রুপার কান্না

 

মাহমুদা নাসরিন

mahmuda nasrin

মাহমুদা নাসরিন

আমাকে এভাবে মেরে ফেললে কেন? আমার কি দোষ ছিল? আমি মেয়ে, আমি একা ছিলাম, তাই তোমরা এতগুলো পুরুষ মিলে আমাকে ধর্ষণ করলে তোমাদের পৈচাশিক কামনা চরিতার্থ করতে। আমি তোমাদের কাছে কতবার আকুতি করেছি, মিনতি করেছি, আমার টাকাপয়সা, মোবাইল ফোন সব দিয়ে তোমাদের পা জড়িয়ে ধরেছি কতবার – বলেছি আমি তোমাদের বোনের মতো, তোমাদের জন্মও তো হয়েছে আমার মতো কোনো মেয়ের গর্ভে, আমার এখনো বিয়ে হয়নি, আমি খুব কষ্ট করছি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানোর জন্যে, আমার সর্বনাশ তোমরা করোনা। আমি ঢাকায় চাকরি করি, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম, আমার মা, ভাই বাড়িতে অপেক্ষা করছে আমার জন্যে, আমাকে ছেড়ে দাও। তোমরা আমাকে ছেড়ে তো দিলেই না, উপরন্তু আমাকে এভাবে, এতজন মিলে রেপ করে, আমার ঘাড় মটকে মেরে ফেললে। আমিওতো তোমাদের মতোই একজন রক্তে মাংসে গড়া মানুষ, হয়তো তোমাদের মতো পুরুষ না : তাহলে ধর্ষণের পরেও কেন আমাকে পাখির মতো ঘাড় মটকে মেরে ফেললে ? আমার কত স্বপ্ন ছিল, শিক্ষক হবো, আরো পড়াশুনা করবো, মাকে আমার কাছে রাখবো- আমার কোনো স্বপ্নই তোমরা পূরণ হতে দিলে না। আমি মাকে শেষ কথা বলেছিলাম ” আমি এখনো বাসে আছি, তুমি চিন্তা করো না, বাসায় পোঁছেই তোমাকে ফোন করবো। মাকে তো আর ফোন করা হয়নি, মাতো শুধু কাঁদছে আর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। আমার মায়ের মত তোমাদের মা আছে, যিনি একজন মহিলা, নয়মাস দশদিন গর্ভে রেখে তোমাদের মতো সন্তান জন্ম দিয়ে কত কষ্ট করে তোমাদের লালন পালন করেছেন। সেই মায়ের মুখ উজ্জ্বল করছো তোমরা এইভাবে, আমার মতো একজন অসহায় মেয়ে যে কিনা পয়সা দিয়ে তোমাদের বাসে উঠেছিল তাকে এতজন মিলে রেপ করেঘাড় মটকে মেরে ফেলে! একটা পিঁপড়ার জীবনও কি দেওয়ার ক্ষমতা তোমাদের আছে? তাহলে একটা মানুষকে তোমরা এভাবে মেরে ফেললে কেন? তোমরা আমাকে রেপ করার পর, তোমাদের কুৎসিত লালসা চরিতার্থ হওয়ার পর আমাকে বাস থেকে ফেলে রেখে যেতে, তাহলেও তো আমি বেঁচে থাকতে পারতাম, আরো কিছুদিন এই সুন্দর পৃথিবীর মুখ দেখতে পারতাম, আমার মা আর ভাই বোনেরা এইভাবে আমাকে হারাতো না। আমাকে এভাবে রেপ করে, ঘাড় মটকে মেরে ফেলার পরদিন থেকেই তোমরা নিয়মিত ঢাকা-ময়মনসিং রুটে বাস চালাচ্ছ, কোনো বিকার নেই তোমাদের। কোনো অনুশোচনা, পাপবোধ, লজ্জা কিছুই তোমাদের নেই। তারমানে – হয়তো তোমরা এধরণের ঘটনা আরো ঘটিয়েছো – এবার তোমরা ধরা পরে গেছো। কিন্তু ধরা পড়লে কি হবে, তোমাদের তো কোনো বিচার বা শাস্তি হবে না। তোমরা বহাল তবিয়তে , দিব্বি বেঁচে থাকবে। কারণ তোমরা পুরুষ আর আমাদের বাংলাদেশের আইন ব্যাবস্থায় এরকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে, কিন্তু কোনো বিচার হয় না। আর এজন্যই তো আমি আইনে পড়া শুরু করেছিলাম।
২০১২ সালে দিল্লিতে জ্যোতিকে বাসে রেপ করে মেরে ফেলেছিলো, ২০১৪ সালে মানিকগঞ্জে শুভেচ্ছা পরিবহনে একটি মেয়েকে ধর্ষণের নির্মম ঘটনা ঘটে, ২০১৫ সালে নারায়ণগঞ্জে এক পোশাক কর্মী কর্মস্হল থেকে ফেরার পথে বাসে ধর্ষিত হয়, ঢাকায় চলন্ত মাইক্রোবাসে গারো তরুণী ধর্ষণের শিকার হন, ২০১৬ সালে বরিশালের একটি বাসে দুই বোনকে ধর্ষণ করা হয়, এবছর নান্দাইলে এক কিশোরী বাসে ধর্ষিত হয়। তাহলে কি মেয়েরা বাসে উঠবে না আর? তোমরা পুরুষরা কি চাও? মেয়েরা লেখাপড়া করবে না, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবে না, তোমরা তাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করবে সেই আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের মতো?
মাহমুদা নাসরিন, শিক্ষক, সমাজকর্মী, টরেন্টো, কানাডা

মন্তব্য