প্রবাসে সত্যিকারের ভালো লেখক অনেক আছেন 

 

কানাডা জুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাঙালি লেখকদেরকে একটা সুতোয় বাঁধা আমাদের অন্যতম একটি লক্ষ্য

Subrata Kumar Dasকানাডার সকল বাঙালি লেখকদের সাথে নিয়ে গত দুইবছর ধরে কাজ করে চলেছে টরন্টোভিত্তিক সাহিত্য সংগঠন বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি)। ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট কানাডীয় বাঙালি লেখকদের রচিত পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারীভাবে নিবন্ধিত বিএলআরসি আগামী ১৪ অক্টোবর দ্বিতীয় বারের মতো আয়োজন করতে যাচ্ছে বাঙালি লেখক সম্মেলন। সম্মেলনকে সামনে রেখে  প্রবাসী কণ্ঠ মুখোমুখি হয় বিএলআরসি-র নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার দাসের সাথে।

প্রবাসী কন্ঠ: আপনাদের সংগঠনের নাম বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার। কেন এমন একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠার কথা আপনাদের মনে হলো?

সুব্রত কুমার দাস: সময়টা ২০১৪। আমরা সাহিত্যকর্মী বন্ধুরা যখনই টরন্টো তথা কানাডার বাঙালি লেখকদের বিষয়ে আলাপ করতাম তখন কয়েকটি প্রসঙ্গ বার বার উঠে আসতো। আমরা খেয়াল করতাম প্রবাসে সত্যিকারের ভালো লেখক অনেক আছেন। কিন্তু দেখতাম খুব কম লেখকই পরস্পরকে চেনেন। খুব কম লেখকই একে অপরের লেখার সাথে পরিচিত। আরও খেয়াল করতাম ভাষাগতভাবে এক হলেও বাংলাদেশের বাঙালি ও পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা প্রবাসে পরস্পরের সাথে যথেষ্ট সম্পৃক্ত নন। তাছাড়াও আমাদের নজরে আসতো অধিকাংশ বাঙালি লেখক কানাডার সাহিত্য সম্পর্কে খুব কম খোঁজখবর রাখেন। স্পষ্ট হতো আমাদের তরুণ প্রজন্ম প্রবাসে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কম আগ্রহী। কীভাবে এই সব বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়, তেমন ভাবনা থেকেই আমরা একটি সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠার তাগিদ বোধ করি।

সিদ্ধান্ত হয় একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার। নাম রাখা হয় বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার সংক্ষেপে বিএলআরসি। আমরা কাজটি আটঘাট বেঁধে করার সিদ্ধান্ত নেই। অবশেষে ২০১৫ সালের শুরুতে আমরা একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্যে কানাডা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করি। ৩০ মার্চ তারিখে আবেদন গৃহীত হয়। সে অর্থে ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ বিএলআরসি-র জন্মদিন। যদিও রেজিস্ট্রেশনের পর ১ বছর ধরে আমরা প্রকাশিত হইনি। শুধু গবেষণা চালিয়েছি আমাদের লক্ষ্যগুলোকে বাস্তবায়ন করতে কী কী করণীয় হবে, কাদের সাথে সংযোগ বাড়াতে হবে, কানাডার কোন কোন সংস্থা আমাদের লক্ষগুলো বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে ইত্যাদি নিয়ে।

প্র.ক: বিএলআরসি-র মূল লক্ষ্যগুলোর ওপর একটু আলোকপাত করবেন?

সুকুদা: বিএলআরসি যে লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে সংক্ষেপে সেগুলো হলো:

* কানাডা জুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাঙালি লেখকদেরকে একটা সুতোয় বাঁধা;

* অভিবাসী বাঙালি লেখকদের লেখা অন্য লেখক-পাঠকের কাছে পরিচিত করানো;

* কানাডায় অভিবাসী পশ্চিমবাংলার লেখকদের সাথে বাংলাদেশের লেখকদের মেলবন্ধন তৈরি করা;

* কানাডীয় লেখকদের সাথে বাঙালি লেখকদের সংযোগ স্থাপন;

* বাঙালি কমিউনিটির তরুণদের মধ্যে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালির ঐতিহ্য-ইতিহাস বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি।

প্র.ক: সংগঠনের সদস্য কারা? সদস্য হবার জন্যে কোন যোগ্যতাকে আপনারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন?

সুকুদা: শুরুতে তিনজন সদস্য ও পরিচালক নিয়ে গঠিত হলেও বিএলআরসি-তে এখন সাতজন পরিচালক রয়েছেন। সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন গুয়েল্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাখাল সরকার। এছাড়াও পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মুক্তচিন্তক আকবর হোসেন, গবেষক সুজিত কুসুম পাল, কবি শিউলি জাহান এবং সংস্কৃতিকর্মী সুব্রত পুরু। রাজনীতিক ও সমাজকর্মী ফায়েজুল করিম একই সাথে প্রতিষ্ঠানের সচিব ও পরিচালক।

এছাড়াও প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে টরন্টোর বাইরে থেকেও সদস্য রয়েছেন। রয়েছেন বিভিন্ন বয়সী সাহিত্যকর্মীরাও। তিনজন তরুণও বিএলআরসি-র সদস্য।  নতুন সদস্যরা হলেন সুরজিৎ রায় মজুমদার, মফিজুল হক, রোজানা নাসরীন, চয়ন দাস, কাজী জহির উদ্দীন, মাহমুদ হাসান, নয়ন হাফিজ, সুচনা দাস বাঁধন, সাঈদ যাদীদ, ফারহানা নাজ শম্পা (হ্যালিফ্যাক্স), অর্ক ভট্টাচার্য, অমিত কুমার মুখোপাধ্যায়, মানসী চৌধুরী, জাভেদ ইকবাল এবং কৃত্তা চৌধুরী।

প্র.ক: প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কী কী কাজ করেছে বিএলআরসি?

সুকুদা: প্রতিষ্ঠার পর বিএলআরসি-র গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট নির্মাণ করা। ঠিকানা: http://en.blrc-org.ca/। এতে শুধু প্রতিষ্ঠানের মানুষদের পরিচিতি নয়, রয়েছে সকল কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও বিস্তারিত ধারণা। রয়েছে অন্তত একটি বই প্রকাশিত হয়েছে এমন বিপুল সংখ্যক কানাডাতে বসবাসরত বাঙালি লেখকের সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক জীবনী। এছাড়াও কানাডায় অভিবাসী পাঁচজন লেখকের ছয়টি বই প্রকাশ করা হয়েছে। পাঁচটি বাংলায়, একটি ইংরেজিতে। দুটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইগুলো জনসমক্ষে আনা হয়েছে।

গতবছর বিএলআরসি সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ করা হয়েছে। সেটিতে লিখেছিলেন কানাডার বিভিন্ন প্রান্তের ৬৭ জন লেখক।

গত বছর ডিসেম্বরে মাসে প্রথম বারের মতো কানাডীয় বাঙালি লেখক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিপুল সংখ্যক বাঙালি লেখক যোগ দিয়েছেন।

এছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে আমাদের সংগঠন। টরন্টোর সাতটি ভাষার তরুণ-তরুণী অংশ নেয় সে অনুষ্ঠানে।

গত মার্চে শুদ্ধভাবে বাংলা লেখার ওপর একটি কর্মশালারও আয়োজন করা হয়েছিল।

প্র.ক: সামনে কী কী পরিকল্পনা রয়েছে আপনাদের?

সুকুদা: অনেকগুলো পরিকল্পনা নিয়ে বিএলআরসি এগিয়ে চলেছে। প্রথমত আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষা উৎসব করা হবে আরও বিস্তৃত পরিসরে। এবার চেষ্টা চলছে আরও বেশি ভাষার মানুষকে সম্পৃক্ত করার, অন্য ভাষার বেশি মানুষের মধ্যে মার্তভাষা দিবসের মূল বার্তা পৌঁছে দেওয়ার।

মার্চ মাসে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করার চেষ্টাও চলছে। বিএলআরসি সে অনুষ্ঠানে বাঙালি কবিদের পাশাপাশি অবাঙালি কবিদেরকে আহ্বান করবে। আমাদের সংগঠন চায় অবাঙালিরা বাঙালি কবিদের কবিতা শুনবেন, বাঙালি কবিরা টরন্টোর অবাঙালি কবিদের কবিতা শুণবেন এবং পরস্পরের কাছে থেকে ঋদ্ধ হবেন।

এছাড়া শিঘ্রই একটি বছরব্যাপী প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পে তরুণদের জন্যে ইংরেজি ভাষায় বাংলা সাহিত্য পাঠের ব্যবস্থা করা হবে। উদ্বোধন হবে আগামী ১৮ নভেম্বর। প্রতিমাস একটি নির্দিষ্ট দিনে তরুণরা একটি নিদৃষ্ট জায়গাতে এসে বই নিতে পারবেন। শেষ হবে আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে। বছরশেষে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের পাঠ নিয়ে একটি মূল্যায়ন জমা দেবে। সেরা দশ মূল্যায়ন নিয়ে প্রকাশ করা হবে একটি স্মরণিকা। শ্রেষ্ঠ তিন মূল্যায়রকারীকে দেওয়া হবে পুরস্কার। বিএলআরসি কৃতজ্ঞচিত্তে উল্লেখ করতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আমেরিকার মিশিগান শহরের অভিবাসী দার্শনিক, সমাজসেবক ও চিকিৎসক ড. দেবাশিস মৃধাকে। তিনি আমাদের প্রকল্পের কথা জেনে সহয়োগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এছাড়াও বিএলআরসি-র আরকেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো কানাডার বাঙালি লেখকদের রচনাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে একটি সংকলন (অ্যানথোলজি) প্রকাশ করা। সে-সংকলনে কানাডীয় বাঙালি লেখকদের লেখা গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, সাহিত্যগবেষণা ইত্যাদির ইংরেজি অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত হবে।

প্র.ক: এবার আসন্ন লেখক সম্মেলনের প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু বলুন।

সুকুদা: টরন্টোতে বাঙালি লেখক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ১৪ অক্টোবর। শহরের ৯ ডজ রোডের কানাডিয়ান লিজিয়ন হলে অনুষ্ঠিত হবে। শুরু হবে বিকেল ৪টায়। লেখক সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত থাকবেন কানাডীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব টরন্টো পোয়েট লরিয়েট অ্যান মাইকেলস, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক আসাদ চৌধুরী, কবি ইকবাল হাসান এবং অন্যরা। স্বাগত ভাষণ দেবেন বিএলআরসি-র সভাপতি গুয়েল্ফ বিশ্ববিদ্যারয়ের অধ্যাপক ড. রাখাল সরকার। সম্মেলন চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বিভিন্ন পর্বে কবিতা, কথাসাহিত্য, গদ্যসাহিত্য নিয়ে আলোচনা ও পাঠে অংশ নেবেন বিপুল সংখ্যক বাঙালি-অবাঙালি তরুণ ও প্রবীন কবি ও লেখক। কানাডার কবিতার বাংলা অনুবাদ নিয়ে একটি আড্ডা-পর্ব থাকবে। এছাড়ারও বাঙালি কিছু তরুনদের নিয়ে ছোট্ট একটি পর্ব থাকবে। এবছরের লেখক সম্মেলনে বিএলআরসি সাহিত্য পত্রিকার দ্বিতীয় সংখাটি প্রকাশিত হবে।

কানাডাবাসী বাঙালি লেখকদের বই সম্পর্কে ধারণা লাভ করার জন্যে বিনা খরচে লেখকদের বই প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে। আগ্রহী লেখকদের সংগঠনের সচিব ফায়েজুল করিমের সাথে (ফোন নং ৬৪৭-৪৭৩-০০৪৭) যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

এবার লেখক সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটিতে আছেন ফায়েজুল করিম, শিউলী জাহান, চয়ন দাশ, নয়ন হাফিজ, অনিরুদ্ধ আলম, বাদল ঘোষ, জাভেদ ইকবাল, তাসমিনা খান, অর্ক ভট্টাচার্য, সূচনা দাস বাঁধন এবং অদিতি কাজী।

প্র.ক: আমাদের পাঠকদের উদ্দেশে আপনার শেষ কথা কী?

সুকুদা: ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় কানাডীয় বাঙালি লেখক সম্মেলনে সকল বাঙালি লেখক-পাঠককে আহ্বান জানাই।

মন্তব্য