ভারত চীন দ্বৈরথঃ সংকটে নতুন মাত্রা!

হাসান গোর্কি

hassan gorkii

‘দোকলাম’ মালভূমিতে চীনের রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়ে চার সপ্তাহ আগে সৃষ্ট সংকট অবসান হবার কোন লক্ষ্মণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। ৮ জুলাই হামবুর্গ -এ জি ২০ সন্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সহাস্য করমর্দনের ছবি কিছুটা আশাবাদ তৈরি করলেও মাঠের ঘটনাক্রম ধীরে ধীরে বৈরিতার সম্ভাবনাকেই স্পষ্ট করে তুলছে। প্রস্তাবিত সড়কটি তৈরি করতে পারলে চীন তার সামরিক ও বেসামরিক উপস্থিতিকে এমন একটা স্পর্শকাতর করিডোরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারবে যার সাহায্যে ভারত তার উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের সাথে স্থলপথে যোগাযোগ রাখে। ‘সেভেন সিস্টারস’ আদুরে নামে ডাকা হলেও মূল ভূখণ্ডের সাথে তাদের সম্পর্ক ভাই বোনের মত নয়। দীর্ঘদিন থেকে রাজ্যগুলিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে অরুণাচলও আছে যেটা চীন ’৬২-র যুদ্ধে দখল করে পরে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছিল। তবে অরুনাচলের মালিকানার দাবি চীন কখনই পরিত্যাগ করেনি। গত বছরের মাঝামাঝি ভারত সেখানে ট্যাঙ্ক, ভারি সাঁজোয়া যান ও স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করলে চীন সেটাকে উস্কানিমূলক কাজ বলে ভারতকে হুশিয়ার করেছিল।
দোকলামের অবস্থান সিকিম, ভুটান এবং শিলিগুড়ির সংযোগস্থলে। সড়কটি নির্মাণ করতে পারলে চীনের জন্য সেটা ঘোড়ার চালের মত কাজ করবে। প্রয়োজনের সময় তারা এই পথে সিকিম এবং ভুটানে সৈন্য পাঠাতে পারবে। আবার ভারতের সাথে যুদ্ধ বেঁধে গেলে চিকেনস নেক বলে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোর বন্ধ করে দিয়ে সেভেন সিস্টারসকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারবে। দোকলাম সড়ক নির্মাণ ভারতের জন্য যে বড় নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করবে সেটা বুঝতে পেরে ভারত উদ্বিগ্ন। ভারত ও চীনের সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার সীমান্ত এখনও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত নয়। ১০১৪ সালে স্যার ম্যাকমোহন কর্তৃক নিরুপিত সীমানাকে (ম্যাকমোহন লাইন) চীন কখনই মেনে নেয়নি; তবে এটাকে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ হিসেবে মেনে চলছে দুই দেশই। বিতর্কিত হলেও অধিকারে থাকা এলাকাকে সংশ্লিষ্ট দেশের ভুখন্ড বলে এতদিন তারা মেনে এসেছে। এই হিসেবে দোকলাম উপত্যাকা ভুটানের অংশ হিসেবেই টিকে ছিল। বিতর্কিত অংশে চীনের রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগে যেখানে ভুটানের সমর্থন নাই সেখানে চীন কোন যুক্তিতে প্রকল্পটি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের তরফে তারও স্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা নাই। তারা বলছে ১৯৪৯ সালে সম্পাদিত শান্তি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারত ভুটানের বিতর্কাতীত অঞ্চলের নিরাপত্তা দিতে পারে যদিও ২০০৭ সালে ভুটানে সংসদীয় গনতন্ত্র চালু হবার পর চুক্তিটি কার্যত বাতিল হয়ে গেছে।

China & Indianচীন বলছে মালিকানার সংকট আছে এমন ভূখণ্ডে ভারত সৈন্য পাঠালে চীনেরও কাশ্মীর সহ বিতর্কিত অঞ্চলে প্রবেশের অধিকার আছে। চীনের ইংরেজি দৈনিক গ্লোবাল টাইমস এর ১৮ জুলাই সংখ্যার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে চীন যুদ্ধ শুরু করতে চায় না। তবে যুদ্ধ শুরু হলে ভারতকে তা পুরা সীমান্ত জুড়েই মোকাবিলা করতে হবে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ভুটান ভারত ও চীনকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে বলেছে। এটা ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক পরাজয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী চীনকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার চেষ্টা করে সাউথ ব্লক ব্যর্থ হয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কেবলমাত্র দোকলাম থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হলেই আলোচনা শুরু হতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পিছু হটা ছাড়া ভারতের সামনে কোন ভাল বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। তবে সেটা কতটা সন্মানজনকভাবে ঘটতে পারে তা নির্ভর করছে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতার ওপর।
কুলদ্বীপ নায়ার গত সপ্তাহে এক নিবন্ধে বলেছেন চীন এই কঠোর অবস্থানে যাবার পেছনে প্রধান কারণ ভারতের তিব্বত নীতি। গত লোকসভা নির্বাচনের পর দালাইলামা অরুনাচল ভ্রমনে গেলে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী তিব্বতকে “প্রতিবেশী রাষ্ট্র” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব চায়নিজ স্টাডিজের সাবেক পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ড. অলোকা আচার্য তার এক গবেষণায় ভারত চীনের সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে তিব্বত-অরুনাচল ইস্যুকে চিহ্নিত করেছিলেন। ক্ষুব্ধ হবার কারণ যাই হোক, দোকলাম ইস্যুতে চীন ভারতকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে যেখান থেকে বের হবার কোন সহজ পথ খোলা নাই।
ভুটান থেকে ভারত বিনাশর্তে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে চীন প্রস্তাবিত সড়কটি নির্মাণ করে ফেলবে যা ভারতের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারত সৈন্য প্রত্যাহার না করলে চীন দোকলামে সীমিত যুদ্ধ শুরু করতে পারে। ডিসেম্বর জানুয়ারিতে হিমালয়ান রিজিয়নে যুদ্ধ করা কঠিন। চীন যদি কোন যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরি করে থাকে তাহলে তারা সেটা শুরু করার জন্য আগস্ট-সেপ্টেম্বর বেছে নেবে। ৬২-র যুদ্ধ তারা শুরু করেছিল অক্টোবরের শেষে। নভেম্বরের মাঝামাঝি প্রবল বরফপাতে ১৪ হাজার ফুট উঁচুতে যুদ্ধরত উভয় পক্ষের বেশ কিছু সৈন্য মারা পরেছিল। শেষমেশ যদি কোন যুদ্ধ না হয় বা চীন যদি সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ায় তাহলেও চীনের উদ্দেশ্য অনেকখানি সফল বলে ধরে নিতে হবে। ভারতকে তারা হয়তো এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে তিব্বতের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করার মাধ্যমে চীনের আভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত না থাকলে চীনও ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পিছপা হবে না। বার্তাটি দিল্লীর কাছে ভাল ভাবেই পৌঁছে গেছে।
তাহলে কি শুধু একটা বার্তা দিতেই এত বড় আয়োজন। না। আইসবার্গের বড় অংশটা পানির নিচে আছে। দোকলাম ইস্যুটি শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক নয় বরং বহুলাংশে অর্থনৈতিক। অন্য কথায় এটা অংশত বিশ্বে এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে চীনের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্র থেকে উদ্ভূত একটা সমস্যা। সমস্যাটি হয়তো কৃত্রিম ও সুক্ষ বুদ্ধিজাত। প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে গেলে চীনকে উৎপাদিত পন্যের বিপণন নিশ্চিত করতে হবে। তার জন্য চলমান বাজারগুলো ধরে রেখে নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। কাজটি দীর্ঘ মেয়াদে করতে গেলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বলয় আরও সম্প্রসারিত করা দরকার। জাপানের নিয়ন্ত্রনে থাকা সেনকাকু দ্বীপের মালিকানা দাবি করার পাশাপাশি দক্ষিন চীন সাগরে কয়েকটি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে সেগুলোতে চীন সামরিক বেসামরিক স্থাপনা তৈরি করেছে। লক্ষ্য প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথটা নিজেদের দখলে রাখা।
বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তির প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন চীন সাগরে কার্যকর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে চীন। এখন তারা চাচ্ছে ভারত মহাসগরে ভারতের আধিপত্যকে সংকুচিত করে ফেলতে। চীন ইতোমধ্যে পাকিস্তানের গোয়াদার এবং শ্রীলঙ্কার হাম্মামতোয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ শেষ করেছে। বিপরীত পক্ষে দুটি বিমানবাহী রনতরীসহ এ অঞ্চলে ভারতের নৌ শক্তিও উপেক্ষা করার মত নয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত তার পক্ষে পূর্বে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত সমগ্র এলাকার দেখাশোনা করুক। জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারত বঙ্গোপসাগরে এক যৌথ নৌ মহড়া করেছে। এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়াই হয়তো এই মহড়ার লক্ষ্য।

আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে থাকলেও জড়িয়ে পরার বা না জড়িয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা থেকে খুব দূরে নেই। চীন চায় বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে নৌ বন্দর তৈরি করে এই অঞ্চলটিকে একটা অভিন্ন বানিজ্যিক সম্পর্কে সংযুক্ত করতে। তারা এই প্রস্তাবিত নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার নাম দিয়েছে স্ট্রিং অব পার্ল বা মুক্তার মালা। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীনের প্রস্তাব এই পরিকল্পনার অংশ ছিল। যতদূর জানা যায় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক শর্তে তারা বন্দরটি নির্মাণ করতে রাজি ছিল। কিন্তু ভারত, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে বাংলাদেশ চুক্তি করা থেকে সরে আসে। ভারত বাংলাদেশের সাথে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তি করার ব্যাপারে আগ্রহী। এরকম একটা চুক্তি সম্ভাব্য চীন- ভারত যুদ্ধে বাংলাদেশকে চীনের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলতে পারে। কারণ তখন ভারত তার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে রসদ ও যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেবে এবং সেই সরবরাহ বন্ধ করতে চীন বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে পারে।
যারা আমাদের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করেন তারা চীনের বন্দর নির্মাণের প্রস্তাব এবং ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রস্তাব গ্রহন করেননি। ধরে নিচ্ছি সিদ্ধান্তগুলো দেশের স্বার্থে এবং সুচিন্তিতভাবে নেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। চীন ও ভারত আমাদের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী এবং উন্নয়ন অংশীদার। সমস্যা হলো তারা পরস্পরের প্রতি বৈরি। সেকারণে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে স্বচ্ছ ও দ্ব্যর্থকতাশূন্য যাতে কোন ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে এবং আমরা কখনও অন্যের ঘটানো ঘটনার শিকার না হয়ে পরি।

হাসান গোর্কি
রয়্যাল রোডস ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ কলম্বিয়া।

hassangorkii@yahoo.com

https://www.outlookindia.com/website/story/how-chinas-gamble-in-bhutan-is-a-sign-of-a-bigger-game/299588

 

মন্তব্য (2) “ভারত চীন দ্বৈরথঃ সংকটে নতুন মাত্রা!

মন্তব্য