কানাডীয় ও অভিবাসী বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্যগত বৈষম্য পাওয়া গেছে

Reminiscing with friends at the dining table

নিকোলাস কেউং

৮০ বছর বয়সের সুং-হ্যাক চোই সামাজিক অঙ্গনে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করে এবং নিজের সাত নাতি-নাতনির দেখাশোনা করার মধ্য দিয়ে এখনও সচল রয়েছেন।

১৯৮২ সালে পরিবার ও চার সন্তানের সঙ্গে অভিবাসী হিসাবে কানাডায় আসা চোই বলেন, “অভিবাসী বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেদের সুস্বাস্থ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারা তাদের সাবেক দেশের সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্কর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।”

তিনি বলেন, “আমি ভাগ্যবান যে আমি ইংরেজিতে কথা বলতে পারি। বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ভাষার বাধাই হলো সবচেয়ে বড় বাধা। তারা এখানকার ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত নয় এবং সেজন্য যে কোনও ধরণের সহায়তা পাবার জন্য ইংরেজি জানা কারও ওপর নির্ভর করতে হয়।”

সর্বশেষ আদম শুমারি অনুযায়ী কানাডায় বসবাসকারীদের মধ্যে শিশুর চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের সংখ্যা বেশি। ওয়েলেসলি ইন্সটিটিউটের এক নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার যেসব ক্ষেত্রে লোকেরা নিজে থেকে রিপোর্ট করে সেসব ক্ষেত্রে কানাডীয় ও অভিবাসী বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বিশেষ করে জাতিগত সংখ্যালঘু এবং ইংরেজি ছাড়াঅন্য ভাষার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ‘গুরুতর’ অসাম্য রয়ে গেছে।

সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়, বয়োজ্যেষ্ঠ অভিবাসী বিশেষ করে যারা সম্প্রতি এদেশে এসেছে তাদের সার্বিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অবস্থা অপেক্ষাকৃত খারাপ। ‘সিনিয়র হেল্থ ইন দ্য জিটিএ’ শীর্ষক রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়।

কানাডীয়দের ক্ষেত্রে যেখানে মাত্র ১৯ শতাংশের স্বাস্থ্যগত অবস্থা সুষ্ঠু/নাজুক, সেখানে সাম্প্রতিক বা মধ্য মেয়াদে কানাডায় আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই াবস্থা হলো ৩৪ শতাংশের। আর দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থানরত বয়োজ্যেষ্ঠ অভিবাসীদের এই অবস্থা দেখা গেছে ২৬ শতাংশের ক্ষেত্রে। নিজে থেকে রিপোর্ট করেন এমন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিস্থিতিতেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।

গত মে মাসে প্রকাশিত আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় এখন ৬৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের মানুষের সংখ্যা ৫৯ লাখ। যেখানে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৫৮ লাখ। অর্থাৎ দেশটির জনসংখ্যায় এবারই প্রথম বয়স্কদের সংখ্যা তরুণদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেল।

জিটিএ অঞ্চলে প্রতি তিনজন বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে প্রায় দুজনই অভিবাসী। বয়োজ্যেষ্ঠ অভিবাসীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ হলেন দৃশ্যমান সংখ্যালঘু এবং ৬৯ শতাংশের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়।

এই অঞ্চলে বয়স্ক অভিবাসীদের জাতিগত পরিসংখ্যানও দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আসা অভিবাসীদের ৮২ শতাংশই হচ্ছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর এবং ৮৮ শতাংশের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়। (অথচ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কানাডায় বসবাসরত অভিবাসীদের মধ্যে ওই সংখ্যা ছিলো যথাক্রমে ২৭ শতাংশ ও ৬২ শতাংশ)।

গবেষক নাওমি লাইটম্যানের সঙ্গে যৌথভাবে সমীক্ষা রিপোর্ট লিখেছেন সিয়ং-গি উম। তিনি বলেন, “বৃহত্তর টরন্টোতে বয়োজ্যেষ্ঠদের দুই-তৃতীয়াংশই অভিবাসী। জনসংখ্যায় পরিবর্তন এসেছে, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনও পাল্টে গেছে। এসব পরিবর্তনের বিষয়ে অদিকুর স্বীকৃতি এসেছে, কিন্তু অন্তর্গত বৈষম্য নিরসনে তেমন কিছু করা হয়নি।”

২০০৭ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সংগৃহীত কানাডার কমিউনিটি হেল্থ সার্ভের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা ১০ হাজার ১২৫ জন বয়োজ্যেষ্ঠকে নমুনা হিসবে বেছে নেন এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পাঁচটি নিয়ামকের (যেমন আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সম্পদের মালিকানার বোধ এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সুবিধাবলী) সঙ্গে কানাডায় বিভিন্ন মেয়াদে বসবাসকারী অভিবাসী ও কানাডীয় নাগরিকদের নিজ থেকে রিপোর্ট করা স্বাস্থ্যগত অবস্থার তুলনা করেন।

অভিবাসীদের বিভিন্ন গ্র“পের মধ্যে দৃশ্যমান সংখ্যালঘু এবং মাতৃভাষা ইংরেজি নয় এমনর অভিবাসীদের মধ্যে স্বাস্থ্যগত বৈষম্য আছে কি না সেটাও গবেষকরা খতিয়ে দেখেন।

সার্বিকভাবে ৪০ শতাংশ বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্য চমৎকার/খুব ভালো দেখা গেছে। অন্যদিকে ৬৭ শতাংশ বয়স্ক ব্যক্তি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য চমৎকার/খুব ভালো বলেছেন।

অবশ্য বয়োজ্যেষ্ঠ জনসংখ্যার বিভিন্ন গ্র“পের মধ্যে অভিবাসনের অবস্থা, কানাডায় অবস্থানের মেয়াদ, মাতৃভাষা অথবা জাতিগত সংখ্যালঘু হওয়ার ভিত্তিতে পরিসংখ্যানের তারতম্য ঘটে।

সিয়ং-গি উম বলেন, একজন অভিবাসীর জাতিগত পরিচয়, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং অভিবাসনের প্রেক্ষাপট তার স্বাস্থ্যগত সামাজিক নিয়ামকের ওপর কী নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে তার ওপরই স্বাস্থ্যগত অবস্থার বৈষম্য নির্ভর করে।

সমীক্ষায় দেখা যায়:

-  আয়ের প্রধান উৎস হিসাবে সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয় এমন লোকেদের সংখ্যা জাতিগত অভিবাসী নয় এমন লোকেদের চেয়ে জাতিগত অভিবাসীদের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ (৭.৫ শতাংশের বিপরীতে ১৪.৭ শতাংশ)।

-  জাতিগত অভিবাসী বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে ন্যূনতম পরিমাণ আয় করেন এমন লোকের সংখ্যা ১৫.৪ শতাংশ যা জাতিগত অভিবাসী নয় এমন লোকেদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি (৭.২ শতাংশ)।

-  বয়োজ্যেষ্ঠ অবিবাসীদের মধ্যে যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি তাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে তিন জনই গত বছর চাকরি পেয়েছেন বা আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন, কিন্তু যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয় তাদের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ২১.৫ শতাংশের।

-    সাম্প্রতিকালে কানাডায় আসা বয়োজ্যেষ্ঠ অবিবাসীদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরই সম্পদের ওপর অধিকারবোধ জোরালো। তুলনায় কানাডীয়দের মধ্যে ৭৫ শতাংশের এবং ৩১ বছরের বেশি সময় ধরে কানাডায় বাসবাসকারীদের মধ্যে এই অধিকারবোধ জোরালো ৭৩ শতাংশের।

উম বলেন, “স্বাস্থ্যগত সাম্য পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জাতিগত দিক থেকে যথাযথ সেবাদান নিশ্চিত করতে পরিষেবা পরিকল্পনায় অধিকতর লক্ষ্যাভিসারী উদ্যোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য আমাদের অধিকতর সম্পদ বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে এমন নয়। বরং এর অর্থ হলো, পরিবর্তিত চাহিদার নিরিখে সৃজনশীল পদ্ধতিতে আমাদের বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বিন্যাস সাধন।”

-টরন্টো স্টার

মন্তব্য