপাক অবস্থায় জবাই করলেও তা হালাল হিসাবেই গণ্য হবে। তবে অমুসলিম কারোর হাতে জবাই করা পশু হারাম। কোন বিধর্মীর দোকান হতে মাংস কিনে খাওয়া জায়েজ নয়। এমনকি উক্ত দোকানের মালিক বা কর্মচারী যদি দাবী করেন যে, মুসলমান দ্বারা জবাই করা হয়েছে, তবু তা জায়েজ নয়।”

আমরা জানি হালাল পণ্যের ব্যবসায় অধিক মুনাফা দেখে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি মেইনস্ট্রিম গ্রোসারীতেও হালাল মাংসের সেকশন খোলা হয়েছে। এর মধ্যে নো-ফ্রিলস, মেট্রো, লবলজ, সুবে, ওয়ালমার্ট এ সবই রয়েছে। ফাস্ট-ফুড রেস্টুরেন্টগুলোও হালাল ফুড এর অপশন রেখেছে ক্রেতাদের জন্য। এর মধ্যে আছে পিজ্জা পিজ্জা, কেএফসি, পাপাইয়াস।

সবাই জানেন উপরে উল্লেখিত গ্রোসারী ও রেস্টুরেন্ট এর প্রায় সব মালিকই বিধর্মী। এই অবস্থায় ক্রেতা বা ভোক্তাগণ কি করবেন? এ বিষয়ে কানাডায় বসবাসকারী মুসলমান ধর্মগুরুদের বক্তব্য কি তা সুষ্পষ্ট করা উচিৎ।

পশু জবাই পদ্ধতি নিয়েও রয়েছে মতভেদ। আমরা জানি কানাডার বড় বড় ফার্মগুলোতে মুরগী জবাই করা হয় মেশিনে। যে প্রক্রিয়ায় সেখানে মুরগী জবাই করা হয় তাতে কিছু কিছু মুরগীর গলা আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু আমরা জেনেছি, মুরগী জবাই করার সময় যদি ভুলক্রমে গলা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায় তবে সেই মুরগী খাওয়া দুরস্ত। গলা সম্পূর্ণ কেটে দেওয়া মাকরূহ। কেউ কেউ বলেন, মেশিনে পশু বা পক্ষী জবাই করা হলে তা আর হালাল থাকে না। হাতে না কাটলে তা হারাম হয়ে যায়। এর বিরোধী পক্ষ বলেন, নিয়ম মেনে অর্থাৎ মুসলমান কর্মচারী দিয়ে জবাই করার আগে ‘বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবর’ বলে মেশিনে জবাই করলে তা হালাল বলেই গণ্য হবে। তাদের যুক্তি হলো, প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে জবাই করার পদ্ধতিও পরিবর্তন করা যেতে পারে।

এখন একদিকে হালাল পণ্য নিয়ে প্রতারণা, অন্যদিকে জবাই পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক এবং পাশাপাশি অমুসলিম দোকান থেকে হালাল পণ্য ক্রয় করা যাবে কি যাবে না এই নিয়েও বিতর্ক থাকায় গোটা ব্যাপারটাই একটি জটিল পরিস্থিতির মুখমুখি দাড়িয়েছে।

আমাদের মনে হয় এই পরিস্থিতিতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য কয়েকজন ধর্মবিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি করা যেতে পারে যারা আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে উপরে উল্লেখিত সমস্যাগুলোর একটি সমাধান খুঁজে বের করবেন। তাহলেই সম্ভবত হালাল পণ্য নিয়ে যে বিতর্ক ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তার অবসান ঘটতে পারে এবং ক্রেতাদের মনের সন্দেহও দূর হতে পারে।

মন্তব্য