কানাডা রেভিনিউ এজেন্সীর ভয় দেখিয়ে প্রতারণা অব্যাহত

 

প্রতারকরা আরো বেশী চতুর হয়ে উঠেছেন

khurshid-alam

॥ খুরশিদ আলম ॥

কানাডা রেভিনিউ এজেন্সীর নাম করে যারা প্রতারণা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে তারা আগের তুলনায় আরো বেশী চতুর ও দক্ষ হয়ে উঠেছেন সম্প্রতি। আর সেই প্রতারক চক্রের উদ্ভাবিত নতুন নতুন কৌশলের ফাঁদে পড়ে কষ্টার্জিত হাজার হাজার ডলার খোয়াচ্ছেন অনেকেই। পুলিশ এই প্রতারকদের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করতে পারছেন না।

সম্প্রতি টরন্টোর ইয়র্ক এলাকায় এই প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে প্রায় অর্ধশত লোক মোটা অংকের অর্থ খুইয়েছেন। স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানায় গত এপ্রিল থেকে এই পর্যন্ত এরকম ৪৫ টি প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছে তারা। প্রতারণার শিকার এই ব্যক্তিরা ইরঃপড়রহং নামের নতুন এক অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) সিস্টেমের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ডলার জমা দিয়েছেন প্রতারকদের একাউন্টে। পুলিশ আরো জানায়, নুতন এই মেশিনে জমা দেয়া এই অর্থ উদ্ধারের কোন উপায় তাদের জানা নেই।  গত ৭ নভেম্বর টরন্টোর ইয়র্ক রিজিয়নে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ এই তথ্য জানায়।

এরকম প্রতারণার শিকার একজন হলেন লিন্ডা। ইয়র্ক রিজিয়নে আয়োজিত ঐ সংবাদ সম্মেলনে লিন্ডা তার নামের শেষাংশ গোপন রেখে  বলেন, প্রতারকরা প্রথমে আমার সেল ফোনে কল করেন। ফোনে তারা বলেন টেক্স জালিয়াতির কারণে কানাডা রেভিনিউ এজেন্সী (সিআরএ) আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। এখন আমি যদি এই মুহুর্তে বিষয়টি সমাধান না করি তবে পুলিশ এসে আমাকে গ্রেফতার করবে কিছুক্ষনের মধ্যে। ইয়র্ক রিজিয়ন পুলিশের হাতে আমাকে গ্রেফতার করার জন্য ওয়ারেন্টও আছে।

লিন্ডা প্রথমে ভেবেছিলেন এটি একটি অবৈধ ফোন কল। সম্ভবত কোন প্রতারক এই কাজটি করছেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি প্রতারককে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন। প্রতারক তাকে এমন কৌশলে তাকে চাপ দিতে থাকেন যে লিন্ডা অবশেষে ঘাবড়ে যান। লিন্ডা বলেন, প্রতারক তার কিছু ব্যক্তিগত তথ্যও যোগাড় করেছিল কোন সূত্র থেকে। আর সে যে স্থান থেকেই কল করে থাকুক, আমার সেল ফোনের মনিটরে নাম উঠে ‘ইয়র্ক রিজিয়নাল পুলিশ’ এর।

কানাডা রেভিনিউ এজেন্সীর নাম করে যারা প্রতারণা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে তারা আগের তুলনায় আরো বেশী চতুর ও দক্ষ হয়ে উঠেছেন সম্প্রতি। ছবি : অনলাইন

কানাডা রেভিনিউ এজেন্সীর নাম করে যারা প্রতারণা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে তারা আগের তুলনায় আরো বেশী চতুর ও দক্ষ হয়ে উঠেছেন সম্প্রতি। ছবি : অনলাইন

লিন্ডা শেষ পর্যন্ত প্রতারকের ফাঁদে পা দেন এবং নিজের ব্যাংক একাউন্ট থেকে বার হাজার ডলার তুলে রিচমন্ড হিলের একটি কনভিনিয়েন্স স্টোরের অভ্যন্তরে বসানো ‘বিটকয়েন অটোমেটেড টেলার মেশিন’ এ ঐ অর্থের পুরোটাই জমা দেন। ঐ বিশেষ মেশিনটি লিন্ডার জমা দেয়া নগদ অর্থ ‘বিটকয়েন’ এ কনভার্ট করে নেয় এবং তা প্রতারকের একাউন্টে চলে যায়।

লিন্ডা জানান, তিনি এই ধরণের মেশিনের কথা আগে কখনো শুনেননি। আর প্রতারক নানান কৌশল অবলম্বন করে আমাকে বুঝায় যে, এই জাতীয় মেশিনই রেভিনিউ কানাডা ব্যবহার করে যাতে করে লোকজন সহজেই এবং দ্রুত তাদের কাছে পাওনা অর্থ জমা দিতে পারেন।

ফোন দেয়া থেকে শুরু করে বিটকয়েন অটোমেটেড টেলার মেশিনে অর্থ জমা দেওয়ার পুরো ঘটনাটি ঘটেছে মাত্র ৪ ঘন্টার মধ্যে। আর এর পরই লিন্ডা বুঝতে পারেন তিনি কি ভুল করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে লিন্ডা বলেন, আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন কি বোকামীটাই না আমি করেছি। হ্যা, আমি আসলেই বোকামী করেছি। আর এর জন্য আমি এখন বিব্রত এবং সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত।

পুলিশের বক্তব্য হলো, এই বিটকয়েন অটোমেটেড টেলার মেশিন অবৈধ নয়। কিন্তু এই মেশিনে একবার ক্যাশ ডলার জমা দেয়ার পর যখন সেটি  বিটকয়েনে রূপান্তরিত হয় তখন তার আর উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। সংবাদ সম্মেলনে ইয়র্ক রিজিয়নের কনস্টেবল রব ভিঙ্গারহোটস বলেন, এটি ওয়ান ওয়ে রাস্তা। একবার ডলার জমা দেয়া হলে তা আর ফেরত পাওয়ার কোন উপায় নেই। একমাত্র যে ব্যক্তি এই অর্থ গ্রহণ করেছেন তিনিই পারেন তা ফেরত দিতে। আর যেহেতু এই অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে তাই এটি ফেরত পাওয়া যাবে তা ভাবার কোন কারণ নেই।

তদন্তকারীরা বলছেন, আমাদের বিশ্বাস এই প্রতারকগণ কানাডার বাইরে থেকে তাদের অপারেশন চালায়। ফলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা আরো কঠিন।

কনস্টেবল রব ভিঙ্গারহোটস বলেন, এই জাতীয় প্রতারণার মাধ্যমে যে সকল ব্যক্তি আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাদের পক্ষে যেহেতু সেই অর্থ আর ফিরে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না তাই সচেতনতাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। তিনি সংবাদ সম্মেলনে আরো জানান লোকজনকে সম্ভাব্য প্রতারণার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বিটকয়েন অটোমেটেড টেলার মেশিন এর পাশে প্রচারপত্র লাগানো হয়েছে। ঐ প্রচারপত্রে বলা আছে কানাডা রেভিনিউ এজেন্সী বা অন্যকোন বৈধ সংস্থা কোন পেমেন্ট গ্রহণ করে না এই বিটকয়েন সিস্টেমের মাধ্যমে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, পুলিশ কখনো টেক্স বকেয়ার জন্য কাউকে গ্রেফতার করে না এবং টেক্স কালেকশনের কোন দায়িত্বও তারা পালন করে না।

উল্লেখ্য যে, গত বছর জানুয়ারী মাসের দিকে এই জাতীয় এক প্রতারক আমাদের বাসায়ও ফোন দিয়েছিল। একবার নয়, একাধিকবার। পরে সুবিধা করতে না পেরে কল দেয়া বন্ধ করে।

ঐ সময় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি টরন্টোতে আমাদের বাংলাদেশী কমিউনিটির আরো অনেকেই এই জাতীয় কল পেয়েছেন। তবে কেউ ভিক্টিম হয়েছেন এমন খবর পাইনি। আর ভিক্টিম হয়ে থাকলেও লজ্জায় কেউ স্বীকার করেননি হয়তো।

কানাডার বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত কানাডিয়ান এন্টি ফ্রড সেন্টার এর কর্মকর্তা ডেনিয়েল উইলিয়াম ইতিপূর্বে বলেছেন, কানাডা রেভিনিউ এজেন্সির নাম করে প্রতারকদের এই ফোন কলের প্রায় সবগুলোই আসে ভারত থেকে। আগে এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা দেশের বাইরে অবস্থিত ভারতীয়দের টার্গেট করে ফোন দিতেন। কিন্তুু এখন তারা প্রতারণায় আরো অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন এবং তাদের কলের সীমানা বাড়িয়ে খোদ কানাডিয়ানদেরকেও জ্বালাতন করছেন।

প্রতারকরা কি কি কৌশল অবলম্বন করে থাকেন তার আরো কিছু নমুনা তুলে ধরেছে কানাডিয়ান এন্টি ফ্রড সেন্টার। যেমন :

০ টেলিফোনের মাধ্যমে প্রতারকরা সম্ভাব্য শিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমরা আপনার টেক্স রিটার্নের ফাইল চেক করে দেখেছি। ফাইল চেক করে আমরা দেখতে পেয়েছি আপনি আপনার আসল ইনকাম গোপন করেছেন টেক্স ফাকি দেওয়ার জন্য। এ জন্য আপনাকে কম করে হলেও ৫০ হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে।

০ প্রতারকরা আরো হুশিয়ারী দেন এই বলে যে, এই বিষয়টি গোপনীয় এবং এটি যেন কারো কাছে প্রকাশ করা না হয়। এমনকি স্বামী বা স্ত্রীর কাছেও না। পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা বন্ধুদের কাছে তো নয়-ই।

০ কানাডা রেভিনিউ এজেন্সি কর্তৃক পাওনা অর্থ সবসময়ই রিসিভার জেনারেল এর নামে পাঠাতে হয়। কিন্তু প্রতারকরা কখনোই বলেন না যে পাওনা অর্থ রিসিভার জেনারেল ফর কানাডা’র নামে পাঠাতে হবে। তার বদলে তারা দাবী করেন পাওনা ঐ অর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন বা মানিগ্রামের মাধ্যমে তাদের কাছে পাঠাতে। অথবা কোন কানাডিয়ান স্টোর থেকে প্রিপেইড কার্ড কিনে তাদের ঠিকানায় পাঠাতে। কখনো কখনো তাদের দেওয়া ব্যাংক একাউন্টেও জামা দিতে বলা হয় পাওনা অর্থ।

প্রতারকদের সর্বশেষ কৌশল হলো এই বিটকয়েন অটোমেটেড টেলার মেশিন। সম্ভাব্য টার্গেটকে তারা এই টেলার মেশিনের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে বলে।

০ ভয় দেখানোর জন্য তারা আরো হুমকী দেন এই বলে যে, “কিছুক্ষনের মধ্যেই আরসিএমপি এসে আপনার দরজায় নক করবে। তাদের কাছে আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য ওয়ারেন্ট রয়েছে।”

০ মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের কাল্পনিক অভিযোগ এনে বা অন্যকোন অপরাধমূলক কাজের কাল্পনিক অভিযোগ এনে তারা আরো ভয় দেখান এই বলে যে “আপনি কানাডা রেভিনিউ এজেন্সির প্রাপ্য অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত আপনার বাড়ি অন্যের জিম্বায় রাখা হবে এবং আপনার পাসপোর্ট আটক করা হবে। আপনার এই অপকর্মের বিষয়টি আপনার ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানদেরকেও জানানো হবে। -সূত্র : টরন্টো স্টার।

কয়েক মাস আগে এক খবরে দেখেছিলাম এই অপরাধ চক্রের কতিপয় সদস্যকে ভারতীয় পুলিশ আটক করেছে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোন উন্নতী হয়ছে এমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত এই অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক অনেক বিশাল এবং শক্তিশালী। সে কারণে কয়েকজন সদস্য গ্রেফতার হলেও তাদের কার্যক্রম থেমে থাকার কথা নয়। আর শুধু ভারতেই যে এই চক্র সক্রিয় সেটিও সম্ভবত ঠিক নয়। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও এই অবৈধ ব্যবসা জমে উঠতে পারে।

আগে দেখা গেছে এদের টার্গেট ছিল মূলত নতুন ইমিগ্রেন্ট। বিশেষ করে এশিয় অঞ্চল থেকে আসা ইমিগ্রেন্ট। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই অপরাধীদের শিকার হচ্ছেন শ্বেতাঙ্গরাও। লিন্ডা সেরকমই একজন নারী।

নুতন আসা ইমিগ্রেন্টরা হয়তো এ দেশের আইন-কানুন সম্পর্কে তেমন অবহিত থাকেন না বা নতুন দেশে নতুন পরিবেশে একটা ভয় ভয় ভাব সবসময়ই তাদের মধ্যে কাজ করে। এবং তার মধ্যে কেউ যদি কোন ইস্যুতে ভয় দেখায় তবে সহজেই তারা কাবু হয়ে যেতে পারেন। পরিণত হতে পারেন শিকারে। কিন্তু লিন্ডার মতো একজন কানাডীয় নারী কি করে এই প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে ১২ হাজার ডলার খোয়ালেন তা নিশ্চিতভাবেই ভাবনার বিষয়। এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে, এই প্রতারক চক্র খুবই প্রশিক্ষিত এবং অত্যন্ত স্মার্ট।

প্রতারকদের কৌশল এই ক্ষেত্রে এতটাই সূক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে উঠেছে তারা কানাডীয় আইন-শৃংখলা বাহিনীর ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে প্রতারণা করেও। প্রথম দিকে প্রতারকরা সশরীরে হাজির হয়ে প্রতারণার অর্থ সংগ্রহ করতো। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। এখন টেকনলজীর অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হওয়াতে প্রতারকদেরও সুবিধা হয়েছে অভাবনীয়। তাদেরকে আর সশরীরে হাজির হতে হয় না প্রতরণার অর্থ সংগ্রহ করতে।

আরসিএমপির মিডিয়া রিলেশন্স কর্মকর্তা সার্জেন্ট পেনি হারমেনের এক বক্তব্য থেকে জানা যায় – গত ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত  এ ধরণের ১৪,৫০০ প্রতারণা বা জালিয়তির রিপোর্ট নথিবদ্ধ করা হয়েছে। আর এই ১৪,৫০০ টি প্রতারণার অর্ধেকই নথিবদ্ধ করা হয়েছে ২০১৫ সালের আগষ্ট থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারী মাসের মধ্যে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই প্রতারকদের কার্মকান্ড প্রায় দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং আরো শঙ্কার বিষয় হলো প্রতারণার সব ঘটনা পুলিশের খাতায় নথিবদ্ধ হয় না। কানাডিয়ান এন্টি ফ্রড সেন্টারের হিসাব মতে মাত্র ৫% প্রতারণার ঘটনা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়। আর এই ৫% হলো উপরে উল্ল্লেখিত ১৪,৫০০ টি প্রতারণার ঘটনা যা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। তাহলে প্রকৃত সংখ্যা কত হতে পারে এবং এই প্রতারক চক্রের সদস্যদের সংখ্যাই বা কত হতে পারে একবার ভেবে দেখুন!

কানাডিয়ান এন্টি ফ্রড সেন্টার এর কর্মকর্তা ডেনিয়েল উইলিয়ামস এর প্রদত্ত এক বক্তব্য থেকে জানা যায় এই প্রতারকরা সাধারণত ইমিগ্রেশন, রিফিউজি এন্ড সিটিজেনশীপ কানাডা অথবা কানাডা রেভিনিউ এজেন্সীর কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি সেজে নতুন আসা ইমিগ্রেন্টদেরকে ফোনগুলো দেন। ফোন দিয়ে এই প্রতারকরা যে সকল হুমকী দেন তার মধ্যে আছে, ইমিগ্রেশনের কাগজ পত্র ঠিকমত পূরণ করা হয়নি, আরো ফি দিতে হবে ইত্যাদি। এগুলো না করলে কানাডা থেকে বহিস্কার করা হবে এমন হুমকীও দেওয়া হয়। আর এ জন্য প্রতারকরা ১,৩০০ ডলার থেকে শুরু করে ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত দাবী করেন।

কানাডায় আরেক ধরণের প্রতারণা হয় ব্যাংক ইন্সপেক্টর এর নাম করে।  এ ক্ষেত্রে প্রতারণার ধরণটা এরকম – প্রতারকদের কেউ একজন টার্গেটকে ফোন দিয়ে বলেন, “আমি অমুক ব্যাংকের একজন সিকিউরিটি কর্মকর্তা। আমাদের ব্যাংক লক্ষ্য করেছে যে কেউ একজন অবৈধভাবে আপনার একাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন।

আতংকিত হওয়ার জন্য এই একটি বাক্যই যথেষ্ট যদি কারো একাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা থেকে থাকে।

তখন আতংকিত টার্গেটকে সিকিউরিটি কর্মকর্তা সাজা ঐ লোকটি বলেন, “এ অপকর্মটি যে করছে তাকে আমরা দ্রুত সনাক্ত করার জন্য চেষ্টা করছি এবং আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোথায় ত্রুটি রয়েছে সেটি বের করার চেষ্টা করছি। ”

এরপর ঐ সিকিউরিটি কর্মকর্তা আতংকিত টার্গেটকে কাছাকাছি কোন পার্কিং লটে দেখা করতে বলবেন এবং কিছু ডলার সাথে নিয়ে আসতে বলবেন। তিনি বলবেন, এই ডলার রি-ডিপোজিট করা হবে কোথায় ত্র“টি সেটা সনাক্ত করার জন্য।

যদি কেউ বিশ্বাস করে তাদের হাতে ডলার তুলে দেন সেই ডলার আর ব্যাংক একাউন্টে ডিপোজিট হয় না, সেটি যায় ব্যাংকের সিকিউরিটি কর্মকর্তা সাজা ঐ প্রতারকের পকেটে। আরসিএমপি’র সূত্রে জানা যায়, এরকম এক প্রতারণার ঘটনায় সেন্ট আলবার্টের এক বাসিন্দা ৯ হাজার ডলার খুইয়েছেন।

কানাডিয়ান এন্টি ফ্রড সেন্টার এর ওয়েবসাইটে প্রতারকদের যে সকল প্রতারণা সম্পর্কে জনগনকে সতর্ক থাকার উপদেশ দেওয়া হয়েছে সেগুলো মধ্যে আরো আছে- ভূয়া পুরষ্কার প্রাপ্তির খবর দিয়ে প্রতারণা করার কৌশল, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, রোমান্স জালিয়াতি, চ্যারিটি জালিয়াতিসহ মোট ১৬ রকম জালিয়াতি। প্রতারকরা একটি জালিয়াতির কৌশল পুরানো হয়ে গেলে আরো নতুন নতুন জালিয়াতির কৌশল বের করে নেন।

উপরে যে সকল প্রতারণা বা জালিয়াতির কথা বলা হলো সেগুলো প্রতিহত করা বা অপরাধীদের গ্রেফতার করা অনেক সময় পুলিশের পক্ষেও সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই নিজে থেকে সতর্ক হওয়াই উত্তম পন্থা। কানাডা রেভিনিউ এজেন্সী এ ব্যাপারে কিছু টিপস দিয়েছে যা অনুসরণ করা যেতে পারে। টিপসগুলো নিুরূপ :

০ কখনোই ইন্টারনেট বা ইমেইলের মাধ্যমে পার্সোনাল ইনফরমেশন দিবেন না। কানাডা রেভিনিউ এজেন্সি কখনোই ইমেইলের মাধ্যমে পার্সোনাল ইনফরমেশন পাঠাতে বলে না।

০ আপনার এক্সেস কোড, ইউজার আইডি এবং পার্সওয়ার্ড গোপন রাখুন।

০ আপনার টেক্স রিটার্ন এর কাজ অন্যকে দিয়ে করানোর সময় নিশ্চিত হয়ে নিন যে ঐ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য। প্রয়োজনে তাদের রেফারেন্স চেক করে নিন।

০ ইমেইলে আসা কোন লিং এ ক্লিক করার আগে সতর্ক থাকুন। প্রতারকরা অনেক সময় এমনসব লিং পাঠায় যেগুলোতে ক্লিক করলে আপনার পার্সোনাল ইনফরমেশন চুরি হয়ে যেতে পারে।

০ টেলিফোনে কলার আইডি দেখে কখানো শতভাগ নিশ্চিত হবে না যে এটি সত্যিই কোন সরকারী প্রতিষ্ঠান বা কোন আসল বা খাঁটি প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে। প্রতারকরা এখন ফলস ফরংঢ়ষধু করাতে পারে আপনার টেলিফোনের কলার আইডিতে।

০ ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড হরিয়ে গেলে বা চুরি হলে সাথে সাথে ব্যাংককে তা অবহিত করুন ।

০ কোন প্রতারণাপূর্ণ টেলিমার্কেটিং বা ইমেইল পেলে তা কানাডিয়ান এন্টি ফ্রড সেন্টার কে অবহিত করুন তাদের অনলাইনের (িি.িধহঃরভৎধঁফপবহঃৎব.পধ) মাধ্যমে অথবা সরাসরি ১-৮৮৮-৪৯৫-৮৫০১ এই নাম্বারে ফোন করে।

রেভিনিউ এজেন্সীর এই টিপস ছাড়াও অর্থকড়ির বিষয়ে নিজের বিচার-বুদ্ধির প্রয়োগ করাটাও জরুরী। কেউ কিছু একটা অভিযোগ বা তথ্য নিয়ে হাজির হলো আর অমনি তা বিশ্বাস করতে শুরু করাটা যে কেমন বোকামী তা আমরা উপরে দেখলাম।

 

 

খুরশিদ আলম

সম্পাদক ও প্রকাশক

প্রবাসীকণ্ঠ

মন্তব্য