কানাডায় বিভেদ সৃষ্টিতে ইন্ধন যোগাচ্ছে নেকাব রাজনীতি

borkha1

অধিকাংশ মুসলিম দেশেই নেকাব পরার বাধ্যবাধকতা নেই। ছবি : ইউরোনিউজ

কুইবেক প্রভিন্সের পার্লামেন্টে রিলিজিয়াস নিউট্রালিটি ল যা বিল ৬২ নামেও পরিচিত, পাস হয়েছে গত ১৮ অক্টোবর। ঐ আইনে বলা হয়েছে, কুইবেকে বাসে বা ট্রেনে উঠতে হলে অথবা কোন সরকারী অফিসে গিয়ে সেবা পেতে হলে কিংবা সরকারী অফিসে কাজ করতে হলে মুখ ঢেকে রাখা যাবে না। অর্থাৎ নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। পর্দার আড়ালে থেকে সেবা নেওয়া যাবে না এবং সেবা দেওয়া যাবে না।

এই আইন স্পষ্টতই মুসলিম সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে করা যদিও বিচার মন্ত্রী স্টিফেনী ভ্যালি বার বার তা অস্বীকার করে আসছেন।

বিলের কোথাও অবশ্য নিকাব বা বোরখার কাথা বলা হয়নি স্পষ্ট করে। বলা হয়নি যে মুসলিম মহিলাগণ রাস্তায় বোরখা পরে এবং নিকাব দিয়ে মুখ ঢেকে বের হতে পারবেন না।

কিন্তু কুইবেকে যারা বোরখা এবং সেই সাথে নেকাব পরেন তারা এখন অনিশ্চয়তা ও আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি যারা হিজাব পরেন তারাও। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে এখন তারা আর রাস্তায় বের হচ্ছেন না। বের হওয়ার আগে একাধিকবার চিন্তা করছেন বের হবেন কি হবেন না। অনেকে ইতিমধ্যে বাইরে বের হওয়ার মাত্রা কমিয়ে দিয়েছেন।

বিলটি পাশ হওয়ার পর পরই কানাডা জুড়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। বিতর্কের পাশাপাশি নিন্দার ঝড়ও উঠে কানাডাব্যাপী। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেন, মহিলারা কোন পোষাক পরবেন আর কোনটি পরবেন না সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব কোন সরকারের নয়। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ক্যাথেলিন ওয়েন এবং আলবার্টার প্রিমিয়ার রিচেল নটলি এই বিল ৬২ এর নিন্দা জানান। নিন্দা জানান মন্ট্রিয়লের মেয়র ডেনিস কোডার।

কুইবেকের বিচার মন্ত্রী স্টিফেনী ভ্যালি বলেন, বিল ৬২ কুইবেক প্রভিন্সের সর্বত্রই কার্যকর হবে। আর কুইবেকের অধিকাংশ অধিবাসী এই আইনের পক্ষে। একই দাবী করেন কুইবেক এর প্রিমিয়ার ফিলিপ কুইয়ার্ড-ও। তিনি বলেন শুধু কুইবেক এর বাসিন্দারা নন, কানাডার সিংহভাগ নাগরিকই এই আইনের পক্ষে।

কানাডায় এই নেকাব নিয়ে বিতর্ক আগেও হয়েছে। আইনী লাড়াইও হয়েছে এ নিয়ে। লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছে সরকার পক্ষ। কিন্তু নেকাব নিষিদ্ধের প্রচেষ্টা এখনো থেমে নেই। কুইবেকে বিল ৬২ পাসের মধ্য দিয়েই সেটি প্রমানিত হলো আবার।

কিন্তু নেকাব নিয়ে এই যে রাজনীতি এবং তর্ক বিতর্ক, তাতে লাভবান হচ্ছেন কারা? মুসলিম নন প্রফিট অর্গানাইজেশন ‘কানাডিয়ান থিংকার্স ফোরাম’ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাহির গোরা বলেন, “নিকাব ইসলামের আবশ্যিক কোন পরিধেয় বস্ত্র নয় এবং সিংহভাগ কানাডিয়ান মুসলিম নারীরা এটি পরেন না। কানাডার প্রায় অর্ধলক্ষ মুসলিম নারীর মধ্যে মাত্র কয়েকশত মহিলা হয়তো এটি পরিধান করে থাকেন।” তাহির গোরার মত আরো অনেক ইসলামী সমাজকর্মী ও বিশেষজ্ঞগণ বলে আসছেন নেকাব ইসলামী পোষাক নয়। কিন্তু তারপরও এক দল নারী এই নেকাবকে আঁকড়ে ধরে আছেন ইসলামী পোষাক ভেবে। অন্যদিকে মূলধারার রাজনীতিকগণ এটিকে ইস্যু বানিয়ে ভোটের রাজনীতি করছেন।

এতে করে স্পষ্টতই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ইসলামের ভাবমূর্তি। অন্যদিকে এটি ইন্ধন যোগাচ্ছে সামাজিক বিভেদ সৃষ্টিতে এবং পাশাপাশি বিভ্রান্তি সৃষ্টিতেও। লক্ষ্যনীয় যে, অধিকাংশ মুসলিম দেশেই নেকাব পরার বাধ্যবাধকতা নেই। নেকাব শরীয়া আইনের অংশ। আজকে বাংলাদেশসহ আরো অনেক মুসলিম দেশ শরীয়া আইন ছাড়াই যদি শাসন ব্যবস্থা সচল রাখতে পারে তবে সে ক্ষেত্রে কানাডাসহ পাশ্চাত্যের গুটি কতক দেশে বোরখা বা নেকাব পরা নিয়ে গোড়াঁ পন্থী একদল মুসলমানের এই বাড়াবাড়ির কোন যুক্তি আছে বলে মনে করেন না অনেকেই। পাশাপাশি কানাডার মূলধারার রাজনীতিকদের মধ্যেও নেকাব এর পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোন যৌক্তিক কারণ আছে বলে মনে করেন না অনেকে। সমাজে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে নেকাব নিয়ে উভয় পক্ষের এই বাড়াবাড়ি আমরা মনে করি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।

মন্তব্য