এই সামার এ ঘুরে আসুন “রিপলি’স অ্যাকুরিয়াম”

Dr

ডা. পুলক

টরন্টোতে এসেছি প্রায় আড়াই বছর হলো, কিন্তু রিপলির অ্যাকুরিয়ামে কেন জানি যাওয়া হয়নি। ব্যাটে বলে হচ্ছিল না। এ বছরের প্রথম দিকে একদিন ব্যাটে বলে হয়ে গেল। যখন ব্যাটে বলে হয়ে গেল তখন সবাই মিলে ঘুরে আসতে বাধা কোথায়? স্কুলের বন্ধু অপু, মাশিয়াত আর মুনিয়া এবং প্রত্যেকের পরিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে চলে এলাম ডাউনটাউন টরন্টোর অন্যতম আকর্ষণ রিপলি অ্যাকুরিয়ামে (Ripley’s Aquarium of Canada)। এটি সিএন টাওয়ারের (CN Tower) ঠিক দক্ষিণ-পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত।

অনলাইনে আগেই টিকিট কাটা ছিল আমাদের। প্রিন্ট করে এনে টিকিট দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়লাম পানির নিচের অদ্ভুত সুন্দর সৌন্দর্য উপভোগ করব বলে। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা গাইড পেপার পেলাম। সেটা পড়ে যা জানতে পারলাম, তাতে অবাক হলাম কিছুটা।

এই অ্যাকুরিয়াম প্রায় পাঁচ দশমিক সাত মিলিয়ন লিটার পানি সংগ্রহ করা হয়েছে। যাতে তাবৎ পৃথিবীর প্রায় সকল পানিতে বাস করা প্রাণীর খুবই সামান্য, প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার প্রাণী এই অ্যাকুরিয়ামে জড়ো হয়েছে। প্রায় সাড়ে চার শ প্রজাতির এই সব প্রাণীর কিন্তু ঠিকানা এক নয়। কেউ এসেছে গভীর সমুদ্র থেকে কেউ বা মিঠাপানি থেকে। এক শ ত্রিশ মিলিয়ন ডলার দিয়ে তৈরি আধুনিক এই অ্যাকুরিয়াম উদ্বোধন করা হয় ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে। পানির তলদেশে কীভাবে থাকে প্রাণীকুল সেটা দেখার জন্য নয়টা ভিন্ন ভিন্ন গ্যালারি করেছে রিপলির অ্যাকুরিয়াম। গ্যালারিগুলো হলো:

এক. কানাডিয়ান পানি (Canadian Waters)

দুই. রংধনু প্রবাল (Rainbow Reef)

তিন. ভয়ংকর হ্রদ (Dangerous Lagoon)

চার. অনুসন্ধানী স্থান (Discovery Centre)

পাঁচ. গ্যালারি (The Gallery)

ছয়. পারফেক্ট প্রিডিটর (Perfect Preditors)

সাত. রে বে (Ray Bay)

আট. জেলির দুনিয়া (Planet Jellies) এবং

নয়. জীবন বাঁচানোর সিস্টেম (Life Support Systems)

দোতলা বিশিষ্ট এই অ্যাকুরিয়ামের প্রথমেই আছে অনুসন্ধানী স্থান আর মেরিন এডুকেশন সেন্টার (Merine Education Centre)। ওটা পার হতেই আসে কানাডিয়ান পানি। প্রায় ১৫ থেকে ২০ জাতের মৎস্যকুল আছে এখানে। উল্ল্লেখ করার মতো আছে ল্যাম্প ফিশ (Lump fish), বিশালাকৃতির প্যাসিফিক অক্টোপাস (Giant pacific octopus) ও আমেরিকান লবস্টার (অসবৎরপধহ ষড়নংঃবৎ) ইত্যাদি। এগুলো দেখতে দেখতে প্রথম তলা শেষ করে বেসমেন্টে যেন অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য বিশাল সারপ্রাইজ।

Mr Pulok

টরন্টোর ডাউনটাউনে অবস্থিত রিপলির অ্যাকুরিয়ামে লেখক ও তার দুই সন্তান

Mrs Pulok

রিপলির অ্যাকুরিয়ামে মিসেস পুলক

রণ পরের গ্যালারিটা হলো রংধনু প্রবালের। অসাধারণ সুন্দর দেখতে সবগুলো মাছ দেখে জাহিন, জারাহ, আদিয়ান, আরিবাহ আর নুসাইবা খুশিতে বাক বাকুম অবস্থা! আমরা বড়রাও বা কম কীসে। কাচের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত সবাই। বাহারি জাতের মাছ যেমন এমরেরার এঞ্জেল ফিশ (Emperor angelfish), ইউলো স্ট্রাইপ ফিশ (Yellow Stripefish), পিকাসো ট্রিগার ফিশ (Picasso triggerfish), ইত্যাদি নাম না জানা মাছগুলো দেখে চোখ জুড়িয়ে গেছে। প্রায় ত্রিশ মিনিটের মতো ছিলাম আমরা সবাই ওখানে।

তারপরের গ্যালারি হলো এই অ্যাকুরিয়ামের সবচেয়ে বড় গ্যালারি। নাম হলো ডেঞ্জারাস লেগুন। আরও আরামদায়ক বিষয় হলো এই গ্যালারিতে আপনাকে হাঁটতে হবে না। কারণ এখানে মুভিং সাইড ওয়াক আছে। অর্থাৎ সাইড ওয়াকের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকলেই হলো। সেই আপনাকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে। এই গ্যালারিতে এসে থমকে যেন না যান, সেই জন্য বুঝি এই ব্যবস্থা! কারণ এই গ্যালারিতে ভয়ংকর শার্ক যেমন আছে, তেমনি আছে নিরীহ কচ্ছপও। বিশালাকৃতির এই গ্যালারিতে এসে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। বিভিন্ন প্রজাতির শার্ক যেমন; স্যান্ড টাইগার শার্ক (Sand Tiger shark), স্যান্ডবার শার্ক (Sandbar shark) ইত্যাদি অন্যতম। প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওদের চলাফেরা দেখছি। যেন ওরা আপনমনে ওদের কাজ করছে আর আমরা দেখছি। অসম্ভব ভালো লাগা নিয়ে পরের গ্যালারির দিকে এগিয়ে চললাম।

ডেঞ্জারাস লেগুন শেষ হওয়ার পরে মাঝখানে কিছু অংশে ওপেন কনসার্ট জোন আছে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে সেদিন শুক্রবার রাত আর সেখানে জ্যাজ গানের একটা কনসার্ট ছিল। বাচ্চাগুলো খেলছিল বলে আমরা বড়রা দুটো-তিনটা গান শুনতে পারলাম। গানগুলো শেষ হতেই দর্শকদের তালির শব্দে বোঝা যাচ্ছিল যে সবাই কত উপভোগ করছে। তখনো আমাদের অ্যাকুরিয়ামের বাকি অর্ধেকটা দেখার বাকি, তাই গান শোনার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হেঁটে হেঁটে চলে যেতে হলো পরের গ্যালারিগুলো দেখতে।

রিপলির ক্যাফে পার হয়ে আসবে গ্যালারি। এখানে অসাধারণ অসাধারণ সব মৎস্যকুল আছে যা সারা পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। উল্ল্লেখযোগ্য হলো নিমো (Nemo), রেড লায়নফিস (Red Lionfish), আর্চারফিস (Archerfish) ইত্যাদি। বাচ্চাগুলো মজা পেল ফাইন্ডিং নিমোর নিমোকে দেখে। ছবিও তোলা হলো অনেকগুলো। পরের গ্যালারিতে চলে গেলাম। নাম হলো পারফেক্ট প্রিডিটর (Perfect Preditors)! ভয়ানক ভয়ানক সব শার্ক ও তাদের নিয়ে গল্প আর সিনেমার ছবি। শার্কের দাঁত থেকে শুরু করে শার্কের সকল বিবরণ আছে এই গ্যালারিতে। আরও আছে কীভাবে শার্ক দেখা যায় পানির নিচে!

রে বে আর প্ল্যানেট জেলি ছিল শেষ দুটো গ্যালারি। রে বেতে থাকা উল্ল্লেখ করার মতো ছিল কাউনোজ রে (Cownose ray), সাউদার্ন স্টিনগ্রে (Southern stingray) ইত্যাদি। প্ল্যানেট জেলিতে ছিল মুন জেলি (Moon jelly), স্পটেড জেলি (Spotted jelly) ইত্যাদি! প্ল্যানেট জেলি গ্যালারির উল্লেখযোগ্য ও মজাদার বিষয় হচ্ছে এখানকার জেলি রং পরিবর্তন করতে পারে। যা সামনাসামনি না দেখলে অবিশ্বাস্য লাগবে। অদ্ভুত এক দৃশ্য, সত্যিই চমকপ্রদ!

নয় নম্বরটি আসলে গ্যালারি

নয় বরং এই অ্যাকুরিয়ামে আসা দর্শকদের বোঝানোর জন্য রাখা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম (Life support System)। এখানে সকল মৎস্যকুল সংরক্ষণ করা কতটা কষ্টসাধ্য তা যেন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের মাধ্যমে দর্শকদের বোঝানো হয়েছে!

মন্তব্য