বিষন্নতা রোধ করতে হলে ছেলে-মেয়েদের আচরণগত কোন পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তার উপর নজর রাখতে হবে

 

M Reza

মাহবুব রেজা :  সহ-সভাপতি, বিসিসিএস

প্রশ্ন :  বিষন্নতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেন্টার এন্ড কমিউনিটি সার্ভিসেস এর পক্ষ থেকে গত ৯ এপ্রিল আপনারা একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলেন। ঐ আলোচনা সভায় বক্তারা কোন কেন বিষয়ের উপর জোর দেন?

উত্তর : সেদিনকার আয়োজনটা ছিল অত্যন্ত অর্থবোধক এবং সময়োপযোগী। আমি নিজেও ভাবিনি যে, আলোচনাটি এরকম ফলপ্রসু হবে। সেদিনকার আলোচনা সভা থেকে বেশ কয়েকটা বিষয় আমদের কাছে মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :-

Ñ যে কোন মূল্যে ছেলে-মেয়ে এবং পিতা-মাতার মধ্যে একটা সুসম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে করে ছেলে-মেয়েরা তাঁদের মনের কথা খুলে বলতে পারে।

Ñ যদি দেখা যায় কারও ছেলে বা মেয়ে মেন্টাল হেলথ ইস্যুতে ভুগছে তবে তা লুকিয়ে না রেখে অত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এদের সঙ্গে অবশ্যই শেয়ার করা।

Ñ পিতা-মাতা হিসেবে কোন অবস্থাতেই নিজেদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে অন্য ছেলে-মেয়েদের তুলনা না করা।

আরেকটি মূল্যবান কথা সেদিন অনেকেই বলেছেন-সেটা হল, ছেলে-মেয়েদের কোন বিহেভিরিয়াল চেঞ্জ বা আচরণগত কোন পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তার উপর নজর রাখা।

প্রশ্ন : এতদিন আমরা জেনে এসেছি যে, বিষন্নতা শুধু প্রথম প্রজন্মের ইমিগ্রেন্টদেরই সমস্যা। কিন্তু এখন দেখছি, আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যেও বিষন্নতা বিরাজ করছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

উত্তর : হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন, এদেশে এসে অনেকেই ভেঙ্গে পরেন। তার প্রথম কারণ হল প্রফেশনাল জব না পাওয়া। তবে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব এবং ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রজন্মের ইমিগ্রেন্টরা অনেক অভিযোগ করার পরও হাল ছেড়ে দেয়না। দ্বিতীয় প্রজন্ম ভাল করবে এই আশাতেই বুকবেধে পরিশ্রম করে যেতে থাকে।

কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের বিষন্নতার কারণগুলো ভিন্ন। এটা স্কুল এর সার্বিক পরিবেশ থেকে আসতে পারে – যেমন নতুন ভাষা, এডুকেশনাল সিস্টেম, পড়ার চাপ, ব্যুলিং ইত্যাদি। তার উপর যদি ঘরে বাবা-মার কলহ বিরাজ করে, তবে সেটাও ছেলে-মেয়েদের বিষন্নতার একটা কারণ হতে পারে। এছাড়াও টেস্ট রেজাল্ট, প্রেম ঘটিত ব্যাপারও বিষন্নতার কারণ হতে পারে।

আরো যে বিষয়গুলো আমি উল্লেখ করতে চাই তা হলো, মা বাবার সাথে ছেলেমেয়েদের সম্পর্কের দূরত্ব। তার মানে, যে মধুর সম্পর্ক থাকা দরকার তা আমরা অনেকসময়ই মেনটেইন করতে পারিনা। এর কারণ সময়ের অভাব। আবার সময় থাকলেও না থাকার অজুহাত দেখানো (যেমন, ফেইস বুক, সেলফোন ইত্যাদি নিয়ে মাত্রাধিক্য ব্যস্ত থাকা), আর্থিক অনটন, পারিবারিক কলহ অনেক কিছুই হতে পারে। শুধু যদি আমরা ছেলে-মেয়েদের বিহেভিরিয়াল চেঞ্জটাকেও ফলো করতে পারি তাহলেও অনেক অঘটন থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

তাই আমি সবাইকে অনুরোধ করবো ছেলেমেয়েদের সাথে মধুর সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য সচেষ্ট হতে। শুধু সুসম্পর্কই যে সবকিছুর সমাধান দিবে সেটারও কোন গ্যারান্টি নেই। কারণ যখন বাচ্চারা টিন-এজ পর্যায়-এর মধ্য দিয়ে পার হয় তখন তাঁদের হরমোনাল চেঞ্জও হয়। তাঁদের ব্যাবহারে দেখা যায় অনেক পরিবর্তন। তাঁদেরও যে দরকার তাঁদের নিজস্ব স্পেস, আমরা কি তাঁদের এই বিষয়টা চিন্তা করি? আমদের উচিত তাঁদের জন্য হ্যাং-এরাউন্ড স্পেস তৈরি করা। যেমন স্পোর্টস ক্লাব সহ অন্যান্য ক্লাবের ব্যবস্থা করা-যেখানে গেলে তারা তাঁদের সমবয়সী ছেলে-মেদের সাথে মিশতে পারবে, বন্ধ্ত্বু করতে পারবে। তখন তাদের মনও প্রফুল্ল থাকবে।

 

প্রশ্ন :  তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিষন্নতা রোধের বিষয়ে অভিভাবকদের ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর : বিষন্নতা কিন্তু একদিনে আসেনা। এটা একটা পূঞ্জিভূত বিষয়। আস্তে আস্তে সৃষ্টি হয়। একটা সময়ে এসে এক অসহনীয় ব্যাথায় রূপ নেয় এই বিষন্নতা। কাজেই শুরু থেকে বিষন্নতার পিক স্টেজ পর্যন্ত অনেক সময় পাওয়া যায়। অভিভাবকরা যদি

ছেলে-মেয়েদের সাথে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখে তাহলে বিষন্নতা রোধ করা খুবই সহজ। আগেও বলেছি ছেলে-মেয়ের বিহেভিরিয়াল চেঞ্জ এর প্রতি সতর্ক দৃষ্টিও এনে দিতে পারে সুফল। স্টিগমা থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেওয়াটাও জরুরী। আরেকটা কথা না বললেই নয়, তা হল, ডিপ্রেশন / মেন্টাল হেলথ সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

প্রশ্ন : বিসিসিএস এর পক্ষ থেকে আপনাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি এ বিষয়ে?

উত্তর : সুন্দর প্রশ্ন। ধন্যবাদ। আমরা এযাবৎ এল্ডার এবিউজ, সিনিয়র এবং তরুণদের মাঝে সম্পর্কের গ্যাপ কমানো, সিনিয়রদের টেকনোলজিক্যাল নলেজ বৃদ্ধি-বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমগুলোর ব্যাবহার, বাচচাদের আর্ট এবং একাকিতত্বে ভুগছে এমন সিনিয়রদেরকে নিয়েই কাজ করে আসছি। তবে ইদানিংকার পরপর দুটো মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের বাঙ্গালী সমাজকে যেভাবে নাড়া দিয়েছে, ঠিক তেমনি ভাবে বিসিসিএস কেও নাড়া দিয়েছে। একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব এড়াতে পারিনি।

গত ৯ এপ্রিল টরন্টোতে আমরা একটা মত বিনিময় সভা দিয়ে শুরু করেছি। আমাদের সাথে এক্সপার্ট টিম আছে, তাদেরকে নিয়ে একটা সঠিক ওয়ার্ক প্লান নিয়েই আমরা অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের প্রথম কাজ হলো আমাদের কাজ কর্মের ধরণ সম্পর্কে কমিউনিটিকে অবহিত করা। তারপর কমিউনিটির লোকদেরকে মেন্টাল হেলথ/বিষন্নতা সম্পর্কে সজাগ করে তোলা, বিষন্নতার কারণ, সিম্পটম, অভিভাবকদের কি করণীয়, এদেশে কি কি প্রফেশনাল সার্ভিস আছে, আমরা কি কি করতে পারি এগুলোর একটা সম্যক চিত্র তাঁদের কাছে তুলে ধরা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে  মেন্টাল হেলথ/বিষন্নতা এখন আর ফাহমি বা সাবিত-এর পরিবারের সমস্যা নয়-এটা আমদের সবার সমস্যা। সে কারণে আমরা ‘বাংলাদেশ সেন্টার এন্ড কমিউনিটি সার্ভিসেস’ এবং ‘লাইট’ (ডিপ্রেশন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সাহায্য প্রদানের একটি সংগঠন ) চাই যে  কমিউনিটির সবাই খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসুক।

আর এসব কারণেই আমাদের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বাবা-মা যারা আছেন তাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ- আপনারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে দ্বিধাবোধ করবেন না। আমাদের সাথে রয়েছে নতুন প্রজন্মের এক ঝাক উদ্যোমী তরুণ-তরুণী যারা দারুন সংবেদনশীল এ প্রসঙ্গটি নিয়ে। এদের সংস্পর্শে এসে আপনার ছেলে-মেয়েরা সহজ-স্বাভাবিক হতে পারবে এবং স্বাচ্ছন্দ অনুভব করবে।

মন্তব্য