বিষন্নতা রোধে সবার আগে দরকার এডুকেশন সেই সাথে এ্যাওয়ারনেস ও একসেপ্টেন্সী

 

বিষন্নতা সম্পর্কে জানতে হবে সন্তান হারানোর আগে, পরে নয় : আরিফ রহমান ও সাবিনা রহমান

বাবা আরিফ রহমান ও মা সাবিনা রহমানের সঙ্গে ফাহমি রহমান

বাবা আরিফ রহমান ও মা সাবিনা রহমানের সঙ্গে ফাহমি রহমান

ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর সেন্ট জর্জ ক্যাম্পাসে লাইফ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল ফাহমি রহমান। কানাডায় জন্ম নেয়া এই তরুণ ছিল অত্যন্ত মেধাবী। এখানে যাকে গিফটেড স্টুডেন্ট বলে সে তাই ছিল। টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে সে দুই বার স্কলাশীপ পায় খুব ভাল মার্ক পাওয়ার জন্য। গত ১৮ ফেব্রুয়ারী ডাউন টাউনে যাওয়া কথা বলে সে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু তারপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। যাওয়ার আগে বাড়িতে রেখে গিয়েছিল সুইসাইডের একটি নোট।

উল্লেখ্য যে, ফাহমি ২০১৫ সালে মারাত্মক এক সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে ভাগ্যক্রমে অক্ষত অবস্থায় বেচেঁ যায়। কিন্তু এর পর থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় যা ক্রমে ডিপ্রেশনে রূপ নেয়।

সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর অনেক খোঁজাখুজি করেও তার কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে গত ৩০ মার্চ টরন্টোর সুগার বিচের কাছে অন্টারিও লেক থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃতদেহ উদ্ধারের খবরে চরমভাবে ভেঙ্গে পরেন ফাহমির বাবা আরিফ রহমান ও মা সাবিনা রহমান। তার মৃত্যু সংবাদে টরন্টোর বাংলাদেশী কমিউনিটিতেও নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।

আমরা প্রবাসী কণ্ঠ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে কথা বলেছি ফাহমির বাবা ও মায়ের সঙ্গে। যদিও তারা সন্তান হারানোর বেদনায় ছিলেন চরম বিপর্যস্ত, তবু কথা বলেছেন আমাদের সঙ্গে। কথা বলেছেন আমাদের কমিউনিটিতে এ বিষয়ে এওয়্যারনেস তৈরীর লক্ষ্যে। এখানে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো:-

প্রথমে কথা বলেছেন ফাহমির মা সাবিনা রহমান। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ফাহমি টরন্টোতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়। ঐ দুর্ঘটনায় তার গাড়ি দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে অক্ষত অবস্থায় বেচেঁ যায়। দুর্ঘটনায় তার কোন ফল্ট ছিল না। যে গাড়ি তাকে হিট করে সেই গাড়ির চালক বেচেঁ আছে। ফাহমির আইনজীবী তাকে বলেছিল ঐ চালকের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য। কিন্তু সে করেনি। তার ভাষ্য ছিল, বৃদ্ধা ঐ মহিলা চালক এমনিতেই অনেক সাফার করেছে। আমি তাকে আর বাড়তি পীড়া দিতে চাই না। তার এই কথায় আমরা খুবই গৌরব অনুভব করেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমরা পৃথিবীতে সবচেয়ে গৌরবান্বিত পিতা-মাতা।

ঐ সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকেই ফাহমি কেমন যেন বদলে যায়। ঘর থেকে বের হতো না। বেশিরভাগ ক্লাশই অনলাইনে করতো। কিন্তু আমরা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি। কিছুটা খুশিও ছিলাম যে সে ঘরেই থাকছে। আমাদের সময় দিচ্ছে। তবে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটায় আমরাও একটা ঝাঁকুনি খেয়েছিলাম।

 পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানে হাস্যোজ্জল ফাহমি রহমানকে দেখা যাচ্ছে বাবা ও মায়ের সঙ্গে


পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানে হাস্যোজ্জল ফাহমি রহমানকে দেখা যাচ্ছে বাবা ও মায়ের সঙ্গে

দুর্ঘটনার পর তাকে আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম তার কোন সাহায্য লাগবে কিনা বিশেষ করে কাউন্সিলিং। কিন্তু সে বলেছিল, না আম্মু আমার কোন কিছু লাগবে না। আমি ঠিক আছি।

সেখানেই আমাদের একটু ভুল ছিল সম্ভবত। ছেলেরা তো সহজে কিছু স্বীকার করতে চায় না। একটু ম্যাচুরিটি দেখানোর প্রবণতা থাকে। মেয়েরা যেমন সমস্যাগুলো বলে ছেলেরা তেমন ভাবে বলে না। বাইরে যাওয়া বন্ধ করার পাশাপাশি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও বন্ধ করে দিয়েছিল ফাহমি। কোন পার্টিতে যেত না। কিন্তু সে এরকম ছিল না। খুবই মিশুক প্রকৃতির ছিল। বন্ধুদের মধ্যে সে ছিল মধ্যমনি। সবসময় হাঁসি-খুশী থাকতো, কৌতুক প্রিয় ছিল।

কিন্তু বাইরে যাওয়া বন্ধ করলেও ঘরে আমাদের সঙ্গে ছিল একেবারে স্বাভাবিক। বাসায় কোন মেহমান আসলে তাদের সঙ্গেও স্বাভাবিক আচরণই করতো। তারাও টের পেত না সে যে ভিতরে ভিতরে সমস্যায় ভুগছিল। বাসায় পার্টির আয়োজন করা হলে সে খুব খুশী হতো। ঘরদোর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই সাহায্য করতো সে।

কিন্তু এভাবে দিন যত কাটছিল ততই সে যেন আরো চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে স্বাস্থ্যহানিও ঘটতে লাগলো। আমরা ভেবেছিলাম সে হয়তো ডায়েট করছে। সেও তাই বলতো। আসলে তা ছিল না, তার খাওয়ার ইচ্ছাটাও ক্রমে কমে এসেছিল। এভাবে আরো কিছুদিন যাওয়ার পর সে একসময় বিছানা নিল। সে তার রূমেই থাকতো বেশীরভাগ সময়। এখানে টিন এজ ছেলে-মেয়েরা বিশেষ করে ছেলেরা একটু প্রাইভেসী চায়। তাই আমরাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কখন তাকে একা থাকতে দিব বা কখন তার কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলবো।

Fahmi

তাজমহল এর সামনে ফাহমি

 

তখন আমি আবার কর্মস্থলে লোকজনের সঙ্গে কথা বললাম। তারা কেউই ডাক্তার না হলেও মেডিক্যাল ফিল্ডে কর্মরত। দেখলাম এ বিষয়ে তাদের মোটামুটি ধারণা আছে। তারা আমাকে জানালো, এটি ডিপ্রেশনের লক্ষণ। ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে হবে।

তখন আমি ছেলে সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম এই বিষয়ে। জানতে চাইলাম সে বাইরে যায় না কেন। কিন্তু সে তখনও বলছে সে ভাল আছে। সে নায়েগ্রা ফলস এ যেতে খুব ভালবাসতো। আমরা তাকে সেখানে নিয়ে যেতে চালাম। সে বললো, না আম্মু তোমরা যাও।

তখন একদিন ফাহমিই আমাকে ডেকে নিয়ে বললো, আম্মু তোমার সাথে কথা আছে। আমি বললাম কি কথা? সে তখন দরজা বন্ধ করে আমার পাশে বসলো। এবং তখনই সে বললো, গত প্রায় এক বছর ধরেই সে ডিপ্রেশনে ভুগছে। একথাটি সে যখন আমাকে জানালো তখন সে একেবারে বিছানায় শোয়া। কিছু খেতে পারে না। ক্ষুধার কোন টেন্ডেন্সীই নেই তার। সে আমাকে আরো শর্ত দিল যে, তার এই ডিপ্রেশনের বিষয়টি যাতে কাউকে না জানাই। আমি জানতে চাইলাম কেন বাবা? তারা জানলে সমস্যা কোথায়? সে বললো কেউ বুঝবে না বিষয়টি। আমি তাকে তখন বলেছিলাম, আমি তো তোমার সঙ্গে অন্য মায়েদের মত আচরণ করিনি। তবে তুমি আমাকে কেন শুরুতেই জানালে না?

ফাহমি এমনিতে খুব যতœশীল ছিল অন্যদের প্রতি। আমাদের ব্যাপারে ছিল তার বিশেষ রকমের যতœ। আমরা কষ্ট পাই এটা সে কখনোই চাইত না। ফলে শত কষ্টের মধ্যেও আমাদেরকে ভাল থাকার ভান করতে হয়েছে যাতে তার ডিপ্রেশনের মাত্রা আরো বেড়ে না যায়।

তখন তাকে বললাম ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য। কিন্তু সে রাজী হলো না এবং বললো, কেউ তাকে আর সাহায্য করতে পারবে না। তারপর অনেক বলাবলির পর সে একদিন রাজী হলো ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য। ডাক্তার তাকে দেখলো।

ডাক্তারের ভাষ্য ছিল, এই বয়েসের ছেলেদের বেলায় এরকমটা হতে পারে। বিশেষ করে তারা যখন ইউনিভার্সিটিতে যায়, হঠাৎ করে লেখাপড়ার চাপ বেড়ে যায়। আর সাবজেক্ট যদি কঠিন হয় যেমন লাইফ সাইন্স, তখন চাপটা বেশীই হয়। তাছাড়া শরীরের হরমন চেঞ্জের বয়স এটি। এই সব মিলিয়ে এংজাইটি অথবা ডিপ্রেশন এর ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ঔষধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে।

ডাক্তার ঔষধ দিলেন। সে সপ্তাহ তিনেক ঔষধ খেলে। প্রথম দিকে মনে হলো, ঔষধে কাজ হচেছ। একটু যেন চাঙ্গা হয়ে উঠছে সে। কিন্তু তার দিনকয়েক পরেই সে ঔষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিল। সে জানালো, এই ঔষুধে নাকি খালি ঘুম পায়। দুর্বল লাগে। এরকম হলে সে ক্লাসে যাবে কি করে।

তার এই ঔষধ বন্ধ করাটা বোধ হয় খুবই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ, মাস না পেরুতেই আবার তার সিম্পটমগুলো দেখা দিল। আবার সেই বিষন্নতা। স্যাডনেস। কিন্তু ঘরে আমাদের সঙ্গে সে কথা বলতো। ওর বাবা ছিল ওর ভাষায় – “বেস্ট ড্যাড ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড”। আর মা সম্পর্কে বলতো, “বেস্ট ফ্রেন্ড ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড”। ফাহমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিল যে আমার সাথে সবকিছুই শেয়ার করতো এবং আলোচনা করতো। আমার জীবনের যা কিছু অর্জন তার পিছনে রয়েছে এই ফাহমির অনুপ্রেরণা।

আমরা কখনো আমাদের ছেলে-মেয়েকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতাম না। বলতাম না যে, দেখ ওমুকে এই করেছে, তোমাদেরকেও তাই করতে হবে। ডাক্তার হতে হবে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে এরকম কোন চাপ কখনো আমরা তাদেরকে দেইনি। তবে ফাহমি যেহেতু অত্যন্ত মেধাবী ছিল তাই তাকে এনকারেজ করতাম যাতে তার সেই মেধার অপচয় না হয়। ফাহমির বড় বোন টুসিয়া একজন ল’ইয়ার। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে পাশ করে বের হয়েছে সে।

ফাহমি খুব বেশী সময় ধরে পড়তো না। অল্প সময় পড়েই সে ভাল রেজাল্ট করতো। তাই বলতাম, দেখ তুমি যদি আরেকটু সময় নিয়ে লেখাপড়া কর তবে চিন্তা কর তুমি কোথা গিয়ে দাড়াতে পারবে।

ঔষধ বন্ধ করার পর তার অবস্থার যখন আবারো অবনতি ঘটতে থাকলো তখন আমরাও চিন্তিত হয়ে পরলাম। তাকে বলতাম তুমি বাইরে যাও। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাও। তুমি ক্লাশেও যাচ্ছ না। এভাবে ঘরে বসে থাকলে তো তুমি আরো বেশী অসুস্থ হয়ে পড়বে।

এর মধ্যে সামার এসে গেল। আমাদের বাড়িটি অন্টারিও লেকের পাশে। ফাহমি আমাকে নিয়ে লেকের ধারে হাটতে যেত প্রায়ই। কোন কোন দিন কয়েক ঘন্টা ধরে সে আমার সঙ্গে আমার হাত ধরে হাটতো। তখন মাঝে মাঝে বলতো – “আম্মু হোয়াট হেভ আই ডান টু মাই লাইফ”। সে আরো বলতো, “আমার বন্ধুরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ থার্ড ইয়ারে কেউ ফোর্থ ইয়ারে। আর আমি স্ট্রাগল করছি নিজেকে নিয়ে। আমাকে কেন ঔষধ খেতে হবে।” সে নিজেকে দোষারোপ করতে আরম্ভ করলো। আমি তখন তাকে বুঝাতে চেষ্টা করতাম। বলতাম, না ফাহমি, তোমার কোন দোষ নেই।

ফাহমির সেল্ফ কনফিডেন্সটা হারিয়ে গিয়েছিল। নিজেকে দোষারোপ করার পাশাপাশি সে আরো মনে করতো সে হ্যান্ডসাম নয়। গুড লুকিং নয়। সে ব্রিলিয়ান্ট নয়। সে অকৃতকার্য। কিন্তু তার এই চিন্তাগুলো সঠিক ছিল না। সে ছিল অত্যন্ত মেধাবী। ৬ ফুটেরও বেশী লম্বা এক তরুণ- আমার চোখে সে ছিল মোস্ট হ্যান্ডসাম এন্ড গর্জিয়াস ইয়ং বয় অন আর্থ।

গত ডিসেম্বরে ওর ফ্রেন্ডদের একটি গেট-টুগেদার হলো। আমরা তাকে উৎসাহ দিলাম ওখানে যাওায়ার জন্য। সে যেতে চায়নি। বললাম – যাও, দেখবে ভাল লাগবে। একপর্যায়ে সে রাজী হলো।

অসুস্থ হওয়ার আগে সে এগুলোতে নিয়মিত যেত। সে ছিল হার্ট অব দ্যা পার্টি। সবাইকে নাচিয়ে রাখতো সে। কিন্তু এবার অনেক বলে কয়ে তাকে পাঠানোর পর সে বেশীক্ষণ সেখানে থাকতে পারেনি। প্রথমে গিয়েছিল হাঁসি মুখেই। কিন্তু গেট-টুগেদার পার্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সে আমাকে ফোন দিয়ে বলল, মা তুমি কি আমাকে পিক-আপ করতে পারবে এখন? আমার ভাল লাগছে না। আমি বললাম কেন কি হয়েছে? তুমি কি অসুস্থ ফিল করছ? সে বললো- না আম্মু, এখানে এসে দেখি আমার বন্ধুরা সবাই প্রায় ডান। এরা কেউ ইঞ্জিনিয়ার কেউ ডাক্তার হয়ে যাবে আর কিছু দিনের মধ্যেই। আমি কি করলাম? আবারো তার সেই একই কথা- হোয়াট হেভ আই ডান টু মাই লাইফ।

তার অবস্থা যখন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিল তখন অনেক বলে কয়ে তাকে আবারো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। সেটা গত জানুয়ারী মাসের ঘটনা। ডাক্তার তাকে দেখে শুনে একটি ঔষধ দিল। সেও রাজী হলো ঔষধ খেতে। বাড়িতে এসে সে ঔষধ খাওয়া শুরু করলো। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দেখলাম ভালর দিকেই যাচ্ছে। সে নিজে থেকেই বলছে ইউনিভার্সিটিতে আবার এপ্লাই করবে। আমরাও খুব খুশী তার উন্নতি দেখে। কি কি সবজেক্ট নিবে তা নিয়ে আলোচনাও হলো। আমরা তাকে বললাম সাবজেক্ট একটু কমিয়ে নাও এবং কঠিন কোন সাবজেক্ট এই মুহুর্তে নিও না। এতে করে প্রেসার কম থাকবে। সেও সেই ভাবেই সব করলো।

এই সময় তার ইমপ্রুভমেন্ট কি হচ্ছে তা জানার জন্য আবার ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার জানতে চাইল এখন সে কিরকম ফিল করছে। সে বললো, আগের মতই, কোন পরিবর্তন দেখছি না। তখন ডাক্তার ঔষধের মাত্রা দিল ডাবল করে। সম্ভবত সেটাই ছিল একটা বড় রকমের ভুল। ডিপ্রেশনের ঔষধ সাথে সাথে কাজ করে না। চার থেকে ছয় সপ্তাহ লাগে কাজ শুরু করতে। কিন্তু ডাক্তার তিন সপ্তাহের মাথায় ঔষধের মাত্রা কেন ডাবল করে দিল আমরা জানিনা। পরে শুনেছি, এই ঔষধ খেলে সুইসাইডাল টেন্ডেসী আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এ জন্য রোগীকে সবসময় ওয়াচের মধ্যে রাখতে হয়। কিন্তু ডাক্তার আমাকে বা ফাহমিকে কিছুই বলেনি এ সম্পর্কে। ফাহমি তো লাইফ সাইন্সের ছাত্র ছিল, তাকেও তো ডাক্তার এ বিষয়টি খুলে বলতে পারতো।

একটি বিষয় আমরা বুঝতে পারতারম যে, ফাহমি অসুস্থ হলেও সে সবসময় চেষ্টা করতো আমাদেরকে হ্যাপী রাখতে। আমাদেরকে বুঝতে দিতে চাইত না তার কষ্টের বিষয়গুলো। বন্ধুদের সঙ্গেও সে তার অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে কখনো কোন কথা বলেনি। পরে যখন তারা বিষয়টি জানতে পারে তখন তারাও হতবাক হয়ে যায়।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারী ভেলেন্টাইন ডে – তে সে আমাদের সঙ্গে নায়েগ্রা গিয়েছিল বেড়াতে। আমরা দুদিন ছিলাম সেখানে। এই দুইদিন সে খুব উৎফুল্ল ছিল এবং বেড়ানোটা বেশ উপভোগ করেছে। ফাহমির এই আচরণ দেখে আমার কিছুতেই তার ডিপ্রেশনের রহস্যটা কোথায় সেই সূত্র খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমরাও খুব খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে, ঔষধ কাজে দিচ্ছে। ঐ নায়েগ্রা যাওয়াটাই ছিল তার সাথে আমাদের শেষ ফ্যামিলি ট্রিপ।

কিন্তু নায়েগ্রা থেকে ফিরে যা লক্ষ্য করলাম তা হলো, ডাবল ডোজের ঔষধ শুরু হওয়ার পর তার অবস্থার কোন উন্নতি প্রকৃত পক্ষে হয়নি। এরই মধ্যে একদিন সে আমাকে জানালো, সে ডাউন টউনে যাবে ঘুরতে। আমিতো খুব খুশী। সে বাইরে যেতে চাইছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কিছু লাগবে কি না। কিছু টাকাও দিতে চাইলাম। সে বললো-না মা, টাকা আমার কাছে আছে। আমি বললাম যাও, কিন্তু আমাকে কিছুক্ষণ পর পর ফোন দিবে। কোথায় আছ কেমন আছ আমাকে জানাবে।

এই সময় আমার কেন জানি মনে একটা সন্দেহ দেখা দিল। যে ছেলে ঘর থেকেই বের হচ্ছে না আজ প্রায় এক বছর, সে কেন হঠাৎ ডাউন টাউনে যেতে চাইছে একা একা? আমি তাকে জিজ্ঞেসও করলাম। কিন্তু সে বললো- না মা, এমনিতেই। অনেকদিন যাই না। কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করবো।

সেই দিনটি ছিল ১৮ ফেব্রুয়ারী। সকালে ডাউন টাউনে যাওয়ার আগে ফাহমি আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কপালে চুমু খেল। বাবাকেও হাগ দিল। সে বের হয়ে গেল। আমরা বারান্দায় দাড়িয়ে তাকে হাত তুলে বিদায় জানালাম। সেও পিছন ফিরে হাত তুলে বিদায় নিল। বিদায় নেওয়ার সময় সে খুবই স্বাভাবিক আচরণ করেছিল যেমনটি আগেও করতো।

ফাহমি চলে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পর একটা টেক্সট ম্যাসেজ পেলাম তার ফোন থেকে।

ঐ ম্যাসেজে সে আমাকে তার ঘরের টেবিলের ড্রয়ারটি চেক করতে বললো। আমি সাথে সাথে তার ঘরে গিয়ে ড্রয়ারটি খুললাম। সেখানে দেখি একটি চিঠি।

চিঠিটি হাতে নিয়েই আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। এটি ছিল একটি সুইসাইডাল নোট। কিছুক্ষণ আগে সে আসলে চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে গেছে আমাদের কাছ থেকে। আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি তখন।

চিঠিতে সে বিস্তারিত লিখে গিয়েছিল। তার ব্যাংক একাউন্ট ক্লোজ করার তথ্য, লেপটপ কাকে দিতে হবে ইত্যাদি সব লিখে রেখে গিয়েছিল চিঠিতে। আর লিখেছিল সেই ভয়াবহ মর্মঘাতী বাক্যটি “আমি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কারণ ডিপ্রেশন, পেইন এবং এর ভোগান্তি আমার পক্ষে সহ্য করা অসহনীয় হয়ে উঠেছে।” সবশেষে লিখেছিল, “আমি তোমাদেরকে অনেক অনেক ভালবাসি।”

পরে তাকে আমরা অনেক জায়গায় খুঁজেছি। পুলিশে খবর দিয়েছি। কমিউনিটির লোকদের সহযোগিতা নিয়েছি। দল বেধে আমরা একেক দিন একেক জায়গায় খুঁজেছি। সে যেসকল জায়গায় যেতে পছন্দ করতো সেসব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ দিয়েছি। ছবি দিয়েছি। যদি কেউ কোন সংবাদ দিতে পারে। কোন প্রচেষ্টাই আমরা বাদ রাখিনি।

অবশেষে নিখোঁজ হওয়ার ৪০ দিন পর গত ৩০ মার্চ তার সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু জীবিত ফাহমির নয়, মৃত ফাহমির সন্ধান। মা-বাবার কাছে এর চেয়ে ভয়াবহ দুঃসংবাদ আর কি হতে পারে আমাদের জানা নেই।

কমিউনিটির প্রতি পরামর্শ :

সাবিনা রহমান বলেন, কমিউনিটিতে আমাদের সবাইকে এই ডিপ্রেশন সম্পর্কে জানতে হবে। আমি এখনো শতভাগ জানিনা এই অসুখটা কেন হয়, এর লক্ষণগুলো কি। শুধু বাচ্চারা যে ডিপ্রেশনে ভুগছে তা নয় বয়স্করাও এই সমস্যায় ভুগছে। বাচ্চাদের মধ্যে বেশী হচ্ছে। বয়স্করা কোন সমস্যা হলে শেয়ার করে। কিন্তু বাচ্চারা সহজে শেয়ার করে না। তারা মনে করে এটি একটি লজ্জার বিষয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে কোন অসুখের মত এই ডিপ্রেশন বা বিষন্নতাও একটি রোগ। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে এর চিকিৎসা সহজ। আমরা ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক জানি। কিন্তু ডিপ্রেশন সম্পর্কে খুব কম জানি। এই যে আমাদের ফাহমি এভাবে চলে গেল, আমার তো মনে হয় এখনো বহু লোক জানে না ডিপ্রেশন বা মেন্টাল ইলনেস কি। আমরা যখন এই রোগটি সম্পর্কে ভাল করে ওয়াকিবহাল হব তখনই সক্ষম হব নিজেকে এবং অন্যকে সাহায্য করতে। আমরা যখন লক্ষণগুলো কি তা জানতে পারবো তখন পরিবারের কেউ মেন্টাল সমস্যায় ভুগলে বা বন্ধুমহলে কেউ মেন্টাল সমস্যায় ভুগলে দ্রুত সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে অসতে পারবো। তাই আমি মনে করি সবার আগে আমাদের যা দরকার তা  হলো এডুকেশন। এটি খুবই জরুরী। এর পর এওয়ারনেস বা সতর্কতা। আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। এর পাশাপাশি কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থাও করতে হবে। আমার একটি বিষয় খুব খারপ লেগেছে যে, আমাদের ফ্যামিলি ডাক্তার বা মনরোগ চিকিৎসক কেউ একবারও বলেনি যে ফাহমির জন্য কাউন্সিলিং এর প্রয়োজন রয়েছে। আমার পরামর্শ হলো, এই বিষয়গুলো আমাদের কমিউনিটির প্রতিটি বাবা-মাকে জানতে হবে, শিখতে হবে। এবং এটি শিখতে হবে সন্তান হারানোর আগে, পরে নয়। আর ডাক্তার যদি কাউন্সিলিং এর কথা নাও বলে তবে নিজে থেকেই এর ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের ফ্যামিলি ডাক্তার ইউলিয়াম ওয়াটসন বলেছিলেন, “Tha system failed him”. কথাটি ফাহমির বেলায় খুবই সত্য ছিল। সেন্ট মাইকেল হাসপাতালের এই চিকিৎসকের তত্বাবধানেই একদিন জন্ম হয়েছিল ফাহমির। ফাহমির ডিপ্রেশনের চিকিৎসার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন।

ফাহমিকে আর আমরা ফিরে পাব না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার নামে একটি অরগানাইজেশন গড়ে তুলবো যার নাম হবে “ফাহমি রহমান ফাউন্ডেশন ফর মেন্টাল হেলথ”। এই অরগানাইজেশনের মূল উদ্দেশ্য হবে লোকজনকে সাহায্য করা বিশেষ করে ফাহমির মত যে ছেলেরা মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করছে তাদেরকে সহায়তা প্রদান করা। আমরা চাই আর কোন বাবা-মাকে যেন এরকম জীবন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করতে না হয়।

এই পর্যায়ে ফাহমির বাবা আরিফ রহমান বলেন, এখানে আমি একটি বিষয় যোগ করতে চাই। এডুকেশনের পাশাপাশি এই রোগ সম্পর্কে একসেপ্টেন্সী খুব দরকার। কানাডায় আমাদের সাউথ এশিয়ান কমিউনিটিতে মেন্টাল হেলথ এর সমস্যাটিকে একসেপ্ট করে নিতে হবে। আমরা এখনো এই সমস্যাটিকে অন্যভাবে দেখি। এটা অন্য যে কোন রোগের মতই একটি রোগ। এ সত্যটি মেনে নিতে হবে। আমি যে অফিসে কাজ করি সেখানে আমি ছাড়া সবাই শ্বেতাঙ্গ। ফাহমির ঘটনাটি তাদেরকে অবহিত করার পর দেখলাম তারা প্রত্যেকেই রোগটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। শুধু আমরা সাউথ এশিয়ানরাই এখনো এই রোগ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানিনা।

আরিফ রহমান  আরো বলেন, ফাহমি নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের পারিবারিক বন্ধুরা এবং কমিউনিটির লোকেরা যে ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তার জন্য আমরা সত্যিই কৃতজ্ঞ। কমিউনিটির প্রতিটি পরিবারে ফহমির জন্য দোয়া করেছে। ফাহমিকে খুঁজে বের করার জন্য ঝড় বৃষ্টি ও তুষারপাতের মধ্যেও যে যখন সুযোগ পেয়েছে তখনই টরন্টোর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছে। ইন্টারনেটে সার্চ করেছে। সবারই কনসার্ন ছিল, ফাহমিকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। এই বিষয়টি আমার কাছে এত ভাল লেগেছে যে, আমি কমিউনিটির লোকদের কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকবো।

মন্তব্য