কানাডায় সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে আপনি কোন এলাকায় আছেন তার ওপর

 

কুইবেকের একজন অধিবাসীর চেয়ে আলবার্টাবাসী একজন অধিবাসীর ক্ষেত্রে দরিদ্র অবস্থা থেকে ধনাঢ্য হবার সম্ভাবনা দ্বিগুণ

আলবার্টায় নি¤œতম আয়ের পরিবারে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৮.৫ শতাংশই সর্বোচ্চ উপার্জনকারী হতে পারেন। ছবিতে আলবার্টা সিটি।

আলবার্টায় নি¤œতম আয়ের পরিবারে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৮.৫ শতাংশই সর্বোচ্চ উপার্জনকারী হতে পারেন। ছবিতে আলবার্টা সিটি।

লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় অথবা সংস্কৃতি কীভাবে আপনার জীবনের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপকের নতুন গবেষণা এই তালিকায় আরও একটি নতুন উপাদান যুক্ত করেছে; সেটি হলো ভৌগলিক অবস্থান।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক গ্রাজুয়েট স্কুলের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইলস কোরাক-এর কার্যপত্রের (Working paper) উপাত্ত অনুযায়ী, কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক সক্রিয়তার ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় ভিন্নতা রয়েছেÑ সেই পার্থক্য এতটাই ব্যাপক যে, তা যে কাউকে সত্যিকারভাবেই বিস্মিত করতে পারে যে, আমরা কানাডীয়রা কোন কোন অঞ্চলে লটারীর অর্থ পেয়ে জীবনধারণ করছি কি না।

মি. কোরাক একটি মানচিত্রটি তৈরি করেছেন যাতে তিনি দেখিয়েছেন যে, কীভাবে ভৌগলিক অবস্থানের ভিত্তিতে কেউ কেউ আয়ের মই বেয়ে ওপরে উঠে যেতে পারে। সবুজ ও ধুসর বা হালকা হলদে অংশগুলো নির্দেশ করছে সেইসব এলাকাকে যেখানে আয়ের মই বেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া সবচেয়ে সহজ, আর ঘন লাল এলাকাগুলি নির্দেশ করছে সেইসব এলাকা যেখানে এটি অপেক্ষাকৃত বেশি কঠিন।

এই মানচিত্রে পঞ্চম সর্বনি¤œ আয়ের পরিবারে (lowest-fifth income family) জন্মগ্রহণকারী একটি শিশুর পরিণত বয়সে পঞ্চম সর্বোচ্চ আয়কারী হয়ে ওঠার (Highest fifth of earner) সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরেছে। সবুজ এলাকাগুলিতে বসবাসকারীদের ধনবান হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ বা তার চেয়েও ভালো। ঘন লাল এলাকার বাসিন্দাদের সেই সম্ভাবনা আড়াই শতাংশেরও কম।

কোরাক আরও একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন যাতে এমন সব অঞ্চল দেখানো হয়েছে যেখানে নি¤œ-আয়ের পরিবারে জন্মগ্রহণকারীদের পরিণত বয়সেও একইরকম বাড়িতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। যে জায়গাগুলি যত বেশি লাল সেখানকার বাসিন্দাদের একটি দারিদ্র্যচক্রের মধ্যে আটকে পড়ার সম্ভাবনা তত বেশি।

এই মানচিত্রে নি¤œ-আয়ের পরিবারে জন্মানো একটি শিশুর পরিণত বয়সেও একই আয়ের শ্রেণীতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। ঘন লাল দিয়ে সেই সব এলাকা নির্দেশ করা হয়েছে যেখানে বাসিন্দাদের “দারিদ্র্যচক্রের” ভেতর আটকে থাকার ৪০ শতাংশের বেশি সম্ভাবনা রয়েছে।

এক সাক্ষাৎকারে হাফিংটন পোস্ট কানাডাকে কোরাক বলেন, “লক্ষ্যণীয় যে, বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বৈপরীত্য কত বেশি।”

যেমন, গবেষণায় পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, কুইবেকের বাসিন্দাদের চেয়ে আলবার্টায় বসবাসকারীদের ধনাঢ্য জীবনযাপনের সম্ভাবনা দ্বিগুণেরও বেশি। তার মানে হলো, সর্বনি¤œ আয়ের পরিবারে জন্মানো একজন আলবার্টানের জন্য তার জীবৎকালে সর্বোচ্চ আয়কারী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কোনও কুইবেকির চেয়ে দ্বিগুণ।

আলবার্টায় নি¤œতম আয়ের পরিবারে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৮.৫ শতাংশই সর্বোচ্চ উপার্জনকারী হতে পারেন। কিন্তু কুইবেকে এটা সম্ভব হয় মাত্র ৯.১ শতাংশ মানুষের পক্ষে।

যখন ধনবান থাকার বিষয়টি সামনে আসে তখনও আলবার্টা প্রায় শীর্ষ অবস্থানে চলে আসে। কোরাকের গবেষণায় দেখা গেছে, আলবার্টায় জন্মগ্রহণকারী সর্বোচ্চ আয়কারী পরিবারের সদস্যদের শতকরা ৩৭ শতাংশই তাদের প্রাপ্তবয়সে একই আয় শ্রেণীতে অবস্থান করে, অথচ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় জন্মানো একই আয়শ্রেণীর মানুষের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা মাত্র ২৫ শতাংশের সামান্য বেশি।

নোভা স্কশিয়া ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হলো দুটি প্রদেশ যেখানে সম্পদ হারানো সবচেয়ে সহজ:

কোরাকের গবেষণায় কতভাগ মানুষ দারিদ্র্যচক্রের মধ্যে বসবাস করে সেই বিষয়েও নজর দিয়েছেÑ অর্থাৎ যারা নি¤œ-আয়ের গ্র“পেই থেকে যায়। এক্ষেত্রেও অঞ্চলভেদে বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে।

ম্যানিটোভা, তিন টেরিটোরি এবং মেরিটাইম প্রদেশগুলোতে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে পড়া মানুষের হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে আলবার্টা ও সাসকাটচেওয়ানে এই হার  সবচেয়ে কম।

কিন্তু এই প্রভেদ কেবল প্রদেশগুলোর মধ্যেই সীমিত নয়। বরং গ্রাম ও নগর অঞ্চলের ভিত্তিতেও এই বিভেদ বিদ্যমান। কানাডার অনেক পল্লী এলাকার চেয়ে বৃহৎ শহরগুলোতে আয়ের গতিশীলতা অনেক বেশি। কোরাক ধারণা করেন যে, পল্লী এলাকার চেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি বিদ্যমান থাকা এবং একইসঙ্গে “সুযোগের বৈচিত্র্য” থাকায় শহরগুলো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে অপেক্ষাকৃত বেশি সক্ষম।

তারপরও এমনকি নগর-গ্রাম বিভেদ থেকেও পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। অনেক গ্রামীণ এলাকা আছেÑ বিশেষ করে পশ্চিমের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোÑ যেখানে দেশের অন্যতম  সেরা অর্থনৈতিক গতিশীলতা বিদ্যমান, যা কোরাকের ভাষায় শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

কোরাক এসব তথ্য উপাত্ত পেয়েছেন ১৯৬০-এর দশকে জন্ম নেয়া প্রায় ৩০ লাখ মানুষের ট্যাক্স রিটার্নের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশাসনিক উপাত্ত পর্যবেক্ষণ এবং সেগুলোকে তাদের বাবা-মার ট্যাক্স রিটার্ন ও সরকারি সেবা পাওয়ার মত অবস্থার সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে। কিন্তু যেহেতু এসব উপাত্ত অর্ধ শতাব্দী আগে জন্ম নেয়া মানুষের তথ্য তুলে ধরে সেজন্য কোরাক চট করে জানিয়ে দেন যে, এগুলোর সবই পেছনে তাকানো উপাত্তÑ এগুলো আমাদেরকে আজকের সময়ে কী ঘটছে এবং আগামীকাল কী ঘটবে সে সম্পর্কে খুব কমই ধারণা দেয়।

 

‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি’র বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে

 

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, উপাত্তগুলোতে দেখা গেছে যে, টরন্টোর আশেপাশে দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্টারিও হচ্ছে আয়ের মই বেয়ে ওপরে উঠে যাওয়ার জন্য কানাডার সবচেয়ে ভালো জায়গা। কিন্তু কোরাক বিস্ময় প্রকাশ করেন এজন্য যে, বর্তমান সময়ে টরন্টোতে সম্পত্তির আকাশছোঁয়া মূল্যের প্রেক্ষিতে এখনও সেটা সত্যি কিনা। ভাড়ার উচ্চ হার এবং বন্ধকীর জন্য বড় ধরণের অর্থ পরিশোধের প্রেক্ষিতে হয়তো মানুষ আয়ের মইতে আটকে থাকছে।

তিন প্রশ্ন রাখেন, “জমির দাম যদি এত বেশি হয় তাহলেও কি টরন্টো আয়ের গতিশীলতার ক্ষেত্রে চালকের ভূমিকায় থাকতে পারে?”

কোরাক বলেন, নীতি নির্ধারকদের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি’র ধারণার দিকে নজর দিতে হবেÑ এমনভাবে নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে যা ব্যাপকতর আয় শ্রেণীর মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনার মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

কোরাক বলেন, অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের সময় আমাদেরকে “প্রবৃদ্ধি এবং আয় বণ্টনের বিষয়টি ভাবতে হবে।” -হাফিংটন পোস্ট।

মন্তব্য