ক্ষমতায় লিবারেলের দুই বছর

 

এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে আবারো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে দলটি

 

ক্ষমতায় লিবারেল পার্টির দুই বছর পূর্তি হলো গত ৪ নভেম্বর। কিন্তু এখনো জনপ্রিয়তায় শীর্ষ অবস্থানে আছে দলটি। ছবি : টরন্টো স্টার

খুুরশিদ আলম : ক্ষমতায় লিবারেল পার্টির দুই বছর পূর্তি হলো গত ৪ নভেম্বর। কিন্তু এখনো জনপ্রিয়তায় শীর্ষ অবস্থানে আছে দলটি। যদি এই মুহুর্তে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তবে লিবারেল পার্টি আবারো নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাবে। বিভিন্ন জরীপ প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় এরকম তথ্যই উঠে এসেছে।

কয়েক মাস আগে গুয়ান্তানামোর সাবেক বন্দী কানাডার নাগরিক ওমর খাদারকে লিবারেল সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ১০.৫ মিলিয়ন ডলার প্রদান ও একই সাথে ক্ষমা প্রার্থনার পর বেশ হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছিল কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গণে। প্রধান বিরোধী দল কনজার্ভেটিভ পার্টি নানান ভাবে চেষ্টা করেছে এই ইস্যুটি কাজে লাগিয়ে জাস্টিন ট্রুডোর জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামাতে। কিন্তু তারা বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। বরং দেখা গেছে গত এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে জুন মাসের শেষের দিকে এসে তার জনপ্রিয়তা আরো ৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। Global News এর পক্ষে পরিচালিত Ipsos poll এর এক জরীপে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

Global News  কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জরীপ প্রতিষ্ঠান Ipsos poll এর ভাইস প্রেসিডেন্ট সেন সিম্পসন বলেন, ওমর ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান জাস্টিন ট্রুডো প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সত্যি। তখন সকলেরই ধারণা ছিল ট্রুডোর জনপ্রিয়তা হ্রাস পাবে। কিন্তু তারপরও জাস্টিন ট্রুডোর জনপ্রিয়তা না কমে বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টি বিস্ময়কর সন্দেহ নেই।

উল্লেখ্য যে, আফগানিস্তানে এক মার্কিন সৈন্য হত্যার অভিযোগে ওমরকে কুখ্যাত গুয়ান্তনামায়  প্রায় ১৩ বছর জেল খাটতে হয়েছে যেখানে তার উপর চালানো হয়েছিল অমানবিক অত্যাচার। কানাডার সুপ্রিম কোর্টও বলেছে গুয়ান্তানামোতে ওমরের উপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা আইনবিরুদ্ধ।

এদিকে জাস্টিন ট্রুডো ক্ষমতা গ্রহণের পর কানাডার অর্থনীতিও বেশ চাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে। ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছে অর্থনীতিতে। এটিও লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা বজায় থাকার পিছন কাজ করেছেন। গত দুই বছরে প্রায় ৪ লাখ নতুন জব ক্রিয়েট হয়েছে। অতীতের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে এই উন্নতী। এনার্জি সেক্টরের অবদানের কারণে এমনটি ঘটেছে।

স্ট্যাটিসটিকস্ কানাডা জানায়, গত মে মাসে রিয়েল গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৬ পার্সেন্ট। অর্থনীতিবিদদের ধারণা ছিল এই বৃদ্ধি ঘটতে পারে ০.২ পার্সেন্ট।

টিডি ব্যাংক এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান ডিপ্রাটো বলেন, কানাডায় প্রায় সব শিল্পখাতেই অর্থনৈতিক অর্জন ছিল স্বাস্থ্যকর। এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি মনে করছেন, অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য।

অবশ্য বাজেট ঘাটতি প্রথম তিন বছরের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের নীচে নামিয়ে আনার প্রতিশ্র“তি দিলেও ২০১৬-১৭ সালে তা ১৭.৮ বিলিয়নের নীচে নামাতে পারেনি লিবারেল সরকার।

পার্লামেন্টে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ছবি : ম্যাকলিনস

পার্লামেন্টে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ছবি : ম্যাকলিনস

স্মরণ করা যেতে পারে যে গত জাতীয় নির্বাচনের আগে লিবারেল পার্টি বেশ কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল। বাকী দলগুলোও দিয়েছিল এই নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি। অর্থাৎ ক্ষমতায় গেলে জনগনের সেবায় কোন দল কি কি করবে, তাদের পরিকল্পনা কি এগুলোর ফিরিস্তি। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দলগুলোর মধ্যে একধরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয় এই প্রতিশ্র“তি প্রদানের ক্ষেত্রে। ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে তখন মরিয়া হয়ে কোন কোন দল প্রতিশ্র“তির সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করতে থাকে। যে প্রতিশ্র“তি রক্ষা করতে পারবে না সেটি দিতেও কার্পন্য করে না কোন কোন দল। কারণ তখন মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতায় যাওয়ার। সব দলের সব প্রার্থীগণই এই কাজটি করে থাকেন। কেউ বেহিসাবীর মত প্রতিশ্র“তি দান করে যান আবার কেউ একটু সংযমের পরিচয় দেন।

তবে নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক, একটা সময় আসে যখন তাদের প্রতিশ্র“তিগুলো পালন হলো কি হলো না সেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভোটারগণ সাধারণত ঐ সব প্রতিশ্র“তির কথা খুব একটা মনে রাখেন না। তবে বিরোধী দলগুলো নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করার জন্য জনগণকে তখন স্বরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগে কি কি প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল এবং সেই প্রতিশ্র“তির কোনগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অর্থাৎ সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধারার চেষ্টা করা হয় এর মাধ্যমে যদি কোন প্রতিশ্র“তি রক্ষা করা না হয়ে থাকে।

অবশ্য এটাও ঠিক, সব নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি রক্ষা করা সম্ভব হয় না কোন দলের পক্ষেই। তারপরও নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দলগুলো প্রতিশ্র“তি দিয়ে যান। জাস্টিন ট্রুডোও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তবে প্রথম এক বছরের মধ্যেই জাস্টিন ট্রুডো আলোচিত বেশ কয়েকটি প্রতিশ্র“তিই রক্ষা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্র“তি গুলো ছিল:-

- মন্ত্রী পরিষদে আগের তুলনায় অধিক সংখ্যক মহিলার অন্তর্ভুক্তিকরণ। যার ফলে প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী বর্তমানে সমান সংখ্যাক পুরুষ ও মহিলা মন্ত্রী রয়েছে ট্রুডোর মন্ত্রীসভায়। ১৫ জন পুরুষ ও ১৫ জন মহিলা মন্ত্রী যাদের অধিকাংশের বয়স ৫০ এর নীচে।

- যাদের বাৎসরিক আয় ৪৫,২৮২ থেকে ৯০,৫৬৩ ডলারের মধ্যে তাদের জন্য ইনকাম টেক্স রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২০.৫% যা আগে ছিল ২২%।

- যাদের বাৎসরিক আয় বছরে ২০০,০০০ ডলারের বেশী তাদের জন্য নতুন ৩৩% টেক্স নির্ধারণ।

- অধিকতর উদার নতুন চাইল্ড বেনিফিট।

- বাধ্যতামূলক আদমশুমারীর লং ফরম প্রত্যার্পন করা।

- নির্দলীয় এবং মেধার ভিত্তিতে সিনেট মেম্বার মনোনয়নের জন্য একটি নিরপেক্ষ এ্যাডভাইজরী বোর্ড গঠন করা।

- সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা।

- সিরিয়া ও ইরাক থেকে কানাডিয়ান ফাইটার জেট প্রত্যাহার করা এবং মানবীয় সাহায্য জোরদার করার পাশাপাশি ইরাকী গ্রাউন্ড ফোর্সকে ট্রেনিং দেওয়া।

- ওল্ড এজ সিকিউরিটি এ্যান্ড গ্যারান্টিড ইনকাম সাপ্লিমেন্ট পাওয়ার জন্য বয়স ৬৭ থেকে কমিয়ে আবার ৬৫ এ করা।

- কানাডা পেনশন প্লান বর্ধিত করার জন্য প্রভিন্সগুলোর সঙ্গে কাজ করা।

- ইয়থ সামার জব প্রোগ্রামের বিস্তৃতিকরণ।

- স্টুডেন্ট গ্র্যান্ট ৫০% বৃদ্ধি করা।

- ই.আই (employment insurance) -এ ক্লেইম করার আগের যে ওয়েটিং টাইম তা কমানোর জন্য আইন পুনর্গঠন করা। ইআই এর জন্য যোগ্য হতে হলে মোট কর্মঘন্টার পরিমাণ কমিয়ে আনা। সূত্র : কানাডিয়ান প্রেস।

এদিকে ক্ষমতায় দ্বিতীয় বছর পূর্তির আগেই নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিতর্কিত আইন রদ করার পাশাপাশি ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত আরো কিছু বিতর্কিত আইন রদ করা হয়েছে। কানাডার ইমিগ্রেশন মন্ত্রী আহমদ হোসেন কানাডার নাগরিকত্ব আইন আরো সহজ করার জন্য গত ৪ অক্টোবর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলেন। এই পরিবর্তনসমূহ বিল সি-৬ এরই অংশ।

নাগরিকত্ব আইনে গুরুত্বপূর্ণ যে পাঁচটি পরিবর্তন আনা হয়েছে তার কয়েকটি গত জুন মাস থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। বাকি পরিবর্তনগুলো, বিশেষ করে কানাডায় শারীরিক উপস্থিতির সময়কাল ও ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট এর কার্যকারিতা শুরু হয়েছে গত ১১ অক্টোবর থেকে।

পরিবর্তিত আইনে বলা হয়েছে, কানাডায় দ্বৈত নাগরিকদের নাগরিকত্ব হরণ করা যাবে না যদি সেই ব্যক্তি কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত হয় বা কানাডার জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কোন কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত হয়। কারো বিরুদ্ধে এই জাতীয় অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে কানাডার প্রচলিত আইনেই তার বিচার করা হবে যেমনটি করা হয় কানাডার অন্যন্য নাগরিকদের বেলায়।

নাগরিকত্বের জন্য আবেদনকারীদেরকে এই মর্মে আর ঘোষণা দিতে হবে না যে নাগরিকত্ব লাভের পর তারা কানাডায়ই বাস করবে। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তারা চাকুরী বা অন্য কোন ব্যক্তিগত কারণে কানাডার বাইরে বাস করতে পারবে যদি তারা চায়।

নাগরিকত্ব লাভের জন্য কতদিন কানাডায় শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে সে বিষয়েও নতুন আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাবেক কনজারভেটিভ সরকার আইন করে গিয়েছিল কানাডার নাগরিকত্ব লাভ করতে হলে ইমিগ্রেন্টদেরকে ৬ বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৪ বছর কানাডায় বাস করতে হবে। তারও আগে নিয়ম ছিল ৪ বছরের মধ্যে তিন বছর কানাডায় থাকতে হবে। লিবারেল সরকার এখন বিল সি-৬ এ নিয়ম করেছে ৫ বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৩ বছর কানাডায় বাস করতে হবে সিটিজেনশীপের জন্য আবেদন করার আগে। তাছাড়া পার্মান্টে রেসিডেন্সী পাওয়ার আগের সময়টাও কাউন্ট করা হবে যারা ঐ সময়টা কানাডায় অবস্থান করছিলেন। তবে সেই সময়ের অর্ধেকটা কাউন্ট করা হবে। অর্থাৎ কেউ এক বছর অবস্থান করে থাকলে ৬ মাস কাউন্ট করা হবে।

নাগরিকত্ব লাভের জন্য ল্যাংগুয়েজ এন্ড নলেজ টেস্ট সহজতর করা হয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টি আইন করে গিয়েছিল যাদের বয়স ১৪ থেকে ৬৪, তাদেরকে ল্যাংগুয়েজ এন্ড নলেজ টেস্ট পাস করতে হবে নাগরিকত্ব পেতে হলে। বর্তমান সরকার নাগরিকত্ব লাভের জন্য ল্যাংগুয়েজ এন্ড নলেজ টেস্ট এর বয়স ১৮ থেকে ৫৪ বছর  করেছে।

ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত এই প্রতিশ্র“তিগুলোর পূরণ কানাডার বিভিন্ন ইমিগ্রেন্ট কমিউনিটিতে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। ফলে লিবারেল পার্টির প্রতি তাদের আনুগত্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কৌতুহলের বিষয় হলো কানাডার মেইন স্ট্রিমের মিডিয়া বিশেষ করে রক্ষণশীল মিডিয়াগুলো ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত এই প্রতিশ্র“তি পূরণকে মোটেও আমলে নিচ্ছে না। লিবারেল পার্টি কি কি নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি পূরণ করেছে তার তালিকা প্রকাশ করার সময় এই বিষয়টি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে বা খুবই কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। অথচ কানাডায় ইমিগ্রেশন আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কানাডার অর্থনীতিতে ইমিগ্রেন্টদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আজ অনস্বীকার্য।

জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল পার্টি যে কয়েকটি নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি এখনো রক্ষা করতে পারেনি বা পরিত্যাগ করেছে তার মধ্যে ইলেক্টরাল রিফর্ম অন্যতম। এটি নিয়ে সবচেয়ে বেশী বাকবিতন্ডা হয়েছে। নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির এক অভিযোগের বরাত দিয়ে TheTyee.ca জানায়, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে জাস্টিন ট্রুডো ১,৮১৩ বার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন নির্বাচিত হলে তিনি ইলেক্টরাল রিফর্ম এর জন্য প্রয়োজনী সব ব্যবস্থা করবেন এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনই হবে বর্তমান সিস্টেমে শেষ নির্বাচন।

লিবারেল পার্টি অবশ্য ক্ষমতায় আসার পর একটি স্পেশাল পার্লামেন্টারী কমিটি গঠন করেছিল বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে লিবারেল পার্টি তাদের মত পাল্টায় এবং ইলেক্টরাল রিফর্ম এর পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে। পরিত্যাগ করার পিছনে যে কারণ তারা দেখায় তা হলো, কানাডিয়ান ভোটারদের মধ্যে নাকি এ বিষয়ের প্রতি তেমন কোন আগ্রহ নেই।

ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর চলার পথ তুলনামূলকভাবে কিছুটা মসৃন ছিল বলা যায়। কারণ, প্রধান দুই বিরোধী দলেই ছিল ভারপ্রাপ্ত বা অন্তবর্তীকালীন নেতা। কনজারভেটিভ পার্টির তৎকালীন নেতা সাবেক প্রধামন্ত্রী স্টিফেন হারপার নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর দলীয় প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তখন অস্থায়ীভাবে ঐ পদের দায়িত্ব নেন রোনা এম্ব্রস। গত ২৭ মে এই দলের নতুন নেতা নির্বাচিত হন এন্ড্রু শিয়ার। তিনি প্রায় হঠাৎ-ই মঞ্চে আসেন।

রক্ষণশীল দলের লবি গ্রুপ ন্যাশনাল সিটিজেনস কোয়ালিশনের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট গেরি নিকোলাস বললেন “শিয়ার হলেন রুপকথার গল্পের মতো হঠাৎ আগত একজন প্রার্থী যিনি খুব গরমও নন আবার খুব শীতলও নন-”। কানাডিয়ান প্রেস এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে শিয়ারের সমর্থক লেসলি উইচার এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, “তিনি মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছেন এবং তিনি একজন খাঁটি মানুষ। তিনি এমন একজন মানুষ যার ওপর পুরো দল ভরসা করতে পারে। কোনও দিক থেকেই তিনি খুব দূরে নন।” ঐ প্রবন্ধে আরো উল্লেখ করা হয়, নিজের প্লাটফর্ম থেকে তিনি সৌখিন জিনিসের ওপর কর হ্রাস, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য এমনকি নিজের পাঁচটি মূল অগ্রাধিকার ঘোষণার সময়ও শিয়ার ছিলেন এমনই একজন প্রার্থী যাকে অনেকে মনে করেন দলটির প্রথম ও একমাত্র নেতা স্টিফেন হারপারেরই প্রতিধ্বনি।

শিয়ারের বয়স জাস্টিন ট্রুডো থেকেও কম। মাত্র ৩৮ বছর বয়স। জাস্টিন ট্রুডোর বয়স ৪৫। অন্যদিকে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন আরেক কম বয়সী রাজনীতিক যার নাম জাগমিত সিং। তার বয়সও ৩৮। আর জাগমিত সিং কানাডার জাতীয় একটি দলের প্রধান হয়ে অতিতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গেছেন। কারণ, কানাডার জাতীয় রাজনীতিতে দলীয় প্রধানের পদে শুরু থেকেই চলে আসছে শ্বেতাঙ্গদের একচ্ছত্র আধিপত্য। সেখানে কালো বা বাদামী বর্ণের কোন স্থান ছিল না। কিন্তু এবার সেই অচলায়তন ভাঙ্গলেন বাদামী বর্ণের জাগমিত সিং। তিনি কানাডার তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) নেতা নির্বাচিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের ক্ষমতা গ্রহণ করেন গত ১ অক্টোবর। এই দলটি গত জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছিল। নির্বাচন শুরুর কয়েক মাস আগে থেকে পরিচালিত বিভিন্ন জরীপে দেখা গিয়েছিল এনডিপি জয়ী হবে। অবশ্য নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসার সাথে সাথে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। এবং নির্বাচনের দিন ভোট গণনার পর দেখা যায় এই দল তৃতীয় স্থান দখল করে।

আগামী ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাটিস্টন ট্রুডোর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাচ্ছেন এই জাগমিত সিং এবং এন্ড্রু শিয়ার। এই দুই তরুন নেতা আগামী নির্বাচনে জাস্টিন ট্রুডোর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন নাকি জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় তার ধারে কাছে ভীড়তে পারবেন না সেটি সময়ই বলে দিবে। তবে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে জাস্টিন ট্রুডোর জনপ্রিয়তা এই দুই তরুণ নেতার চেয়ে অনেক বেশী।

গত অক্টোবর মাসের শেষের দিকে পাঁচটি জাতীয় জরীপ চালানো হয় জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যাচাই করার জন্য। ঐ পাঁচটি জরীপেই দেখা গেছে জাস্টিন ট্রুডো এগিয়ে আছেন। সিবিসি পুল ট্রাকার এই পাঁচটি জরীপের তথ্য-উপাত্ত যাচাই বাছাই করে দেখেছে লিবারেল পার্টি জনপ্রিয়তার বিচারে ৫.৮ পয়েন্টে এগিয়ে আছে। শতকরা হিসাবে লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা ৩৭.৪% এবং কনজারভেটিভ পার্টির জনপ্রিয়তা ৩১.৬%। নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির জনপ্রিয়তা ১৭.৯%। ২০১৫ সালের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা ২.১ পয়েন্ট কমেছে। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টির পয়েন্ট কমেছে ০.৩ এবং নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির কমেছে ১.৮ পয়েন্ট।

উপরের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে সিবিসি পুল ট্রাকার জানায়, এই মুহুর্তে নির্বাচন হলে লিবারেল পার্টি আবারো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে। আর এর সম্ভাবনা ৯৩%।

সিবিসি পুল ট্রাকার আরো জানায় সাম্প্রতিক জরীপ সমূহের গড় হিসাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে দেখা যায় এই মুহুর্তে নির্বাচন হলে লিবারেল পার্টি পাবে ১৮০টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য ১৬৯টি আসন এর প্রয়োজন। সেখানে ১৮০টি আসন পেলে বহুদূর এগিয়ে থাকবে লিবারেল পার্টি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে লিবারেল পার্টি আসন পেয়েছিল ১৮৪টি।

দলীয়ভাবে লিবারেল এর জনপ্রিয়তা সামান্য (২.১ পয়েন্ট) পরিমাণে হ্রাস পেলেও এখনো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই ক্ষমতায় পুননির্বাচিত হওয়ার অবস্থানে আছে। ব্যক্তিগতভাবে জাস্টিন ট্রুডোর জনপ্রিয়তায়ও তেমন দাগ পড়েনি। কানাডার রাজনীতিতে চমক সৃষ্টির পাশাপাশি অধিকতর সক্রিয় ও সহসী এবং সপ্রতিভ ফেডারেল সরকার উপহার দেওয়ার জন্য জাস্টিন ট্রুডো ইতিমধ্যেই প্রশংশিত হয়েছেন কানাডার সাধারণ মানুষের কাছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী এখনো রকস্টারদের মতই সমাদর পান।

জরীপ প্রতিষ্ঠান এবাকাস ডাটা’র প্রধান নির্বাহী ডেভিড কলেটো ইতিপূর্বে বলেন, গত নির্বাচনে জাস্টিন ট্রুডো তার সমালোচকদের বোকা বানিয়েছেন এবং ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজনীতিকদের প্রতি জনগনের প্রত্যাশাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

কানাডার জনগণ চান রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও অবারিত দ্বার। ট্রুডো কানাডার রাজনীতিতে সেই বিষয়গুলোই আনার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার করেছিলেন ঠিক তার উল্টোটি। জনগণ এমনকি পার্টির লোকদের কাছেও তিনি স্বচ্ছ ছিলেন না। মিডিয়াকে বরাবরই এড়িয়ে চলতেন। গোপনদ্বার বৈঠকে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে ও চাপিয়ে দিতে ভালবাসতেন।

কানাডার জরীপ প্রতিষ্ঠানের EKOS Research Associates এর প্রেসিডেন্ট ফ্রেঙ্ক  গ্র্যাভিস ইতিপূর্বে বলেন, কানাডিয়ানদের কাছে লিবারেল যদিও এখন একটি পছন্দের দল কিন্তু এই পরিস্থিতি বদলাতে সময় নিবে না যদি অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপের দিকে যায়। এটাই এখন বড় ধরণের ঝুঁকি সামনে। সাধারণ মানুষ ধৈর্য্য ধরবে। তবে পর্যবেক্ষন করবে এই দলটি তাদের প্রতিশ্র“তি ঠিকমত পালন করে কি না।

গ্র্যাভিসের এই ভবিষ্যতবাণী ছিল আরো প্রায় এক বছর আগের। এই এক বছরে কানাডার অর্থনীতিতে কোন নেতিবাচক প্রভাব পরেনি। বরং ব্যাপক অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে অর্থনীতিতে। এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে বলে অর্থনীতিবিধগণ মনে করছেন, অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য।

মন্তব্য