এই পরবাসে রবে কে-২

নাজমুল ইসলাম

Nazmul Islam

এদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া একটা অভিজ্ঞতা বটে। অন্টারিওতে ড্রাইভার্স লাইসেন্সের বিভিন্ন শ্রেণী আছে। ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর লাইসেন্স নিতে হয়। প্রথম ধাপ নলেজ টেস্ট বা জি১ (এ১) পাশ করতে হয়, এরপর রোডটেস্ট জি২ (এ২) এবং জি (এ)। প্রত্যেকটির মাঝখানে ওয়েটিং টাইম আছে। জি১ পাশ করার আটমাস পর জি২ এবং জি২ পাশ করার এক বছর পর জি লাইসেন্সের জন্য রোড টেস্ট দেয়া যায়। জি১ সবার জন্য বাধ্যতামুলক। গাড়ী চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে জি২ না দিয়ে সরাসরি জি লাইসেন্সের জন্য রোডটেস্ট দেয়া যায়। সেক্ষেত্রে নলেজ টেস্ট দেয়ার সময় প্রমাণ দেখাতে হয়। এক বন্ধুর পরামর্শ মোতাবেক দেশ থেকে বিআরটিএ’র সার্টিফিকেট নিয়ে এলাম সময় বাঁচিয়ে সরাসরি জি দেয়ার জন্য। যথারীতি জি১ পরীক্ষার দিন টাকা জমা দেয়ার সময় বিআরটিএ’র সার্টিফিকেটটা জমা দিতেই কাউন্টারের মেয়েটি জানালো যে আমার জি২ বা জি দেয়ার জন্য কোন ওয়েটিং টাইম নেই। দেশে গাড়ী না থাকলেও অফিসার কাম ড্রাইভারের চাকরির সুবাদে ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা ছিল। কিছুটা ঠেলায় পড়েই শেখা আর কি।
অফিসার কাম ড্রাইভার বিষয়টা পাঠকদের জন্য একটু পরিস্কার করি। চাকরিতে বদলীর সুবাদে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ইনচার্জ হিসাবে যোগদান করেছি। অফিস রাঙামাটি। তখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল ফোন চালু হয়নি। অফিসে ল্যান্ডফোন থাকলেও অনেকটা দীপান্তরের অনুভূতি। তবে হাতীর মাহুত নেই। হাতি হলো অফিসের ল্যান্ডরোভার গাড়ীটা। প্রতি লিটারে সাড়ে তিন বা চার কিলোমিটারের বেশী চলে না। সমস্যা হলো গাড়ীর চালক নেই। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারের চাকরিও শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু গাড়ীটা রয়ে গেছে। হেড অফিস থেকে জানানো হলো, অদুর বা সুদুর কোন ভবিষ্যতেই ড্রাইভার দেয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু গাড়ীটি সচল রাখতে হবে। অর্থাৎ কর্মরত কর্মকর্তাকেই চালাতে হবে। বিগত বছরগুলোতে আমার আগে যারা কর্মরত ছিলেন তারাও নাকি নিজেরাই চালিয়েছেন। এভাবেই চলেছে।
রাঙামাটি বাংলাদেশের একমাত্র রিক্সাবিহীন শহর। খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান শহরেও রিক্সা চলে। অথচ রাঙামাটিতে সিএনজি চালিত বেবীট্যাক্সি ছাড়া আর কোন পাবলিক যানবাহন নেই। এই গাড়ীটাই ভরসা। সেটাও যদি চালকের অভাবে বসে থাকে, তাহলে চলবো কী করে। অগত্যা অফিসের সেই ল্যান্ডরোভারটা নিয়ে আমার ড্রাইভিং অভিজ্ঞতার শুরু এবং অতঃপর ছয় বছরের অভিজ্ঞতা। বিআরটিএ যেহেতু প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছে। অতএব পাহাড় হোক আর সমূদ্র হোক গাড়ী চালাতে ভয় কী? তাছাড়া মুরুব্বীরা তো বলেই দিয়েছেন যে রাস্তায় গরুছাগল চিনলেই হলো।
প্রসঙ্গান্তরে অনেক কথা হয়ে গেল। বলছিলাম এদেশে ড্রাইভার্স লাইসেন্সের কথা। একদিন সকালবেলা আমার এক বন্ধু আমাকে ড্রাইভ টেস্ট সেন্টারে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল, ‘একবারে পাশ না করলে ধোলাই খাবি’। বন্ধুর ঝাড়ি শিরোধার্য করে ড্রাইভ টেস্ট সেন্টার থেকে ঘন্টা তিনেক পর একবারেই জি১ নিয়ে বের হলাম। এবার লেসন নেবার পালা। কানাডায় সবকিছুই যেন উল্টোপাল্টা। এদেশে রাস্তার ডান দিক দিয়ে গাড়ী চলে। ইলেকট্রিক সুইচ উল্টোদিকে অন হয়। নাম ফুটবল অথচ খেলে হাত দিয়ে। গাড়ীগুলো লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ। কাজেই নিজের দেশে যে যত পাকা ড্রাইভারই হোক না কেন, রাস্তার এই ডান-বাম ঠিক করার জন্য হলেও কয়েকটা লেসন নিতে হয়। তাই ঠিক করলাম রোড টেস্ট দিতে যাবার আগে বেশ কয়েকটা লেসন নিয়ে তারপর যাবো।
আমার ইনস্ট্রাক্টর সাহেব বেশ ভাল মানুষ। প্রায় আমার সমবয়সী। বরিশালের শ্রুতিমধুর ভাষায় কথা বলেন। আমাদের দেশের প্রায় সব জেলার ভাষাই বেশ মেলোডিয়াস এবং শ্রুতিমধুর। কয়েকদিনেই বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে গেল। আমার প্রথম ফরমাল গাড়ী চালানো শেখা পিএটিসি’র ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ে। সেখানে বিআরটিসি’র টেনিং ইনস্টিটিউট থেকে যারা এসে আমাদের ড্রাইভিং শেখাতেন, তাদের ওস্তাদ বলে সম্বোধন করতে হতো। পিএটিসি অথরিটি ট্রেনিংয়ের শুরুতেই বিষয়টা আমাদের জানিয়ে দিয়েছিল। এখানে সেসব ঝামেলা নেই। এখানে ইনস্ট্রাক্টরকে ওস্তাদ বলতে হয়না। ভাই বলেই ডাকি। আমি আগে থেকেই গাড়ী চালানো জানি বলে আমার ইনস্ট্রাক্টর ভাই খুব এক্সাইটেড। কারণ আগে থেকে ড্রাইভিং জানা স্টুডেন্টকে ড্রাইভিং শেখানোও সহজ আবার রোডটেস্টে পাশ করার সম্ভাবনা একটু হলেও বেশী থাকে। তাছাড়া যে ইনস্ট্রাক্টরের কাছে যত বেশী স্টুডেন্ট পাশ করে, তার তত সুনাম হয়। ইনস্ট্রাক্টর ভাইয়ের এক্সাইটেড হওয়াটা মোটেই অযৌক্তিক নয়।
কয়েকটা লেসন নেয়ার পর একদিন ইনস্ট্রাক্টর ভাই বললেন, ‘চলেন এবার রোড টেস্ট দিতে যাই’। যেহেতু আমার যেকোন সময় জি২ অথবা সরাসরি জি দেয়ার অনুমতি আছে। কাজেই সরাসরি জি দেয়ার সিদ্ধান্তই নিলাম। দু’একজন বন্ধু বয়ান দিল, ‘এত এডভেঞ্চার করিস না দোস্ত, পাশ হবে না’। ‘আগে জি২ দে, পরে জি দিস’ ইত্যাদি ইত্যাদি। বন্ধুদের এসব কথায় আমাকে একটু দ্বিধান্বিত দেখে আমার ইনস্ট্রাক্টর যুক্তি দিলেন, ‘আপনারে যেহেতু এই সরকার সরাসরি জি দেয়ার সুযোগ দেছে, আপনি সে সুযোগ নেবেন না ক্যান? জি দিয়ে ফেল করলে তো এ্যামনেই জি২ দেতে হইবে। হ্যাগো কথায় কান দিয়েন না। নিজের বুদ্ধিতে খয়রাতি (ফকির) হওয়াও ভাল’। দেখলাম ওস্তাদের কথায় যুক্তি আছে। খুবই ন্যায্য কথা। অতএব শিরোধার্য।

অন্টারিওর ক্লিনটন শহরের ড্রাইভ টেস্ট সেন্টার।  ছবি : গুগুল অনলাইন

অন্টারিওর ক্লিনটন শহরের ড্রাইভ টেস্ট সেন্টার। ছবি : গুগুল অনলাইন

আমি রোড টেস্ট দিতে গিয়েছিলাম ক্লিনটন শহরে। ক্লিনটন টরন্টো থেকে প্রায় তিন ঘন্টার ড্রাইভ। যাবার সময় ভিতরে ভিতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন পাশ করার জন্য গ্রামাঞ্চলে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। বিষয়টা কিছুটা সেরকমই। আমাদের দেশে একসময় গ্রামাঞ্চলে গিয়ে নকল করে ম্যাট্রিক পাশ করে আসার বেশ প্রচলন হয়েছিল। এখন বোধহয় আর গ্রামে যাবার দরকার হয় না। কারণ এখন ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় কিছু লিখতে না পারলেও সারাদেশের সবাইকে জিপিএ-৫ দেয়ার মহান কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। বিশাল কর্মযজ্ঞ। যাইহোক, রোড টেস্টের জন্য আমার ক্লিনটন যাবার উদ্দেশ্য জলবত পরিস্কার। ছোট নিরিবিলি শহরে রোড টেস্ট দেয়াও সহজ হবে, পাশের সম্ভাবনাও অনেক বেশী থাকবে। ইনস্ট্রাক্টররা এজন্যে অতিরিক্ত টাকা নিলে ক্ষতি কী?।
ক্লিনটন গিয়ে অপরাধবোধ অনেকটা কমে গেল। কারণ দেখলাম টরন্টো আর মিসিসাগা শহর থেকে অনেক পরীক্ষার্থী এসেছে এই গ্রামাঞ্চলে পরীক্ষা দিতে। একটা বিষয় একটু চিন্তায় ফেলে দিল। সবাই বলাবলি করছে, অমুক এক্সামিনার ভাল সবাইকে পাশ করায়। অমুক এক্সামিনার ভাল না, তমুকের কাছে পাশ করা কঠিন ইত্যাদি ইত্যাদি। সিরিয়াল অনুযায়ী আমার যে এক্সামিনারের সঙ্গে টেস্ট দিতে যাবার কথা, তাঁর সম্পর্কে শুনলাম ‘খুব ভাল মহিলা’। প্রায় সবাইকেই নাকি পাশ করায়। আশ্বস্ত হয়ে অপেক্ষা করছি। যখন আমার পালা এলো হঠাৎ দেখলাম আমার এক্সামিনার বদল হয়েছে। একজন ক্যান্ডিডেট রেজিস্ট্রেশন করেও আসেনি অথবা আসতে পারেনি। তার স্লটে আমাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার এক্সামিনার সাহেব (নাম ভুলে গেছি) ইতোমধ্যে পর পর তিনজনকে ফেল করিয়েছেন। তিনজনকেই গাড়ী থেকে বিমর্ষ চিত্তে বেরিয়ে আসতে দেখেছি। তৃতীয় পরীক্ষার্থী ছিলেন একজন বাঙালী ভদ্রমহিলা। তিনি রীতিমত ক্রন্দনরত অবস্থায় গাড়ী থেকে বেরিয়ে এলেন। এবার আমি চার নম্বর আসামী।
গাড়ীর দিকে যাবার সময় আমার ইনস্ট্রাক্টরের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালাম। ইনস্ট্রাক্টর ভাই সান্তনা দিলেন, ‘যান ভাই, আল্লাহ্ ভরসা’। মনে মনে বললাম, এক্সামিনারের পাশ করানোর হার দেখে নিজের উপরই ভরসা হচ্ছে না। আল্লাহ্ কি করবে? আল্লাহ্ তো আমার রোড টেস্ট দিয়ে দিবে না রে ভাই। এযাবৎ তো নিজের উপরে ভরসা করেই চলেছি। কোন বিষয়ে নিজের অযোগ্যতা থাকলে শুধু আল্লাহ্র উপর ভরসা করে চালানো যায় না। এই দেশে তো আরও যায় না। অতপর এক্সামিনারসহ গাড়ীতে গিয়ে বসলাম।
এক্সামিনার কানাডিয়ান সাদা মানুষ। গাড়ীতে বসেই জিজ্ঞাসা করলো, ‘হাইওয়েতে কতবার উঠেছো?’ তখনও আমি তিন-চারবারের বেশী হাইওয়েতে উঠিনি। আমি মিথ্যা বলতে একেবারে পারি না একথা ঠিক না, তবে দক্ষতার সঙ্গে পারি না। ধরা পড়ে যাই। তবু ভয়ে ভয়ে বললাম, পাঁচ-ছয়বার। আমার ইনস্ট্রাক্টর পনের-বিশবার বলার কথা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। বলতে পারিনি। এত ডাহা মিথ্যা বলা কি সহজ কথা?। এক্সামিনার সাহেব ভ্রু কুঁচকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘৪০১-এর কতবার উঠেছো?’ একই উত্তর দিলাম, পাঁচ-ছয়বার। এছাড়া আর কি বলবো? আমার হাইওয়ে প্র্যাকটিস কেবল হাইওয়ে ৪০১-এ। দুইবার উঠেছি আমার ইনস্ট্রাক্টরের সঙ্গে। আর দুইবার আমার এক কাকার সঙ্গে।
এক্সামিনারের নির্দেশ মতো পার্কিং লট থেকে বের হলাম। ক্লিনটনে হাইওয়ের লিমিট ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু হাইওয়েতে উঠে কখন যে ৮৫ কিলোমিটার স্পীড উঠে গেছে বুঝতে পারিনি। হঠাৎ এক্সামিনার সাহেব একটু গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘এটা কিন্তু ৮০ কিলোমিটার লিমিটের রাস্তা’। সতর্ক করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে থ্যাঙ্কস দিয়ে এক্সিলারেটর থেকে পা তুলে ফেললাম। দুইবার প্যারালাল পার্কিং করালো আমাকে দিয়ে। দুইবার কেন করালো জানিনা। ফলাফলের কথা চিন্তা করে চোখে অন্ধকার দেখলাম। অবশেষে পর্কিং লটে ফিরে এলাম। প্রচন্ড উৎকণ্ঠা নিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে আছি। মনে হলো বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে কেউ। এক্সামিনার সাহেব আমার দিকে কয়েক সেকেন্ট তাকিয়ে রইলেন। এরপর অনেক কষ্টে কুঁথে কুঁথে বললেন, ‘ওকে… ইউ পাস’।
নাজমুল ইসলাম
টরন্টো

মন্তব্য